কথায় বলে, পয়সা থাকলে ভূতের বাবারও শ্রাদ্ধ হয়। এ কাজ কখনও কেউ করেছেন কি না তা জানা নেই ঠিকই, কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে যা অকল্পনীয় তেমন নানা কাজই করে থাকেন ধনবান ব্যক্তিরা।
যদিও ধনাঢ্যরা এখন কেবল অকল্পনীয় কাজেই সীমিত থাকেননি। নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্তদের কাছে যা পাতে দেওয়ার যোগ্য নয়, সে সমস্ত জিনিসকেই আপন করে নিচ্ছেন। সে সমস্ত অদ্ভুত জিনিসই নাকি তাঁদের ‘স্টাইল স্টেটমেন্ট’ প্রকাশ করছে।
সেলোটেপ থেকে পলিথিন প্যাকেট, সবই এখন উচ্চবিত্তদের ফ্যাশনে ‘ইন’। তৈরি করছে নামীদামি সংস্থা। তা গায়ে তুলেই লাল গালিচা কাঁপাচ্ছেন তারকারা। আর ‘এ কেমন সাজ’ ভেবে মাথা চুলকোচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
তবে বেশ দেখে যতই ভুরু কোঁচকানো হোক না কেন, দাম শুনলে চক্ষু চড়কগাছ হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। বরং না হওয়াটাই একটু অস্বাভাবিক।
এ তালিকায় প্রথমেই আসে নামী স্প্যানিশ সংস্থার তৈরি সম্ভারের অর্ন্তগত ছেঁড়া জ্যাকেট। যেমন নাম, তেমনই রূপ। লাল রঙের ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন সেই জ্যাকেট দিয়ে হয়তো বাঙালি মধ্যবিত্ত বাড়িতে ঘরও মোছা হয় না। কিন্তু সমাজের উচ্চবিত্ত শ্রেণির মানুষদের কাছে তা ‘এক্সক্লুসিভ কলেকশন’সম।
ছেঁড়া সেই জ্যাকেটের দাম শুনলে আঁতকে উঠতে হয়। ‘দীর্ণ’ সেই জ্যাকেটটির দাম ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৮৪ হাজার টাকা। এখানেই শেষ নয়। ২০২৫-এর অক্টোবরের শেষে জ্যাকেটটি সেই স্প্যানিশ সংস্থার ওয়েবসাইটে লঞ্চ করার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই শেষও হয়ে যায়, যা নিয়ে সমাজমাধ্যমে হইহই পড়ে গিয়েছিল। এ-হেন জ্যাকেট এত টাকা দিয়ে কারা কেনে ভেবে ব্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন নেটাগরিকেরা।
এ তো গেল জামার কথা। ইটালির এক নামী সংস্থা এই তালিকায় যোগ করেছে আলাদা মাত্রা। অফিসের ডেস্কে বা পড়ার টেবিলে যে জিনিসকে ফেলনার মতো পড়ে থাকতে দেখা যায়, সেটাকে সমাজে ‘সম্মানের’ জায়গা দিয়েছে সেই ইটালীয় সংস্থা।
ক্ষুদ্র পেপারক্লিপে করা হয়েছে রুপোর জল। তার উপর খোদাই রয়েছে সেই সংস্থার নাম। ফলত সেটির মান বৃদ্ধি পেয়েছে। তার পর ‘মানি ক্লিপ’-এর তকমা দিয়ে ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১৫ হাজার টাকা দিয়ে বিক্রি করা হয়েছে সেই ক্লিপ। বহু ভারতীয়ের বেতনের সমান অঙ্ক খরচ করে টাকা আটকানোর সেই ‘অমূল্য’ ক্লিপ বহু জনই কিনেছেন।
জুতো নিয়ে বহু মানুষই খুঁতখুঁতে থাকেন। পাদুকাযুগলকে যে জিনিস ধুলো-ময়লা, আঘাত প্রভৃতি থেকে রক্ষা করছে, তার গায়ে যে ময়লা লাগবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বহু মানুষই সেটা মেনে নিতে পারেন না। এমনকি চকচকে পালিশ করা জুতোয় যদি কেউ ভুল করে পা তুলে দেন, তা নিয়ে রাস্তাঘাটে বেধে যায় বচসা। তবে উচ্চবিত্তেরা সেই ‘ধুলো মাখা’ জুতোই প্রায় ৬০ হাজার টাকা দিয়ে কিনে পরেন।
এই ধারণাও বেরিয়েছে এক ইটালির সংস্থার মাথা থেকেই। বহু দিন ধরে ধুলো-ময়লা জমার পর জুতোর যেমন রং হয়, তেমন ধাঁচের এক জুতো বানিয়েছে তারা। নাম দিয়েছে ‘ডার্টি স্নিকার্স’। বহু ধনবান ব্যক্তি সেই জুতোর মধ্যে সত্তরের দশকের ছোঁয়া খুঁজে পেয়েছেন। ‘ভিন্টেজ’ সেই জুতো কিনে নিজেদের জুতোর সম্ভারকে সমৃদ্ধ করেছেন তাঁরা।
ধুলোমাখা জুতো তা-ও মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু ছেঁড়া জ্যাকেটের নির্মাতা সেই স্প্যানিশ সংস্থা জুতোতেও যোগ করেছে ‘দারিদ্রের ছোঁয়া’। এই জুতো পরার ভাল দিক একটাই, নিত্য ব্যবহার করার ফলে ছিঁড়ে গেলেও তা আর কেউ ধরতে পারবেন না। কারণ সেটি আগে থেকেই ছিন্নবিচ্ছিন্ন।
ছেঁড়া সেই জুতোও তাদের ‘ডেস্ট্রয়েড’ সম্ভারের অন্তর্গত। দাম হাজারের সীমানা পেরিয়ে গিয়ে পৌঁছেছে লক্ষে। ভারতীয় মুদ্রায় ‘মাত্র’ এক লক্ষ ৬০ হাজার টাকা খরচ করতে পারলেই ছেঁড়া সেই জুতোজোড়া হয়ে যেত আপনার। যেত, কারণ, বর্তমানে সেই জুতোর স্টক শেষ। এমন জুতো সম্ভারে না রাখলেই যে নয়! তাই ধনবান ব্যক্তিরা তা বাজারে আসার সঙ্গে সঙ্গেই কিনে ফেলেছেন।
চিপসের প্যাকেটের আদলেও ব্যাগ তৈরি করে বাজারে শোরগোল ফেলেছে সেই স্প্যানিশ সংস্থা। এক বিখ্যাত সংস্থার চিপসের প্যাকেটকে প্রায় হুবহু নকল করে তৈরি হয়েছে সেই ব্যাগের সজ্জা। দুঃখের বিষয় একটাই, সেই ব্যাগের ভিতর কোনও চিপস থাকে না। বাছুরের চামড়া দিয়ে তৈরি সেই ব্যাগের দাম ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় দেড় লক্ষ টাকা।
কেবল জামা-জুতো বানালেই তো চলবে না। তার সঙ্গে পরার জন্য মানানসই গয়না বানানোও তো জরুরি। সেটা মাথায় রেখে সেই স্প্যানিশ সংস্থা বাজারে এনেছে সেলোটেপ ব্রেসলেট। ঘরের এক কোণে পড়ে থাকা মোটা সেলোটেপের রোলের মতো দেখতে সেটিকে। তবে দামে তার কয়েকশো গুণ। স্বচ্ছ সেলোটেপের রোলের ন্যায় দেখতে সেই ব্রেসলেটের মূল্য প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ টাকা।
কেবল মানুষে সীমিত থাকলেই তো হবে না, তাঁদের পোষ্যদের দিকটাও তো ভেবে দেখতে হবে। ‘মানি ক্লিপ’ তৈরি করা ইটালির সেই নামী সংস্থা তাই সারমেয়দের জন্য তৈরি করেছে বিশেষ এক জামা। সেই জামা যেমন তাকে উষ্ণ রাখবে, তেমনই জল থেকেও বাঁচাবে। আনুমানিক ৮২ হাজার থেকে শুরু হয়েছে সেই কোটের দাম।
সেফটিপিন বড় কাজের জিনিস। খুলে যাওয়া জামার বোতাম কুঁড়েমির বশে সেলাই করতে না পারলে দিব্য একটা সেফটিপিন লাগিয়ে পরে নেওয়া যায়। কিন্তু ধনাঢ্যরা তো তা করতে পারেন না। কিন্তু সেফটিপিন তো কাজে লাগেই। তাই ইটালির নামী সংস্থা সেফটিপিনে হালকা কুরুশের কাজ জুড়ে দিয়েছেন, যা দেখতে খুবই সুন্দর হলেও দাম শুনে ঢোক গিলতে হয়। ১০ টাকায় যেখানে একপাতা সেফটিপিন পাওয়া যায়, সেখানে সেই সেফটিপিন একটা কিনতেই খরচ হবে প্রায় ৬৯ হাজার টাকা।
বহুমূল্য অদ্ভুত জিনিসের তালিকায় রয়েছে আরও নানা জিনিস। সাধারণ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় বহু জিনিসে বাড়তি কিছু বিষয় যোগ করে তৈরি করা হয়েছে সেগুলি। যত দিন এগোচ্ছে, উচ্চবিত্তদের সাজসজ্জায় সেগুলির জায়গা আরও প্রশস্ত হচ্ছে। ফুলেফেঁপে উঠছে নামী সংস্থারা। নিম্নবিত্ত এবং মধ্যবিত্তেরা বরাবরের মতো ‘এ জিনিসে আর এমন কী আছে’ ভেবেই দিন কাটাচ্ছেন।