১৮ বছরে শূন্য শতাংশ রিটার্ন! গণপ্রজাতন্ত্রী চিনের (পিপল্স রিপাবলিক অফ চায়না) শেয়ার বাজার সংক্রান্ত এ-হেন খবর প্রকাশ্যে আসতেই দুনিয়া জুড়ে পড়ে গিয়েছে শোরগোল। তবে কি উপরে চাকচিক্য থাকলেও বেজিঙের অর্থনীতির গায়ে লেগেছে ঘুণপোকা? না কি স্টকের সূচককে ইচ্ছা করেই নিম্নমুখী রাখছেন ড্রাগন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং? চলতি আর্থিক বছরের (২০২৫-’২৬) শেষ লগ্নে পৌঁছে তারই জবাব খুঁজছেন দুনিয়ার তাবড় বিশ্লেষকেরা।
বর্তমানে অর্থনীতির নিরিখে বিশ্বের দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে চিন। তবে যে গতিতে বেজিঙের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বা জিডিপি (গ্রস ডোমেস্টিক প্রোডাক্ট) বৃদ্ধির হার বাড়ছে, তাতে যে কোনও দিন আমেরিকাকে পিছনে ফেলতে পারে তারা। আর তাই গত এক বছরে বেশ কয়েক বার চোখে চোখ রেখে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে চ্যালেঞ্জ করতে দেখা গিয়েছে ড্রাগনকে। এ-হেন পরিস্থিতিতে মান্দারিনভাষীদের শেয়ার বাজারের নামমাত্র রিটার্ন তাঁদের প্রকৃত শক্তি নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহের জন্ম দিয়েছে।
মূল চিনা ভূখণ্ডে বেশ কয়েকটি শেয়ার বাজার রয়েছে। তার মধ্যে আকারের দিক থেকে সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জ সবচেয়ে বড়। এর সূচকের নাম সাংহাই কম্পোজ়িট। গত বছরের (পড়ুন ২০২৫ সাল) এপ্রিলে সংশ্লিষ্ট বাজারের বৃদ্ধি সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে জনপ্রিয় গণমাধ্যম দ্য ইউরেশিয়ান টাইম্স। সেই রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০০৭ সাল থেকে প্রায় এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে সাংহাই কম্পোজ়িট। ফলে লগ্নিকারীদের মুনাফা প্রায় হচ্ছে না বললেই চলে।
একই ছবি দেখা গিয়েছে হংকং স্টক এক্সচেঞ্জেও, যার শেয়ার সূচকের নাম হ্যাং শ্যেং ইনডেক্স। ২০২৫ সালের এপ্রিলের তথ্য অনুযায়ী, শেষ ১৮ বছরে চিনের নামীদামি কর্পোরেটগুলির একটিও ওই বাজারে বলার মতো পারফরম্যান্স করতে পারেনি। ফলে নামমাত্র রিটার্নেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে টেনসেন্ট, আলিবাবা ও মেইতুয়ানের মতো বেজিঙের বড় বড় সংস্থায় লগ্নিকারীদের।
হংকং স্টক এক্সচেঞ্জকে চিনা শিল্প সংস্থাগুলির ‘সেকেন্ড হোম’ বললে অত্যুক্তি করা হবে না। বাজার মূলধনের নিরিখে বেজিঙের প্রায় সমস্ত বড় বড় কর্পোরেটই সেখানে তালিকাভুক্ত রয়েছে। কিন্তু তাদের বৃদ্ধির সূচক হতাশাজনক হওয়ায় ড্রাগনের অর্থনীতি নিয়ে সন্দেহ জোরালো হচ্ছে। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ২০০৭ সাল থেকে গত বছরের (পড়ুন ২০২৫ সাল) এপ্রিলের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের এসঅ্যান্ডপি-৫০০ নামের শেয়ার সূচক বেড়েছে ২৫০ শতাংশ।
ভারতের ক্ষেত্রেও এই ১৮ বছরের শেয়ার বাজারের বৃদ্ধি বেশ চমকপ্রদ। ২০০৭-’২৫ সালের এপ্রিলের মধ্যে ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জের নিফটি-৫০কে ৫০০ শতাংশ বাড়তে দেখা গিয়েছে। চিনা গণমাধ্যমগুলির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৮-’২৪ সালের মধ্যে বেজিঙের জিডিপি বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। কিন্তু তা সত্ত্বেও ড্রাগনভূমির শেয়ার বাজারগুলি হতাশাজনক পারফরম্যান্স করায় ঘনীভূত হয়েছে রহস্য। এর নেপথ্যে অবশ্য একাধিক কারণ খুঁজে পেয়েছেন বিশ্লেষকদের একাংশ।
ব্রোকারেজ ফার্মগুলির দাবি, গত ১৫ বছরে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ার বাজারে লগ্নি করে গড়ে সাড়ে ১২ শতাংশ পর্যন্ত রিটার্ন পেয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। ভারতের বম্বে ও ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জের ক্ষেত্রে সেই অঙ্কটা কম-বেশি ১১ শতাংশ বলে জানা গিয়েছে। সেখানে চিনের সাংহাই বা হংকঙের শেয়ার বাজার থেকে মিলছে মেরেকেটে দু’শতাংশ রিটার্ন। অর্থাৎ, ব্যাঙ্ক বা ডাকঘরের প্রথাগত লগ্নির থেকেও অনেক কম মুনাফা দিয়েছে মান্দারিনভাষীদের স্টক এক্সচেঞ্জ।
চিনা শেয়ার বাজারের বৃদ্ধির সূচকের ‘কচ্ছপ গতি’র নেপথ্যে প্রথম কারণ হিসাবে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলিকে চিহ্নিত করেছেন আর্থিক বিশ্লেষকেরা। সাংহাই, শেনজ়েন এবং বেজিং স্টক এক্সচেঞ্জের তালিকাভুক্ত অর্ধেকের বেশি কোম্পানিই ড্রাগনভূমির সরকারি সংস্থা। বিশেষজ্ঞদের দাবি, তারা কখনওই ঊর্ধ্বমুখী রাখে না বৃদ্ধির সূচক। এবং তা করে প্রশাসনিক নির্দেশ মেনেই। ওই বাজারগুলিতে বেশ কয়েকটি বেসরকারি কর্পোরেট রয়েছে। তাদের মুনাফাকেও টেনে শূন্যে নামানোর প্রবণতা আছে তাদের।
তা হলে কি গত ২০ বছর ধরে বিপুল লোকসানে চলছে যাবতীয় চিনা রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা? বিষয়টি কিন্তু একেবারেই তেমন নয়। মূলত দেশের পরিকাঠামোগত উন্নয়নের কাজে সরকারি সংস্থাগুলিকে ব্যবহার করে বেজিং। অর্থাৎ, রাস্তা, সেতু বা বাঁধনির্মাণের মতো প্রকল্পের বরাত পায় তারা। নাগরিক জীবনকে উন্নত করার লক্ষ্যে নেওয়া এই সমস্ত পরিকল্পনা থেকে কোনও লাভ করা সম্ভব নয়। সেই কারণেই ড্রাগনভূমির শেয়ার বাজারে লগ্নি থেকে বিপুল মুনাফা অর্জন করতে পারছেন না বিনিয়োগকারীরা।
ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে ছবিটা কিন্তু সম্পূর্ণ আলাদা। এখানকার শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলি বাজার অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। পরিকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পের বদলে কোনও না কোনও সামগ্রী উৎপাদন করে থাকে তারা। উদাহরণ হিসাবে কোল ইন্ডিয়া, হিন্দুস্তান অ্যারোনটিক্স লিমিটেড (হ্যাল) বা ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশন লিমিটেডের কথা বলা যেতে পারে। আর তাই ব্যবসায় মুনাফা হলে তার লভ্যাংশ পান লগ্নিকারীরা।
দ্বিতীয়ত, স্টক এক্সচেঞ্জের বিনিয়োগকারীদের চিরকালই আলাদা গুরুত্ব দিয়ে এসেছে নয়াদিল্লি এবং ওয়াশিংটন। তা ছাড়া পরিকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পের বরাত সাধারণত বেসরকারি সংস্থাকে দিয়ে থাকে এই দুই দেশের সরকার। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আবার কাজ হয় সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে। এর পোশাকি নাম পিপিপি মডেল (পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ)। ফলে বড় প্রকল্পের বরাত মিললেই ছুটতে শুরু করে রাষ্ট্রায়ত্ত বা বেসরকারি সংস্থার স্টকের সূচক।
মজার বিষয় হল, ২০০০-’০৭ সালের মধ্যে চিনা শেয়ার বাজারকে উল্কার গতিতে ছুটতে দেখা গিয়েছিল। এ প্রসঙ্গে ‘ম্যাকার্টিক ওয়ান’-এর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট তথা বিজ়নেস পার্টনার হেড কুণাল আচার্য বলেছেন, ‘‘ওই সময় পরিকাঠামো, শিল্পোৎপাদন এবং রিয়্যাল এস্টেটকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছিল বেজিং। ফলে ড্রাগনভূমিতে আসতে থাকে বিপুল পরিমাণে বিদেশি পুঁজি। কিন্তু ২০০৭ সালে পৌঁছে ফেটে যায় সেই বুদ্বুদ। বাড়ি-ফ্ল্যাট সে ভাবে বিক্রি না হওয়ায় মাথায় হাত পড়ে বহু সংস্থার।’’
২০২০ সালে কোভিড অতিমারির সময় আরও মারাত্মক ভাবে ধাক্কা খায় চিনা অর্থনীতি। পরবর্তী বছরগুলিতে সেটা সামলে উঠলেও বেজিং এবং হংকঙের শেয়ার বাজারে তার কোনও প্রভাব দেখা যায়নি। শুধু তা-ই নয়, কোভিডের সময় খাদে নেমে যাওয়া সাংহাই কম্পোজ়িট এবং হ্যাং শ্যেং ইনডেক্স উপরের দিকে ছুটতে ব্যর্থ হয়। ২০১৮ সালে ড্রাগনের বার্ষিক আর্থিক বৃদ্ধির হার ছিল ৬-৮ শতাংশ। ২০২৪ সালে সেটাই কমে ৪.৯ শতাংশে নেমে আসে।
চিনের শেয়ার বাজার ধাক্কা খাওয়ার নেপথ্যে ভূ-রাজনৈতিক কারণও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। একসময় সস্তায় শিল্পোৎপাদনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলি ড্রাগনভূমিকে বেছে নিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী কালে সেটাই তাদের দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়ায়। পশ্চিমি দুনিয়ার ওই সিদ্ধান্তের জেরে ধীরে ধীরে তাদের বাজার অর্থনীতিকে খেয়ে ফেলে বেজিং। পাশাপাশি, প্রযুক্তি চুরির মাধ্যমে হুবহু একই রকমের দেখতে ব্যাপক সস্তার জিনিস আমজনতার হাতে তুলে দিতে শুরু করে মান্দারিনভাষীরা।
পশ্চিমি দুনিয়ার নির্ভরশীলতাকে হাতিয়ার করে গত কয়েক বছরে ভূ-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বহু বার সুর চড়িয়েছে বেজিং। ফলে ২০২১-’২২ আর্থিক বছর থেকে বদলাতে শুরু করে পরিস্থিতি। ড্রাগনভূমির পাশাপাশি অন্যত্র কারখানা সরিয়ে নেওয়ার কাজে হাত লাগায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি বহুজাতিক সংস্থা। সেই তালিকায় নাম রয়েছে আইফোন নির্মাণকারী কোম্পানি অ্যাপলেরও।
গত বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর দেশের আর্থিক বৃদ্ধি সংক্রান্ত একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে চিনের জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরো বা এনবিএস (ন্যাশনাল ব্যুরো অফ স্ট্যাটিসটিক্স)। সেখানে বলা হয়, ২০২৫ সালের অগস্টে খুচরো বাজারে পণ্য বিক্রির পরিমাণ ২০২৪ সালের অগস্টের নিরিখে বৃদ্ধি পেয়েছে মাত্র ৩.৪ শতাংশ। অন্য দিকে, কারখানাগুলির উৎপাদন বেড়েছে ৫.২ শতাংশ, ২০২৪ সালের অগস্টের পর থেকে যা সর্বনিম্ন। সংশ্লিষ্ট রিপোর্টের প্রভাবও সেখানকার শেয়ার বাজারে পড়তে দেখা গিয়েছে।
কোনও দেশের স্টক এক্সচেঞ্জ কতটা চাঙ্গা রয়েছে, তা বুঝতে ‘প্রাইস-টু আর্নিং (পি/ই) মাল্টিপল’-এর উপর চোখ রাখেন আর্থিক বিশ্লেষকেরা। এর মাধ্যমে সেখানে তালিকাভুক্ত সংস্থাগুলির শেয়ারের দাম ও প্রাপ্ত আয়ের অনুপাত জানা যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে পি/ই মাল্টিপলের অঙ্ক ২৬ এক্স। সেখানে ভারত ও চিন দাঁড়িয়ে আছে যথাক্রমে ২২ ও ১৪ এক্সে।
কুণালের কথায়, ‘‘পি/ই মাল্টিপল কম হওয়ায় চিনা শেয়ার বাজারে লগ্নি করা তুলনামূলক ভাবে বেশ সস্তা। কিন্তু, মনে রাখতে হবে যে যুক্তরাষ্ট্র বা ভারতের মতো অর্থনীতির সুনির্দিষ্ট নীতি মেনে চলে না সেখানকার সরকার। যখন-তখন আইন বদলে ফেলার প্রবণতা রয়েছে বেজিঙের। তা ছাড়া স্টক এক্সচেঞ্জ এবং অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানে হেরফেরও বহু বার করেছে ড্রাগন। এর জেরে দীর্ঘ মেয়াদে সেখানকার শেয়ার বাজার থেকে মোটা মুনাফার আশা কম।’’