Pakistan US Rare Earths Deal

বাক্সে ‘কুমিরছানা’ ভরে ট্রাম্পকে ‘বোকা’ বানিয়ে কোটি কোটি ডলার পকেটে পুরল পাকিস্তান! জুয়া খেলছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট?

বিরল খনিজের বিরাট ভান্ডারের কথা বলে আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি সেরে ফেলেছে পাকিস্তান। কোটি কোটি ডলার পকেটে পুরতে ওয়াশিংটনকে ‘কুমিরছানা’ দেখাচ্ছে ইসলামাবাদ?

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ২৫ জানুয়ারি ২০২৬ ০৭:৪১
Share:
০১ ১৮

মাটি খুঁড়লেই নাকি উঠবে টন টন বিরল খনিজ! তার দু’-একটি নমুনা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামনে পেশ করে তাঁর মন জিতে নিয়েছে পাকিস্তান। ফলস্বরূপ ইসলামাবাদের সঙ্গে তড়িঘড়ি ৫০ কোটি ডলারের বাণিজ্যচুক্তি সেরে ফেলেছে আমেরিকা। সত্যিই কি ভারতের পশ্চিমের প্রতিবেশীর কাছে আছে বিপুল বিরল খনিজের সম্ভার, না কি গোটাটাই ভাঁওতা? সমঝোতা হওয়ার তিন মাসের মাথায় ক্রমশ জোরালো হচ্ছে সেই প্রশ্ন। ফলে অস্বস্তি বাড়ছে ট্রাম্প প্রশাসনের।

০২ ১৮

গত বছরের (পড়ুন ২০২৫ সালের) অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্র সফরে যান পাক প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ় শরিফ এবং সেনা সর্বাধিনায়ক বা সিডিএফ (চিফ অফ ডিফেন্স ফোর্সেস) ফিল্ড মার্শাল আসিফ মুনির। ওই সময় হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা হলে তাঁর সামনে বিরলে খনিজে ভরা একটা সুটকেস তুলে ধরেন তাঁরা। এর পর ইসলামাবাদের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি করতে আর দেরি করেনি ওয়াশিংটন। বিনিময়ে বিপুল বিরল খনিজ সরবরাহের প্রতিশ্রুতি শাহবাজ় ও মুনিরের থেকে পেয়েছে আমেরিকা।

Advertisement
০৩ ১৮

ইসলামাবাদ-ওয়াশিংটনের সমঝোতা অনুযায়ী, ২০২৮ সালের মধ্যে পাকিস্তানের বিরল ধাতুর খনিগুলির সম্প্রসারণের কাজ শেষ করবে আমেরিকা। অর্থাৎ, আগামী দু’বছর ইসলামাবাদের উপর যুক্তরাষ্ট্রীয় ডলারের বন্যা হতে চলেছে বললে অত্যুক্তি হবে না। শাহবাজ় ও মুনিরের দাবি, তাঁদের দেশে ২ লক্ষ ৩০ হাজার বর্গমাইল জুড়ে ছড়িয়ে আছে ছ’লক্ষ কোটি ডলারের বিরল খনিজ। পরিকাঠামোর অভাবে যা তুলতে পারছেন না তাঁরা।

০৪ ১৮

পাক প্রধানমন্ত্রী ও সেনা সর্বাধিনায়কের এ-হেন দাবি ঘিরে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। বিশ্লেষকদের দাবি, বিরল খনিজ়ের এত বড় ভান্ডার থাকলে, এত দিন তা কেন কাজে লাগাল না ইসলামাবাদ। দীর্ঘ দিন ধরেই আর্থিক দিক থেকে একরকম দেউলিয়ার দরজায় দাঁড়িয়ে আছে ভারতের পশ্চিমের প্রতিবেশী। বিরল খনিজের বিপুল সম্ভার থাকা সত্ত্বেও অবস্থার কোনও পরিবর্তন কেন হচ্ছে না তাদের? এই প্রশ্নের উত্তর সর্বদাই এড়িয়ে গিয়েছে শাহবাজ় প্রশাসন।

০৫ ১৮

আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তির পর তাদের বিরল খনিজের ভান্ডারকে ‘বিশ্বের সর্ববৃহৎ’ বলে দাবি করে ইসলামাবাদ। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, পাকিস্তানের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বা জিডিপিতে (গ্রস ডোমেস্টিক প্রোডাক্ট) খনিজ সম্পদের অবদান মাত্র ৩.২ শতাংশ। দুনিয়ার মোট খনিজ রফতানির ০.১ শতাংশ আসে ভারতের পশ্চিমের প্রতিবেশীটির থেকে। ফলে শাহবাজ় প্রশাসনের ‘লক্ষ কোটি ডলারের’ খনিজ মজুত থাকার দাবিকে ‘আষাঢ়ে গল্প’ বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকদের একাংশ।

০৬ ১৮

দ্বিতীয়ত, খনিজের মান নির্ধারণের জন্য আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত দু’টি সংগঠন রয়েছে। সেগুলি হল, অস্ট্রেলিয়ার জয়েন্ট অরে রিজ়ার্ভস কমিটি (জেওআরসি) এবং কানাডার এন১ ৪৩-১০১। বিশ্ববাজারে খনিজ সম্পদ বিক্রির সময় ভারত, চিন বা ব্রাজ়িলের মতো দেশগুলি এদের শংসাপত্র ব্যবহার করে থাকে। এ ছাড়াও আছে নিজস্ব গুণগত মানের কোড, যার কোনওটাই ব্যবহার করে না পাকিস্তান। এতে ইসলামাবাদের বিপুল খনিজ সম্পদ নিয়ে সন্দেহ আরও বেড়েছে।

০৭ ১৮

শাহবাজ় সরকারের দাবি, বিরল খনিজ উত্তোলনের জন্য তাদের চাই বিদেশি বিনিয়োগ। কারণ, পরিকাঠামোর অভাব রয়েছে তাদের। বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন, সে ক্ষেত্রে বেজিঙের লগ্নিকে কেন কাজে লাগাল না ইসলামাবাদ? গত কয়েক বছরে ‘চিন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক বারান্দা’ বা সিপিইসি (চায়না-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডর) প্রকল্পে ৬,৫০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে ড্রাগন সরকার। ভারতের পশ্চিমের প্রতিবেশী দেশটির বেশ কয়েকটি খনিও পরিচালনা করে মান্দারিনভাষীরা।

০৮ ১৮

বেজিং-ইসলামাবাদ ‘বন্ধুত্বপূর্ণ’ সম্পর্কের কথা মাথায় রেখে বিশ্লেষকদের দাবি, চিনের থেকে বিরল খনিজের লগ্নি পাওয়া পাকিস্তানের পক্ষে কখনওই কঠিন ছিল না। শাহবাজ়-মুনির এক বারের জন্যও সেই রাস্তায় না হাঁটায় সন্দেহ জোরালো হতে শুরু করেছে। এ ব্যাপারে গত শতাব্দীর ৯০-এর দশকে ড্রাগনের অর্থানুকূল্যে চালু থাকা সাইন্দক তামার খনিটির কথা উল্লেখ করেছেন তাঁরা। এর রাজস্বের পরিসংখ্যান বার বার গোপন করার অভিযোগ উঠেছে ভারতের পশ্চিমের প্রতিবেশী দেশটির বিরুদ্ধে।

০৯ ১৮

বিশেষজ্ঞদের কথায়, বর্তমানে বিরল খনিজ়ের ক্ষেত্রে আমেরিকার চেয়ে চিনা লগ্নি অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য। কারণ, সংশ্লিষ্ট খনিজগুলির পরিশোধন শিল্পের ৯২ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে বেজিং। এ ছাড়া বিরল খনিজ উৎপাদনের ৬১ শতাংশ আছে ড্রাগনের হাতে। ফলে মার্কিন সহায়তায় ওই ধাতু উত্তোলন করতে পারলেও ইসলামাবাদকে যেতে হবে মান্দারিনভাষীদের কাছেই। কারণ, রাতারাতি কোনও পরিশোধন কেন্দ্র গড়ে তোলা সম্ভব নয়। এগুলি ব্যয়বহুল হওয়ায় লগ্নিকে সীমিত করতে পারে।

১০ ১৮

বিরল খনিজের ব্যাপারে চিনের উপর আমেরিকার যথেষ্ট নির্ভরশীলতা রয়েছে। গত বছরের (পড়ুন ২০২৫ সাল) নভেম্বরে এই ইস্যুতে ওয়াশিংটনকে ‘ব্ল্যাকমেল’ করতে ছাড়েনি বেজিং। দু’তরফে বাণিজ্যিক সংঘাত তীব্র হলে পাঁচটি বিরল খনিজের রফতানি কিছু দিনের জন্য বন্ধ করে ড্রাগন সরকার। ফলে বৈদ্যুতিন সামগ্রী থেকে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম নির্মাণে বিপাকে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র। আগামী দিনে ফের এই পরিস্থিতি তৈরির আশঙ্কা আছে ষোলো আনা। আর তাই পাকিস্তানের ব্যাপারে ট্রাম্প ‘জুয়া খেলছেন’ বলেই ধারণা বিশ্লেষকদের।

১১ ১৮

ইসলামাবাদের বিরল খনিজ ভান্ডার হাতে পেলেও সেখান থেকে ওই ধাতুগুলি বার করে আনা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে একেবারেই সহজ নয়। এর জন্য এক দশকের বেশি সময় লাগতে পারে ওয়াশিংটনের। কারণ, পাক বিরল খনিজ পরিশোধনের জন্য চিনের কাছেই যেতে হবে তাদের। সেখানে বেজিং কম আগ্রহী হলে সমস্যা বাড়বে। দ্বিতীয়ত, ভারতের পশ্চিমের প্রতিবেশীটির খনি প্রযুক্তি বেশ পুরনো। ফলে মান্ধাতার আমলের যন্ত্রপাতি দিয়ে বিরল ধাতু উত্তোলন করতে দীর্ঘ সময় লেগে যেতে পারে।

১২ ১৮

এ ছাড়া আরও একটি সমস্যা রয়েছে। পাকিস্তানের আমলাতন্ত্র আর পাঁচটা দেশের থেকে অনেক বেশি জটিল। কারণ, সেখানকার প্রশাসনে সরাসরি হস্তক্ষেপ করে থাকে সেনাবাহিনী। এর জেরে গত কয়েক বছরে বার বার সংবিধান বদল করেছে ইসলামাবাদ। ২০১০ সালের সংশোধনী অনুযায়ী, খনিজ সম্পদের উপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ জোরালো করে তারা। পরে এর বিকেন্দ্রীকরণ সংক্রান্ত একাধিক সরকারি নির্দেশ জারি করতে দেখা গিয়েছে শরিফ প্রশাসনকে, যেটা লগ্নিকারীদের জন্য বিভ্রান্তিকর।

১৩ ১৮

উদাহরণ হিসাবে বালোচিস্তানের রেকো ডিক খনি প্রকল্পের কথা বলা যেতে পারে। বিদেশি বিনিয়োগে সেখান থেকে তামা ও সোনা উত্তোলনের কথা রয়েছে পাক প্রশাসনের। কিন্তু, আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় সেই কাজ ২০২৮ সাল পর্যন্ত পিছিয়ে দিয়েছে শাহবাজ় সরকার। ফলে ‘বিরক্ত’ বিনিয়োগকারীদের একাংশ ইতিমধ্যেই ইসলামাবাদের দিক থেকে মুখ ফেরাতে শুরু করেছেন। তার মধ্যেই অনুদানের অনুরোধ জানিয়ে নতুন করে লগ্নি টানতে মরিয়া হয়ে উঠেছে ভারতের পশ্চিমের প্রতিবেশী।

১৪ ১৮

বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমের কাছে ইতিমধ্যেই মুখ খুলেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেকো ডিক খনি সংস্থার এক শীর্ষকর্তা। তাঁর কথায়, ‘‘খনির নিরাপত্তার জন্য অর্থ মন্ত্রকের কাছে ১৮০ কোটি পাকিস্তানি টাকা চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু, মাত্র ২৫ কোটি ৭০ লক্ষ পাকিস্তানি অর্থ মঞ্জুর করে ইসলামাবাদ। বাকিটা অনুদানের মাধ্যমে তোলা হবে বলে জানানো হয়েছে।’’ প্রশাসনের এ-হেন মনোভাব যে যথেষ্ট উদ্বেগজনক, তা বকলমে স্বীকার করে নিয়েছেন তিনি।

১৫ ১৮

পাকিস্তানের খনিজ সম্পদের সিংহভাগ (পড়ুন ৮০ শতাংশ) বালোচিস্তানে অবস্থিত। ইসলামাবাদের চারটি প্রদেশের মধ্যে একে সর্বাধিক অশান্ত বলা যেতে পারে। দীর্ঘ দিন ধরেই পাকিস্তানের থেকে আলাদা হয়ে পৃথক রাষ্ট্র তৈরি করতে চাইছে বালোচিস্তান। আর তাই সেখানে দানা বেঁধেছে সশস্ত্র বিদ্রোহ। ফলে প্রায়ই সেনা-পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়াতে দেখা যায় তাঁদের। এই পরিস্থিতিতে বিদেশি লগ্নিকারীরা সেখানে বিনিয়োগ করতে কতটা আগ্রহী হবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।

১৬ ১৮

গত বছর (পড়ুন ২০২৫ সাল) শাহবাজ় সরকারের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি সেরে ফেলার পর ইসলামাবাদের ‘বিশাল খনিজ তেলের ভান্ডার’ নিয়ে বিস্ফোরক দাবি করেন ট্রাম্প। নিজের সমাজমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ তিনি লেখেন, ‘‘আগামী দিনে এর উন্নতিতে পাকিস্তানের সঙ্গে মিলে কাজ করবে আমেরিকা। কে বলতে পারে, একদিন হয়তো নয়াদিল্লিকেই তেল বিক্রি করবে ইসলামাবাদ।’’ তাঁর ওই মন্তব্যের পর দুনিয়া জুড়ে পড়ে যায় শোরগোল।

১৭ ১৮

তবে তেল থাকা নিয়ে পাকিস্তান দু’চোখে স্বপ্নের নগরী বুনলেও সেই তেল এখনও খুঁজে বার করা যায়নি। তেলের ভান্ডার থাকা নিয়ে পাকিস্তানের জিগির তোলার সূত্রপাত ২০১৮ সাল থেকে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান খনিজ তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে বলে দাবি তুলে আন্তর্জাতিক মঞ্চে শোরগোল ফেলে দিয়েছিলেন।

১৮ ১৮

সেই সময় পাক জনতাও আনন্দে উদ্বেল হয়ে বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন যে, সে দেশে তেল ও জ্বালানির সঙ্কট কাটতে চলেছে। তবে প্রচুর ঢাকঢোল পিটিয়ে করাচির উপকূলে খনন চালিয়েও কোনও তেলের ভান্ডার খুঁজে পাওয়া যায়নি সে সময়। সে দেশের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রকও জানিয়ে দিয়েছিল যে, তেলের ভান্ডারের খোঁজ পাওয়া যায়নি পাকিস্তানে।

সব ছবি: সংগৃহীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement