Gold Holding Rules in India

বাড়িতে কতটা সোনা রাখতে পারেন ভারতীয়েরা? কত রাখলে জেল? সোনা না কেনার মোদী-নিদানের পর উঠছে নানা প্রশ্ন

মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেকেই ভবিষ্যতের সঞ্চয় হিসাবে মন দেন গয়না কেনায়। ভারতীয় মহিলাদের হলুদ ধাতুর অলঙ্কারের প্রতি রয়েছে প্রবল আকর্ষণ। সোনাকে এ দেশে সৌভাগ্য ও সম্পদের প্রতীক বলে মনে করা হয়।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ১৩ মে ২০২৬ ১৫:৪৯
Share:
০১ ২১

পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাতের আবহে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডার (ফরেক্স) বাঁচাতে এক বছর দেশবাসীকে সোনা না কেনার আর্জি জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সপ্তাহান্তে হায়দরাবাদের এক জনসভা থেকে ওই মন্তব্য করেন তিনি। সেই আর্জির ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই, অর্থাৎ বুধবার থেকে সোনা-রুপোর উপর আমদানি শুল্ক এক ধাক্কায় ৯ শতাংশ বিন্দু বৃদ্ধি করল কেন্দ্র।

০২ ২১

আগে এই দুই ধাতুর আমদানিতে ৬ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছিল। এ বার তা বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করা হল। কেন্দ্রের এই সিদ্ধান্তে সোনা-রুপোর দাম এক ধাক্কায় অনেকটা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্বর্ণব্যবসায়ীরা।

Advertisement
০৩ ২১

সোনা এবং রুপোর উপর ১০ শতাংশ আমদানি শুল্ক এবং ৫ শতাংশ কৃষি পরিকাঠামো ও উন্নয়ন সেস চাপানো হয়েছে। ফলে আড়াই গুণ আমদানি শুল্ক বেড়ে গিয়েছে। কেন্দ্র আশাবাদী, এই সিদ্ধান্তের জেরে সোনা আমদানিতে রাশ টানা যাবে। বাণিজ্যে ঘাটতি কমবে এবং ডলারের নিরিখে টাকার পতনও আটকানো যাবে।

০৪ ২১

বিষয়টি নিয়ে দেশবাসীর মনেও আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি ভারতীয়দের অনেকের মনে এ প্রশ্নও জাগছে, ঠিক কত সোনা বাড়িতে মজুত করতে পারবেন তাঁরা? এ নিয়ে সরকারি নিয়মই বা কী?

০৫ ২১

মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেকেই ভবিষ্যতের সঞ্চয় হিসাবে মন দেন গয়নার দিকে। ভারতীয় মহিলাদের হলুদ ধাতুর অলঙ্কারের প্রতি রয়েছে প্রবল আকর্ষণ। সোনাকে এ দেশে সৌভাগ্য ও সম্পদের প্রতীক বলে মনে করা হয়। এ ছাড়া বরাবরই বিনিয়োগের নিরাপদ মাধ্যমের তকমা পেয়ে এসেছে হলুদ ধাতু।

০৬ ২১

আর তাই গয়না হোক বা কয়েন, প্রায় প্রত্যেকেই সাধ্য অনুযায়ী বাড়িতে কিছু সোনা রাখা পছন্দ করেন। ভারতীয় সংস্কৃতিতে উৎসবের সময়ে হলুদ ধাতু কেনা শুভ বলেও মনে করা হয়।

০৭ ২১

কত পরিমাণ সোনা বাড়িতে রাখা যাবে, সেই বিষয়ে সরকারের সুনির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। তার বেশি হলুদ ধাতু থাকলে গ্রেফতার, এমনকি জেল পর্যন্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আর তাই সোনা কেনার সময়ে সেই নিয়ম মনে রাখা প্রয়োজন।

০৮ ২১

‘সেন্ট্রাল বোর্ড অফ ডিরেক্ট ট্যাক্সেস’-এর (সিবিডিটি) নিয়ম অনুযায়ী, একজন বিবাহিত মহিলা নিজের কাছে সর্বোচ্চ ৫০০ গ্রাম পর্যন্ত সোনা রাখতে পারেন। অবিবাহিতদের ক্ষেত্রে এর পরিমাণ ২৫০ গ্রাম। পরিবারের পুরুষ সদস্যেরা ১০০ গ্রাম পর্যন্ত সোনা রাখতে পারবেন নিজেদের কাছে। ব্যক্তিগত ভাবে সোনা রাখার এই অনুমোদিত সীমার জন্য বিনিয়োগ সংক্রান্ত কোনও প্রামাণ্য নথির প্রয়োজন হয় না।

০৯ ২১

সরকারি নিয়মে এ-ও বলছে, নাগরিকদের কাছে বৈধ সীমার অতিরিক্ত সোনা থাকলে তার নথি থাকতে হবে। তবে বাড়িতে নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি হলুদ ধাতু থাকলে তল্লাশির সময়ে সরকারি আধিকারিক ইচ্ছা করলেই তা বাজেয়াপ্ত করতে পারবেন না।

১০ ২১

সোনার উপর আয়করের নিয়মটি বেশ সহজ। যদি কোনও ব্যক্তি ঘোষিত আয় বা করমুক্ত আয়ের (যেমন কৃষি) অর্থে হলুদ ধাতু কিনে থাকেন, তবে তাঁকে কোনও কর দিতে হবে না। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সোনার ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য।

১১ ২১

সোনা রাখার ক্ষেত্রে আয়কর না থাকলেও বিক্রির ক্ষেত্রে অবশ্যই কর দিতে হবে। যদি কোনও ব্যক্তি হলুদ ধাতু মজুত থাকার তিন বছর পর বিক্রি করেন, তা হলে সেখান থেকে প্রাপ্ত অর্থ ‘দীর্ঘমেয়াদি মূলধন লাভ’ (লং টার্ম ক্যাপিটাল গেনস) হিসাবে গণ্য হবে। এর পরিমাণ ২০ শতাংশ। কিন্তু গ্রাহক সোনা কেনার তিন বছরের মধ্যে তা বিক্রি করলে সেই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। সে ক্ষেত্রে লভ্যাংশ যুক্ত হবে ব্যক্তিগত আয়ের সঙ্গে। এর পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির উপর প্রযোজ্য করের ধাপের উপর ভিত্তি করে কর নেবে সরকার।

১২ ২১

অন্য দিকে সরকারি নিয়ম এ-ও বলছে, সোনা কেনার জন্য কোনও গ্রাহক এক দিনে দু’লক্ষ টাকার বেশি নগদ লেনদেন করতে পারবেন না। আয়কর আইনের ধারা ২৬৯এসটি অনুযায়ী, দু’লক্ষ টাকা পর্যন্ত সোনা নগদে কেনা যাবে। এর বেশি পরিমাণ অর্থ কার্ড বা চেকের মাধ্যমে পরিশোধ করতে হবে।

১৩ ২১

কোনও ব্যাক্তি যদি দু’লক্ষ টাকা বা তার বেশি মূল্যের সোনা কেনেন, তা হলে তাঁকে দোকানে প্যান কার্ডের বিবরণ জমা দিতে হবে। আয়কর আইনের ১১৪বি ধারা অনুযায়ী এটি বাধ্যতামূলক। আবার আয়কর আইনের ২৭১ডি ধারা অনুযায়ী, একদিনে দু’লক্ষ টাকার বেশি মূল্যের সোনা নগদে কিনলে, নগদ লেনদেনের সমপরিমাণ জরিমানা প্রযোজ্য হতে পারে।

১৪ ২১

অনেকে আবার ‘কাগুজে সোনা’ কিনতে পছন্দ করেন। যেমন ‘সোভেরেইন গোল্ড বন্ড’ (এসজিবি)। প্রথম বার ক্ষমতায় আসার পর ২০১৫ সালে এটি চালু করে নরেন্দ্র মোদী সরকার। এর মাধ্যমে সরকারের ঘর থেকে স্বর্ণ বন্ড কেনার সুযোগ পেত আমজনতা। সোভেরেইন গোল্ড বন্ডে একজন গ্রাহককে এক গ্রাম থেকে চার কিলো পর্যন্ত সোনা কেনার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। তবে বর্তমানে এই ব্যবস্থা বন্ধ হয়েছে। বন্ধ হওয়ার আগে পর্যন্ত যাঁরা কিনেছিলেন, তাঁদের জন্য অবশ্য বিষয়টি বৈধ।

১৫ ২১

২০১৬ সালের ১ ডিসেম্বর বাড়িতে সোনা রাখার ব্যাপারে একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি জারি করে সিবিডিটি। সেখানে বলা হয়, স্বর্ণালঙ্কার রাখার পরিমাণের কোনও ঊর্ধ্বসীমা নেই। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে থাকা হলুদ ধাতুর উৎস পরিষ্কার হতে হবে। পাশাপাশি, এটি আয়ের সঙ্গে সঙ্গতিবিহীন হলে চলবে না।

১৬ ২১

সোনার নথিপত্রে গরমিল থাকলেই যে অলঙ্কার আয়কর দফতর বাজেয়াপ্ত করবে, এমনটা নয়। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তিবিশেষে কিছু ছাড় মিলবে। উদাহরণ হিসাবে বিবাহিত মহিলাদের কথা বলা যেতে পারে। তাঁদের কাছে নির্দিষ্ট পরিমাণের চেয়ে অধিক স্বর্ণালঙ্কার থাকলে তা বাজেয়াপ্ত না করার নির্দেশ দিয়েছে সিবিডিটি।

১৭ ২১

১৯৬৮ সালে সোনা নিয়ন্ত্রণ আইন (গোল্ড কন্ট্রোল অ্যাক্ট) পাশ করে কেন্দ্র। ওই আইনে হলুদ ধাতু কেনার ঊর্ধ্বসীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ১৯৯০ সালে সেই আইন বাতিল করে সরকার।

১৮ ২১

প্রসঙ্গত, ভারত বিশ্বের মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম সোনা ব্যবহারকারী দেশ। দেশে সোনার চাহিদা মেটাতে বিপুল পরিমাণ হলুদ ধাতু আমদানি করতে হয়। তা ছাড়া দেশে সোনায় বিনিয়োগ করার চাহিদাও বেড়েছে বহু গুণ। সমস্ত দিক বিবেচনা করেই কেন্দ্র দেশবাসীকে এক বছর সোনা না কেনার পরামর্শ দিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। রবিবার প্রধানমন্ত্রী মোদী দেশবাসীর কাছে আবেদন করেছিলেন, তাঁরা যেন এক বছর সোনা কেনা বন্ধ রাখেন। বাঁচাতে বলেন দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডারও (ফরেক্স)।

১৯ ২১

কিন্তু কেন এই পদক্ষেপের কথা বলেছিলেন মোদী? বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত মহল বলছে, বিদেশ থেকে সোনা আমদানি করতে যে বৈদেশিক মুদ্রা খরচ হয় কেন্দ্রীয় সরকারের, বর্তমান পরিস্থিতিতে তাতেই রাশ টানতে চাইছে সরকার। এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে (১ মে পর্যন্ত) ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডার ৭৭৯ কোটি ৪০ লক্ষ মার্কিন ডলার কমে গিয়েছে, যা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৭৪ হাজার কোটি টাকা। তার ফলে দেশে এখন বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডার হয়েছে ৬৯,০৬৯ কোটি ৩০ লক্ষ মার্কিন ডলার, যা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৬৫ লক্ষ ২৪ হাজার কোটি টাকা।

২০ ২১

বিশ্বে সোনা কেনার ক্ষেত্রে ভারত অগ্রগণ্য। প্রতি বছর এ দেশের মানুষ ৭০০ থেকে ৮০০ টন সোনা কেনেন। কিন্তু এ দেশে সোনা মেলে মাত্র এক থেকে দু’টন। অর্থাৎ, প্রয়োজনের ৯০ শতাংশ সোনা আমদানি করতে হয়। সোনা আমদানি করতে গিয়ে প্রচুর পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা খরচ হয়।

২১ ২১

তা ছাড়া, পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাতের আবহে তেলের দাম বেড়েছে। বেড়েছে আমদানির খরচও। আমদানি-রফতানি ব্যবস্থায় অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। সোনা আমদানির খরচও বেড়েছে। তার ফলে চাপ পড়ছে ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডারে। আর সে কারণে প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীকে আপাতত এক বছর সোনা কিনতে বারণ করেছেন বলে মনে করা হচ্ছে।

সব ছবি: ফাইল থেকে।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement