Bab El-Mandeb Strait

ইরান যুদ্ধের মধ্যেই ‘দুর্দশার দুয়ারে’ তালা ঝোলানোর তোড়জোড়! ‘বাইপাস’ দিয়ে তেল আনার স্বপ্নে দাঁড়ি পড়বে দিল্লির?

পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ শুরু হওয়া ইস্তক আন্তর্জাতিক খনিজ তেল বাণিজ্যের ব্যস্ততম সামুদ্রিক রাস্তা হরমুজ় প্রণালী অবরুদ্ধ করে রেখেছে ইরান। ফলে বিকল্প হিসাবে লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের বাব এল মান্দেব প্রণালী ব্যবহার করছে ভারত-সহ একাধিক দেশ। এ বার সেটাও বন্ধ করার ছক কষছে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী গোষ্ঠী।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ২৩ মার্চ ২০২৬ ১৪:৪৯
Share:
০১ ১৮

হরমুজ় প্রণালী অবরুদ্ধ করে প্রত্যাঘাত শানাচ্ছে ইরান। তেহরানের এই রণকৌশলে হতচকিত আমেরিকা। অবস্থা ভাল নয় তাদের সঙ্গী ইজ়রায়েলেরও। অন্য দিকে যুক্তরাষ্ট্রের উপর চাপ বাড়াতে পশ্চিম এশিয়ার একের পর এক আরব রাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলে খনি, শোধনাগার এবং গ্যাসক্ষেত্রকে নিশানা করছে সাবেক পারস্যের শিয়া ফৌজ। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে তরল সোনার দাম। যুদ্ধের জেরে কি এ বার বন্ধ হবে উপসাগরীয় তেলের ব্যবসা? উঠছে সেই প্রশ্নও।

০২ ১৮

এ-হেন পরিস্থিতিতে পরিত্রাতা হয়ে সামনে এসেছে সৌদি আরব। অবরুদ্ধ হরমুজ়কে ‘বুড়ো আঙুল’ দেখিয়ে সম্পূর্ণ অন্য রাস্তায় তরল সোনা ও এলপিজির (লিকুইফায়েড পেট্রোলিয়াম গ্যাস) সরবরাহ শুরু করে দিয়েছে রিয়াধ। তার জন্য ‘পূর্ব-পশ্চিম অপরিশোধিত তেল পাইপলাইন’-এর বহুল ব্যবহার করতে হচ্ছে তাদের। পশ্চিম এশিয়ার আরব রাষ্ট্রটির এই পদক্ষেপে জ্বালানি সঙ্কটের মধ্যেও নয়াদিল্লি কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে পারছে বললে অত্যুক্তি হবে না।

Advertisement
০৩ ১৮

কিন্তু, অপরিশোধিত তেল এবং তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের জন্য সৌদি প্রশাসন যে ‘বাইপাস’কে আঁকড়ে ধরেছে, তাতেও আছে কাঁটা। সংশ্লিষ্ট সামুদ্রিক রাস্তাটির দরজা খুলছে লোহিত সাগরে। তার পর বাব এল মান্দেব প্রণালী হয়ে এডেন উপসাগর ঘুরে পণ্যবাহী জাহাজগুলি আসছে আরব সাগরে। হরমুজ়ের মতো সংশ্লিষ্ট রাস্তাটিও আটকাতে পারে ইয়েমেনের বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুথি। পর্দার আড়ালে থেকে তাদের হাতিয়ার ও গোলা-বারুদ দিয়ে ক্রমাগত সাহায্য করে যাচ্ছে তেহরান।

০৪ ১৮

লোহিত এবং এডেন উপসাগরের সংযোগকারী বাব এল মান্দেবের দৈর্ঘ্য এবং প্রস্থ যথাক্রমে ১৩০ এবং ৪০ কিলোমিটার। তবে কোনও কোনও জায়গায় সংশ্লিষ্ট প্রণালীটি মাত্র ৩০-৩৩ কিলোমিটার চওড়া। ফলে এর উপর ইয়েমেনের নিয়ন্ত্রণ সবচেয়ে বেশি। বাব এল মান্দেবের উল্টো দিকে রয়েছে ‘আফ্রিকার শিং’ বা ‘হর্ন অফ অফ্রিকা’। এককথায় সরু সামুদ্রিক জলপথটি আরব উপদ্বীপ থেকে জিবুতি, ইরিত্রিয়া এবং সোমালিয়াকে পৃথক করেছে।

০৫ ১৮

বর্তমানে দিনে প্রায় ৮৮ লক্ষ ব্যারেল খনিজ তেল পরিবহণ হয় বাব এল মান্দেবের করিডর দিয়ে। পাশাপাশি, ওই রুটে চলাচল করে বিশ্বের সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রায় ১০-১২ শতাংশ পণ্য। এ-হেন গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা বন্ধ হলে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তরল সোনার দর যে অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়বে, তা বলাই বাহুল্য। এতে ব্যাহত হবে ভারত-ইউরোপের আমদানি-রফতানি। ফলে বাব এল মান্দেবের অবরোধ যুদ্ধকে আরও ভয়ঙ্কর করে তুলবে বলেই মনে করছেন সামরিক বিশ্লেষকদের একাংশ।

০৬ ১৮

১৮৬৯ সালে সুয়েজ় খালে জুড়ে যায় লোহিত সাগর ও ভূমধ্যসাগর। ফলে আফ্রিকা ঘুরে পণ্য নিয়ে যাওয়ার বদলে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে সহজ পথে শুরু হয় বাণিজ্য। গত ১৫৭ বছরে এর অন্যথা হয়নি। কিন্তু মজার বিষয় হল, বাব এল মান্দেব হয়েই যাচ্ছে এই সামুদ্রিক রাস্তা। এককথায় একে সুয়েজ় খালের প্রবেশদ্বার বলা যেতে পারে। আর তাই সেখানে হুথিদের দৌরাত্ম্যের আশঙ্কায় তীব্র হচ্ছে আতঙ্ক।

০৭ ১৮

অতীতে লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগর সংলগ্ন এই সামুদ্রিক রাস্তা ইয়েমেনের এই বিদ্রোহীরা কখনও অবরুদ্ধ করেনি, এমনটা নয়। ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে গত বছরের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাব এল মান্দেব দিয়ে পণ্যবাহী জাহাজ পরিবহণ করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলা চালিয়ে লোহিত সাগরে ‘ইটারনিটি সি’ এবং ‘ম্যাজিক সিজ়’ নামের দু’টি মালবাহী জাহাজ ডুবিয়ে দেয় হুথিরা। আক্রমণে প্রাণ হারান চার জন নাবিক।

০৮ ১৮

পশ্চিমি গণমাধ্যমগুলির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩-’২৫ সালের মধ্যে লোহিত সাগর এবং বাব এল মান্দেবে শতাধিক পণ্যবাহী জাহাজে হামলা চালিয়েছে ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহী গোষ্ঠী। ২০২৪ সালের মার্চে তাদের আক্রমণে প্রাণ হারান ‘ট্রু কনফিডেন্স’ নামের একটি মালবাহী জাহাজের তিন নাবিক। ফলে গত তিন বছরে এই রাস্তায় আমদানি-রফতানি প্রায় ৫০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। বর্তমানে হুথিরা ফের সক্রিয় হলে পরিস্থিতি যে আরও খারাপ হবে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।

০৯ ১৮

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরে পশ্চিম এশিয়ার গাজ়া থেকে ইজ়রায়েলে ঢুকে মারাত্মক হামলা চালায় প্যালেস্টাইনপন্থী বিদ্রোহী গোষ্ঠী হামাস। নির্বিচারে গুলি চালিয়ে প্রায় ১,২০০ জন ইহুদিকে হত্যা করে তাঁরা। এর পর তেল আভিভের পক্ষে চুপ করে থাকা সম্ভব ছিল না। তড়িঘড়ি হামাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামে ইহুদি ফৌজ। ওই বছরের নভেম্বরে প্যালেস্টাইনপন্থী বিদ্রোহীদের পাশে দাঁড়িয়ে ইজ়রায়েলকে নিশানা করে ইরান সমর্থিত হুথিরা।

১০ ১৮

ইহুদি-হামাস এবং ইয়েমেনের যুদ্ধে হুথিরা জড়িয়ে পড়া ইস্তক উত্তপ্ত হয়েছে বাব এল মান্দেব। গুরুত্বপূর্ণ এই সামুদ্রিক রাস্তাটিকে চালু রাখতে ২০২৪ সালে আসরে নামে আমেরিকা। পশ্চিম এশিয়ার দেশটিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বিদ্রোহীদের গুপ্ত ঠিকানায় বোমাবর্ষণ করে মার্কিন বিমানবাহিনী। তাতে পঞ্চম প্রজন্মের ‘স্টেলথ’ প্রযুক্তির ‘বি-২ স্পিরিট’ বোমারু বিমান ব্যবহার করেছিল ওয়াশিংটন। তার পরেও যুক্তরাষ্ট্র হুথিদের কোমর পুরোপুরি ভাঙতে পারেনি।

১১ ১৮

গত বছরের (পড়ুন ২০২৫ সাল) মার্চে লোহিত সাগরে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস হ্যারি ট্রুম্যান এবং তার সঙ্গে থাকা অন্য যুদ্ধজাহাজগুলিতে ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলা চালায় ইয়েমেনের ওই বিদ্রোহী গোষ্ঠী। এর পর অগস্টে রাজধানী সানায় ইহুদি বায়ুসেনার আক্রমণে প্রাণ হারান হুথি প্রধানমন্ত্রী আহমেদ গালিব আল-রাহাবি। মৃত্যু হয় তাদের মন্ত্রিসভার আরও ১১ সদস্যের। এই ঘটনার প্রতিশোধ নেওয়া হবে বলে ইতিমধ্যেই হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছে হুথিরা।

১২ ১৮

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের দাবি, ইরান যুদ্ধের মধ্যে নতুন করে বাব এল মান্দেব অবরুদ্ধ করার ‘মেগা সুযোগ’ পেয়ে গিয়েছে ইয়েমেনের ওই বিদ্রোহী গোষ্ঠী। কারণ, এ বছরের ফেব্রুয়ারি থেকেই লোহিত এবং ভূমধ্যসাগরীয় এলাকায় বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ডকে মোতায়েন রেখেছিল আমেরিকা। কিন্তু, সম্প্রতি ওই যুদ্ধজাহাজকে গ্রিসের বন্দরে সরানোর নির্দেশ দিয়েছে মার্কিন যুদ্ধ দফতরের (ডিপার্টমেন্ট অফ ওয়ার) সদর কার্যালয় পেন্টাগন।

১৩ ১৮

এ বছরের ১২ মার্চ সৌদি আরবের উপকূল সংলগ্ন লোহিত সাগরে হঠাৎ করেই অগ্নিকাণ্ডের শিকার হয় জেরাল্ড আর ফোর্ড। বিষয়টি নিয়ে তড়িঘড়ি বিবৃতি দেয় পশ্চিম এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় কমান্ড ‘সেন্টকম’। আমেরিকার সামরিক কর্তারা জানান, ইরান যুদ্ধের কারণে রণতরীটিতে আগুন লাগেনি। জাহাজটির লন্ড্রি থেকে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। যদিও তেহরানের দাবি, ফোর্ডকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলা চালিয়েছে আইআরজিসি। তাতেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী।

১৪ ১৮

গ্রিসের ক্রিট দ্বীপের সৌদা উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের একটি নৌসেনা ঘাঁটি রয়েছে। পেন্টাগন সূত্রে খবর, আপাতত সেখানেই নোঙর করবে জেরাল্ড আর ফোর্ড। সৌদার ছাউনিতেই চলবে জাহাজটির মেরামতি। পাশাপাশি, অগ্নিকাণ্ডের কারণ খুঁজে বার করতে তদন্তে নামছে আমেরিকা। কারণ ইতিমধ্যেই প্রকাশ্যে এসেছে অন্তর্ঘাতের তত্ত্ব। সাবেক সেনাকর্তাদের কথায়, জেরাল্ড ফোর্ড সরে যাওয়ায় আপাতত অরক্ষিত হয়ে পড়েছে লোহিত সাগর। ফলে বাব এল মান্দেব অবরুদ্ধ করতে সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপাতে পারে হুথি।

১৫ ১৮

এ বছরের মার্চের তৃতীয় সপ্তাহে আরও তীব্র হয়েছে এই আতঙ্ক। কারণ, আমেরিকা ও ইজ়রায়েলকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন ইয়েমেনের বিদ্রোহী গোষ্ঠীটির অন্যতম শীর্ষনেতা আব্দুল মালিক আল-হুথি। তাঁর কথায়, ‘‘বাব এল মান্দেব বন্ধ করার বিকল্প আমাদের সামনে রয়েছে। এর জন্য নৌ-ড্রোন এবং জাহাজ ধ্বংসকারী ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে আমরা প্রস্তুত হচ্ছি। তবে ছাড় পাবে বিশেষ কয়েকটা দেশের পণ্যবাহী জাহাজ।’’ আব্দুলের এই হুমকিকে উড়িয়ে দিচ্ছেন না কেউই।

১৬ ১৮

তবে বাব এল মান্দেব অবরুদ্ধ হলে ইউরোপ-এশিয়ার বাণিজ্য পুরোপুরি থমকে যাবে, তা কিন্তু নয়। কারণ, বিকল্প হিসাবে আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ (কেপ অফ গুড হোপ) ঘুরে পণ্য পরিবহণ করতে পারবে মালবাহী জাহাজ। তবে সে ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সমস্যার মুখে পড়বে তেলের ট্যাঙ্কার। হরমুজ় বন্ধ থাকায় লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর দিয়ে যাবতীয় তরল সোনা রফতানি করছে সৌদি আরব। ওই প্রণালীর পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ পেয়ে গেলে সেখানেও হামলা চালাতে পারে হুথিরা।

১৭ ১৮

ইয়েমেনের বিদ্রোহী গোষ্ঠীটির দৌরাত্ম্যের কথা মাথায় রেখে ইতিমধ্যেই মার্স্ক, হ্যাপাগ-লয়েড এবং সিএমএ-র মতো পণ্যবাহী জাহাজ সংস্থাগুলি লোহিত সাগরের রাস্তায় যাতায়াত আংশিক ভাবে বাতিল করেছে। আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে পণ্য পরিবহণ করছে তারা। এতে সময় এবং খরচ দুটোই উর্ধ্বমুখী হয়েছে। বাব এল মান্দেব অবরুদ্ধ হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সেটা আরও বেশি চাপ ফেলবে।

১৮ ১৮

আরবি শব্দ বাব এল মান্দেবের অর্থ হল ‘দুর্দশার দুয়ার’। পশ্চিম এশিয়ার উপকথা অনুযায়ী, প্রলয়ঙ্কর ভূমিকম্পে ‘আফ্রিকার শিং’ থেকে আলাদা হয়ে যায় আরব উপদ্বীপ। এর জেরে ওই এলাকায় গজিয়ে ওঠে সঙ্কীর্ণ ওই সামুদ্রিক রাস্তা। সৃষ্টির সময় তাতে ডুবে গিয়ে প্রাণ হারান বহু মানুষ। এত দিন এশিয়া-ইউরোপের বাণিজ্যে অক্সিজেন জুগিয়ে এসেছে সেই বাব এল মান্দেব। তা অবরুদ্ধ করে হুথিরা আরও দুর্দশা বাড়ায় কি না, সেটাই এখন দেখার।

ছবি: সংগৃহীত ও এআই সহায়তায় প্রণীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement