ধীরে ধীরে কমছে শিশুর জন্মের হার! অন্য দিকে বুড়ো হচ্ছে আমজনতা। ভারতের শরীরে এ বার চিন, জাপান, ইতালি ও স্পেনের ‘জনহ্রাস’ রোগের উপসর্গ দেখা দেওয়ায় উদ্বিগ্ন কেন্দ্র। সম্প্রতি, এ ব্যাপারে একটি সমীক্ষা রিপোর্ট জমা পড়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের ঘরে। তাতেই উঠে এসেছে এ দেশের মহিলাদের সন্তান প্রজননের চাঞ্চল্যকর ছবি।
চলতি বছরের মে মাসে সরকারের ঘরে জমা পড়ে ‘স্যাম্পল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম স্ট্যাটিস্টিক্যাল রিপোর্ট, ২০২৪’। এই সমীক্ষা চালিয়েছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীনস্থ ‘রেজিস্ট্রার জেনারেল অ্যান্ড সেন্সাস কমিশনার’। সেখানে বলা হয়েছে এই প্রথমবার প্রতিস্থাপন স্তরের নীচে নেমে গিয়েছে ভারতের মোট প্রজনন হার বা টিএফআর (টোটাল ফার্টিলিটি রেট)। ফলে আগামী দিনে কমতে পারে জনসংখ্যা।
উল্লেখ্য, বছরের পর বছর ধরে স্থিতিশীল জনসংখ্যা বজায় রাখতে হলে দেশের মাতৃশক্তিকে একটি সুনির্দিষ্ট হারে সন্তানের জন্ম দিতে হবে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় একেই বলা হয় টিএফআরের প্রতিস্থাপন স্তর। ভারতের ক্ষেত্রে সেটা ২.১। কিন্তু কেন্দ্রীয় সমীক্ষা রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ওই সূচক ১.৯তে নেমে যায়। আর তাই সরকারের কপালে পড়েছে চিন্তার ভাঁজ।
‘স্যাম্পেল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম স্ট্যাটিস্টিক্যাল’ শীর্ষক রিপোর্টে আবার শিশুর জন্মের হারের ক্ষেত্রে একটি সুস্পষ্ট আ়ঞ্চলিক বৈপরীত্য প্রকাশ্যে এসেছে। উদাহরণ হিসাবে বিহারের কথা বলা যেতে পারে। সেখানকার মাতৃশক্তির প্রজনন হার ২.৯, যা সারা দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ স্থানে রয়েছে উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ এবং রাজস্থান। এই তিন রাজ্যে শিশুর জন্মের হার যথাক্রমে ২.৬, ২.৪ এবং ২.৩।
অর্থাৎ সমীক্ষা রিপোর্ট অনুযায়ী বিহার, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ এবং রাজস্থানে টিএফআরের প্রতিস্থাপন স্তর এখনও জাতীয় গড়ের উপরেই রয়েছে। কিন্তু, সূচক সবচেয়ে নীচে নেমেছে দিল্লিতে। রাজধানীর মাতৃশক্তির সন্তান উৎপাদনের হার ১.২। রাজস্থান বাদে দিয়ে পশ্চিমের অন্য রাজ্য এবং দক্ষিণ ভারতে মহিলাদের প্রজনন হার উল্লেখ্যযোগ্য হারে কমে গিয়েছে।
জন্মের নিরিখে দিল্লির চেয়ে মাত্র একধাপ উপরে রয়েছে তামিলনাড়ু, কেরল এবং পশ্চিমবঙ্গ। এই তিন রাজ্যে মোট প্রজনন হার ১.৩ বলে সমীক্ষা রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্ধ্রপ্রদেশ, জম্মু-কাশ্মীর, মহারাষ্ট্র এবং পঞ্জাবের ক্ষেত্রে সূচক দাঁড়িয়েছে ১.৪-এ। হিমাচল প্রদেশ, কর্নাটক এবং তেলঙ্গানায় আবার এটি ১.৫ রেকর্ড করা হয়েছে।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, সমীক্ষকেরা গ্রামীণ এবং শহুরে এলাকার আলাদা আলাদা নমুনা সংগ্রহ করেছেন। সেখানেও একটা বিভাজনের ছবি প্রকাশ্যে এসেছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, এ দেশের গ্রামীণ এলাকায় মোট প্রজননের হার শহরাঞ্চলের থেকে বেশি। গ্রামে শিশু জন্মের হার ২.১। শহরে সেটা ১.৫-এ নেমে গিয়েছে। এই প্রবণতা প্রায় প্রতিটি রাজ্য এবং কেন্দ্রশাসিত এলাকায় দেখা গিয়েছে।
তবে এ ক্ষেত্রে একমাত্র ব্যতিক্রমী ছবি দেখা গিয়েছে কেরলে। দক্ষিণী রাজ্যটির শহর এলাকায় শিশুর জন্মের হার বেশি। প্রতিবেশী তামিলনাড়ুর ক্ষেত্রে আবার গ্রাম ও শহরের মাতৃশক্তির প্রজনন হার সমান। সমীক্ষা জানিয়েছে, গত পাঁচ দশক ধরে ধীরে ধীরে ভারতে কমেছে টোটাল ফার্টিলিটি রেট। তাই অবিলম্বে এ ব্যাপারে কেন্দ্রের নজর দেওয়া প্রয়োজন।
তথ্য বলছে, ১৯৭১-’৮১ সালের মধ্যে ভারতে মোট জন্মহার ৫.২ থেকে কমে ৪.৫-এ নামে আসে। ১৯৯১ সালে আরও হ্রাস পেয়ে ওই সূচক দাঁড়ায় ৩.৬-এ। ২০২৪ সালে সেটা ১.৯-এ পৌঁছে গিয়েছে। ১৯৭১ সালে গ্রামীণ এলাকায় প্রজনন হার ছিল ৫.৪। সেটাই ২০২৪ সালে ২.১-এ নেমে এসেছে। শহরের ক্ষেত্রে ৪.১ থেকে হ্রাস পেয়ে সূচক ১.৫-এ এসে থেমেছে।
বড় রাজ্য এবং কেন্দ্রশাসিত এলাকাগুলির মধ্যে গত ১০ বছরে দিল্লির জন্মহার সর্বাধিক দ্রুত হ্রাস পেয়েছে। ২০১২-’১৪ থেকে ২০২২-’২৪ সালের মধ্যে এর পরিমাণ ২৯.৪ শতাংশ বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে রয়েছে গুজরাত ও তামিলনাড়ু। ওই সময়সীমার মধ্যে এই দুই রাজ্যে জন্মহার হ্রাস পাওয়ার পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ২৫ ও ২৩.৫ শতাংশ।
সমীক্ষকেরা জানিয়েছেন, জন্মহার হ্রাস পাওয়ার প্রবণতা সবচেয়ে কম বিহারে। সেখানে টিএফআর কমেছে মাত্র ৯.৪ শতাংশ। বিহারের উপরে থাকা তিনটি রাজ্য হল ছত্তীসগঢ়, হিমাচল প্রদেশ এবং পঞ্জাব। এর মধ্যে ছত্তীসগঢ়ের প্রজনন হার হ্রাস পেয়েছে ১১.৫ শতাংশ। বাকি দুই রাজ্যের ক্ষেত্রে তা ১১.৮ শতাংশ বলে জানা গিয়েছে।
সমীক্ষার রিপোর্টে সাধারণ প্রজনন হার বা জিএফআর-এও (জেনারেল ফার্টিলিটি রেট) পরিবর্তন লক্ষ করা গিয়েছে। এর জন্য ১৫-৪৯ বছর বয়সি প্রতি ১,০০০ জন মহিলার শিশু জন্মের হার সংক্রান্ত নমুনা সংগ্রহ করে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের আওতাধীন দফতর। তাদের দাবি, জাতীয় ভাবে জিএফআর ১২ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। ২০১২-’১৪ সালের মধ্যে এটা ছিল ৭৮.৮। ২০২২-’২৪ সালের মধ্যে তা ৬৪.৬-তে নেমে এসেছে।
ভারতে গ্রামীন এলাকার জিএফআর ৮৬.২ থেকে কমে ৭১.৯ হয়েছে। শহরের ক্ষেত্রে সাধারণ জন্মহার ৬১.২ থেকে হ্রাস পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৫১। এ ক্ষেত্রেও প্রথম স্থানে আছে দিল্লি। সমীক্ষকেরা রাজধানীর জিএফআরে ২৯.৯ শতাংশের পতন রেকর্ড করেছেন। দিল্লির শহরাঞ্চলে এর পরিমাণ ৩৫.৬ শতাংশ বলে জানা গিয়েছে।
প্রতি ১,০০০ জন মহিলার নিরিখে শিশুর জন্মের হার বিহারে সবচেয়ে বেশি। সমীক্ষার রিপোর্টে সেটা ৯৬ উল্লেখ করে হয়েছে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে রয়েছে উত্তরপ্রদেশ এবং রাজস্থান। এই দুই রাজ্যে প্রজনন হার যথাক্রমে ৮৩ এবং ৮২.৭ বলে জানা গিয়েছে। গত এক দশকে একমাত্র বিহারের শহরাঞ্চলে বেড়েছে শিশুর জন্মের হার। সেটা ৭৫.৯ থেকে ৭৭.৫ হয়েছে।
সমীক্ষকেরা জানিয়েছেন, জন্মহারের এ-হেন বিভাজনের জেরে উত্তরের তুলনায় দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলিতে প্রবীণ নাগরিকের সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। উদাহরণ হিসাবে কেরল এবং তামিলনাড়ুর কথা বলা যেতে পারে। এই দুই রাজ্যে মোট জনসংখ্যার ১৫.১ শতাংশ এবং ১৪.২ শতাংশের বয়স ৬০ বছর বা তার বেশি। অন্য দিকে দেশের নবীনতম রাজ্য হিসাবে উঠে এসেছে বিহার।
বিহারের জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশের বয়স ১৪ বছরের নীচে। অন্য দিকে শিশু মৃত্যুর হার মধ্যপ্রদেশ এবং উত্তরপ্রদেশে সবচেয়ে বেশি। এই দুই রাজ্যে পাঁচ বছরের কম বয়সি প্রতি ১,০০০ জনের মধ্যে মারা যাওয়ার সংখ্যা ৪১। সেখানে কেরলে এই হার মাত্র নয়। দেশের গ্রামীণ এলাকায় পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুমৃত্যুর হার ৩২। শহরে সেটা ১৯-এ দাঁড়িয়ে আছে।
এ দেশের নবজাতকের মৃত্যু হারও ভয়াবহ। সমীক্ষার রিপোর্টে বলা হয়েছে, জন্মের প্রথম সপ্তাহে প্রাণ হারাচ্ছে ৫২.৭ শতাংশ শিশু। অন্য দিকে প্রথম ২৮ দিনের মধ্যে মৃত্যু হওয়া নবজাতকের সংখ্যা ৭২.৮ শতাংশ। ২০২৪ সালে প্রায় ৯৫.৪ শতাংশ সন্তান প্রসব হয়েছে কোনও না কোনও সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্র। শহর ও গ্রামাঞ্চলে এই সংখ্যা যথাক্রমে ৯৭.৯ ও ৯৪.৬ শতাংশ।
২০২৪ সালে মোট সন্তান প্রসবের ৭১.৭ শতাংশ সরকারি হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ঘটেছে বলে জানা গিয়েছে। ষদিও তার পরেও নবজাতকের মৃত্যু অন্য প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। কারণ, কোনও রকম চিকিৎসা তত্ত্বাবধান ছাড়াই প্রায় ৪৫.৫ শতাংশ শিশু মৃত্যুর তথ্য সমীক্ষায় উঠে এসেছে। গ্রামীণ এলাকায় এই সংখ্যা ৪৮.৯ শতাংশ বলে জানা গিয়েছে।
২০২৪ সালে হাসপাতালে নবজাতকের মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৪০.২ শতাংশ। এর মধ্যে সরকারি হাসপাতালে মারা যাওয়া শিশুর সংখ্যা ২৪.৭ শতাংশ বলে জানা গিয়েছে। বেসরকারি হাসপাতালের ক্ষেত্রে সেটা ১৫.৫ শতাংশ। হাসপাতালের বাইরে পেশাদার চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থেকে মৃত্যু হয়েছে ১৪.৩ শতাংশ শিশুর।
এর পাশাপাশি দেশ জুড়ে বিয়ের ধারণাতেও বড় বদল লক্ষ করা গিয়েছে। ২০২৪ সালে ২১ বছর বা তার চেয়ে বেশি বয়সের তরুণীদের মধ্যে সংসারজীবনে ঢুকে পড়ার সংখ্যা ছিল ৭৩.৫ শতাংশ। এঁদের মধ্যে আবার ২৪.৫ শতাংশ বিয়ে করেছেন ১৮ থেকে ২০ বছরের মধ্যে। অপ্রাপ্তবয়স্ক বিবাহিত মেয়েদের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২.১ শতাংশ। শহরাঞ্চের মাতৃশক্তির দেরিতে বিয়ে করার প্রবণতাও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।