IRGC vs Trump

‘কালো ইগল’-এর ঠোক্করের আতঙ্কে থরহরিকম্প! ট্রাম্পের ইয়র্কারে স্টাম্প ওড়ার ভয়ে শান্তিচুক্তিতে নিমরাজি শিয়া ফৌজ?

Is Iran’s IRGC declining to peace deal due to flip flop tactics of US President Donald Trump

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০২ মে ২০২৬ ১৩:১৪
Share:
০১ ১৮

ইরান যুদ্ধে ইতি টানতে মরিয়া আমেরিকা। সেই লক্ষ্যে বার বার সংঘর্ষবিরতি ও শান্তি আলোচনার কথা বলছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু, পত্রপাঠ যাবতীয় আর্জি উড়িয়ে ‘যুদ্ধং দেহি’ ভাব দেখাচ্ছে তেহরান। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে খনিজ তেলের দাম। এর জেরে গোটা পরিস্থিতির দায় গিয়ে পড়েছে সাবেক পারস্যের আধা সেনা ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ বা আইআরজিসির উপর। যদিও সম্পূর্ণ অন্য তত্ত্ব দিচ্ছেন সামরিক বিশ্লেষকেরা।

০২ ১৮

সাবেক সেনাকর্তাদের বড় অংশ মনে করেন, ইচ্ছা থাকলেও এখনই যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে যাওয়া ইরানের পক্ষে অসম্ভব। কারণ, মুখে মিষ্টি কথা বললেও পশ্চিম এশিয়ায় সমরসজ্জা চালিয়ে যাচ্ছে আমেরিকা। তা ছাড়া ঘন ঘন বিভিন্ন রকমের বিবৃতি দিয়ে তেহরানের যাবতীয় আস্থা ভেঙে ফেলেছেন ট্রাম্প। পাশাপাশি, শান্তি আলোচনার মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ফলে সংঘাত জিইয়ে রাখার দায় একা আইআরজিসির ঘাড়ে দেওয়া অনুচিত।

Advertisement
০৩ ১৮

চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল ইরান যুদ্ধ নিয়ে বিবৃতি দেয় মার্কিন সরকার। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বাসভবন তথা প্রশাসনিক কার্যালয় হোয়াইট হাউস জানায়, আপাতত তেহরানের সঙ্গে সংঘর্ষবিরতিতে রয়েছে ওয়াশিংটন। প্রায় একই কথা শোনা গিয়েছে আমেরিকার পার্লামেন্ট ‘কংগ্রেস’-এর নিম্নকক্ষ হাউস অফ রিপ্রেজ়েন্টেটিভসের অধ্যক্ষ (স্পিকার) মাইক জনসনের গলায়। আরও এক ধাপ এগিয়ে তিনি বলেছেন, ‘‘পশ্চিম এশিয়ায় শান্তি ফেরানোর চেষ্টা চলছে।’’

০৪ ১৮

কিন্তু, এই ধরনের মন্তব্যের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই জানা যায়, ইরানকে ‘শিক্ষা দিতে’ উপসাগরীয় ছাউনিগুলিতে ‘কালো ইগল’ (ডার্ক ইগল) মোতায়েনের তোড়জোর শুরু করে দিয়েছে আমেরিকা, যা প্রকৃতপক্ষে এক ধরনের ‘হাইপারসনিক’ (শব্দের পাঁচ গুণের চেয়ে গতিশীল) ক্ষেপণাস্ত্র। মার্কিন গণমাধ্যমগুলির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘণ্টায় ৬,১৭৪ কিলোমিটার বেগে হামলা চালাতে পারে ‘কালো ইগল’। ২,৭৮০ কিলোমিটার দূরে থাকা লক্ষ্যবস্তুকে চোখের নিমেষে ধ্বংস করার ক্ষমতা রয়েছে তার।

০৫ ১৮

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের দাবি, ‘কালো ইগল’ ক্ষেপণাস্ত্রের ভিতরে রয়েছে একটি ‘গ্লাইড বডি’। এর সাহায্যে যে কোনও মুহূর্তে দিশা বদলাতে পারে এই হাতিয়ার। বিশ্বের সেরা ‘আকাশ প্রতিরক্ষা’ (এয়ার ডিফেন্স) ব্যবস্থাও সহজে একে চিহ্নিত করতে পারবে না বলে জানিয়েছে আমেরিকা। ভূগর্ভস্থ বাঙ্কার, ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের লঞ্চার-সহ অন্যান্য সামরিক পরিকাঠামো অনায়াসে ধ্বংসের লক্ষ্যে ‘কালো ইগল’-এর নকশা তৈরি হয়েছে বললে অত্যুক্তি হবে না।

০৬ ১৮

পাশাপাশি, ইরান যুদ্ধের জোটসঙ্গী ইজ়রায়েলে ৬,০০০ টন গোলাবারুদ পাঠিয়েছে আমেরিকা। এ ব্যাপারে ইহুদি রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের একটি সূত্রকে উদ্ধৃত করে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে টাইমস অফ ইজ়রায়েল এবং জেরুজ়ালেম পোস্ট। তাদের দাবি, দু’টি জাহাজ এবং একাধিক সামরিক বিমানে তেল আভিভে এসেছে ওই সমস্ত হাতিয়ার। অধিকাংশই স্থল ও আকাশপথে হামলার সামরিক সরঞ্জাম বলে জানা গিয়েছে। ফলে আইআরজিসির পক্ষে আমেরিকাকে বিশ্বাস করা কঠিন।

০৭ ১৮

ইরান যুদ্ধ থামাতে ইতিমধ্যেই মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নিয়েছে পাকিস্তান। কিন্তু তেহরানের অভিযোগ, সেখানে মোটেই নিরপেক্ষ ভূমিকা নিচ্ছে না ইসলামাবাদ। উল্টে আমেরিকার শর্ত মেনে শান্তি সমঝোতায় পারস্য উপসাগরের শিয়া মুলুকটিকে সই করানোর নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন পাক ফৌজের সেনাসর্বাধিনায়ক (চিফ অফ ডিফেন্স ফোর্সেস) ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। ফলে ওয়াশিংটন ও ইসলামাবাদ দু’পক্ষের উপরেই সন্দেহ বাড়ছে তেহরানের।

০৮ ১৮

ইরানের অভ্যন্তরীণ সমস্যাও শান্তিচুক্তির পক্ষে বড় বাধা হতে পারে বলে জানিয়েছেন বিশ্লেষকদের একাংশ। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানের বিরুদ্ধে ইজ়রায়েল এবং আমেরিকা যৌথ সামরিক অভিযানে নামলে পশ্চিম এশিয়ায় বেধে যায় যুদ্ধ। লড়াইয়ের প্রথম দিনই ইহুদি-মার্কিন হামলায় প্রাণ হারান শিয়া ধর্মগুরু তথা সর্বোচ্চ নেতা (সুপ্রিম লিডার) আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেই। ফলে পারস্য উপসাগরের কোলের রাষ্ট্রটিতে দেখা গিয়েছে নেতৃত্বের সঙ্কট।

০৯ ১৮

আলি খামেনেইয়ের মৃত্যু হলে তাঁর ছেলে মোজ়তবাকে পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা হিসাবে বেছে নেয় ইরানি শিয়া ধর্মগুরুদের কাউন্সিল। কিন্তু, আমেরিকা ও ইজ়রায়েলি বিমানহানায় জখম হয়েছেন তিনিও। সূত্রের খবর, মুখ বেঁকে গিয়েছে তাঁর। এমনকি অঙ্গহানির খবরও প্রকাশ করেছে একাধিক পশ্চিমি গণমাধ্যম। ফলে আইআরজিসিকে নিয়ন্ত্রণ করার শক্তি এই মুহূর্তে তেহরান হারিয়ে ফেলেছে বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।

১০ ১৮

তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ ইরানের সরকারি ফৌজ নয়। সর্বোচ্চ নেতার নিয়ন্ত্রণাধীনে এটি একটি আধা সামরিক বাহিনী, ১৯৭৯ সালে ইসলামিক বিপ্লবের পর যা তৈরি করেন তৎকালীন সুপ্রিম লিডার রুহুল্লাহ খোমিনি। তেহরানের সরকারি ফৌজের থেকে ঢে়র বেশি শক্তিশালী হওয়ায় জোড়া ‘সুপার পাওয়ার’-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধের যাবতীয় দায়িত্ব রয়েছে তাদের কাঁধে। অন্য দিকে শুধুমাত্র সীমান্ত রক্ষার কাজে নিযুক্ত আছে সাবেক পারস্যের সরকারি সেনা।

১১ ১৮

বিশেষজ্ঞদের কথায়, এত দিন রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং সেনা কমান্ডারদের মধ্যে ‘সেতুবন্ধন’-এর কাজ করছিলেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা। কিন্তু, ২৮ ফেব্রুয়ারি ইজ়রায়েল এবং আমেরিকার আক্রমণে সেই তার কেটে যাওয়ায় জটিল হয়েছে পরিস্থিতি। তেহরানের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ আইআরজিসির হাতে চলে গিয়েছে বলেই মনে করছেন তাঁরা। ফলে সেনা কমান্ডারদের সবুজ সঙ্কেত ছাড়া কোনও শান্তি সমঝোতায় সই করা সেখানকার কোনও রাজনৈতিক নেতার পক্ষে অসম্ভব।

১২ ১৮

সম্প্রতি, ইরানি রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং আইআরজিসির মধ্যে ভাঙনের খবর প্রকাশ্যে আনে বেশ কিছু গণমাধ্যম। তাঁদের দাবি, মুখে হুঙ্কার ছাড়লেও অবিলম্বে আমেরিকার সঙ্গে শান্তিচুক্তি সেরে ফেলতে আগ্রহী তেহরানের রাজনীতিকেরা। অন্য দিকে এ ব্যাপারে ঘোরতর আপত্তি আছে ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’-এর অফিসারদের। তাঁদেরই চাপের মুখে যুদ্ধের কথা বলতে হচ্ছে সেখানকার বিদেশমন্ত্রী বা পার্লামেন্টের স্পিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতাকে।

১৩ ১৮

এর পাশাপাশি ক্ষমতার ভরকেন্দ্র নিজেদের হাতে রাখতে ‘নরমপন্থী’ রাজনৈতিক নেতাদের ধীরে ধীরে ‘কোণঠাসা’ করছে আইআরজিসি। উদাহরণ হিসাবে মাসুদ পেজ়েশকিয়ানের কথা বলা যেতে পারে। বর্তমানে ইরানের প্রেসিডেন্ট পদে রয়েছেন তিনি। কিন্তু, চলতি বছরের মার্চের মাঝামাঝি থেকে বিদেশনীতি বা যুদ্ধের ব্যাপারে একটা শব্দও উচ্চারণ করতে দেখা যায়নি তাঁকে। উল্টে সেই জায়গায় অনেক বেশি দায়িত্ব নিচ্ছেন তেহরান পার্লামেন্টের স্পিকার মহম্মদ বাকের কালিবাফ এবং বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি।

১৪ ১৮

গত ১৭ এপ্রিল, শুক্রবার হরমুজ় নিয়ে অবশ্য একের পর এক বিস্ফোরক পোস্ট করেন ট্রাম্প। তিনি জানান, সংশ্লিষ্ট সঙ্কীর্ণ জলপথটি খুলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ইরান। শুধু তা-ই নয়, আগামী দিনে সংঘাত পরিস্থিতিতে সামুদ্রিক রাস্তাটিকে নাকি কখনওই ঢাল হিসাবে ব্যবহার করবে না তেহরান। পাশাপাশি, সাবেক পারস্যের যাবতীয় ইউরেনিয়াম যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আসতে চলেছে বলেও ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ ঘোষণা করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট, যার কোনওটাই মানেনি উপসাগরীয় দেশটির শিয়া সরকার।

১৫ ১৮

এর ঠিক পরের দিনই নতুন করে হরমুজ় অবরুদ্ধ করে আইআরজিসি। পরে সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে বিবৃতি দেয় ইরানের সামরিক কমান্ড। শিয়া ফৌজের অভিযোগ, প্রতিশ্রুতি ভেঙে তাঁদের বন্দরে যাতায়াতকারী জাহাজগুলির উপর নৌ অবরোধ চালিয়ে যাচ্ছে আমেরিকা। যদিও সে কথা অস্বীকার করেছে ওয়াশিংটন। তবে তেহরানের অর্থনীতি ভেঙে ফেলতে হরমুজ় বন্ধ করে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্রের নৌসেনাও।

১৬ ১৮

এ ছাড়া শান্তিচুক্তিতে ইরানের রাজি না হওয়ার নেপথ্যে ট্রাম্পের অবদানও নেহাত কম নয়। গত ৩০ এপ্রিল হরমুজ়ের নাম বদলে ‘ট্রাম্প প্রণালী’ করে দেন তিনি। এর পর ওই এলাকার সংশোধিত মানচিত্রের ছবি নিজের সমাজমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ পোস্ট করতে দেখা যায় তাঁকে। একে মার্কিন আগ্রাসন হিসাবেই দেখেছে তেহরান।

১৭ ১৮

বিশ্লেষকেরা মনে করেন, শান্তিচুক্তি নিয়ে আইআরজিসির মনে দু’টি ভয় কাজ করছে। প্রথমত, সমঝোতা হলে হরমুজ় প্রণালী থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করতে হবে তাদের। তখন ওই সঙ্কীর্ণ জলপথে ঢুকে হামলা চালানোর সুযোগ পেয়ে যাবে মার্কিন নৌবাহিনী। শুধু তা-ই নয়, এতে রাতারাতি পাল্টে যেতে পারে যুদ্ধের গতি। আর তাই আমেরিকা ও ইজ়রায়েলকে চাপে রাখতে কোনও অবস্থাতেই নিজেদের সুবিধাজনক অবস্থান ছাড়তে রাজি নয় তেহরান।

১৮ ১৮

দ্বিতীয়ত, ইরানের হাতে থাকা ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ হওয়া ইউরেনিয়াম হাতিয়ে নিতে চাইছেন ট্রাম্প। তেহরানের খনিজ সমৃদ্ধ খার্গ দ্বীপটি কব্জা করার কথাও বলতে শোনা গিয়েছে তাঁকে। ফলে শান্তিচুক্তিতে আইনি মারপ্যাঁচে এগুলির উপর আমেরিকা যে নজর দেবে না, তার কোনও নিশ্চয়তা নেই। আর তাই আপাতত যুদ্ধের জিগির জিইয়ে রাখতে চাইছে পারস্যের ওই আধা সামরিক বাহিনী।

ছবি: সংগৃহীত, প্রতীকী ও এআই সহায়তায় প্রণীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement