E-Rickshaw Off

স্মার্টফোন বদলাচ্ছে ‘কিল সুইচে’! চলতে চলতে স্তব্ধ হচ্ছে ই-রিকশা, তিন চিনা অ্যাপ নিষিদ্ধ করে সতর্ক করল কেন্দ্র

এমন কিছু ভিডিয়ো সমাজমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে যাতে দাবি উঠেছে যে কেউ চাইলে স্মার্টফোনে কিছু চিনা অ্যাপ ব্যবহার করে ই-রিকশার কাছে গিয়ে মাঝপথে সেগুলিকে বন্ধ করে দিতে পারেন।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০৪ জুলাই ২০২৬ ০৮:১২
Share:
০১ ১৯

আপাতনিরীহ একটি স্মার্টফোন অ্যাপ। সেই অ্যাপে আঙুল ছোঁয়াতেই স্তব্ধ হয়ে যেতে পারে রাস্তায় চলতে থাকা ই-রিকশা। চিনে উৎপত্তি হওয়া কয়েকটি অ্যাপ ডাউনলোড করে তার মাধ্যমে দূর থেকে ই-রিকশার মোটর বন্ধ করে দেওয়া বা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে একটি স্মার্টফোন কার্যত ই-রিকশার ‘কিল সুইচ’-এ পরিণত হচ্ছে। মাঝপথে আচমকাই ঝাঁকুনি দিয়ে থমকে যাচ্ছে বাহন। বিপাকে পড়ছেন চালক ও যাত্রী উভয়ই।

০২ ১৯

ভারতের বিভিন্ন শহর ও মফস্সলে ই-রিকশা এখন গণপরিবহণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কম খরচে যাতায়াতের সুযোগ করে দেওয়ায় এই যানবাহনের জনপ্রিয়তা দ্রুত বেড়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে একটি নতুন প্রযুক্তি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সম্প্রতি এমন কিছু ভিডিয়ো সমাজমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে যাতে দাবি উঠেছে যে কেউ চাইলে স্মার্টফোনে কিছু চিনা অ্যাপ ব্যবহার করে ই-রিকশার কাছে গিয়ে মাঝপথে সেগুলিকে বন্ধ করে দিতে পারেন।

Advertisement
০৩ ১৯

‘কিল সুইচ’ বলতে এমন একটি প্রযুক্তিকে বোঝায়, যার সাহায্যে দূর থেকে কোনও যানবাহনের বিদ্যুৎ সরবরাহ বা মোটরের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া যায়। সাধারণত নিরাপত্তা, চুরি রোধ বা বহর (ফ্লিট) পরিচালনার জন্য কিছু গাড়িতে এই ধরনের ব্যবস্থা থাকে। তবে যদি এটি অননুমোদিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের হাতে চলে যায়, তা হলে তা বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

০৪ ১৯

ই-রিকশাগুলির ক্ষেত্রেও তেমনটাই ঘটছে। বিষয়টি নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা শুরু হলেও আদতে এটি একটি বিপজ্জনক প্রবণতা। অনেক ই-রিকশায় স্মার্ট কন্ট্রোলার বা ব্লুটুথচালিত মোটর কন্ট্রোল সিস্টেম ব্যবহার করা হয়। চালক একটি মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে গাড়ির বিভিন্ন সেটিংস পরিবর্তন করতে পারেন। যেমন মোটরের সর্বোচ্চ গতি নির্ধারণ, ব্যাটারির তথ্য দেখা, ত্রুটির সঙ্কেত পরীক্ষা, মোটর লক বা আনলক করা। এ ছাড়াও সফ্‌টঅয়্যার আপডেট করার মতো জটিল কারিগরি কাজও করা হয়।

০৫ ১৯

বেশ কিছু ই-রিকশার মালিকের অভিযোগ, কিছু চিনা অ্যাপে এমন একটি ফিচার রয়েছে, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট অনুমতি থাকলে মোটরকে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া যায়। অর্থাৎ কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ই-রিকশা চলা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। যদিও এই অ্যাপটির চল এখানে নতুন নয় এবং ই-রিকশা চালকেরা দীর্ঘ দিন ধরেই একই ধরনের অ্যাপ ব্যবহার করে আসছেন।

০৬ ১৯

সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য হওয়ায় এই স্বল্প মূল্যের তিন চাকার যানটি সম্প্রতি ভারতীয় বাজার জুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। তবে এই ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর অনেকেই বৈদ্যুতিন তিন চাকার যান তৈরির পদ্ধতিতে একটি মৌলিক ত্রুটি খুঁজে পেয়েছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ সব সিস্টেমের কিছুতে পর্যাপ্ত পাসওয়ার্ড সুরক্ষা বা ব্যবহারকারী যাচাইকরণ (অথেনটিকেশন) ব্যবস্থা না থাকায় বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

০৭ ১৯

অনেক আধুনিক ই-রিকশায় ব্লুটুথ-সক্ষম ব্যাটারি সিস্টেম ব্যবহার করা হয়। প্রস্তুতকারক সংস্থা ব্যাটারির অবস্থা নিরীক্ষণের জন্য লসিজি, এবং ব্যাট-বিএমএসের মতো অ্যাপ ব্যবহার করে। ভারতের বাজারে বিক্রি হওয়া কিছু অসুরক্ষিত লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির একটি গুরুতর নিরাপত্তা দুর্বলতাকে কাজে লাগাতে পারে বলে অভিযোগ রয়েছে।

০৮ ১৯

এ সব ব্যাটারিতে ব্যবহৃত কিছু ব্যাটারি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম ব্লুটুথের মাধ্যমে কোনও পাসওয়ার্ড বা শক্তিশালী ব্যবহারকারী-যাচাইকরণ ছাড়াই সংযুক্ত হয়। ফলে ব্লুটুথের কার্যকর সীমার মধ্যে থাকা কেউ সংশ্লিষ্ট অ্যাপ ব্যবহার করে ব্যাটারির সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পারলে ই-রিকশার কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করার অধিকার পেয়ে যান।

০৯ ১৯

ব্লুটুথের কার্যকর সীমার মধ্যে থাকা যে কেউ সংশ্লিষ্ট মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করে কাছাকাছি থাকা একটি ই-রিকশার কন্ট্রোলারের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পারেন। সংযোগ সফল হলে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই গাড়িটির মোটর বন্ধ বা অচল করে দেওয়া সম্ভব। এ কারণেই নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা এই দুর্বলতাকে স্মার্টফোনভিত্তিক একটি সম্ভাব্য ‘কিল সুইচ’-এর সঙ্গে তুলনা করছেন।

১০ ১৯

তিনটি চিনা অ্যাপের কার্যক্রম নিয়ে অভিযোগ উঠতেই কেন্দ্রের তথ্য ও প্রযুক্তি মন্ত্রক ভারতের গুগ্‌ল প্লে স্টোর থেকে এই তিনটি অ্যাপ সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়েছে। সংবাদসংস্থা এএনআইয়ের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। এই অ্যাপগুলির সাহায্যে দূর থেকে ব্যাটারিচালিত যানবাহন বন্ধ করে দেওয়ার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অপব্যবহার হওয়া এই ধরনের অন্যান্য অ্যাপও ব্লক করা হবে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রের তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রক।

১১ ১৯

সওয়ারি নিয়ে যাওয়ার মাঝপথে ই-রিকশা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনায় ভুক্তভোগীদের দুর্দশার কথা সমাজমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া বিভিন্ন ভিডিয়োয় ছড়িয়ে পড়েছে। দেশের বিভিন্ন এলাকার চালকেরা জানিয়েছেন, তাঁদের ই-রিকশা হঠাৎ রাস্তার মাঝখানে থেমে যাওয়ায় যাত্রী ও চালক উভয়ই আটকা পড়ছেন। ই-রিকশাটি কোনও ভাবেই চালু করা সম্ভব হচ্ছিল না। সেটি হাত দিয়ে ঠেলতে হয়েছিল।

১২ ১৯

বহু রিকশাচালকের অভিযোগ, সিস্টেমটি আনলক করার জন্য তাঁর কাছ থেকে টাকার দাবি করা হয়েছে। টাকা দিলে তবে গড়াচ্ছে ই-রিকশা। তাঁদের দাবি, এই ত্রুটির কারণে বর্তমানে অসংখ্য ই-রিকশা মেরামতের জন্য বিভিন্ন গ্যারাজে পড়ে রয়েছে।

