Iran’s Energy Warfare

হরমুজ় বন্ধ করে প্রতিবেশীদের তেল শোধনাগারে লাগাতার হামলা, আমেরিকাকে বাগে আনতে ‘খেলা’র নিয়মই পাল্টে ফেলছে ইরান?

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজ়রায়েলকে প্যাঁচে ফেলতে হরমুজ় বন্ধ রাখার পাশাপাশি একের পর এক আরব রাষ্ট্রের খনিজ তেল শোধনাগারগুলিকে নিশানা করছে ইরান। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধকে জ্বালানি সঙ্কট আর অর্থনৈতিক লড়াইয়ে নিয়ে যাচ্ছে তেহরান?

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ১০ মার্চ ২০২৬ ১৬:৩২
Share:
০১ ১৮

প্রথমে সৌদি আরব। তার পর কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি এবং কুয়েত হয়ে বাহরিন। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধে আমেরিকা ও ইজ়রায়েলকে চাপে ফেলতে একের পর এক আরব রাষ্ট্রের খনিজ তেল শোধনাগারগুলিকে নিশানা করছে ইরান। পাশাপাশি, হরমুজ় প্রণালীকেও বন্ধ রেখেছে তেহরান। ফলে বিশ্ববাজারে হু-হু করে চড়ছে তরল সোনার দর। শিয়া ফৌজের এ-হেন রণকৌশলে যথেষ্ট ‘বেকায়দায়’ ওয়াশিংটন ও তেল আভিভ। চাপ বাড়ছে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর উপর।

০২ ১৮

চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পরই সৌদি আরবের সবচেয়ে বড় তেল সংস্থা আরামকোর শোধনাগারে হামলা চালায় তেহরানের ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ বা আইআরজিসি। মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে দু’বার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র আছড়ে পড়ে সেখানে। ফলে তড়িঘড়ি তরল সোনার উৎপাদন ও সরবরাহ বন্ধ করতে বাধ্য হয় রিয়াধ। দ্বিতীয় ধাপে কাতারের তরল প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন কেন্দ্রকে নিশানা করে সাবেক পারস্যের শিয়া ফৌজ।

Advertisement
০৩ ১৮

সংঘর্ষ এর পর আরও তীব্র হলে আমিরশাহির ফুজাইরাহ তেল শোধনাগার ধ্বংসের চেষ্টা চালায় আইআরজিসি। ফলে বেশ কিছুটা ব্যাহত হয় সেখানকার উৎপাদন। এই তালিকায় সর্বশেষ নামটি হল বাহরিন। ‘কামিকাজ়ে’ (আত্মঘাতী) ড্রোনে আরব মুলুকটির অন্যতম বড় তেল শোধনাগার বাপকোকে নিশানা করে তেহরান। পাইলটবিহীন বিমান আক্রমণ শানাতেই বিকট বিস্ফোরণে আগুন ধরে যায় সেখানে। গলগল করে বেরোতে শুরু করে কালো ধোঁয়া।

০৪ ১৮

বাহরিনের অর্থনীতিতে বাপকো তেল শোধনাগারের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। এটি ওই আরব দেশটির প্রধান তরল সোনা উৎপাদন কেন্দ্র। ইরানি ড্রোন হামলায় সেখানকার বেশ কয়েক জন কর্মী আহত হওয়ার খবর পাওয়া গিয়েছে। শোধনাগারের ক্ষয়ক্ষতির কোনও স্পষ্ট রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসেনি। পাশাপাশি, পশ্চিম এশিয়ার আরব রাষ্ট্রগুলিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা প্রায় প্রতিটি মার্কিন সেনাঘাঁটিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনে নিশানা করছে তেহরান।

০৫ ১৮

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের দাবি, আইআরজিসির এই রণকৌশলের নেপথ্যে রয়েছে তেল অর্থনীতির অঙ্ক। বিশ্ববাজারে তরল সোনার দরকে ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলারে নিয়ে যেতে চাইছে তেহরান। ইতিমধ্যেই তা ১২০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে। খনিজ তেলের আকাশছোঁয়া দাম বিশ্ব জুড়ে ঊর্ধ্বমুখী করছে মুদ্রাস্ফীতির সূচক, যার আঘাত থেকে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইজ়রায়েলেরও বাঁচার উপায় নেই। ভারতীয় অর্থনীতির উপরেও পড়তে শুরু করেছে এর প্রভাব।

