বাবা ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা। সেই ইরান, যেখানে কয়েক দিন আগেই মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে রাস্তায় নেমেছিলেন সাধারণ জনগণ। চলছিল ধরপাকড়। জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি নিয়ে প্রতিবাদ করতে গিয়ে মৃত্যুও হয়েছে অনেকের। আর সেই ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের পুত্রের সঙ্গে যুক্ত সম্পত্তির পরিমাণ নজর কাড়ার মতো!
কথা হচ্ছে মোজতবা খামেনেইয়ের। বিভিন্ন দেশে বিপুল সম্পত্তি, বিলাসবহুল বাড়ি— কী নেই তাঁর সঙ্গে সম্পর্কিত সম্পত্তির তালিকায়! তেমনটাই উঠে এসেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গের এক বছরব্যাপী তদন্তে।
মোজতবা ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা খামেনেইয়েরই দ্বিতীয় পুত্র। সেই আয়াতোল্লা, যাঁর কথায় ইরানে বাঘে-গরুতে এক ঘাটে জল খায়, যিনি সম্প্রতি সংঘাতে জড়িয়েছেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সঙ্গে।
খামেনেইয়ের প্রশাসনের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ভাবে সুর চড়িয়ে যাচ্ছেন ট্রাম্প। চাপ দিচ্ছেন পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ চুক্তি নিয়েও। ইতিমধ্যেই আমেরিকার রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন পশ্চিম এশিয়া লাগোয়া সমুদ্রে পৌঁছে গিয়েছে। ইরানে খামেনেই-বিরোধী বিক্ষোভকেও প্রকাশ্যে সমর্থন করেছেন ট্রাম্প। অন্য দিকে, ইরান আগেই জানিয়েছে, আমেরিকা কোনও রকম হামলা চালালে তার জবাব দেওয়ার জন্য তৈরি রয়েছে তারা।
দুই দেশের মধ্যে যখন এই পরিস্থিতি, সেই আবহে প্রকাশ্যে এল খামেনেই-পুত্র মোজতবার সঙ্গে যুক্ত তাকলাগানো সম্পত্তির পরিমাণ। ব্লুমবার্গের ওই তদন্ত অনুযায়ী, লন্ডনে বিত্তশালীদের এলাকা হিসাবে বিখ্যাত ‘বিলিওনিয়ারস রো’-তে মোজতবার সঙ্গে যুক্ত একাধিক বিলাসবহুল বাড়ি রয়েছে। এর মধ্যে একটি নাকি রয়েছে তাঁর নামেই। পাশাপাশি, ইউরোপে বিলাসবহুল হোটেল এবং পশ্চিম এশিয়ায় একাধিক রিয়্যাল এস্টেটের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন তিনি।
উত্তর লন্ডনের ‘দ্য বিশপস অ্যাভিনিউ’ এমন একটি রাস্তা, যার চারধারে রয়েছে একাধিক প্রাসাদোপম বাড়ি। তবে সেই বিলাসবহুল বাড়িগুলির বেশির ভাগই খালি। রাস্তাটি প্রতিনিয়ত পাহারা দিচ্ছে সশস্ত্র নিরাপত্তারক্ষীরা। আর সেখানেই নাকি মোজতবার সঙ্গে সম্পর্ক থাকা সমস্ত সম্পত্তির বীজ পোঁতা রয়েছে।
ব্লুমবার্গের তদন্তমূলক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, উত্তর লন্ডনের ‘দ্য বিশপস অ্যাভিনিউ’য়ে থাকা কিছু ভুয়ো কোম্পানির আড়ালেই ওই সব সম্পত্তি বৃদ্ধির বিষয়টি লুকিয়ে রয়েছে, যা তেহরান থেকে দুবাই এবং ফ্রাঙ্কফুর্ট পর্যন্ত বিস্তৃত একটি অর্থপাচার চক্রের অংশ।
যদিও প্রতিবেদন অনুসারে, অত বিপুল পরিমাণ সম্পত্তির মালিকানা মোজতবা খামেনেইয়ের নামে নেই। তবে পশ্চিমি গোয়েন্দাদের মূল্যায়ন এবং ওয়াকিবহল মহল বলছে, এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সেই সব সম্পত্তির লেনদেনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন মোজতবা।
২০১৯ সালে মোজতবার উপর চেপেছিল মার্কিন নিষেধাজ্ঞা। কিন্তু ব্লুমবার্গের প্রতিবেদন বলেছে, তা সত্ত্বেও মোজতবার বিদেশি বিনিয়োগের মধ্যে রয়েছে ১০ কোটি পাউন্ডেরও বেশি মূল্যের ব্রিটিশ সম্পত্তি, দুবাইয়ের একটি ভিলা এবং ইউরোপ জুড়ে একাধিক বিলাসবহুল হোটেল। সম্পত্তিগুলি কেনার জন্য অর্থ নাকি পাঠানো হয়েছিল ব্রিটেন, সুইৎজ়ারল্যান্ড, লিচেনস্টাইন এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহির ব্যাঙ্কগুলির মাধ্যমে, যে অর্থ মূলত ইরানের তেল বিক্রি থেকে এসেছে।
ব্লুমবার্গের পর্যালোচনা করা নথি অনুযায়ী, ২০১৪ সালে লন্ডনের একটি সম্পত্তি ৩ কোটি ৩৭ লক্ষ ইউরোয় কেনা হয়েছিল। সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, ব্রিটেন এবং আয়ারল্যান্ডের মাঝে আইরিশ সাগরে অবস্থিত স্ব-শাসিত ব্রিটিশ নগরী ‘আইল অফ ম্যান’ এবং ক্যারিবিয়ানে নিবন্ধিত সংস্থাগুলির মাধ্যমে মোজতবা বিদেশে অর্থ পাচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন বলেও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এই সংস্থাগুলি নাকি ফ্রাঙ্কফুর্ট এবং ম্যালোর্কার হোটেল-সহ ইউরোপ জুড়ে রিয়্যাল এস্টেট এবং আতিথেয়তা ক্ষেত্রে সম্পত্তি কেনার জন্য ব্যবহৃত হয়েছিল বলেও জানা গিয়েছে। যদিও এই কোনও সম্পত্তিরই মালিকানা মোজতবার নামে নেই। বরং অনেক সম্পত্তির পাশে নাম রয়েছে গত বছর ব্রিটেন কর্তৃক নিষিদ্ধ ইরানি নির্মাণ ব্যবসায়ী তথা ধনকুবের আলি আনসারির।
ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ ৫৭ বছর বয়সি আনসারিকে ‘দুর্নীতিগ্রস্ত ইরানি ব্যাঙ্কার এবং ব্যবসায়ী’ হিসাবে বর্ণনা করে নিষিদ্ধ করেছিল। তাঁর বিরুদ্ধে ইরানের ‘ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কোর’কে (আইআরজিসি) আর্থিক মদত দেওয়ার অভিযোগও উঠেছিল। যদিও আনসারির বিরুদ্ধে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) বা আমেরিকার কোনও নিষেধাজ্ঞা নেই।
আইনজীবীর মাধ্যমে এক বিবৃতিতে আনসারি মোজতবার সঙ্গে তাঁর কোনও আর্থিক বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের কথা অস্বীকার করেছেন। তাঁর উপর চাপানো ব্রিটিশ নিষেধাজ্ঞাকেও তিনি চ্যালেঞ্জ করবেন বলে স্পষ্ট করেছেন।
জার্মানি এবং স্পেনের হোটেলগুলির পাশাপাশি লন্ডনের এক ডজনেরও বেশি সম্পত্তির সন্ধান পেয়েছে ব্লুমবার্গ। ফ্রাঙ্কফুর্টের একটি হোটেলও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। অর্থপাচারের তদন্তে জড়িত এক জন ইউরোপীয় কর্মকর্তা ব্লুমবার্গকে বলেছেন, আনসারির উপর আরও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলে তাঁর ব্রিটেনের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে তা বিক্রি করা হতে পারে।
যদিও পুরো বিষয়টিতে মোজতবার নাম জড়ানোয় স্বাভাবিক ভাবেই অস্বস্তিতে ইরান প্রশাসন। ইরানের অভ্যন্তরে দীর্ঘ দিন ধরে সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা খামেনেই এবং তাঁর পরিবারকে ‘সততা এবং সরলতার প্রতীক’ হিসাবে চিত্রিত করে আসছে সে দেশের রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমগুলি।
১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের মাধ্যমে রাজতন্ত্রকে উৎখাত করার নেপথ্যে তাঁদেরই কৃতিত্ব স্বীকার করা হয়। খামেনেই পরিবারের বিনয়ী জীবনযাপন এবং পার্থিব সম্পত্তিতে তাঁদের ‘অনীহা’কে তুলে ধরা হয় জনসাধারণের চোখে। তবে এর মধ্যেই খামেনেই-পুত্রের সঙ্গে যোগ থাকা বিপুল সম্পত্তির বিষয়টি প্রকাশ্যে এসেছে ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে।
ইরানে প্রশাসনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি এবং অর্থনৈতিক দুর্দশা নিয়ে জনসাধারণের ক্রমবর্ধমান ক্ষোভের মধ্যেও বিষয়টি প্রকাশ্যে এসেছে। অভিযোগ উঠেছে, রাজনৈতিক যোগাযোগকে সম্পত্তি বৃদ্ধির কাজে লাগিয়েছেন মোজতবা।
৫৬ বছর বয়সি মোজতবা ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার দ্বিতীয় পুত্র। তাঁকেই খামেনেইয়ের সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসাবে বিবেচনা করা হয়। মাঝে খামেনেইয়ের শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় পর মোজতবার আসনে বসা নিয়ে জল্পনা আরও বেড়েছিল।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, খামেনেই তাঁর মৃত্যুর আগেই পদ ছাড়তে পারেন। জীবিত অবস্থাতেই তিনি উত্তরসূরি হিসাবে তাঁর ছেলেকে ইরানের সর্বোচ্চ পদে দেখতে চান। আর এই নতুন নেতা বাছাইয়ের কাজ নিজের হাতেই রেখেছেন খামেনেই।
শোনা যায়, গত কয়েক বছর ধরে গোপনেই নাকি দেশের সর্বোচ্চ নেতা হিসাবে দায়িত্ব পালনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন মোজতবা। অন্তরালে থেকেও ইরানের রাজনীতিতে তাঁর যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে বলে মত আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের একাংশের।
তবে ওয়াকিবহাল মহলের দাবি, মোজতবাকে নিয়ে ইরানের সব পক্ষ সন্তুষ্ট নয়। তিনি সর্বোচ্চ পদে বসুন, এমনটা অনেকেই চান না। প্রকাশ্যে খুব একটা দেখাও দেন না মোজতবা। তার মধ্যেই তাঁকে এবং তাঁর সঙ্গে যুক্ত সম্পত্তি নিয়ে জলঘোলা হতে স্বাভাবিক ভাবেই অস্বস্তির মুখে খামেনেই পরিবার।