এ যেন ‘বিনা মেঘে বজ্রপাত’! ভেনেজ়ুয়েলার মার্কিন সামরিক অভিযানের খবর আসতেই মাথায় হাত চিনের। ঋণ, খনিজ সম্পদ এবং পরিকাঠামো খাত মিলিয়ে কারাকাসে কয়েক হাজার কোটি ডলারের লগ্নি রয়েছে বেজিঙের। লাটিন (দক্ষিণ) আমেরিকার দেশটিতে ড্রাগনের বিনিয়োগ করা সেই অর্থের পুরোটাই যে ডুবতে বসেছে, তাতে একরকম নিশ্চিত আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের একাংশ। নতুন বছরের গোড়ায় এ-হেন আর্থিক লোকসানের ধাক্কা সামলানো মান্দারিনভাষীদের জন্য যে কঠিন হবে, তা বলাই বাহুল্য।
১৯৯৯ সালে ভেনেজ়ুয়েলার প্রেসিডেন্ট হন বামনেতা উগো চাভেজ়। তিনি ক্ষমতায় আসার পরই অন্য উচ্চতায় ওঠে বেজিং-কারাকাস সম্পর্ক। ফলে লাটিন আমেরিকার দেশটির কৌশলগত ক্ষেত্রগুলিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির সুযোগ খুলে যায় ড্রাগনের সামনে। ২০০৫-’১৫ সালের মধ্যে ভেনেজ়ুয়েলার ‘তরল সোনা’ এবং অন্যান্য খনিজ সম্পদের বাজারে মান্দারিনভাষীদের প্রবেশাধিকার দেন চাভেজ়। এটা করা ছাড়া অবশ্য তাঁর সামনে ছিল না কোনও দ্বিতীয় বিকল্প। কারণ, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার চাপে তত দিনে ‘খোঁড়াতে’ শুরু করেছে কারাকাসের অর্থনীতি।
ক্যারিবিয়ান সাগর সংলগ্ন দেশটির খনিজ তেলে লগ্নি করেই কিন্তু চিন চুপ করে থাকেনি। পরবর্তী কালে পরিকাঠামোগত উন্নতির নামে ভেনেজ়ুয়েলাকে ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ বা বিআরআই প্রকল্পের আওতায় নিয়ে আসেন ড্রাগন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। এতে রাস্তা, রেল, সেতু এবং উড়ালপুল নির্মাণের নামে গত কয়েক বছরে কোটি কোটি ডলার ঢেলেছে বেজিং। পাশাপাশি, অর্থনীতি সচল রাখতে কারাকাসকে বিপুল ঋণ দিতে কার্পণ্য করেনি মান্দারিনভাষীরা।
বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি দ্য ইউরেশিয়ান টাইমসের কাছে মুখ খোলেন যুক্তরাষ্ট্রের উইলিয়াম অ্যান্ড মেরি কলেজের একাধিক অর্থনীতির অধ্যাপক। তাঁদের দাবি, ২০১৬ সালের মধ্যেই চিন থেকে নেওয়া ভেনেজ়ুয়েলার ঋণের পরিমাণ ১০ হাজার ৫০০ কোটি ডলার ছাপিয়ে যায়। ফলে বেজিঙের বৃহত্তম ঋণগ্রহণকারীদের তালিকায় একেবারে উপরের দিকে উঠে আসে কারাকাস। ঋণের ওই ‘ব্যালেন্স শিট’কে সামনে রেখে লাটিন আমেরিকার দেশটির থেকে আরও সস্তায় ‘তরল সোনা’ আমদানির একটি চুক্তি সেরে নেওয়ার ছক কষছিল ড্রাগন।
চাভেজ়ের আমলেই ভেনেজ়ুয়েলার খনিজ তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা হয়ে ওঠে চিন। পরবর্তী দশকগুলিতে যার কোনও নড়চড় হয়নি। ২০০৮ সালে কারাকাসের অপরিশোধিত তেল উত্তোলক সংস্থা ‘পিডিভিএসএ’র সঙ্গে বিশেষ সমঝোতা করে বেজিঙের রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ‘চায়না ন্যাশনাল পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন’। এর পরই দু’দেশের যৌথ উদ্যোগে জন্ম হয় ‘পেট্রোসিনোভেনেসা’ কোম্পানির, যা এত দিন ক্যারিবিয়ানের উপকূলীয় দেশটি থেকে ‘তরল সোনা’ কেবলমাত্র ড্রাগনভূমিতে পাঠাচ্ছিল।
চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি ভেনেজ়ুয়েলার খনিজ তেলের রফতানি সংক্রান্ত একটি বিস্ফোরক তথ্য প্রকাশ করে সাংহাইয়ের গবেষণা সংস্থা ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফিউচার্স’। তাদের দাবি, বর্তমানে দিনে প্রায় ন’লক্ষ ব্যারেল ‘তরল সোনা’ আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করে থাকে কারাকাস। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, তার মধ্যে আট লক্ষ ব্যারেলই যায় চিনে। অর্থাৎ, এত দিন লাটিন দেশটির অপরিশোধিত তেলের ৯০ শতাংশই কিনছিল বেজিং। কিন্তু মার্কিন সেনা অভিযানের পর এই ছবি আমূল পাল্টাতে চলেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
খনিজ সম্পদ বাদ দিলে ভেনেজ়ুয়েলার টেলি পরিষেবা ক্ষেত্রে চিনা লগ্নির অঙ্ক নেহাত কম নয়। ২০০৪ সালে কারাকাসের সঙ্গে সবচেয়ে বড় চুক্তি করে বেজিঙের টেক জায়ান্ট হুয়াওয়ে টেকনোলজিস। লাটিন দেশটিতে ফাইবার অপটিক পরিকাঠামো উন্নত করার দায়িত্ব পায় তারা। এর জন্য ২৫ কোটি ডলার খরচ করেছিল তৎকালীন চাভেজ় সরকার। পরবর্তী সময়ে ওই ফাইবার অপটিককে কেন্দ্র করে ক্যারিবিয়ান উপকূলের দেশটিতে গড়ে ওঠে একটি শক্তিশালী ৪জ়ি নেটওয়ার্ক, যাতে উপকৃত হয়েছেন সেখানকার বাসিন্দারাও।
মার্কিন আর্থিক বিশ্লেষকদের দাবি, দীর্ঘ দিন ধরেই ভেনেজ়ুয়েলার লৌহ আকরিক, বক্সাইট, সোনা ও বিরল ধাতুর উপর নজর রয়েছে চিনের। গত ১০-১২ বছরে কারাকাসের এই খনিক্ষেত্রগুলিতে বিপুল লগ্নি করেছে বেজিং। শুধু তা-ই নয়, ক্যারিবিয়ান উপকূলবর্তী দেশটির ধাতু সংস্থা ‘ভেনেজ়োলানা ডি গুয়ানা’র বেশ কিছু স্টকও আছে ড্রাগনের দখলে। চাভেজ়-পরবর্তী সময়ে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক মজবুত করতে ভেনেজ়ুয়েলায় হাতিয়ার ও সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ শুরু করে ড্রাগন, যা প্রেসিডেন্ট শি-র ‘মাস্টারস্ট্রোক’ বলে মনে করা হয়েছিল।
২০১৭ সালে কারাকাসের উপর নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করে মার্কিন প্রশাসন। এর জেরে বিশ্ববাজারে খনিজ তেল বিক্রি করা ভেনেজ়ুয়েলার পক্ষে বেশ কঠিন হয়ে ওঠে, যার অবশ্যম্ভাবী পরিণতিতে বাড়তে থাকে তাদের চিনা ঋণের বোঝা। পরিস্থিতি জটিল হচ্ছে বুঝতে পেরে লাটিন আমেরিকার দেশটিকে নতুন করে ধার দেওয়া বন্ধ করে বেজিংও। এতে ‘তাসের ঘরের’ মতো ভেঙে পড়ার দশা হয় ভেনেজ়ুয়েলার অর্থনীতির। ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে ফের ড্রাগনের দ্বারস্থ হন সেখানকার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো।
বিশেষজ্ঞদের দাবি, ওই সময় চিনা ঋণের সরবরাহ অব্যাহত রাখতে বেজিঙের জন্য খনিজ তেলের ভান্ডার একরকম পুরোপুরি খুলে দেয় কারাকাস। মাদুরোর সেই ‘টোপ’ গিলতে বেজিঙের সময় লাগেনি। ফলে মার্কিন নিষেধাজ্ঞাকে ‘বুড়ো আঙুল’ দেখিয়ে লাটিন আমেরিকার দেশটিতে লগ্নি অব্যাহত রাখে ড্রাগনভূমির শি সরকার। মান্দারিনভাষীদের এ-হেন ‘ঔদ্ধত্য’কে অবশ্য একেবারেই ভাল চোখে দেখেনি ওয়াশিংটন।
এ ব্যাপারে উদাহরণ হিসাবে বেজিঙের ‘চায়না কনফর্ড রিসোর্সেস কর্পোরেশন’-এর সঙ্গে কারাকাসের ২০ বছরের চুক্তির কথা বলা যেতে পারে। ২০২৪ সালে মাদুরোর উপস্থিতিতে যে সমঝোতায় সই করে চিন। এতে ঠিক হয় ভেনেজ়ুয়েলার তৈলক্ষেত্রগুলিতে ১০০ কোটি ডলার লগ্নি করবে ড্রাগনভূমির ওই সংস্থা। এ বছরের শেষে তাদের দৈনিক ৬০ হাজার ব্যারেল ‘তরল সোনা’ উত্তোলনের কথা আছে। আমেরিকার চাপে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের কাজ তারা আদৌ শেষ করতে পারবে কি না, তা নিয়ে বেশ ধোঁয়াশা রয়েছে।
গত ২ জানুয়ারি মধ্যরাতে (স্থানীয় সময় রাত ২টো নাগাদ) ভেনেজ়ুয়েলায় আক্রমণ শানায় মার্কিন ফৌজ। ওই সময় রাজধানী কারাকাসে ঢুকে প্রেসিডেন্ট মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে তুলে নিয়ে যায় আমেরিকার ডেল্টা ফোর্স। এই সামরিক অভিযানের কোড নাম ছিল ‘অপারেশন অ্যাবসুলিউট রিজ়লভ’ বা চরম সংকল্প। মাদুরো গ্রেফতার হতেই ক্যারিবিয়ান উপকূলের দেশটির বিশাল তৈলভান্ডার নিয়ে স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে একের পর এক বিস্ফোরক বিবৃতি দেন যুক্তরাষ্ট্রের বর্ষীয়ান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর তাতেই চিনের কপালে পড়েছে চিন্তার ভাঁজ।
জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহেই ভেনেজ়ুয়েলার তেল নিয়ে নিজের সমাজমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ একটি পোস্ট করেন ট্রাম্প। সেখানে তিনি লেখেন, ‘‘কারাকাসের অন্তর্বর্তিকালীন সরকার আমেরিকাকে সরবরাহ করবে তিন থেকে পাঁচ কোটি ব্যারেল উচ্চমানের তেল, যা বিক্রি হবে বাজারমূল্যে।’’ এই অর্থের নিয়ন্ত্রণও যে ওয়াশিংটনের হাতেই থাকবে, তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তাঁর এই ঘোষণার পর লাটিন আমেরিকার দেশটি থেকে চৈনিক সংস্থাগুলির পাততাড়ি গোটানো শুধু সময়ের অপেক্ষা বলেই মনে করা হচ্ছে।
মাদুরো অপহরণের কয়েক দিনের মাথাতেই ভেনেজ়ুয়েলার অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে একটি চুক্তি সেরেছে ট্রাম্প প্রশাসন। বিশেষজ্ঞদের দাবি, এর জেরে কারাকাসের অপরিশোধিত তৈলভান্ডারের উপর নিয়ন্ত্রণ দৃঢ় করতে সক্ষম হয়েছে ওয়াশিংটন। বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে মুখ খুলেছেন মার্কিন জ্বালানি সচিব ক্রিস্টোফার রাইট। তাঁর কথায়, ‘‘সংশ্লিষ্ট তরল সোনার বাজারমূল্য প্রায় ২০০ কোটি ডলার।’’ ক্যারিবিয়ানের উপকূলবর্তী দেশটির খনিজ তেল ভারতকে বিক্রি করতে যে আমেরিকা যথেষ্টই আগ্রহী, তা-ও স্পষ্ট করেছেন তিনি।
একসময় ভেনেজ়ুয়েলার ‘তরল সোনা’র অন্যতম ক্রেতা ছিল নয়াদিল্লি। কিন্তু কারাকাসের উপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার চাপ বাড়তেই সেখান থেকে তেল কেনা ধীরে ধীরে কমিয়ে দেয় ভারত। বর্তমানে অবশ্য রাশিয়ার থেকে সর্বাধিক ‘তরল সোনা’ কিনছে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকার। এতে আমেরিকার আপত্তি থাকলেও তাতে তেমন গা করেনি নয়াদিল্লি, যার জেরে এ দেশের পণ্যে ৫০ শতাংশ শুল্ক চাপিয়ে দিয়েছেন ট্রাম্প। ওয়াশিংটনের নিয়ন্ত্রণে থাকা ভেনেজ়ুয়েলার তেল কিনলে সেই সমস্যা মিটে যেতে পারে বলেও মনে করছেন আর্থিক বিশ্লেষকদের একাংশ।
মার্কিন জ্বালানি সচিব জানিয়েছে, আগামী দিনে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি করা নিয়ম মেনে বিক্রি হবে ভেনেজ়ুয়েলার তেল। ‘তরল সোনা’ রফতানি থেকে প্রাপ্ত টাকা কারাকাসেই পাঠাবে ওয়াশিংটন, যাতে সেটা আমজনতার হিতার্থে খরচ করতে পারে মাদুরো-উত্তর সেখানকার অন্তর্বর্তী সরকার। এই প্রক্রিয়ায় কোথাও দুর্নীতিকে জায়গা দেওয়া হবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। আমেরিকার এই সিদ্ধান্ত ক্যারিবিয়ানের উপকূলবর্তী দেশটিতে থাকার ক্ষেত্রে চিনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকদের একাংশ।
হংকঙের গণমাধ্যম সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রেনমিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাটিন আমেরিকান স্টাডিজ় সেন্টারের ডিরেক্টর কুই শোজ়ুন বলেছেন, ‘‘আমেরিকার পক্ষে ভেনেজ়ুয়েলার তেল, অন্যান্য খনিজ় এবং পরিকাঠামোগত ক্ষেত্রে চিনা সংস্থাগুলির উপস্থিতি মেনে নেওয়া কঠিন। সেই কারণে ইতিমধ্যেই পেট্রোসিনোভেনসা-র মতো যৌথ উদ্যোগে তৈরি কোম্পানিকে অসাংবিধানিক বলতে শুরু করেছে ওয়াশিংটন। কারণ, কারাকাস থেকে বেজিং বেরিয়ে গেলে সেই শূন্যস্থান মার্কিন সংস্থাগুলির সাহায্যে পূরণ করা ট্রাম্পের পক্ষে অনেক বেশি সহজ হবে।’’
তবে ভেনেজ়ুয়েলায় কর্মরত চিনা সংস্থাগুলির সম্পত্তি আমেরিকা বাজেয়াপ্ত করবে না বলেই মনে করেন শোজ়ুন। তাঁর দাবি, এতে লগ্নিকারীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হতে পারে, যার আঁচ এসে ওয়াল স্ট্রিটের শেয়ার বাজারে লাগুক, তা কখনওই চান না প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ওটুকু বাদ দিলে বেজিঙের লোকসানের পরিমাণ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তার জবাব পেতে অপেক্ষা করতে হবে আরও কিছু দিন।