১৩ ১৯

চালকদের অভিযোগ, অ্যাপভিত্তিক এই সিস্টেমটি কী ভাবে কাজ করে, সে সম্পর্কে যাদের ধারণা রয়েছে তাঁরা সহজেই গাড়ির ব্যাটারি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে সংযোগ স্থাপন করে ই-রিকশা চালু বা বন্ধ করতে পারছেন। অন্য দিকে, প্রযুক্তিগত জ্ঞান না থাকায় অনেক চালক তাঁদের গাড়ি পুনরায় সচল করতেও হিমশিম খাচ্ছেন।

১৪ ১৯

বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যার মূল কারণ শুধু অ্যাপ নয়, বরং এর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। যদি অ্যাপে দুর্বল পাসওয়ার্ড, অপর্যাপ্ত এনক্রিপশন বা সহজে ভেঙে ফেলা যায় এমন ব্লুটুথ সংযোগ থাকে, তাহলে অননুমোদিত ব্যক্তি গাড়ির নিয়ন্ত্রণে প্রবেশ করতে পারে। এ ছাড়া অনেক সময় কম দামের কন্ট্রোলারে একই ডিফল্ট পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা হয় বা যথাযথ সাইবার নিরাপত্তা মানা হয় না। ফলে প্রযুক্তিটি অপব্যবহারের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

১৫ ১৯

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, ইন্টারনেট-সংযুক্ত যানবাহনের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও শক্তিশালী করতে হবে। প্রতিটি স্মার্ট কন্ট্রোলারে শক্তিশালী এনক্রিপশন, আলাদা পাসওয়ার্ড, মাল্টি-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন এবং নিয়মিত সফ্‌টঅয়্যার আপডেট করা জরুরি। এ ছাড়া নির্মাতাদের উচিত এমন ভাবে সিস্টেম ডিজ়াইন করা, যাতে চলন্ত অবস্থায় দূর থেকে মোটর সম্পূর্ণ বন্ধ করা না যায়। প্রয়োজনে শুধু গতি সীমিত করার মতো নিরাপদ ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে।

১৬ ১৯

এই ঘটনার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হল জননিরাপত্তার ঝুঁকি। ব্যস্ত সড়ক, স্কুল, বাজার ও জনবহুল এলাকায় প্রতি দিন বিপুল সংখ্যক ই-রিকশা চলাচল করে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেগুলিতে একাধিক যাত্রী থাকেন। চলন্ত অবস্থায় কোনও ই-রিকশা যদি হঠাৎ দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারায় বা বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে তা সড়ক দুর্ঘটনা, তীব্র যানজট, যাত্রীদের বিপাকে পড়া এবং চালকদের আর্থিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।

১৭ ১৯

উত্তরপ্রদেশের এক ই-রিকশা নির্মাতা সংস্থার আধিকারিক জানিয়েছেন, তাঁর সংস্থার তৈরি ১৫ হাজারের মতো রিকশা দিল্লির রাজপথে চলাচল করে। ব্যাটারি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (বিএমএস) কখনওই পাসওয়ার্ড-সুরক্ষিত করে তৈরি করা হয়নি। কারণ, নির্মাতারা স্বপ্নেও ভাবেননি এই নিরাপত্তার ঘাটতিটি এত বড় মাত্রার বিশৃঙ্খলার কারণ হয়ে উঠতে পারে।

১৮ ১৯

আর একটি ই-রিকশা নির্মাতার সংস্থার কর্ণধার জানিয়েছেন, এই সিস্টেমগুলি মূলত সার্ভিস ইঞ্জিনিয়ারদের রক্ষণাবেক্ষণ ও ত্রুটি শনাক্তকরণের কাজ সহজ করার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। সে কারণেই এতে কোনও পাসওয়ার্ড সুরক্ষা যোগ করা হয়নি।

১৯ ১৯

পুরনো ই-রিকশাগুলিতে এই ধরনের সমস্যা নেই। পুরনো মডেলের ই-রিকশাগুলোতে ব্লুটুথ-সুবিধা না থাকায় সেগুলো সাধারণত এই ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকির বাইরে থাকে। অন্য দিকে, নতুন মডেলের ই-রিকশাগুলোতে থার্ড-পার্টি অ্যাপের অননুমোদিত সংযোগ এড়াতে পাসওয়ার্ড-সুরক্ষিত ব্যবস্থা যুক্ত করা হয়েছে। ফলে তা এই ধরনের অপব্যবহারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্য ভাবে কমিয়ে দেয়।

ছবি: সংগৃহীত ও এআই সহায়তায় তৈরি।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement