Global internet risk

মার্কিন হানা ঠেকাতে ১০০০০০০০০০০০০০ ডলারের ‘সাত রাজার ধন’ পণবন্দি! ইরানি তুরুপের তাসে মাত হবেন ট্রাম্প?

ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের এই সংঘাত এখন আর কেবল ভৌগোলিক সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই। ইরানি কমান্ডাররা প্রথাগত নৌ বা বিমানশক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এঁটে উঠতে না পেরে অপ্রতিসম যুদ্ধকৌশল বেছে নিতে পারে বলে মনে করছেন অনেকেই। ধূসর এলাকা বলে পরিচিত ক্ষেত্রগুলিই ইরানের সম্ভাব্য সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়ে উঠতে পারে।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ১৪ মে ২০২৬ ১২:০৭
Share:
০১ ২০

সারা বিশ্বকে এক লহমায় অচল করে দিতে পারে ইরান। তার জন্য প্রয়োজন পড়বে না কোনও অত্যাধুনিক অস্ত্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবির পর আশঙ্কার কাঁটায় বিদ্ধ গোটা বিশ্ব। সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট অফ ইউনাইটেড স্টেটস অফ আমেরিকার এক বিস্ফোরক মন্তব্যের পর পৃথিবী জুড়ে ইন্টারনেট স্তব্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কার কথাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না অনেকে।

০২ ২০

গত রবিবার এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, মার্কিন বাহিনী মাত্র দু’সপ্তাহের মধ্যে ইরানের প্রতিটি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে সক্ষম। তাঁর দাবি, ইরান সামরিক ভাবে প্রায় পরাজিত এবং যুক্তরাষ্ট্র চাইলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ইরানের অবশিষ্ট সামরিক লক্ষ্যবস্তুগুলিকে গুঁড়িয়ে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে। চূড়ান্ত আঘাত হানতে আরও কিছু সামরিক পরিকাঠামোয় হামলা চালানো প্রয়োজন। তাতেই নাকি পরাজয় স্বীকার করতে বাধ্য হবে তেহরান।

Advertisement
০৩ ২০

ট্রাম্পের যুক্তি, যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে ইরানের প্রায় ৭০ শতাংশ গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। তিনি দাবি করেছেন যে, মার্কিন সেনাবাহিনী চাইলে মাত্র দু’সপ্তাহের মধ্যে ইরানের প্রতিটি একক লক্ষ্যবস্তু (যেমন ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি, অস্ত্র কারখানা এবং সামরিক কমান্ড সেন্টার) ধ্বংস করা সম্ভব।

০৪ ২০

আধুনিক যুদ্ধবিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের এই সংঘাত এখন আর কেবল ভৌগোলিক সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই। বরং এটি বর্তমানে বহুমুখী যুদ্ধের রূপ নিতে শুরু করেছে। ইরান চাইলেই আধুনিক বিশ্বের স্নায়ুকে বিকল করে দিতে পারে। আধুনিক বহুমুখী এবং ধূসর এলাকা বলে পরিচিত ক্ষেত্রগুলিই ইরানের সম্ভাব্য সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়ে উঠতে পারে।

০৫ ২০

ইরানি কমান্ডাররা প্রথাগত নৌ বা বিমানশক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এঁটে উঠতে না পেরে অপ্রতিসম যুদ্ধকৌশল বেছে নিতে পারে বলে মনে করছেন অনেকেই। বিশ্ব জুড়ে ইন্টারনেট পরিষেবাকে স্তব্ধ করে দেওয়ার জন্য সমুদ্রের তলদেশের ইন্টারনেট কেব্‌লগুলিকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে এমন আশঙ্কা কথাও উঠে এসেছে বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে।

০৬ ২০

হরমুজ় প্রণালীর জলরাশির নীচে জালের মতো বিছানো রয়েছে ‘সাবমেরিন ফাইবার-অপটিক কেব্‌ল’। গোটা বিশ্বের ইন্টারনেট সংযোগের মেরুদণ্ড এটি। এর উপর নির্ভর করে বিশ্বের অধিকাংশ ডিজিটাল কমিউনিকেশন, আর্থিক লেনদেন, ক্লাউড কম্পিউটিং ট্রাফিক, ভিডিয়ো কনফারেন্সিং, সমাজমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির কর্মকাণ্ড।

০৭ ২০

লোহিত সাগর এবং হরমুজ প্রণালীর তলদেশ দিয়ে যাওয়া ফাইবার অপটিক কেব্‌লগুলি এশিয়া, ইউরোপ এবং আফ্রিকার মধ্যে তথ্য আদানপ্রদান করে। কোনও একটি কেব্‌লও যদি কাটা পড়ে, ইন্টারনেট ট্রাফিক ভেঙে পড়তে পারে। ইরান যদি সরাসরি বা তার সহযোগী সশস্ত্র ছায়াবাহিনীর মাধ্যমে এই কেব্‌লগুলিতে আঘাত হানে, তবে দুনিয়া জুড়ে ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা এবং স্টক মার্কেট ধসে পড়তে পারে।

০৮ ২০

কারণ এই কেব্‌লগুলিই হল বিশ্বের ইন্টারনেট ব্যবস্থার স্নায়ুতন্ত্র। আন্তর্জাতিক ডিজিটাল ট্রাফিকের ৯৯ শতাংশেরও বেশি তথ্য বহন করে সমুদ্রতলে ডুবে থাকা কেব্‌লগুলি। ইরান তার ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে এই কেব্‌লগুলিকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে এমনটাই মনে করছেন সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞেরা।

০৯ ২০

এই কেব্‌লগুলিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে দেওয়ার অর্থ হল ১০ লক্ষ কোটি টাকার বাণিজ্যে সরাসরি আঘাত। গোটা পৃথিবীতে এক লহমায় ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যাওয়া। হরমুজ় কেবল খনিজ তেল এবং তরল প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহণের সামুদ্রিক রাস্তা নয়, এই প্রণালীর মধ্যে দিয়ে গিয়েছে গুরুত্বপূর্ণ প্রচুর সমুদ্রগর্ভস্থ ইন্টারনেট কেব্‌ল।

১০ ২০

হরমুজ় এবং বাব এল-মানদেব— সঙ্কীর্ণ এই দু’টি প্রণালী সমুদ্রের তলায় বিছোনো ফাইবার-অপটিক তারের এক বিশাল জালের ঠিক উপরে অবস্থিত। হাজার হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত এই সরু তারগুলো ভিডিয়ো কল, ইমেল থেকে শুরু করে ব্যাঙ্কিং লেনদেন এবং এআই পরিষেবা— বিশ্বের ইন্টারনেট ব্যবস্থাকে সচল রাখার প্রায় সমস্ত তথ্য বা ডেটা বহন করে।

১১ ২০

সমুদ্রের নীচে মাকড়সার জালের মতো ছড়িয়ে থাকা ১৫ লক্ষ কিলোমিটারের কেব্‌লগুলিকে আধুনিক সভ্যতার ‘ডিজিটাল ধমনী’ বললেও অত্যুক্তি হয় না। যতটা শক্তিশালী, ঠিক ততটাই অরক্ষিত। স্থলভাগের পরিকাঠামোর মতো সমুদ্রতলের এই কেব্‌লগুলিকে সর্ব ক্ষণ পাহারা দেওয়া কার্যত অসম্ভব।

১২ ২০

সাধারণত দুই থেকে সাত ইঞ্চি পুরু কেব্‌লগুলিকে ধীরগতিসম্পন্ন জাহাজের মাধ্যমে সমুদ্রগর্ভে স্থাপন করা হয়। এদের আয়ুষ্কাল কম করে ২৫ বছর। ইস্পাতের বর্ম ও একটি প্লাস্টিকের আবরণে মোড়ানো কেব্‌লের ভিতরে থাকে ফাইবারের তার। প্রতি সেকেন্ডে ২,৮৯,৬৮২ কিলোমিটার গতিতে ডেটা প্রেরণ করতে সক্ষম এই কেব্‌লগুলি।

১৩ ২০

বিশ্বের মহাসাগরগুলির উপর দিয়ে আড়াআড়ি ভাবে ৬০০টিরও বেশি সক্রিয় বা পরিকল্পিত ডুবো তার নিয়ে গঠিত সমগ্র বৈশ্বিক তারের নেটওয়ার্কটি পাঁচ লক্ষ মাইলেরও বেশি দীর্ঘ, যা দিয়ে পৃথিবী থেকে চাঁদে তিন বারেরও বেশি বার যাওয়া সম্ভব।

১৪ ২০

২০২৪ সালে, গাজ়ায় ইজ়রায়েল-হামাসের মধ্যে সংঘাত চলাকালীন হামাসের প্রতি সমর্থন জানাতে একটি বড় অভিযান চালায় ইরান সমর্থিত ইয়েমেনের বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুথি। হুথির তরফে লোহিত সাগরের তলায় বেশ কয়েকটি ইন্টারনেট কেব্‌ল নষ্ট করা হয়। ফলে এশিয়া এবং আফ্রিকার কিছু অংশে ইন্টারনেটের গতি উল্লেখযোগ্য ভাবে কমে যায়। জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় কেব্‌লগুলি সম্পূর্ণ মেরামত করতে কয়েক মাস সময় লেগে গিয়েছিল সে সময়।

১৫ ২০

একই ভাবে, ২০২৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সৌদি আরবের জেড্ডার কাছে লোহিত সাগরে একাধিক সমুদ্রগর্ভস্থ ফাইবার-অপটিক কেব্‌ল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেই ঘটনার পর ভারত, পাকিস্তান, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি এবং পশ্চিম এশিয়ার কিছু অংশে ইন্টারনেট পরিষেবা অচল হয়ে পড়েছিল।

১৬ ২০

লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালীর মধ্য দিয়ে বর্তমানে ২০টিরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ফাইবার অপটিক কেব্‌ল পাতা রয়েছে। এই কেব্‌লগুলি দিয়েই এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান ঘটে। ইরান যেহেতু হরমুজ প্রণালীর উত্তর উপকূলে অবস্থিত, তাই তারা সহজেই এই ইন্টারনেট পরিকাঠামোয় আঘাত হানতে পারে। কোনও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ছাড়াই শুধুমাত্র জলের নীচে থাকা তারগুলো কেটে দিয়ে ব্যাঙ্কিং ও আর্থিক পরিষেবার মূলে কুঠারাঘাত করতে পারে।

১৭ ২০

বর্তমান পরিস্থিতিতে হরমুজ়ে অবরোধ থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত কেব্‌লগুলি মেরামত করার ঝুঁকি নেওয়া হবে না। আর এক বার এই কেব্‌ল কেটে দিলে নাশকতার ষড়যন্ত্রে কারা যুক্ত তা শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন। সময়সাপেক্ষও বটে। অনেক সময় মেরামতের জাহাজ পৌঁছোতে কয়েক সপ্তাহ লেগে যায়। এক এক মুহূর্তে বিলম্বের মানে বৈশ্বিক অর্থনীতির অপূরণীয় ক্ষতি।

১৮ ২০

পশ্চিম এশিয়ার ক্ষেত্রে, হরমুজ় প্রণালী এবং লোহিত সাগরের মধ্যে দিয়ে ২০টিরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রগর্ভস্থ ফাইবার-অপটিক কেব্‌ল পাতা রয়েছে। এশিয়া এবং ইউরোপের মধ্যে বৈশ্বিক তথ্য ইন্টারনেট ট্র্যাফিকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সেতুর কাজ করে। এই ডিজিটাল ধমনীতে আঘাত হানলে তার জেরে রক্তাক্ত হবে এশিয়া, ইউরোপ-সহ পশ্চিম এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল।

১৯ ২০

কোনও দুর্ঘটনাবশতও যদি কেব্‌লগুলি বিপর্যস্ত হয়, তা মেরামত করতে পারে একমাত্র বিশেষ সুবিধাযুক্ত কিছু জাহাজ। হরমুজ়ের অচলাবস্থা না কাটলে সে সব করাও বেশ মুশকিল হবে। নিরাপত্তার কারণেই ২০২৫-এর অক্টোবর মাস থেকে এ ধরনের বিশেষ জাহাজ ওই অঞ্চলে যেতে পারেনি।

২০ ২০

আধুনিক সমরাস্ত্র বিশেষজ্ঞদের মতে, আমেরিকা যতই সামরিক পেশিশক্তির আস্ফালন করুক না কেন, ইরানের কাছে এমন এক অস্ত্র রয়েছে যা ব্যবহার করলে বিশ্বের ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এই সমুদ্র তলদেশের ধূসর ক্ষেত্রে হানা দিলে পারমাণবিক অস্ত্রও অকেজো। ইরান যদি সত্যিই এই লক্ষ কোটি ডলারের ব্যবসার পথ বন্ধ করার সক্ষমতা রাখে, তবে যুক্তরাষ্ট্র পরমাণু বোমার আঘাত হেনেও এই সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। এর ফলে পুরো বিশ্বের অর্থনীতি ‘কোল্যাটারাল ড্যামেজ’ বা আনুষঙ্গিক ক্ষতির শিকার হবে বলে মত বিশেষজ্ঞদের একাংশের।

ছবি: সংগৃহীত ও এআইসহায়তায় প্রণীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement