মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথের দু’দিনের মাথায় বড় ঘোষণা। বাংলায় কেন্দ্রীয় প্রকল্প ‘আয়ুষ্মান ভারত’ চালুর কথা ঘোষণা করলেন শুভেন্দু অধিকারী। চলতি বছরের ১১ মে, সোমবার নবান্নের ১৪ তলায় মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠক করেন তিনি। সেখানেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকে ছিলেন রাজ্যের পাঁচ মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ, অগ্নিমিত্রা পাল, অশোক কীর্তনিয়া, ক্ষুদিরাম টুডু এবং নিশীথ প্রমাণিক। এ ছাড়াও ছিলেন বেশ কয়েক জন পদস্থ আধিকারিক।
২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে বিনামূল্যের একটি স্বাস্থ্য প্রকল্প চালু করে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকার। এর পোশাকি নাম ‘আয়ুষ্মান ভারত প্রধানমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনা’। সরকারি অর্থে পরিচালিত বর্তমানে একে বিশ্বের বৃহত্তম স্বাস্থ্য প্রকল্প বললে অত্যুক্তি হবে না। এর সুবিধা নিতে অস্বীকার করে বাংলার তৎকালীন শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস। উল্টে ‘স্বাস্থ্য সাথী’ নামের একটি পৃথক প্রকল্প চালু রেখেছিলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে বিনামূল্যের একটি স্বাস্থ্য প্রকল্প চালু করে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকার। এর পোশাকি নাম ‘আয়ুষ্মান ভারত প্রধানমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনা’। সরকারি অর্থে পরিচালিত বর্তমানে একে বিশ্বের বৃহত্তম স্বাস্থ্য প্রকল্প বললে অত্যুক্তি হবে না। এর সুবিধা নিতে অস্বীকার করে বাংলার তৎকালীন শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস। উল্টে ‘স্বাস্থ্য সাথী’ নামের একটি পৃথক প্রকল্প চালু রেখেছিলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
এ বছরের বিধানসভা ভোটে তৃণমূলের পতন হতেই কবে থেকে রাজ্যে ‘আয়ুষ্মান ভারত’ চালু হবে, তা নিয়ে তুঙ্গে ওঠে জল্পনা। ১১ মে মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকেই তাতে সবুজ সঙ্কেত দিলেন নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। ফলে এ বার থেকে পরিবারপিছু বছরে পাঁচ লক্ষ টাকার স্বাস্থ্য বিমার সুবিধা পাবেন বঙ্গবাসী। কবে থেকে এতে আবেদন করা যাবে, তা অবশ্য স্পষ্ট করেনি রাজ্য প্রশাসন।
‘আয়ুষ্মান ভারত’ নিয়ে মাতামাতির নেপথ্যে অবশ্য একাধিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, এর আওতায় থাকা তালিকাভুক্ত হাসপাতালগুলিতে দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তরের চিকিৎসা পরিষেবা একরকম নিখরচায় পেয়ে থাকেন গ্রাহক। দ্বিতীয়ত, প্রবীণদের জন্য এটি চালু করেছে কেন্দ্র। পাশাপাশি, ঘরে বসে অনলাইনে ‘আয়ুষ্মান ভারত’-এর কার্ডের জন্য আবেদন করতে পারেন তাঁরা। এর জন্য প্রয়োজন হয় না একগুচ্ছ নথির।
নিয়ম অনুযায়ী, এ দেশের যে কোনও আয়ের ব্যক্তি পাঁচ লক্ষ টাকার এই কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য বিমার সুবিধা পাওয়ার যোগ্য। গ্রামীণ এলাকায় যাঁদের একটি মাত্র কাঁচাঘর (মাটির দেওয়াল ও চাল) রয়েছে, তাঁরাও ‘আয়ুষ্মান ভারতে’ আবেদন করতে পারবেন। পাশাপাশি, পরিবারে ১৬-৫৯ বছর বয়সি কোনও সক্ষম প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ সদস্য না থাকলেও মিলবে এর সুবিধা। এ ছাড়া তফশিলি জাতি ও উপজাতি এবং ভূমিহীন পরিবারগুলি পাবে ‘আয়ুষ্মান ভারত’-এর কার্ড।
গ্রামে বসবাসকারী দিনমজুরদের পরিবারকে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের আওতাভুক্ত রেখেছে কেন্দ্র। বিশেষ ভাবে সক্ষম ব্যক্তিরাও এতে আবেদন করতে পারবেন। শহরের ক্ষেত্রে হকার, মুচি, ফেরিওয়ালা, পরিচারিকা, আবর্জনা সংগ্রহকারী, নির্মাণ শ্রমিক, কলের মিস্ত্রি, রাজমিস্ত্রি, রঙের মিস্ত্রি, রিকশাচালক, পরিবহণ শ্রমিক, দোকানের কর্মচারী, ঝাড়ুদার এবং মালিরা ‘আয়ুষ্মান ভারত’-এর সুবিধা পাবেন।
‘আয়ুষ্মান ভারত’-এর কার্ড পেলে সংশ্লিষ্ট পরিবার বছরে পাঁচ লক্ষ টাকা পর্যন্ত স্বাস্থ্য বিমার সুবিধা পাবে। যে কোনও জটিল অস্ত্রোপচার বা গুরুতর অসুস্থতার চিকিৎসা খরচ পুরোপুরি রয়েছে এই প্রকল্পের আওতায়। শুধু তা-ই নয়, বাংলা বাসিন্দা হয়ে দিল্লি বা মুম্বইয়ের যে কোনও নথিভুক্ত হাসপাতালে নিখরচায় চিকিৎসা করাতে পারবেন তাঁরা। পরিবার বড় হলেও কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য বিমাটির সুবিধা পাওয়ায় সমস্যা নেই।
উল্লেখ্য, একটি পরিবারের ক’জন সদস্য ‘আয়ুষ্মান ভারত’-এর সুবিধা পাবেন, তার কোনও বিধিনিষেধ রাখেনি কেন্দ্র। কন্যাসন্তান এবং প্রবীণ সদস্যদের সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য বিমার আওতাভুক্ত করেছে মোদী সরকার। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে এই প্রকল্পে আসে বড় বদল। ৭০ বছর বা তার বেশি বয়সিদের এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তাঁদের জন্য আলাদা করে এতে একটি টপ আপের সুবিধাও দিয়ে রেখেছে কেন্দ্রীয় প্রশাসন।
নতুন নিয়মে বলা হয়েছে, ৭০ বছর বা তার বেশি বয়সি এ দেশের যে কোনও নাগরিক ‘আয়ুষ্মান ভারত’-এর জন্য আবেদন করতে পারবেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির স্বাস্থ্য বিমা থাকলেও এই প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনও বাধা নেই। কেন্দ্রীয় সরকারি স্বাস্থ্য প্রকল্প বা সিজিএইচএস (সেন্ট্রাল গভর্নমেন্ট হেল্থ স্কিম) এবং স্বাস্থ্য বিমার আওতাভুক্ত প্রাক্তন সৈনিকরাও (এক্স সার্ভিসমেন কনট্রিবিউটরি হেলথ স্কিম বা ইসিএইচএস) ‘আয়ুষ্মান ভারত’-এর সুবিধা নিতে পারেন।
যে সমস্ত পরিবার আগে থেকে ‘আয়ুষ্মান ভারত’-এর অন্তর্ভুক্ত, সেখানকার প্রবীণ সদস্যদের জন্য পাঁচ লক্ষ টাকার টপ আপের সুবিধা চালু করেছে কেন্দ্র। তাঁরা আলাদা করে পাঁচ লক্ষ টাকার অতিরিক্ত স্বাস্থ্য বিমা পাবেন। সংশ্লিষ্ট অর্থ শুধুমাত্র প্রবীণদের জন্য বরাদ্দ থাকবে। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সেটা ভাগ হবে না। ৭০ ঊর্ধ্বদের জন্য এটা যে বাড়তি পাওনা, তা বলাই বাহুল্য।
২০২৪ সালের নতুন নিয়মে আরও বলা হয়, যাঁদের পাকা বাড়ি আছে এবং নিজস্ব দু’চাকা বা চারচাকার যান যাঁরা ব্যবহার করেন, তাঁরাও আয়ুষ্মান ভারতে আবেদন করতে পারবেন। কেন্দ্রীয় সরকারি স্বাস্থ্য বিমা প্রকল্পের সুবিধা পাবেন সরকারি চাকুরিজীবী, মাসে ১০ হাজার টাকার বেশি আয় করা পরিবার, ৫০ হাজার টাকার বেশি কিসান ক্রেডিট কার্ডের আওতায় থাকায় কৃষক এবং আয়কর প্রদানকারীরা।
‘আয়ুষ্মান ভারতে’ আবেদনের একটি সুনির্দিষ্ট পোর্টাল রয়েছে। সেটা হল beneficiary.nha.gov.in। সেখানে ঢুকে গ্রাহককে মোবাইল নম্বর দিয়ে লগ ইন করতে হবে। এর পর আধারভিত্তিক ই-কেওয়াইসি সম্পন্ন করতে হবে তাঁকে। এই প্রক্রিয়া শেষ হলে স্বাস্থ্য বিমার ডিজিটাল কার্ড ডাউনলোড করে নিতে পারবেন ওই ব্যক্তি।
২০২৪ সালের অক্টোবরে আয়ুষ্মান ভারত প্রধানমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনার সঙ্গে কর্মী রাজ্য বিমা যোজনাকে (ইএসআইসি) মেশানোর প্রস্তাবে সিলমোহর দেয় কেন্দ্র। দিল্লিতে হওয়া ইএসআই-এর মেডিক্যাল বেনিফিট কাউন্সিলের বৈঠকে এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় শ্রম মন্ত্রক। ফলে বর্তমানে ইএসআই-এর সদস্যেরা আয়ুষ্মান ভারতের অধীনে চিকিৎসার সুবিধা পাচ্ছেন।
২০১৬ সালের ডিসেম্বরে বাংলায় ‘স্বাস্থ্য সাথী’ নামের একটি প্রকল্প চালু করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৎকালীন তৃণমূল সরকার। সেখানেও পরিবারপিছু বছরে পাঁচ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বিনামূল্যের স্বাস্থ্য বিমা দিচ্ছিল প্রশাসন। এর দু’বছরের মাথায় ‘আয়ুষ্মান ভারত’-এর ঘোষণা হওয়ায় মোদী প্রশাসনের বিরুদ্ধে প্রকল্প চুরির অভিযোগ তোলে ঘাসফুল শিবির। যদিও তাতে আমল দেয়নি পদ্মশিবির।
গত ১০ বছরে ‘স্বাস্থ্য সাথী’ প্রকল্পে নাম নথিভুক্ত করিয়েছেন বাংলার কয়েক কোটি মানুষ। তাঁদের কাছে আছে স্বাস্থ্য সাথী কার্ড। ‘আয়ুষ্মান ভারত’ চালু হলে রাজ্যের এই পুরনো বিমা প্রকল্পটির সুবিধা মিলবে কি না, তা অবশ্য স্পষ্ট নয়। পাশাপাশি, যাঁরা ‘স্বাস্থ্য সাথী’র সুবিধা পেয়েছেন, তাঁরা ‘আয়ুষ্মান ভারতে’ আবেদন করতে পারবেন কি না, তা-ও খোলসা করেননি নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
নবান্নে মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে শুভেন্দু বলেন, ‘‘বাংলায় চালু থাকা কোনও প্রকল্প বন্ধ করবে না বিজেপি সরকার।’’ তাঁর এই মন্তব্যের জেরে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। যদিও বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি, আয়ুষ্মান ভারতের সঙ্গে অচিরেই মিশতে পারে স্বাস্থ্য সাথী। আগামী ১৮ মে ফের মন্ত্রিসভার বৈঠক করবেন নতুন মুখ্যমন্ত্রী। তার মধ্যে গোটা বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকে আরও কয়েকটি বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজ্যের বিজেপি সরকার। সরকারি চাকরির পরীক্ষায় আবেদনের জন্য বয়সের ঊর্ধ্বসীমা পাঁচ বছর বৃদ্ধি করেছেন নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। পাশাপাশি, সীমান্তে কাঁটাতার দেওয়ার জন্য আগামী ৪৫ দিনের মধ্যে বিএসএফ-কে জমি দেওয়ার কথাও ঘোষণা করেছেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমা যোজনা, পিএমশ্রী, বিশ্বকর্মা, বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও, উজ্জ্বলা যোজনা-সহ বিভিন্ন কেন্দ্রীয় প্রকল্পেও রাজ্যকে সক্রিয় ভাবে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন বিজেপির মন্ত্রিসভা। জেলাশাসকদের দ্রুত এই সংক্রান্ত আবেদন কেন্দ্রীয় মন্ত্রকে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে রাজ্য সরকার।