চোখে-মুখে রক্ত, সারা শরীরে আঁকা রয়েছে উল্কি। চরিত্রের উগ্রতা ফুটে উঠছে অভিব্যক্তিতে। চলতি বছরে প্রেমদিবসের আগে বিশাল ভরদ্বাজের পরিচালনায় প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাওয়ার কথা ‘ও’ রোমিয়ো’র। সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত প্রচারমূলক ঝলকে বলি অভিনেতা শাহিদ কপূরকে এমন ‘অ্যাংরি’ অবতারেই দেখা গিয়েছে। ছবিমুক্তির আগেই তা নিয়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক।
বলিপাড়া সূত্রে খবর, ‘ও’ রোমিয়ো’ ছবিটি মুম্বইয়ের কুখ্যাত গ্যাংস্টার হুসেন উস্তারার জীবনকাহিনি নিয়ে তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু হুসেনের কন্যা সনবার শেখ ছবির পরিচালক বিশাল ভরদ্বাজ এবং প্রযোজক সাজিদ নাদিয়াদওয়ালাকে আইনি নোটিস পাঠিয়েছেন।
ছবিনির্মাতাদের কাছে দু’কোটি টাকা ক্ষতিপূরণও দাবি করেছেন সনবার। তার ফলে বাতিল করে দেওয়া হয়েছে ছবির ‘ট্রেলার’ মুক্তির অনুষ্ঠান। পাশাপাশি, হুসেন উস্তারাকে নিয়ে কৌতূহলও জন্মেছে দর্শকমহলের। কে ছিলেন হুসেন উস্তারা? কুখ্যাত আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন দাউদ ইব্রাহিমের সঙ্গে তাঁর চিরপ্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণই বা কী?
মুম্বইয়ে জন্ম হুসেন উস্তারার। যদিও তাঁর আসল নাম হুসেন শেখ। কিশোর বয়স থেকেই মারদাঙ্গায় জড়িয়ে পড়তেন হুসেন। ১৬ বছর বয়সে হাতাহাতি করতে গিয়ে রাগের বশে প্রতিপক্ষের কাঁধে খুর চালিয়ে দিয়েছিলেন হুসেন।
‘উস্তারা’ শব্দের অর্থ খুর। খুর চালিয়ে প্রতিপক্ষকে মেরে ফেলেছিলেন ১৬ বছর বয়সি হুসেন। তার পর থেকেই হুসেন উস্তারা নামে পরিচিত হতে শুরু করেন তিনি। নিজের একটি ছোটখাটো দলও তৈরি করে ফেলেছিলেন হুসেন।
সংবাদমাধ্যম সূত্রে খবর, হুসেনের দলে যাঁরা কাজ করতেন তাঁদের অধিকাংশই ছিলেন প্রতিবন্ধী। কিন্তু অবৈধ কাজকর্ম সারতে তাঁরা ছিলেন অতি দক্ষ। হুসেনের কর্মকাণ্ডের কথা পৌঁছে গিয়েছিল দাউদের কানেও। হুসেনের দিকে বন্ধুত্বের হাতও নাকি বাড়িয়ে দিয়েছিলেন তিনি।
মুম্বইয়ের আন্ডারওয়ার্ল্ডের বেতাজ বাদশা হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন হুসেন। কারও কাছে মাথা নোয়ানো স্বভাববিরুদ্ধ ছিল তাঁর। দাউদ বন্ধুত্বের হাত বাড়ালেও তাঁর সঙ্গে কাজ করতে চাননি হুসেন। বরং অন্ধকারজগতের কুখ্যাত ডনকে প্রতিপক্ষ বানিয়ে ফেলেছিলেন তিনি।
হুসেনের সঙ্গে দাউদের সরাসরি শত্রুতা আরও বাড়তে শুরু করেছিল তাঁর জীবনে স্বপ্নাদিদি আসার পর। স্বপ্নাদিদির আসল নাম ছিল আশরাফ খান। স্বপ্নার স্বামী মেহমুদ কালিয়া খুন হয়েছিলেন দাউদের কারণে।
দাউদ নাকি মেহমুদকে তাঁর হয়ে কাজ করতে বলেছিলেন। কিন্তু দাউদের প্রস্তাবে রাজি হননি মেহমুদ। শত্রুর সংখ্যা বাড়াতে চাননি দাউদ। পুলিশকে মেহমুদের ব্যাপারে গোপন তথ্য পাচারের দায়িত্ব নিজেই নিয়েছিলেন দাউদ। পুলিশ এনকাউন্টারে মারা যান মেহমুদ।
স্বামীর মৃত্যুর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য শত্রুর শত্রুর সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন স্বপ্নাদিদি। তিনি নাকি দেহব্যবসায়ী সেজে হুসেনের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। পরে নিজের উদ্দেশ্যের কথা হুসেনকে জানিয়েছিলেন স্বপ্নাদিদি।
সেই সময় দাউদের শত্রুসংখ্যা কম ছিল না। স্বপ্নাদিদিকেও অন্যদের মতো ভেবে ফেলেছিলেন হুসেন। তিনি ভেবেছিলেন, স্বপ্নাদিদি হয়তো মুখেই বড় বড় কথা বলছেন। আসল সময় ভয় পেয়ে পালিয়ে যাবেন তিনি। স্বামীর হত্যার প্রতিশোধ নিতে পারবেন না। কিন্তু হুসেনকে ভুল প্রমাণিত করেন স্বপ্নাদিদি।
বোরখা ছেড়ে অন্য পোশাক পরতে শুরু করেন স্বপ্নাদিদি। হুসেনের দলে যোগ দিয়ে অস্ত্র চালানো থেকে শুরু করে লড়াইয়ের কৌশল, মোটরবাইক চালানো পর্যন্ত শিখে ফেলেছিলেন তিনি। স্বপ্নাদিদির সঙ্গে হাত মিলিয়ে দাউদের অবৈধ ব্যবসার ক্ষতি করা শুরু করেছিলেন হুসেন।
মুম্বইয়ের পুরুষশাসিত আন্ডারওয়ার্ল্ডের ‘লেডি ডন’ হয়ে উঠেছিলেন স্বপ্নাদিদি। পাশে পেয়েছিলেন হুসেনকে। দাউদকে খুন করার পরিকল্পনা করেছিলেন দু’জনে। বেশ কয়েক বার যৌথ ভাবে দাউদের উপর আক্রমণও চালিয়েছিলেন তাঁরা।
হুসেন এবং স্বপ্নাদিদি একজোট হয়ে দাউদকে নাকানিচোবানি খাইয়ে ছে়ড়েছিলেন। কানাঘুষো শোনা যায়, স্বপ্নাদিদির প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন হুসেন। কিন্তু স্বপ্নাদিদি সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। প্রেমে পড়লে মূল লক্ষ্য থেকে মনোযোগ সরে যেতে পারে ভেবে হুসেনের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখতে শুরু করেছিলেন স্বপ্নাদিদি।
১৯৯৪ সালে মুম্বইয়ের বাড়িতে দাউদের ছায়াসঙ্গী ছোটা শাকিলের দলবলের হাতে মারা যান স্বপ্নাদিদি। এলোপাথাড়ি ভাবে ২২ বার কুপিয়ে মেরে ফেলা হয় তাঁকে। স্বপ্নাদিদির মৃত্যুর পরেও আন্ডারওয়ার্ল্ডে সক্রিয় ছিলেন হুসেন।
একসঙ্গে নাকি তিনটি ফোন ব্যবহার করতেন হুসেন। কাজকর্মের জন্য একটি ফোন, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার জন্য একটি ফোন এবং তৃতীয় ফোনটি শুধুমাত্র প্রেমিকার সঙ্গে কথা বলার জন্য ব্যবহার করতেন তিনি। হুসেনের অগুনতি নারীসঙ্গের কথাও কারও অজানা ছিল না।
১৯৯৮ সালের সেপ্টেম্বর মাস। সংবাদমাধ্যম সূত্রে খবর, প্রেমিকার সঙ্গে লুকিয়ে দেখা করতে গিয়েছিলেন হুসেন। দেখা করে বেরোনোর সময় গাড়িতে উঠতে যাচ্ছিলেন তিনি। তখনই হুসেনকে ঘিরে ফেলে ছোটা শাকিলের দলবল। গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যায় তাঁর দেহ। মৃত্যু হয় দাউদের চরম প্রতিপক্ষের।