Foreign Fighters in Iran Protest

মেশিনগান থেকে নির্বিচারে গুলি, গুম খুন! ৫০০০ ভাড়াটে যোদ্ধার তাণ্ডবে জনরোষ থামাল খামেনেইয়ের ইরান

ধীরে ধীরে স্তিমিত হচ্ছে ইরানের গণবিক্ষোভ। জনরোষ ঠেকাতে প্রতিবেশী ইরাক থেকে শিয়া যোদ্ধাদের ডেকে পাঠান তেহরানের ধর্মগুরু তথা সর্বোচ্চ নেতা (সুপ্রিম লিডার) আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেই। সাবেক পারস্য দেশে আন্দোলন থামানোর নামে গণহত্যা চালিয়েছে তারা, বলছে একাধিক পশ্চিমি গণমাধ্যম।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ১৮ জানুয়ারি ২০২৬ ১২:০৫
Share:
০১ ১৮

উন্মত্ত জনতাকে শিক্ষা দিতে কঠোর দমননীতি। অগ্নিগর্ভ ইরানে মন্ত্রের মতো কাজ করেছে সেই ‘ওষুধ’। ফলে মাত্র তিন সপ্তাহেই বিক্ষোভকারীদের একরকম ‘ঠান্ডা ঘরে’ ঢুকিয়ে দিলেন তেহরানের শিয়া ধর্মগুরু তথা সর্বোচ্চ নেতা (সুপ্রিম লিডার) আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেই। সূত্রের খবর, জনরোষ থামাতে হিজ়বুল্লা এবং শিয়া সশস্ত্র বিদ্রোহীদের মাঠে নামান তিনি। আন্দোলন বন্ধ করানোর নামে সাবেক পারস্য দেশের মাটি রক্তে ভিজিয়ে দিতে হাত কাঁপেনি তাঁদের, যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে একাধিক মানবাধিকার সংগঠন।

০২ ১৮

পশ্চিমি গণমাধ্যমগুলির প্রতিবেদন অনুযায়ী, জানুয়ারিতে গণবিক্ষোভ তীব্র হতেই একাধিক ইরানি নিরাপত্তাবাহিনীকে ‘দেখামাত্র গুলি করার’ নির্দেশ দেন খামেনেই। কিন্তু, তাদেরই একাংশ এই কাজে অস্বীকৃত হলে প্রমাদ গোনেন তেহরানের ধর্মগুরু তথা সর্বোচ্চ নেতা। এ ব্যাপারে জোর করলে পরিস্থিতি যে হিতে বিপরীত হতে পারে, তা বুঝতে দেরি হয়নি তাঁর। ফলে কিছুটা বাধ্য হয়েই আরবিভাষী শিয়া গোষ্ঠীগুলিকে তলব করেন খামেনেই। কঠোর দমননীতিতে দ্রুত জনরোষ নিয়ন্ত্রণে আনতে বলা হয় তাদের।

Advertisement
০৩ ১৮

খামেনেইয়ের আদেশ মিলতেই চটপট কাজে লেগে পড়ে ওই সমস্ত শিয়া গোষ্ঠী। বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে মিশে গিয়ে প্রথমে আন্দোলনের শীর্ষ নেতৃত্বকে চিহ্নিত করে তারা। এর পর এক এক করে নির্মম ভাবে নিকেশ করা হয় তাঁদের। পাশাপাশি, উন্মত্ত জনতার উপর নির্বিচারে গুলি চালাতেও দ্বিধা করেনি তারা। পশ্চিমি সংবাদসংস্থাগুলি জানিয়েছে, প্রাথমিক ভাবে ৮০০ থেকে ৮৫০ জন নির্দয় কুখ্যাত যোদ্ধাকে এই গণহত্যার দায়িত্ব দেন তেহরানের শিয়া ধর্মগুরু। পরে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৫,০০০।

০৪ ১৮

সূত্রের খবর, আন্দোলন থামানোর নামে ইরান জুড়ে হত্যালীলা চালানোর নেপথ্যে মূলত হাত আছে ইরাকি শিয়া লড়াকুদের, যাদের বড় অংশই প্যালেস্টাইনপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজ়বুল্লার সদস্য। ধর্মীয় তীর্থযাত্রীর ছদ্মবেশে সীমান্ত পেরিয়ে সাবেক পারস্য দেশে ঢোকে তারা। এর পর খামেনেইয়ের নির্দেশে রাজধানী তেহরান-সহ অন্যান্য উপদ্রুত এলাকাগুলিতে নিয়ে যাওয়া হয় তাদের। সেখানে পৌঁছোনোর পর আন্দোলনের মুখ বন্ধ করতে বলপ্রয়োগের মাত্রা বাড়াতে থাকে তারা। ফলে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে মৃতের সংখ্যা।

০৫ ১৮

সংবাদসংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে এই সমস্ত বহিরাগত শিয়া বিদ্রোহী গোষ্ঠী। কারণ, জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে ধীরে ধীরে মৃতের সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছিল। পাশাপাশি তেহরানে কমে যায় ধর্মঘট, খামেনেই-বিরোধী মিছিল ও বিক্ষোভ। জনরোষের তেজ কমার পর আন্দোলনে ইন্ধন দেওয়ার অভিযোগে ধরপাকড় শুরু করে ইরানি প্রশাসন। ধৃতদের গারদে পাঠায় স্থানীয় নিরাপত্তাবাহিনী। বিচারে তাঁদের অনেকের মৃত্যুদণ্ডও হয়েছে।

০৬ ১৮

অগ্নিগর্ভ ইরানকে শান্ত করতে কী ভাবে বিদেশি শিয়া বিদ্রোহীদের সাহায্য খামেনেই নিয়েছেন, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা তুলে ধরেছে জনপ্রিয় মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএন। বাগদাদের একটি সামরিক সূত্রকে উদ্ধৃত করে গত ১৬ জানুয়ারি এই সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে তারা। সেখানে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর বা এ বছরের ১ জানুয়ারি ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির সঙ্গে ‘দূত’ মারফত যোগাযোগ করেন পারস্যের সর্বোচ্চ নেতা। এর পরই উপসাগরীয় দেশটিতে সীমান্ত পেরিয়ে ঢোকার নীলনকশা ছকে ফেলে তারা।

০৭ ১৮

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাগদাদের সামরিক ফৌজের এক পদস্থ কর্তা সিএনএনকে জানিয়েছেন, মূলত দুটো সীমান্ত পেরিয়ে ইরানে প্রবেশ করে পাঁচ হাজার শিয়ার দল। সেগুলি হল ইরাকের মায়সান প্রদেশের সাইব এবং ওয়াসিত প্রদেশের জুরবাতিয়া। এ ছাড়া দিয়ালা ও বসরার সীমান্তও তাঁরা ব্যবহার করেছে বলে খবর পাওয়া গিয়েছে। এর মধ্যে এক জায়গায় সীমান্ত পার হয় ৮০০ শিয়া যোদ্ধা। বাকিরা ভাগে ভাগে অন্য এলাকা দিয়ে সাবেক পারস্য দেশের মাটিতে পা রেখেছিল।

০৮ ১৮

বিক্ষোভ থামানোর নামে ইরানে তাণ্ডব চালানো ওই সমস্ত শিয়া যোদ্ধার বড় অংশই ইরাকের ‘পপুলার মোবিলাইজ়েশন ফোর্সেস’ নামের বিদ্রোহী সংগঠনের ছত্রছায়ায় কাজ করে বলে জানিয়েছে সিএনএন। তবে আলাদা আলাদা গোষ্ঠীর সদস্যপদ রয়েছে তাদের। সেগুলি হল, কাটাইব হিজ়বুল্লা, হরকত হিজ়বুল্লা আল-নুজ়াবা, কাটাইব সৈয়দ আল-শুহাদা এবং বদর অর্গানাইজ়েশন। পর্দার আড়ালে থেকে যাদের দশকের পর দশক ধরে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে তেহরান।

০৯ ১৮

ইরানি রাজধানী বাদ দিলে দেশের আরও কয়েকটি সংবেদনশীল এলাকায় সংশ্লিষ্ট শিয়া যোদ্ধাদের দেখা গিয়েছে বলে দাবি করেছে একাধিক পশ্চিমি গণমাধ্যম। সেই তালিকায় আছে পারস্যের হামেদান শহর। বিশ্লেষকদের দাবি, কোনও জায়গাতেই আন্দোলন থামানোর জন্য দয়া-মায়া বা ‘ইসলামীয় ভ্রাতৃত্ববোধের’ (ইসলামিক ব্রাদারহুড) পরিচয় দেয়নি তারা। জনরোষে বিদেশি বিদ্রোহীদের কেউ আহত বা নিহত হয়েছেন কি না, তা অবশ্য জানা যায়নি।

১০ ১৮

ইরাক থেকে হাজারে হাজারে শিয়া যোদ্ধার ইরানে ঢোকার ইঙ্গিত অবশ্য প্রথম বার দেন বাগদানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের পদস্থ কর্তা আলি ডি। সংবাদসংস্থা দ্য মিডিয়ালাইনকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘‘গত ১১ জানুয়ারি শিয়া তীর্থযাত্রীদের ৫০ আসনের কয়েক ডজন বাস সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিবেশী দেশটিতে ঢুকে পড়ে। তাদের অধিকাংশের গন্তব্য ছিল তেহরান। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, তীর্থযাত্রীরা কোনও পরিবার সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছিলেন না। ছিল না বয়স্ক নাগরিক। বাসে থাকা যুবকদের সবাই একই রকমের কালো টি শার্ট পরেছিলেন।’’

১১ ১৮

আলি ডির দাবি, ১১ জানুয়ারি সব মিলিয়ে ৫০ আসনের মোট ৬০টি বাস ইরানে ঢুকেছিল। তত দিনে অবশ্য প্রতিবেশী দেশটির একের পর এক এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে জনরোষ। সরকারি হিসাবে, মোট ৩১টি প্রদেশের ৬১৪টি জায়গায় মারাত্মক আকার ধারণ করে গণবিক্ষোভ। ফলে শিয়া যোদ্ধারা গুলি চালানোর আগে দু’বার ভাবেনি। যদিও কিছুটা ধৈর্য দেখালে বহু মৃত্যুই আটকানো যেত বলে মনে করেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের একাংশ।

১২ ১৮

কুর্দ জাতিগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষার মানবাধিকার সংগঠন ‘হেঙ্গাও অর্গানাইজ়েশন ফর হিউম্যান রাইটস’ আবার খামেনেইয়ের সিদ্ধান্তের জন্য গত বছরের (২০২৫ সালের) জুনের ১২ দিনের যুদ্ধকে দায়ী করেছেন। ওই সময় ইরানে লাগাতার বোমাবর্ষণ করে ইজ়রায়েলি এবং আমেরিকার বিমানবাহিনী। সেই হামলা সামলে ইহুদি রাষ্ট্রের একাধিক শহরকে হাইপারসনিক (শব্দের পাঁচ গুণের চেয়ে গতিশীল) ক্ষেপণাস্ত্রে নিশানা করে তেহরানের আধা সেনা ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ বা আইআরজিসি।

১৩ ১৮

২০২৩ সাল থেকে কয়েক দফায় ইজ়রায়েলের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে ইরান। প্রতিটা ক্ষেত্রেই বেছে বেছে তেহরান ফৌজের একাধিক শীর্ষ কমান্ডারকে নিকেশ করে ইহুদিরা। ‘হেঙ্গাও অর্গানাইজ়েশন’-এর দাবি, এর জেরে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে পারস্যের সেনাবাহিনী ও আইআরজিসি। ফলে জনরোষ থামাতে তাদের ময়দানে নামাতে পারেননি খামেনেই। আর তাই তড়িঘড়ি ইরাকি শিয়া যোদ্ধাদের ডেকে পাঠান তিনি।

১৪ ১৮

বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে মুখ খুলেছেন ইরানি পার্লামেন্ট ‘মজলিস-এ শোরা-এ ইসলামি’র বিরোধী দলের নেতা মেহেদি রেজ়া। তাঁর দাবি, ‘‘ইরাকি শিয়া যোদ্ধাদের দেশের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবন এবং দফতরগুলিতে মোতায়েন করেছেন খামেনেই। তারা চলে আসার পর বিক্ষোভকারীদের সে দিকে ঘেঁষতে পর্যন্ত দেওয়া হয়নি।’’ অন্য দিকে, আরবিভাষী এই যোদ্ধাদের হিজ়বুল্লা এবং হাশদ আল-শাবির গোষ্ঠীর সন্ত্রাসী বলে উল্লেখ করেছেন তেহরানের সাংবাদিক নেজ়াত বাহরামি।

১৫ ১৮

বিদেশি শিয়া যোদ্ধাদের অত্যাচারের বর্ণনা মিলেছে মার্কিন গণমাধ্যম নিউ ইয়র্ক পোস্টে। নাম-পরিচয় গোপন রেখে সেখানে তেহরানবাসী এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, ইরাকি হিজ়বুল্লা সদস্যেরা মেশিনগান হাতে শহরের মূল রাস্তাগুলিতে টহল দিয়েছে। কোনও জায়গায় ভিড় দেখলেই নির্বিচারে গুলি চালাচ্ছে তারা। ফলে ভয়ে অনেকেই বাড়ি থেকে বার হওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। তাই বিক্ষোভ দ্রুত ঠান্ডা হয়ে যায়।

১৬ ১৮

সংবাদসংস্থা রয়টার্স আবার জানিয়েছে, জনরোষ থেমে যাওয়ার পরও তেহরান-সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ড্রোন উড়িয়ে আমজনতার উপর নজর রাখছে খামেনেই প্রশাসন। বিক্ষোভ কমলেও সরকারবিরোধী আগুন যে সাবেক পারস্য দেশটিতে পুরোপুরি নিবে গিয়েছে, তা বলা যাবে না। ১৬ জানুয়ারি বিক্ষিপ্ত কিছু অশান্তির খবর প্রকাশ্যে এলেও তা মানতে চায়নি ইরান।

১৭ ১৮

বিক্ষোভ থামার পর সাবেক পারস্য দেশের সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে বিস্ফোরক রিপোর্ট প্রকাশ করে মিডল ইস্ট আইকে। সেখানে ‘ইরান হিউম্যান রাইটস’ নামের একটি মানবাধিকার সংগঠনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা মাহমুদ আমিরি-মোঘাদ্দামের দেওয়া তথ্য তুলে ধরেছে তারা। তাঁর দাবি, ‘‘দেশ জুড়ে গণহত্যা চালিয়েছেন খামেনেই, যাতে ৩,৪২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে।’’

১৮ ১৮

অন্য দিকে, ভারতের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক নিয়ে মুখ খুলেছেন সে দেশের নির্বাসিত যুবরাজ রেজ়া পহলভি। যুক্তরাষ্ট্রের মাটি থেকে বলেছেন, তাঁর দেশ ‘স্বাধীন’ হলে নয়াদিল্লির সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ হবে তেহরানের সম্পর্ক। তাই আন্দোলনকারীদের মাটি কামড়ে পড়ে থাকার আহ্বান জানাতে দেখা গিয়েছে তাঁকে। তবে যে ভাবে খামেনেই পরিস্থিতি সামাল দিয়েছেন, তাতে পহেলভির স্বপ্নপূরণের ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহ আছে বিশ্লেষকদের।

সব ছবি: সংগৃহীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement