Shilpi Jain-Gautam Singh Case

বিহারের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর ভাইয়ের আবাসনের পাশে অর্ধনগ্ন দেহ! ধর্ষণের অভিযোগ, দেশকে নাড়া দিয়েছিল যে মৃত্যুরহস্য

১৯৯৯ সালের ৩ জুলাই পটনায় ১২ ফ্রেজার রোডে একটি আবাসনের পাশের গ্যারাজে রাখা একটি গাড়ির মধ্যে থেকে উদ্ধার হয় দু’টি অর্ধনগ্ন দেহ। একটি দেহ পুরুষের। অন্যটি এক মহিলার। পরে মৃতদেহ শনাক্ত করা হয়।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ১৩ মে ২০২৬ ১০:৩৫
Share:
০১ ২০

১৯৯৯ সালের জুলাই মাস। দু’দশকেরও বেশি সময় আগে এক জোড়া মৃত্যুরহস্যকে কেন্দ্র করে শোরগোল পড়ে গিয়েছিল বিহারের রাজনীতিতে। সেই জোড়া মৃত্যুর ঘটনাটিকে বিহারের রাজনীতির সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর এবং ‘হাই-প্রোফাইল’ ঘটনাগুলির মধ্যে অন্যতম বলে মনে করা হয়। কথা হচ্ছে শিল্পী জৈন এবং গৌতম সিংহ মৃত্যুরহস্যের।

০২ ২০

১৯৯৯ সালের ৩ জুলাই পটনায় ১২ ফ্রেজার রোডে একটি আবাসনের পাশের গ্যারাজে রাখা একটি গাড়ির মধ্যে থেকে উদ্ধার হয় দু’টি অর্ধনগ্ন দেহ। একটি দেহ পুরুষের। অন্যটি এক মহিলার। পরে মৃতদেহ শনাক্ত করা হয়। মৃতার নাম ছিল শিল্পী জৈন এবং পুরুষের দেহটি গৌতম সিংহের। ২ জুলাই থেকে নিখোঁজ ছিলেন তাঁরা।

Advertisement
০৩ ২০

শিল্পী এবং গৌতম— দু’জনেই বিহারের বর্ধিষ্ণু পরিবার সন্তান। পটনার একটি বিখ্যাত কাপড়ের দোকানের মালিক উজ্জ্বলকুমার জৈনের কন্যা ছিলেন শিল্পী। পড়তেন পটনা কলেজে। পটনায় সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েও বাজিমাত করেছিলেন তিনি। জিতেছিলেন ‘মিস পটনা’র খেতাব। অন্য দিকে, গৌতম ছিলেন সেই সময় বিহারের শাসকদল আরজেডির যুব শাখার নেতা। তাঁর বাবা ছিলেন লন্ডনের চিকিৎসক। শোনা যায়, এই গৌতম এবং শিল্পী প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন।

০৪ ২০

এ-ও শোনা যায়, যুগলের সম্পর্ককে মান্যতা দেয়নি শিল্পীর পরিবার। গৌতমের রাজনৈতিক যোগের কারণেই নাকি মেয়ের সম্পর্ক মানতে চাননি শিল্পীর বাবা। অনেক চেষ্টা করেও শিল্পীর বাবাকে রাজি করাতে পারছিলেন না শিল্পী এবং গৌতম। সেই শিল্পী এবং গৌতমেরই অর্ধনগ্ন দেহ উদ্ধার হয়েছিল ১২ ফ্রেজার রোডের আবাসনের পাশের গ্যারাজে রাখা গাড়ি থেকে। কিন্তু শিল্পী এবং গৌতমকে কি খুন করা হয়েছিল, না কি তাঁরা আত্মহত্যা করেছেন? এ নিয়ে ধন্দ এখনও কাটেনি।

০৫ ২০

পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছিল, পরিবার পাশে না দাঁড়ানো সত্ত্বেও নিজেদের ভালবাসাকে পূর্ণতা দেন গৌতম এবং শিল্পী। দু’জনে নাকি গোপনে বিয়েও করেছিলেন। তবে সুখী হননি। পরিবারের সম্মতি না মেলার মানসিক যন্ত্রণা কুরে কুরে খাচ্ছিল ওই যুগলকে। তেমনটা জানিয়েছিলেন তাঁদের বন্ধুরাও। পাশাপাশি দাবি উঠেছিল, সেই কারণেই নাকি আত্মঘাতী হন যুগল।

০৬ ২০

প্রাথমিক ভাবে পুলিশের তদন্তে যুগল আত্মঘাতী হয়েছে বলে দাবি করা হলেও শিল্পী এবং গৌতমের অর্ধনগ্ন দেহ উদ্ধারের নেপথ্যে অন্য কোনও রহস্য রয়েছে বলেই সন্দেহ করেছিলেন তাঁদের পরিজনেরা। যুগলের দেহ উদ্ধারের এক সপ্তাহের মধ্যে মুখ খুলেছিলেন শিল্পীর বাবা-মা। তাঁরা দাবি করেছিলেন, খুন করা হয়েছে শিল্পীকে। যদিও গৌতমের পরিবার এ নিয়ে মুখ খোলেননি।

০৭ ২০

এই রহস্যমৃত্যুর আঁচ গিয়ে পড়ে বিহারের রাজনীতির আঙিনাতেও। যে আবাসনের পাশ থেকে শিল্পী এবং গৌতমের দেহ উদ্ধার করা হয়, সেটি ছিল তৎকালীন শাসক দল আরজেডির বিধানসভা পরিষদের সদস্য সাধু যাদবের।

০৮ ২০

সাধু ছিলেন বিহারের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা আরজেডি প্রধান লালুপ্রসাদ যাদবের শ্যালক। লালু-পত্নী রাবড়ী দেবীর ভাই। সেই সময় বিহারে ক্ষমতায় ছিল আরজেডিই। মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন রাবড়ি দেবী। ফলে এই জোড়া রহস্যমৃত্যু ঘিরে আরও সরগরম হয়েছিল বিহারের রাজনীতি।

০৯ ২০

শিল্পী এবং গৌতম হত্যারহস্য সংক্রান্ত অনেক প্রশ্নেরই উত্তর মেলেনি। তাঁদের দেহ যে গ্যারাজ থেকে উদ্ধার হয়েছিল, সেটি ভিতর থেকে তালাবন্ধ ছিল। ফলে বাইরের কারও পক্ষে তা জানা অসম্ভব ছিল যে, ওই গ্যারাজে গাড়ির মধ্যে দু’টি মৃতদেহ রয়েছে। তা হলে কে খবর দিল পুলিশে? কে-ই বা জানলেন যে, গাড়িতে মৃতদেহ রয়েছে?

১০ ২০

তৎকালীন পুলিশ সুপার এমএস ভাটিয়া দাবি করেছিলেন, ঘুমের ওষুধ বা বিষ খেয়ে আত্মঘাতী হয়েছেন শিল্পী এবং গৌতম। তবে সেই দাবি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। পাশাপাশি, মৃতদেহ উদ্ধারের সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাস্থলে পৌঁছে যান সাধুর বহু সমর্থক। একই সঙ্গে পুলিশ মৃতদেহ দু’টি তড়িঘড়ি সরিয়ে দেওয়ার পর এক কনস্টেবল গাড়িটি নিয়ে চলে যান। ফলে প্রমাণ নষ্ট নিয়েও প্রশ্নও উঠেছিল। প্রশ্ন উঠেছিল পরিবারের অনুমতি ছাড়া গৌতমের দেহের শেষকৃত্য করা নিয়েও।

১১ ২০

শিল্পী এবং গৌতমের রহস্যমৃত্যু নিয়ে রাজনৈতিক টানাপড়েনের জেরে শেষমেশ দেহ দু’টি উদ্ধারের ছ’দিন পর সেই ঘটনায় সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দেয় বিহার সরকার। আর এর পরই এই ঘটনায় এক নয়া তথ্য প্রকাশ্যে আসে।

১২ ২০

তদন্তভার হাতে নেওয়ার পরই শিল্পীর ‘ভ্যাজাইনাল ফ্লুইড’ সংগ্রহ করে তা ডিএনএ পরীক্ষার জন্য হায়দরাবাদে পাঠায় সিবিআই। ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্টে দাবি করা হয়, মৃত্যুর আগে ধর্ষণ করা হয়েছিল শিল্পীকে। এক জন নয়, অনেকে মিলে তাঁকে ধর্ষণ করেছিল। হইচই পড়ে যায় বিহারের রাজনীতিতে।

১৩ ২০

সেই সময় জল্পনা ছড়ায়, অন্যত্র খুন করা হয়েছিল শিল্পী এবং গৌতমকে। তার পর তাঁদের দেহ ওই গ্যারাজে গাড়ির মধ্যে রাখা হয়। এই ঘটনায় অন্যতম অভিযুক্ত হিসাবে সাধু যাদবের নাম উঠে আসে।

১৪ ২০

রক্তের নমুনার জন্য আরজেডির এক যুব নেতাকে তলব করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি তদন্তে সহযোগিতা করেননি। শোনা যায়, সাধুই নাকি সেই যুবক, যিনি ডিএনএ পরীক্ষা করাতে অস্বীকার করেছিলেন। সেই সময় বিরোধী দলনেতা সুশীল মোদী অভিযোগ করেছিলেন, মুখ্যমন্ত্রীর আত্মীয়ই অভিযুক্ত। তদন্তে উঠে আসে, গৌতমের ব্যবসায়িক অংশীদার ছিলেন সাধু। তাঁরা একসঙ্গে একটি রেস্তরাঁও চালাতেন।

১৫ ২০

অনেকে এমন অভিযোগও তুলেছিলেন যে, অপরাধীদের আড়াল করতে স্থানীয় থানার পুলিশ তথ্যপ্রমাণ লোপাট করেছে। ৪ বছর ধরে তদন্ত চালানোর পর মামলাটি বন্ধ করে দেয় সিবিআই। প্রাথমিক রিপোর্ট অস্বীকার করে আশ্চর্যজনক ভাবে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার তরফে জানানো হয়, এটা আত্মহত্যাই, ধর্ষণ বা খুন নয়।

১৬ ২০

সিবিআইয়ের এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত হয়নি শিল্পীর পরিবার। শিল্পীর বাবা-মা মনে করেন তাঁদের কন্যা এবং গৌতমকে খুন করা হয়েছিল। যদি আত্মহত্যাই হয়ে থাকে তা হলে তা জানাতে কেন ৪ বছর সময় নিল সিবিআই? এই প্রশ্ন তোলেন তাঁরা।

১৭ ২০

বোনের মৃত্যুরহস্য কিনারার জন্য ২০০৬ সালে শিল্পীর ভাই প্রশান্ত জৈন মামলাটি পুনরায় খোলার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু অপহরণ করা হয় তাঁকে। পরে প্রশান্তকে উদ্ধার করা হয়। কিন্তু তিনি আর সেই মামলা নিয়ে এগোননি।

১৮ ২০

গত বছর বিহার বিধানসভা নির্বাচনের সময় আবার খবরে উঠে আসে শিল্পী-গৌতম মৃত্যুরহস্যের ঘটনা। প্রাক্তন ভোটকুশলী তথা জনসূরাজ দলের প্রধান প্রশান্ত কিশোর (রাজনৈতিক মহলে তিনি পরিচিত পিকে নামে) দাবি করেছিলেন, শিল্পী-গৌতম মৃত্যু মামলায় অনেক অভিযুক্তের মধ্যে এক বিজেপি নেতার নাম ছিল।

১৯ ২০

পিকের দাবি, শিল্পী-গৌতম মৃত্যুর ঘটনায় ওই বিজেপি নেতার ভূমিকা নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠেছিল এবং ওই ঘটনায় তিনি অভিযুক্ত ছিলেন। যদিও পিকে ওই দাবি তুললেও বিষয়টি নিয়ে বিশেষ হইচই পড়েনি।

২০ ২০

দেশে অনেক অপরাধের খবরই প্রকাশ্যে আসে, যা ঘিরে হইচইও হয়। আবার সেই অপরাধ রহস্যের চাদরেই ঢাকা পড়ে থাকে। বিহারের শিল্পী এবং গৌতমের মৃত্যুও তেমনই এক রহস্য, যার কোনও কিনারা হয়নি।

সব ছবি: সংগৃহীত, ফাইল এবং প্রতীকী।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement