আমেরিকা এবং ইজ়রায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ইরান হরমুজ় প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার কারণে ভারতে রান্নার গ্যাসের (এলপিজি) জোগানে টান পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে মঙ্গলবার বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। উৎপাদন বৃদ্ধি, বুকিং পদ্ধতির বদলের পরে এ বার অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে গৃহস্থালিতে রান্নার গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্র।
ইজ়রায়েল-আমেরিকার সঙ্গে ইরানের সংঘাত ১২তম দিনে পা দিয়েছে বুধবার। ইজ়রায়েল ক্রমাগত ইরানের উপর হামলার তেজ বৃদ্ধি করছে। পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পাল্টা হামলা চালাচ্ছে ইরানও। তেহরান বুঝিয়ে দিয়েছে, তারা কোনও ভাবে কারও সামনে মাথা নত করবে না। যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য তারা প্রস্তুত। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আমেরিকা-ইরান-ইজ়রায়েল সংঘর্ষ আরও জটিল আকার নিতে শুরু করেছে।
যুদ্ধ পরিস্থিতির ফলে গত সাত দিন ধরে বন্ধ রয়েছে পণ্য পরিবহণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ় প্রণালী। ফলে ব্যাহত হয়েছে ভারতের প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ। প্রতি দিনের ১৯.১ কোটি আদর্শ ঘনমিটার (স্ট্যান্ডার্ড কিউবিক মিটার) গ্যাস ব্যবহারের প্রায় অর্ধেকই আমদানির মাধ্যমে পূরণ করে ভারত। হরমুজ় প্রণালী দিয়ে ট্যাঙ্কার চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পশ্চিম এশিয়া থেকে প্রায় ৬ কোটি আদর্শ ঘনমিটার গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে।
এর ফলে গ্যাস সরবরাহকারীরা ‘ফোস ম্যাজ়হা’র (ফোস ম্যাজ়হা হল একটি সাধারণ চুক্তিগত ধারা যা যুদ্ধ, ধর্মঘট, দাঙ্গা, মহামারি, বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দায়বদ্ধতা বা বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্ত করে। ওই সময়ে চুক্তির শর্তাবলি পূরণ করতে বাধা পেলে জরিমানা থেকে অব্যাহতি পেতে পারেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।) দ্বারস্থ হয়। এর প্রভাব পড়ছে ভারতে।
পশ্চিম এশিয়ায় ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার আবহে গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় ভারতীয় বন্দরগুলিতে এলপিজি সরবরাহ ধীর গতিতে চলছে। সোমবার থেকে মহারাষ্ট্র, পঞ্জাব, অন্ধ্রপ্রদেশের মতো রাজ্যগুলিতে সরবরাহ ব্যাপক ভাবে হ্রাস পেয়েছে। এ হেন পরিস্থিতিতে দেশের রান্নার গ্যাসের জোগানে টান পড়েছে। বহু হোটেল-রেস্তরাঁ বন্ধ বা বন্ধের মুখে। অনেকে আবার খাদ্যতালিকায় কাটছাঁট করেছে।
ভারতীয় রেলের ‘ইন্ডিয়ান রেলওয়ে কেটারিং অ্যান্ড ট্যুরিজ়ম কর্পোরেশন লিমিটেড (আইআরসিটিসি)’ সতর্ক করেছে যে, দূরপাল্লার ট্রেনে ভ্রমণকারী যাত্রীদের খাবার সরবরাহের পরিষেবা সাময়িক ভাবে ব্যাহত হতে পারে। আইআরসিটিসির ‘বেস কিচেন নেটওয়ার্ক’ খাবার প্রস্তুত করে, যা পরে প্যান্ট্রি কার এবং অনবোর্ড ক্যাটারিং পরিষেবার মাধ্যমে ট্রেনগুলিতে সরবরাহ করা হয়। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতি দিন প্রায় ১৭ লক্ষ যাত্রীকে খাবার পরিবেশন করা হয়। সেই পরিষেবা সাময়িক ভাবে ব্যাহত হতে পারে বলেই জানিয়েছে আইআরসিটিসি। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যে সকল যাত্রী টিকিট বুক করার সময় ইতিমধ্যেই খাবার বুক করেছেন, তাঁদের খাবার পরিষেবা ব্যাহত হলে তাঁরা খাবারের টাকা ফেরত পাবেন। সব মিলিয়ে রান্নার গ্যাস নিয়ে জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে দেশে।
এ হেন পরিস্থিতিতে পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকার গৃহস্থালিতে ব্যবহৃত রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডার এবং পাইপের মাধ্যমে গ্যাস পরিবহণ খাতে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বজায় রাখতে সক্রিয় হয়েছে। এলপিজি উৎপাদন, সিএনজি এবং পাইপে সরবরাহ করা রান্নার গ্যাস ব্যবহারকারীদের এ ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্র।
গেজেট বিজ্ঞপ্তি জারি করে কার্যকর করা হয়েছে অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আইন, ১৯৫৫। রান্নার গ্যাসের সরবরাহে যাতে কোনও প্রভাব না পড়ে, তা নিশ্চিত করার জন্যই এই আইন কার্যকর করা হয়েছে। সরকারি বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, এখন থেকে দেশে উৎপাদিত প্রাকৃতিক গ্যাসের উপর অগ্রাধিকার থাকবে লিকুইফায়েড পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) প্রস্তুতকেন্দ্রগুলিরও।
মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রক জানিয়েছে, আমেরিকা এবং ইজ়রায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ইরান হরমুজ় প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার কারণে ভারতে গ্যাস সরবরাহের ৩০ শতাংশ ব্যাহত হয়েছে। মন্ত্রকের তরফে একটি গেজেট বিজ্ঞপ্তিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, আমদানি করা গ্যাস অগ্রাধিকারহীন খাত থেকে সরিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহারকারীদের দিকে পাঠাতে হবে।
এই পরিস্থিতিতে এক নজরে জেনে নেওয়া যাক ভারতের প্রাকৃতিক গ্যাস সংক্রান্ত অর্থনীতি কী এবং কী ভাবে তা কাজ করে। কেনই বা ভারতের প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের জন্য প্রয়োজনীয় হরমুজ় প্রণালী?
প্রতি দিন ভারতে গ্যাসের চাহিদা ১৯ কোটি আদর্শ ঘনমিটারেরও বেশি। এর অর্ধেকের বেশি আমদানি করা হয়। ভারতে গ্যাসের চাহিদার খাত বিশ্লেষণ করে দেখা গিয়েছে, দেশে সার প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলিতে প্রতি দিন ৫.৮ কোটি আদর্শ ঘনমিটার এবং বিদ্যুৎ পরিষেবায় ২.৫ কোটি আদর্শ ঘনমিটার গ্যাস ব্যবহৃত হয়। শোধনাগার এবং পেট্রোকেমিক্যাল ও শহরে গ্যাস পরিবেশকরা প্রতি দিন যথাক্রমে ২.২ কোটি এবং ৩.৭ কোটি আদর্শ ঘনমিটার গ্যাস ব্যবহার করে। বাকি অন্যান্য খাতে ব্যবহৃত হয়।
প্রাকৃতিক গ্যাসের একাধিক জ্বালানি রয়েছে— তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি), পাইপে সরবরাহ করা রান্নার গ্যাস (পিএনজি), সঙ্কুচিত প্রাকৃতিক গ্যাস (সিএনজি) এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বা বাণিজ্যিক গ্যাস। ২০২৪-’২৫ অর্থবর্ষে ভারতে প্রায় ২.৯৬ কোটি টন এলপিজি ব্যবহার করা হয়েছিল। দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের মাসিক গড় খরচ প্রায় ২৬ লক্ষ টন।
দেশে বর্তমানে ৩৩ কোটিরও বেশি এলপিজি গ্রাহক রয়েছেন। এলপিজির চাহিদার প্রায় ৯০ শতাংশ ব্যবহৃত হয় গৃহস্থালিতে। বাকিটা হোটেল-রেস্তরাঁ এবং অন্যান্য খাতে। এ দেশে এলপিজির চাহিদার ৬০ শতাংশেরও বেশি আমদানি করা হয়, যার ৯০ শতাংশ আসে হরমুজ় প্রণালী দিয়ে।
পিএনজি সরবরাহ করে গ্যাস বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান যেমন মহানগর গ্যাস লিমিটেড (এমজিএল), গুজরাত গ্যাস লিমিটেড, ইন্দ্রপ্রস্থ গ্যাস লিমিটেড (আইজিএল)-এর মতো সংস্থা। পিএনজি গৃহস্থালি এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান যেমন হোটেল এবং রেস্তরাঁতেও ব্যবহৃত হয়।
সিএনজি মূলত ব্যবহৃত হয় অটো, গাড়ি, বাসের মতো পরিবহণ যানের জ্বালানি হিসাবে। ভারতে প্রতি দিন ১.২-১.৫ কোটি আদর্শ ঘনমিটার সিএনজি ব্যবহার করা হয়। অন্য দিকে, এলএনজির চাহিদা রয়েছে কাচ এবং সেরামিক-সহ বিভিন্ন শিল্পে।
কিন্তু পশ্চিম এশিয়ায় তৈরি হওয়া যুদ্ধ পরিস্থিতিতে হরমুজ় প্রণালী দিয়ে পণ্য পরিবহণ ব্যাহত হওয়ায় দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের জোগানে ব্যাঘাত ঘটেছে। ফলে দেশে গ্যাস সরবরাহ বিঘ্নিত। গ্যাসের জোগান নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় আশঙ্কায় ভুগছে সাধারণ মানুষ। রেস্তরাঁ কর্তৃপক্ষগুলি জানিয়েছেন, এলপিজি সরবরাহের ঘাটতির কারণে খাদ্য পরিষেবা ব্যাহত হতে পারে। এমনকি, তাঁদের কার্যক্রমও বন্ধ করতে হতে পারে। আর যদি তা হয়, তা হলে কাঁচামাল সরবরাহকারীরাও আতান্তরে পড়বেন। এর প্রভাব অর্থনীতিতে পড়বে বলেও মনে করছেন বিশেষজ্ঞেরা।
প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার প্রভাব অনুভূত হচ্ছে কর্নাটক, মহারাষ্ট্র, পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যে। কর্নাটকের উপ-মুখ্যমন্ত্রী এবং রাজ্য কংগ্রেস সভাপতি ডি কে শিবকুমার মঙ্গলবার জানিয়েছেন, দেশে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহে ঘাটতির কারণে সে রাজ্যের হোটেল এবং বাণিজ্যিক শিল্প ব্যাপক ভাবে প্রভাবিত হয়েছে। সোমবার বেঙ্গালুরু হোটেল অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, বাণিজ্যিক গ্যাসের সিলিন্ডার সরবরাহ হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে বেঙ্গালুরুতে হোটেল এবং রেস্তরাঁর কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রভাব পড়েছে মুম্বইয়েও। এলপিজি সরবরাহকারীরা জানিয়েছেন যে, ইতিমধ্যেই রান্নার গ্যাসের লভ্যতার উপর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বুক করার পর দুই থেকে আট দিন দেরি করে গ্যাস পৌঁছোচ্ছে গ্রাহকদের বাড়িতে। হোটেল এবং রেস্তোরাঁগুলিতে ব্যবহৃত বাণিজ্যিক সিলিন্ডারের সরবরাহ প্রায় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে। হোটেল এবং অন্য বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে কালোবাজারির মাধ্যমে ঘরোয়া সিলিন্ডার কিনতে বাধ্য করা হতে পারে বলেও আশঙ্কাপ্রকাশ করেছেন এলপিজি ডিলাররা।
পুণে পৌর কমিশনার নৌকিশোর রাম সংবাদসংস্থা এএনআইকে জানিয়েছেন, ঘাটতি রোধ করতে এলপিজির উপর নির্ভরশীল শহরের ১৮টি শ্মশান সাময়িক ভাবে বন্ধ করে দেওয়া হবে। তবে অন্য শ্মশানগুলি চালু থাকবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।