তিন দশক ধরে টেলিভিশনজগতের সঙ্গে যুক্ত। একের পর এক হিন্দি ধারাবাহিকের পাশাপাশি বেশ কয়েকটি হিন্দি ছবিতেও নৃত্যশিল্পীর ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন তিনি। কিন্তু রাতারাতি বিনোদনের দুনিয়া থেকে ‘উধাও’ হয়ে গিয়েছিলেন টেলি নায়িকা। সম্প্রতি একটি পডকাস্টে নিজের জীবনের এক অন্ধকার অধ্যায় নিয়ে আলোচনা করেছেন জসবীর কৌর।
১৯৭৫ সালের জুনে মহারাষ্ট্রের মুম্বইয়ে জন্ম জসবীরের। টেলিভিশনজগতের অতি পরিচিত মুখ হলেও তিনি কেরিয়ার শুরু করেছিলেন বড়পর্দায়। শাহরুখ খান, হৃতিক রোশন, ঐশ্বর্যা রাই বচ্চনের ছবিতে নেপথ্য নৃত্যশিল্পী (ব্যাকগ্রাউন্ড ডান্সার) হিসাবে পারফর্ম করেছেন জসবীর। সেখান থেকেই ছোটপর্দায় আগমন তাঁর।
‘কহো না প্যার হ্যায়’, ‘বাদশা’, ‘মহব্বতেঁ’, ‘সোলজার’, ‘তাল’-এর মতো বহু হিন্দি ছবিতে নেপথ্য নৃত্যশিল্পী হিসাবে কাজের সুযোগ পেয়েছেন জসবীর। পাশাপাশি ছোটপর্দার বিভিন্ন ধারাবাহিকের জন্য অডিশনও দিতেন তিনি। ২০০৪ সালে একতা কপূরের ‘কে. স্ট্রিট পালি হিল’ ধারাবাহিকে অভিনয় করে ছোটপর্দায় পা রাখেন জসবীর।
২০০৬ সালে সম্প্রচারিত ‘ঘর কি লক্ষ্মী বেটিয়া’ ধারাবাহিকে নেতিবাচক চরিত্রে অভিনয় করে ধারাবাহিকনির্মাতাদের নজর কাড়েন জসবীর। ‘সিআইডি’, ‘অনুপমা’, ‘ওয়ারিস’, ‘সসুরাল সিমর কা’-র মতো একাধিক হিন্দি ধারাবাহিকে অভিনয় করে দর্শকের ঘরে ঘরে পৌঁছে যান তিনি। কিন্তু এই পেশাই তাঁকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিয়েছিল বলে সাক্ষাৎকারে জানান জসবীর।
২০১০ সালে ‘সিআইডি’ ধারাবাহিকে অভিনয়ের সুযোগ পান জসবীর। প্রায় টানা দু’বছর ক্রাইম ঘরানার এই জনপ্রিয় ধারাবাহিকে ইনস্পেক্টর কাজলের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন তিনি। কিন্তু সেই ধারাবাহিকনির্মাতারা রাতারাতি জসবীরকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ অভিনেত্রীর।
জসবীর জানান, প্রতি দিন দীর্ঘ সময় ধরে ধরাাবাহিকের শুটিং করতে হত। নিজের কাজ নিয়ে যথেষ্ট সচেতন ছিলেন তিনি। কিন্তু একদিন হঠাৎ করেই তাঁকে অফিসে ডেকে বলা হয় যে, তিনি আর ধারাবাহিকের অংশ থাকবেন না। এই সিদ্ধান্ত জসবীরের কাছে একেবারেই অপ্রত্যাশিত ছিল।
জসবীরের দাবি, সরানোর সময় তাঁর বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগ তুলেছিল প্রযোজনা সংস্থা। অভিনেত্রীর আচরণগত সমস্যা রয়েছে, অভিনেত্রীর হাঁটাচলার ধরন ঠিক নয়, চিত্রনাট্যে অভিনেত্রীর জন্য কোনও সংলাপ না থাকলেও তিনি জোর করে দৃশ্যে ঢুকে পড়েন, সেটে অশ্রাব্য ভাষায় কথা বলেন— জসবীরের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় খাড়া করেছিল প্রযোজনা সংস্থা।
ধারাবাহিকনির্মাতাদের অভিযোগ শুনে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন জসবীর। এ সব অভিযোগ যে সত্য নয়, তা তিনি ভাল করেই জানতেন। তাই তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সকল অভিযোগই অস্বীকার করেছিলেন জসবীর। অভিনেত্রী আদৌ ধারাবাহিকে অভিনয় করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে বার বার বৈঠকে বসতেন ধারাবাহিকনির্মাতারা।
এই ঘটনার সময় মানসিক দিক দিয়ে একেবারে ভেঙে পড়েছিলেন জসবীর। অবসাদ ঘিরে ধরেছিল তাঁকে। বাড়ি ফিরে রাতের পর রাত কান্নাকাটি করতেন তিনি। মেয়ের এই অবস্থা সহ্য করতে পারতেন না জসবীরের মা। এক রাতে তিনিও যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে কেঁদে ফেললেন। মাকে তাঁর জন্য কাঁদতে দেখে ধারাবাহিক ছেড়ে বেরিয়ে আসার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন জসবীর।
সাক্ষাৎকারে জসবীর জানান, দুঃসময়ে ধারাবাহিকের কোনও সহ-অভিনেতাকেই পাশে পাননি। সকলেই মুখে কুলুপ এঁটেছিলেন। এমনকি, ‘সিআইডি’ ছেড়ে দেওয়ার পর কেউ তাঁর খোঁজ পর্যন্ত নেননি বলে দাবি জসবীরের। এই ঘটনায় আরও ভেঙে পড়েছিলেন অভিনেত্রী।
পেশাগত জীবনেও প্রভাব পড়েছিল জসবীরের। ‘সিআইডি’ ছাড়ার পর বেশ কয়েক বছর তাঁর হাতে কোনও বড় কাজ ছিল না। আর্থিক সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু কোনও পরিস্থিতিতেই অভিনয় ছাড়েননি তিনি। ছোটোখাটো ক্যামিয়ো চরিত্রে অভিনয় করে কেরিয়ার টিকিয়ে রেখেছেন জসবীর। জীবনের এই কঠিন অবস্থার জন্য ‘কালোজাদু’ দায়ী বলে দাবি তাঁর।
জসবীর বলেন, ‘‘আমায় এক জ্যোতিষী বলেছিলেন যে, আমার উপর কালোজাদু করা হয়েছে। একগোছা চুল কেটে নিয়ে কেউ মাটিতে পুঁতে দিয়েছিল। পরে আমি নিজেও বুঝতে পারি যে, মাঝখান থেকে একগোছা চুল কেটে নেওয়া হয়েছে। ঠিক তার পর থেকেই ধারাবাহিকের কাজ চলে যাওয়া থেকে শুরু করে আর্থিক সমস্যার মতো যাবতীয় কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছে আমায়। তার আগে পর্যন্ত সব কিছু স্বাভাবিক ছিল।’’
জসবীরের কথায়, প্রায় সাত বছর ধরে কঠিন অবস্থার মধ্যে জীবন কাটিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু এই কঠিন সময়ে সর্বদা তাঁকে অনুপ্রেরণা জুগিয়ে গিয়েছেন তাঁর স্বামী বিশাল মাদলানি। পেশায় ব্যবসায়ী এবং ধারাবাহিক প্রযোজক। জিমে শরীরচর্চা করতে যাওয়ার সময় বিশালের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল জসবীরের।
জিমের বন্ধুত্ব থেকে প্রেমের সম্পর্কে পরিণতি পেতে বেশি সময় লাগেনি। দু’বছর সম্পর্কে থাকার পর ২০১৬ সালের মার্চে মুম্বইয়ে আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বিয়ে করেন জসবীর এবং বিশাল। বিয়ের দু’বছর পর ২০১৮ সালে কন্যাসন্তানের জন্ম দেন জসবীর।
বর্তমানে ধারাবাহিকে অভিনয় চালিয়ে যাচ্ছেন জসবীর। পাশাপাশি স্বামীর সঙ্গে ব্যবসায় হাত লাগিয়েছেন তিনি। মুম্বইয়ের একটি গ্রামে বাংলো কিনেছেন তাঁরা। সেখানে নাচ-গানের পাশাপাশি শরীরচর্চারও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।