০৬ ১৮

কাতারের গণমাধ্যম আল জ়াজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধের মধ্যে ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৮ মার্চ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দর ২৫ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। গত ৬ মার্চ ব্যারেলপ্রতি ৯১ ডলারে ঘোরাফেরা করছিল তরল সোনা, ১৯৮৩ সালের পর যা সর্বাধিক। ৯ মার্চ সেটাই বেড়ে পৌঁছে যায় ১১৬ ডলারে। ফলে ভারত-সহ একাধিক দেশের শেয়ারবাজারে দেখা গিয়েছে মহাপতন।

০৭ ১৮

পশ্চিমি গণমাধ্যমগুলি জানিয়েছে, এই সংঘাতের জেরে ইতিমধ্যেই বিশ্বব্যাপী অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের এক পঞ্চাংশ বন্ধ হয়ে গিয়েছে। কারণ, লড়াইয়ের গোড়া থেকেই হরমুজ় প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ফেলে আইআরজিসি। ফলে গুরুত্বপূর্ণ ওই সামুদ্রিক রুটে চলাচল করতে পারছে না কোনও পণ্যবাহী জাহাজ। তেহরান অবশ্য রাশিয়া, চিনের মতো ‘বন্ধু’ রাষ্ট্রগুলির ট্যাঙ্কার চলাচলে নিষেধাজ্ঞা রাখেনি। কিন্তু ঝুঁকি থাকায় সেখানে জাহাজ নিয়ে যাচ্ছে না কেউই।

০৮ ১৮

সামরিক বিশেষজ্ঞদের অনেকেই মনে করেন, সংশ্লিষ্ট লড়াইয়ে কৌশলগত দিক থেকে সুবিধাজনক জায়গায় রয়েছে ইরান। কারণ, পশ্চিম এশিয়ার আরব দেশগুলির খনিজ তেল পরিবহণের ব্যস্ততম সামুদ্রিক রাস্তা হল হরমুজ় প্রণালী। ১৬৭ কিলোমিটার লম্বা এবং ৩৩-৩৯ কিলোমিটার চওড়া ওই সঙ্কীর্ণ সামুদ্রিক পথটি বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তরল সোনা পরিবহণ করে থাকে। বর্তমানে তা আইআরজিসির থেকে ছিনিয়ে নেওয়া ‘শিবেরও অসাধ্য’।

০৯ ১৮

হরমুজ় প্রণালী দিয়ে দিনে ১৪ কোটি ব্যারেল খনিজ তেল সরবরাহ করে সৌদি আরব, আমিরশাহি, ইরাক, কুয়েত এবং বাহরিনের মতো উপসাগরীয় আরব দেশ। তা সারা বিশ্বের প্রায় দেড় দিনের জ্বালানি চাহিদা মিটিয়ে থাকে বলে জানা গিয়েছে। যুদ্ধ শুরু হওয়া ইস্তক তা বন্ধ থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে তৈরি হচ্ছে ব্যবধান। এর ফলে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে অপরিশোধিত তেলের দাম।

১০ ১৮

সংবাদসংস্থা রয়টার্স সূত্রে খবর, ইরানি আক্রমণের আতঙ্কে খনিজ তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎপাদন হ্রাস করতে বাধ্য হয়েছে ইরাক। আমিরশাহির অবস্থাও তথৈবচ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুবাইয়ের তেল সংস্থার এক পদস্থ কর্তা বলেছেন, ‘‘আমাদের তেলের কুয়োগুলো প্রায় পরিপূর্ণ। অথচ তরল সোনা বিদেশে সরবরাহ করা যাচ্ছে না। তার উপর রয়েছে আইআরজিসির ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ভয়। এই পরিস্থিতি অর্থনীতিকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যেতে পারে।’’

১১ ১৮

বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়তে শুরু করায় তরল সোনার ব্যবহার সীমিত করেছে দক্ষিণ কোরিয়া বা আরওকে (রিপাবলিক অফ কোরিয়া)। পরিস্থিতি নিয়ে যথেষ্ট উদ্বিগ্ন মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি। তাঁর কথায়, প্রায় জরুরি অবস্থার মুখে দাঁড়িয়ে আছে কায়রোর অর্থনীতি। অন্য দিকে জাপানের শেয়ারবাজারের সূচক নেমেছে সাত শতাংশ। মার্চের শেষে যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রাস্ফীতির হার ৩.৭ থেকে ৪ শতাংশে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন আর্থিক বিশ্লেষকেরা।

১২ ১৮

ইরান যুদ্ধ নিয়ে সংসদে বিবৃতি দিয়েছেন ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। তিনি জানিয়েছেন, গত ১ মার্চ তেহরানের তিনটি রণতরীকে এ দেশের বন্দরে নোঙর করার অনুমতি দেওয়া হয়। তার মধ্যে একটি হল ‘আইআরআইএস লাভান’। বর্তমানে সেটি রয়েছে কেরলের কোচি বন্দরে। এর জন্য নয়াদিল্লিকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন পারস্যের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি।

১৩ ১৮

বিশ্ববাজারে তেলের দর চড়তে থাকায় আমদানির বিকল্প অনুসন্ধান শুরু করে দিয়েছে কেন্দ্র। বর্তমানে দুনিয়ার মোট ৪০টি দেশ থেকে তরল সোনা কিনছে ভারত। পশ্চিম এশিয়া ছাড়াও এর মধ্যে রয়েছে রাশিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ভেনেজ়ুয়েলার নাম। ফলে ঘরোয়া বাজারে পেট্রল-ডিজ়েলের মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা কম। তবে সমস্যা হতে পারে তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের ক্ষেত্রে। এত দিন এর সিংহভাগই কাতার থেকে আমদানি করছিল নয়াদিল্লি।

১৪ ১৮

যুদ্ধ শুরুর দিনেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইজ়রায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান প্রাণ হারান ইরানের শিয়া ধর্মগুরু তথা সর্বোচ্চ নেতা (সুপ্রিম লিডার) আয়াতোল্লা আলি খামেনেই। তাঁর মৃত্যুর এক সপ্তাহের মধ্যেই বছর ৫৬-র মোজ়তবা খামেনেইকে বেছে নিয়েছে তেহরান। সম্পর্কে তিনি আলি খামেনেইয়ের ছেলে। ৮৮ জন শিয়া ধর্মগুরুদের একটি দল তাঁকে বাছাই করেছে বলে জানা গিয়েছে। যদিও এটা প্রত্যাশিত ছিল বলেই মনে করে ওয়াকিবহাল মহল।

১৫ ১৮

তেহরানের পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা হিসাবে আলি খামেনেইয়ের পুত্র মোজ়তবার নাম ঘোষণা হতেই তাঁকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। বাবার ছেড়ে যাওয়া কাজ তিনি এগিয়ে নিয়ে যাবেন বলে মনে করছে ক্রেমলিন। প্রসঙ্গত, মোজ়তবার হাতেই থাকবে আইআরজিসির রাশ। ফলে পশ্চিম এশিয়ার লড়াই আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা থাকছে। অন্য দিকে তাঁকেও হত্যার হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছে ইজ়রায়েল।

১৬ ১৮

যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় গণমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টের আবার দাবি, জলপথে ক্ষেপণাস্ত্রের কাঁচামাল সরবরাহ করে ইরানকে সাহায্য করছে বেজিং। ‘গুপ্তচর’ উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণ করে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে তারা। সেখানে বলা হয়েছে, চিনের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলের এক বন্দর থেকে রওনা দিয়েছে তেহরানের দুই জাহাজ। সেগুলিতে ক্ষেপণাস্ত্রের জ্বালানি তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সোডিয়াম পারক্লোরেট থাকার সম্ভাবনা প্রবল।

১৭ ১৮

অন্য দিকে, পশ্চিম এশিয়ার লড়াইয়ে ‘নাক গলানোর’ চেষ্টা করছেন ইউক্রেন প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জ়েলেনস্কি। সৌদি আরবের যুবরাজ তথা প্রধানমন্ত্রী মহম্মদ বিন সলমনকে তেহরানের ড্রোন হামলা রুখতে প্রয়োজনীয় কারিগরি এবং প্রযুক্তিগত সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। ফলে উপসাগরীয় এলাকার পরিস্থিতি যে জটিল হচ্ছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।

১৮ ১৮

সামরিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, খোলা ময়দানের লড়াইয়ে ইরানের পক্ষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইজ়রায়েলের মতো জোড়া শক্তির সঙ্গে এঁটে ওঠা কঠিন। সেই কারণেই বিশ্ব জুড়ে জ্বালানি সঙ্কট তৈরি করতে চাইছে তেহরান। পরিস্থিতি বদলাতে আমেরিকান ও ইহুদিরা যুদ্ধকৌশলে কোনও বড় বদল আনে কি না, সেটাই এখন দেখার।

সব ছবি: সংগৃহীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement