প্রকাশ্যে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান তথা ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের মিথ্যাভাষণ! ভারত নয়, ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর আবহে পাকিস্তানের তরফেই বার বার যোগাযোগ করা হয়েছিল আমেরিকার সঙ্গে। তেমনটাই উঠে এল ‘ফরেন এজেন্টস রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট (ফারা)’-এর অধীনে দাখিল করা মার্কিন লবিং সংক্রান্ত নথিতে।
সেই নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৬ থেকে ৯ মে-র মধ্যে, অর্থাৎ ভারতের ‘অপরাশেন সিঁদুর’-এর সময় ভারত-পাক সংঘাত চলাকালীন ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক, প্রতিরক্ষা এবং জাতীয় নিরাপত্তা কর্তাদের সঙ্গে বার বার যোগাযোগ করে পাকিস্তান।
সংবাদসংস্থা এএনআইয়ের পর্যালোচনা করা ওই নথি অনুযায়ী, ওই সময় আমেরিকার আইনপ্রণেতা, মার্কিন কংগ্রেসের সদস্য, আমেরিকার অর্থ মন্ত্রকের কর্মকর্তা, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা, প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত ব্যক্তি এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে প্রায় ৬০ বার যোগাযোগ করেছিল পাকিস্তান। তেমনটাই তথ্য রয়েছে ওই নথিতে।
গত বছর পহেলগাঁও হত্যাকাণ্ডের পর ভারত-পাক সংঘাত এবং ভারতের অপরাশেন সিঁদুরের বর্ষপূর্তির আবহে রবিবার পাকিস্তান সেনাপ্রধান আসিম মুনির দাবি করেন, গত বছর অপরাশেন সিঁদুরের পর সৃষ্ট সংঘাতের জেরে নয়াদিল্লি মধ্যস্থতা এবং যুদ্ধবিরতির জন্য আমেরিকার দ্বারস্থ হয়েছিল।
রাওয়ালপিন্ডির জেনারেল হেডকোয়ার্টার্সে ভারতের সঙ্গে চার দিনব্যাপী সংঘাতকে ইসলামাবাদ কর্তৃক দেওয়া নাম ‘মার্কা-ই-হক’-এর প্রথম বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ভাষণ দেওয়ার সময় ওই দাবি করেন পাক সেনাপ্রধান। পাশাপাশি তিনি এ-ও দাবি করেন, ওই সংঘাতের সময় পাকিস্তানের কৌশল ভারতের চেয়ে ভাল ছিল।
মুনির বলেন, “আমেরিকার নেতৃত্বের মাধ্যমে মধ্যস্থতার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিল ভারত, যা পাকিস্তান বৃহত্তর আঞ্চলিক শান্তির স্বার্থে মেনে নিয়েছিল।” ভারত ‘অপারেশন সিঁদুর’ শুরু করার প্রায় এক বছর পর আসিম মুনির ওই মন্তব্য করেন। তবে যুদ্ধবিরতি এবং মার্কিন মধ্যস্থতা সংক্রান্ত সর্বশেষ দাবিটি উত্থাপনের আগে বিগত এক বছরে বার বার ভারতকে লক্ষ্য করে বিবৃতি দিয়েছেন মুনির।
কিন্তু মুনিরের সেই দাবি ভুল বলে প্রমাণ করে দিল ‘ফারা’র অধীনে দাখিল করা নথি। ওই নথি থেকে জানা যায়, পহেলগাঁও জঙ্গি হামলার জবাবে ভারত ‘অপারেশন সিঁদুর’ শুরু করার পর এবং পাকিস্তান ও পাক-অধিকৃত কাশ্মীরে জঙ্গি কাঠামোয় হামলা চালানোর পর ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক অংশীদারদের সঙ্গে বার বার যোগাযোগ করছিল ইসলামাবাদ। ওই সময় পাকিস্তানের তরফে আমেরিকার সঙ্গে প্রায় ৬০ বার যোগাযোগ করা হয়েছিল বলে নথিতে উঠে এসেছে।
ভারত ‘অপারেশন সিঁদুর’ শুরুর পর বিবৃতি দিয়েছিল, এটি পাকিস্তান এবং পাক-অধিকৃত কাশ্মীর জুড়ে ছড়িয়ে থাকা জঙ্গি পরিকাঠামো ভেঙে দেওয়ার লক্ষ্যে একটি ত্রি-বাহিনী অভিযান।
২০২৫ সালের ৬ এবং ৭ মে-র মধ্যবর্তী রাতে জারি করা এক বিবৃতিতে প্রতিরক্ষা মন্ত্রক জানায়, ভারতীয় সেনা জঙ্গিযোগ থাকা নয়টি ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। বিবৃতিতে মন্ত্রক আরও জানিয়েছিল, পাকিস্তানের কোনও সামরিক ঘাঁটিকে ওই অভিযানে লক্ষ্যবস্তু করা হয়নি।
ওই অভিযানের পরেই ভারত-পাক সংঘাত শুরু হয়। চলে প্রায় চার দিন। পরে সংঘাত থামার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, আমেরিকার মধ্যস্থতার কারণেই নয়াদিল্লি এবং ইসলামাবাদের মধ্যে সমঝোতা হয়েছে। যদিও ভারত সেই দাবি খারিজ করে দিয়েছিল।
পরে পাক সেনাপ্রধান মুনির আবার দাবি করেন, ‘অপারেশন সিঁদুর’-পরবর্তী সংঘাতে মধ্যস্থতার জন্য আমেরিকার দ্বারস্থ হয়েছিল ভারত। তবে ‘ফারা’র ওই নথি থেকে ইঙ্গিত মেলে, ভারত ৬ মে হামলা শুরু করার পর পাকিস্তানের প্রতিনিধিরা আলাদা আলাদা করে একাধিক বার আমেরিকার সঙ্গে যোগাযোগের আর্জি জানায়, যার বেশির ভাগই ছিল মার্কিন কংগ্রেস এবং সেনেট দফতরের সঙ্গে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূতের বৈঠকের আবেদন।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই নথিগুলিতে নাকি বার বার পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূতের বৈঠক সংক্রান্ত অনুরোধের বিবরণ ব্যবহার করা হয়েছে। ৭ এবং ৮ মে-র নথিগুলিতে নাকি আবার ক্রমবর্ধমান ভাবে দু’দেশের মধ্যে তৈরি হওয়া উত্তেজনা সম্পর্কিত আলোচনার উল্লেখ পাওয়া গিয়েছে।
পাকিস্তানের তরফে নথিভুক্ত যোগাযোগগুলির মধ্যে ছিল আমেরিকার সামরিক বাহিনীর প্রাক্তন সদস্য ব্রায়ান মাস্ট, ‘হাউস মাইনরিটি’র নেতা হাকিম জেফ্রিসের সঙ্গে যুক্ত জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং ‘সিনেট মেজরিটি’র নেতা জন থুনের কার্যালয়ের কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ। সেগুলিতে ‘হাউস মেজরিটি’র নেতা স্টিভ স্কেলিসের সঙ্গে যুক্ত উপদেষ্টাদের সঙ্গে যোগাযোগের কথাও নথিভুক্ত করা হয়েছে।
বেশ কয়েকটি নথি অনুযায়ী, ৯ মে ভারত-পাক সংঘাত তীব্রতর হওয়ায় আমেরিকার প্রতিরক্ষা এবং জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের কেন্দ্র করে প্রায় ২০ থেকে ২৫টি আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। বেশ কয়েকটি জায়গায় ‘প্রতিরক্ষা অ্যাটাশের সঙ্গে বৈঠকের অনুরোধ’-এর উল্লেখ ছিল, যা ওয়াশিংটনে নিযুক্ত পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা অ্যাটাশে ব্রিগেডিয়ার ইরফান আলির সঙ্গে সম্পর্কিত।
এই নথিগুলি পহেলগাঁও জঙ্গি হামলার পর দু’দেশের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধির সময়কালে ওয়াশিংটনে ভারত এবং পাকিস্তানের ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়ও তুলে ধরেছে। এই তথ্যগুলি সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর পূর্ববর্তী প্রতিবেদনের সঙ্গে মিলে যায়, যেখানে বলা হয়েছিল যে ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি নিয়ে বেশ কয়েক বার আলোচনা হয়েছিল। দুই দেশের ‘ডিরেক্টর জেনারেল অফ মিলিটারি অপারেশনস (ডিজিএমও)’-এর মধ্যে একটি হটলাইনের মাধ্যমে যোগাযোগের পর অবশেষে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় দুই দেশ।
যুদ্ধবিরতি ঘোষণার আগে ভারত জানিয়েছিল, পাকিস্তানের ‘ডিরেক্টর জেনারেল অফ মিলিটারি অপারেশনস (ডিজিএমও)’ তৎকালীন ভারতীয় ডিজিএমও রাজীব ঘাইয়ের সঙ্গে প্রথম যোগাযোগ করেন। পরে নয়াদিল্লি যুদ্ধবিরতির ঘোষণা করে এবং একই সঙ্গে জানায় যে এই প্রক্রিয়ায় কোনও তৃতীয় পক্ষ জড়িত ছিল না।
এএনআই কর্তৃক পর্যালোচিত নথিগুলোতে ‘অপারেশন সিঁদুর’ শুরু হওয়ার পর এবং যুদ্ধবিরতির আগে ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনও ভারতীয় কূটনৈতিক বা প্রতিরক্ষা-সম্পর্কিত যোগাযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অন্য দিকে, নথির তথ্য থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে ভারতীয় হামলার সময় আমেরিকার রাজনীতিবিদ, মার্কিন কংগ্রেসের দফতর এবং প্রতিরক্ষা ও জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে ধারাবাহিক যোগাযোগ ছিল পাকিস্তানের।
অর্থাৎ আমেরিকার সেই নথি অনুযায়ী স্পষ্ট, ‘অপারেশন সিঁদুর’-পরবর্তী ভারত-পাক সংঘাত নিয়ে মুনির যা বলেছেন তা সর্বৈব ভাবে মিথ্যা। অন্তত তেমনটাই মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞেরা। বিশেষজ্ঞদের দাবি, বিশ্বের বুকে পাকিস্তানের ‘বীরত্ব’ প্রমাণ করতেই ‘মিথ্যাচার’ করছেন পাক সেনাপ্রধান। তবে এর নেপথ্যে পাকিস্তানের অন্য দেশে অস্ত্র বিক্রির ফিকির থাকতে পারে বলেও মত বিশেষজ্ঞদের একাংশের।