গায়ক তখন তারুণ্যে। ১৮ বছর বয়সে গানের একটি রিয়্যালিটি শোয়ে প্রতিযোগী হিসাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু সেখান থেকে বিজয়ী হয়ে ফিরতে পারেননি তিনি। ২০০৫ সাল। তার পর কেটে গিয়েছে ২১ বছর। এই ২১ বছরে শুধু বলিউড নয়, সমগ্র বিশ্বের জনপ্রিয় গায়কের তালিকায় নাম লিখিয়ে ফেলেছেন অরিজিৎ সিংহ।
দীর্ঘ কেরিয়ারের সফল যাত্রায় পাড়ি দিতে দিতেই সিদ্ধান্ত নিলেন, কোনও ছবিতে আর গান গাইবেন না অরিজিৎ। সেই ঘোষণার পর মন ভেঙে যায় শ্রোতাকুলের। গায়ককে নিয়ে শুরু হয় নানা জল্পনাও।
কেউ বলছেন, একক ভাবে সঙ্গীতনির্মাণের দিকে মন দেবেন অরিজিৎ। কারও দাবি, তিনি নাকি রাজনীতির মাঠে নামতে পারেন। তবে অধিকাংশের মতে, আগামী দিনে ক্যামেরার আড়ালে থাকলেও তাঁকে দেখা যেতে পারে পরিচালকের আসনে। সেই ইঙ্গিত নাকি অরিজিৎ দিয়েছিলেন বহু বছর আগেই! সে প্রসঙ্গে খোলসা করে জানালেন বলিউডের এক জনপ্রিয় ছবিনির্মাতা।
১৫ বছর আগেকার ঘটনা। ২০১২ সালে প্রেক্ষাগৃহে অনুরাগ বসুর পরিচালনায় মুক্তি পায় ‘বরফি!’। ২০১১ সালে সেই ছবির শুটিং শুরু করেছিলেন বাঙালি পরিচালক। মুম্বই, কলকাতার পাশাপাশি হিন্দি ছবিটির শুটিং করেছিলেন দার্জিলিঙেও। সেই সময় নাকি অনুরাগকে মনের কথা জানিয়েছিলেন অরিজিৎ।
সকলকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা জানিয়ে মঙ্গলবার অরিজিৎ সমাজমাধ্যমের পাতায় পোস্ট করে জানান যে, তিনি আর প্লেব্যাক করবেন না। অনুরাগের ‘বরফি!’ ছবিতে গান গেয়েছিলেন অরিজিৎ। তবে, গায়কের এই সিদ্ধান্তে নাকি বিন্দুমাত্র অবাক হননি অনুরাগ। বরং, তিনি নাকি অরিজিতের মনের ইচ্ছা আগে থেকেই জানতেন বলে দাবি করেন।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে অরিজিতের সিদ্ধান্ত নিয়ে অনুরাগ জানান যে, ‘বরফি!’ ছবিতে তাঁর সহ-পরিচালক হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন গায়ক। কিন্তু অনুরাগ তাঁর সহ-পরিচালনার প্রস্তাবে রাজি না হলেও বুঝতে পেরেছিলেন যে, অরিজিতের ক্যামেরার পিছনের দুনিয়ায় আগ্রহ রয়েছে।
‘বরফি!’ ছবিতে সহ-পরিচালনার সুযোগ না পেলেও সেই ছবিতে গান গেয়েছিলেন অরিজিৎ। সেই গানগুলি বিপুল জনপ্রিয়তাও পেয়েছিল। তবে, নিজের ইচ্ছা পূরণের পথে পা বাড়িয়ে দিয়েছিলেন অরিজিৎ।
হিন্দি বা অন্য কোনও ভাষার বাণিজ্যিক ছবির পরিচালনার ক্ষেত্রে বিচরণ করতে পারেননি অরিজিৎ। নিজের পথ নিজেই তৈরি করেছিলেন তিনি। ‘সা’ নামের একটি ছবি পরিচালনা করেন অরিজিৎ। ২০১৯ সালে বিদেশের এক চলচ্চিত্র উৎসবে সেই ছবি প্রদর্শিতও হয়।
শোনা যাচ্ছে, প্লেব্যাক থেকে বিরতি নিয়ে অরিজিৎ নাকি হিন্দি ছবি পরিচালনার দিকে পাকাপাকি ভাবে মন দিয়েছেন। জঙ্গলকে ঘিরে চিত্রনাট্যের কাহিনি আবর্তিত হয়েছে। অরিজিৎকে এই ছবিনির্মাণে সাহায্য করছেন তাঁর জীবনসঙ্গিনী কোয়েল সিংহ।
একাংশের দাবি, অরিজিতের নতুন ছবিতে দেখা যেতে পারে এক তারকা-কন্যাকেও। বলি অভিনেতা নওয়াজ়উদ্দিন সিদ্দীকীর কন্যা শোরা সিদ্দীকী। বর্তমানে লন্ডনে অভিনয়ের প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন ১৫ বছর বয়সি শোরা।
অরিজিৎ নাকি আরও দু’টি ছবির পরিচালনার কাজে হাত দিয়েছেন। সেই ছবিগুলিতে প্রত্যক্ষ যোগ রয়েছে অরিজিতের স্ত্রী কোয়েলের। তবে, গায়ক অথবা কোনও প্রযোজনা সংস্থার তরফে আনুষ্ঠানিক ভাবে এখনও কিছু ঘোষণা করা হয়নি।
২০২৩ সালের এক সাক্ষাৎকারে অরিজিৎ জানিয়েছিলেন, তিনি নিজের নামের মধ্যেই আর নিজেকে খুঁজে পান না। নিজের নাম শুনলে নাকি কিছুটা বিরক্তও হন। কেরিয়ার শুরুর দিকে অনুগামীরা যখন তাঁর নাম ধরে চিৎকার করতেন তখন খুব আনন্দ হত অরিজিতের। কিন্তু যত দিন গিয়েছে, তত নিজের নামের সঙ্গেই দূরত্ব তৈরি হয়েছে গায়কের।
একসময় নিজের গান না শোনার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন অরিজিৎ। সাক্ষাৎকারে গায়ক বলেছিলেন, “নিয়মই ছিল, বাড়িতে আমি থাকলে কেউ যেন আমার গান না চালায়। তার পর ধীরে ধীরে এই বিষয়টা নিয়ে আমি খানিকটা স্বাভাবিক হই।”
যোগ্যতা অনুযায়ী শিল্পীদের পারিশ্রমিক দেওয়া হয় না বলেও দাবি করেছিলেন অরিজিৎ। তাঁর কথায়, “একজন শিল্পী কখনওই ব্যবসায়ীদের মতো বাস্তববাদী হতে পারেন না। কিন্তু শিল্পীদের উপরেই ব্যবসা নির্ভর করে। শিল্পীদের সঠিক এবং ন্যায্য পারিশ্রমিক দেওয়া উচিত অথবা তাঁদের দিয়ে কোনও কাজই করানো উচিত নয়। এমন বহু মানুষ রয়েছেন যাঁরা সঠিক পারিশ্রমিক পান না।” এই ধরনের পরিবেশ যে একজন শিল্পীকে ধ্বংস করতে পারে, সে কথাও জানিয়েছিলেন গায়ক।
অরিজিৎ নিজের এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডলের পাতায় লিখে জানিয়েছেন, তিনি প্লেব্যাক থেকে অবসর নেওয়ার কথা বহু দিন ধরে ভাবছিলেন। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস জোগাতে পারছিলেন না। মঙ্গলবার পোস্টে গায়ক লেখেন, ‘‘সোজা ভাবে বলতে গেলে, আমার খুব সহজেই একঘেয়েমি চলে আসে। মঞ্চে পারফর্ম করার সময়ও প্রায়ই নিজের গানের অ্যারেঞ্জমেন্ট বদলে দিই। আমি ক্লান্ত হয়ে গিয়েছি। নতুন ধরনের সঙ্গীতের খোঁজে নামছি।’’ পোস্টের শেষে অরিজিতের সংযোজন, ‘‘আমি আসলে নতুন ধরনের গায়ক-গায়িকাদের গান শুনতে চাই, যাঁরা আমাকে অনুপ্রাণিত করতে পারবেন।’’