স্বামীর পেশার সঙ্গে অভিনেত্রীর পেশার দূরদূরান্তে কোনও যোগ নেই। তবুও আধ ঘণ্টার আলাপেই প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন। যে পেশার মানুষকে কোনও দিন বিয়ে করবেন না বলে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, এক বছর সম্পর্কে থাকার পর সেই পেশার মানুষকেই বিয়ে করেন বলি অভিনেত্রী পরিণীতি চোপড়া। তবে, তাঁর ‘প্রেমিকের’ তালিকা নাকি ছিল দীর্ঘ। তালিকায় বলিউডের অভিনেতা থেকে শুরু করে নাম রয়েছে চলচ্চিত্রজগতের দুই পরিচালকেরও।
মাত্র ১৭ বছর বয়সে লন্ডনে গিয়েছিলেন পরিণীতি। ম্যাঞ্চেস্টার বিজ়নেস স্কুলে ব্যবসা, অর্থনীতি এবং বিনিয়োগ নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন তিনি। তিনটি বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করার পর সেখানে গানবাজনা নিয়েও পড়াশোনা করেছিলেন নায়িকা।
কলেজের পড়াশোনা শেষ করে লন্ডনেই চাকরি খুঁজতে শুরু করেছিলেন পরিণীতি। কিন্তু ২০০৯ সালে ব্রিটেনে অর্থনৈতিক মন্দার ফলে চাকরির আকাল দেখা যায়। ফলে সেখানে হাজার চেষ্টা করেও চাকরি পাচ্ছিলেন না তিনি। বাধ্য হয়ে তাঁকে মুম্বইয়ে ফিরে আসতে হয়। মুম্বই ফিরে বলিউডে কেরিয়ার গড়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েন তিনি।
কানাঘুষো শোনা যায়, বহু জায়গায় অডিশন দিয়েও অভিনয়ের সুযোগ পাচ্ছিলেন না পরিণীতি। মনের মতো সুযোগ না পেয়ে শেষে যশরাজ ফিল্মস প্রযোজনা সংস্থায় মার্কেটিং বিভাগে কাজ করতে শুরু করেন। পদোন্নতির পর সেই সংস্থার জনসংযোগ আধিকারিক হয়ে যান তিনি।
অভিনয়জগতের এত কাছাকাছি থেকেও অভিনয় করতে পারছেন না ভেবে চাকরি ছেড়ে অভিনয় শেখার জন্য একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্রে ভর্তি হন পরিণীতি। ২০১১ সালে ‘লেডিস ভার্সেস রিকি বহল’ ছবিতে অভিনয় করেন তিনি। কিন্তু সেই চরিত্রটি ছিল স্বল্পদৈর্ঘ্যের।
পরের বছর ২০১২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘ইশকজ়াদে’ ছবির হাত ধরে পাকাপাকি ভাবে বলিউডে যাত্রা শুরু করেন পরিণীতি। এই ছবিতে অর্জুন কপূরের বিপরীতে জুটি বেঁধে মুখ্যচরিত্রে অভিনয় করতে দেখা যায় তাঁক। বলিপাড়ার গুঞ্জন, সেই ছবির নায়কের প্রেমে পড়ে যান অভিনেত্রী।
‘ইশকজ়াদে’ ছবির শুটিং চলাকালীন অর্জুনের সঙ্গে নাকি রসায়ন জমে উঠেছিল পরিণীতির। নায়ক-নায়িকার বন্ধুত্বপূর্ণ খুনসুটির সম্পর্ক কারও নজর এড়িয়ে যায়নি। কানাঘুষো শোনা যায়, সেই সময় অর্জুনের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন পরিণীতি। কিন্তু কোনও কারণে তাঁদের সম্পর্ক ভেঙে যায়।
পরে ‘নমস্তে ইংল্যান্ড’, ‘সন্দীপ অউর পিঙ্কি ফারার’ নামে দু’টি ছবিতে একসঙ্গে অভিনয় করেছেন পরিণীতি এবং অর্জুন। পরে দুই তারকা যদিও স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, তাঁদের মধ্যে বন্ধুত্ব ব্যতীত অন্য সম্পর্ক নেই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই বন্ধুত্ব আরও দৃঢ় হয়েছে।
২০১৪ সালে ‘দাওয়াত-এ-ইশক’ ছবিটি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাওয়ার পর পরিণীতির সঙ্গে নাম জড়িয়ে পড়েছিল বলি অভিনেতা আদিত্য রায় কপূরের। ছবির প্রচারের জন্য ভারতের নানা প্রান্তে খেতে যেতেন দুই তারকা। পর্দার আড়ালেও তাঁদের সম্পর্কের সমীকরণ ধরা পড়ছিল ছবিশিকারিদের ক্যামেরায়।
শোনা যেতে থাকে, আদিত্যের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছেন পরিণীতি। পরে নায়িকাকে এই বিষয়ে সরাসরি প্রশ্ন করা হলে তিনি জানিয়েছিলেন, আদিত্যের মতো কোনও মানুষকে তিনি কখনওই ডেট করবেন না। কারণ, আদিত্য সব সময় পরিণীতিকে শরীরচর্চা এবং ডায়েট নিয়ে ‘জ্ঞান’ দিতে থাকেন। আদিত্যের এই আচরণে বিরক্ত হয়ে পড়েন নায়িকা। পরে জানা যায়, দুই তারকা শুধুমাত্র বন্ধু ছিলেন।
বলিপাড়ায় পরিণীতির অভিষেক হয়েছিল ‘লেডিস ভার্সেস রিকি বহেল’ ছবির মাধ্যমে। এই ছবির পরিচালক ছিলেন মণীশ শর্মা। শোনা যায়, অডিশন থেকে শুরু করে পরিণীতিকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা ছিল মণীশের। তার পর মণীশের পরিচালনায় ‘শুদ্ধ দেসী রোমান্স’ ছবিতে কাজ করেন পরিণীতি। দীর্ঘ কাজের সূত্র ধরেই ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকে তাঁদের।
প্রায়শই বিভিন্ন পার্টি, ডিনার এবং ছবির স্ক্রিনিংয়ে একসঙ্গে দেখা যেত পরিণীতি এবং মণীশকে। মুম্বইয়ের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে গুঞ্জন ছিল যে, তাঁরা দীর্ঘ কয়েক বছর সম্পর্কে ছিলেন। পরিণীতি যখনই মণীশ সম্পর্কে কথা বলতেন, তখনই তাঁকে ‘মেন্টর’ হিসাবে উল্লেখ করতেন।
২০১৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে জানা গিয়েছিল যে, পরিণীতির সঙ্গে মণীশের সম্পর্ক ভেঙে গিয়েছে। জনশ্রুতি, কেরিয়ারের লক্ষ্য এবং ব্যক্তিগত কিছু মতভেদের কারণেই তাঁরা আলাদা হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তবে, বিচ্ছেদের পরেও তাঁরা পরস্পরের প্রতি তিক্ততা পোষণ করেননি। ২০১৭ সালে মণীশের প্রযোজনায় ‘মেরি প্যারি বিন্দু’ ছবিতে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন পরিণীতি।
পরিণীতির সঙ্গে নাম জড়িয়ে পড়েছিল বলি অভিনেতা সুশান্ত সিংহ রাজপুতেরও। ‘শুদ্ধ দেসী রোমান্স’ ছবিতে পরিণীতির সহ-অভিনেতা ছিলেন সুশান্ত। লাজুক স্বভাবের মানুষ ছিলেন প্রয়াত অভিনেতা। কিন্তু পরিণীতির সঙ্গে তিনি খুব সহজ ভাবে মেলামেশা করতেন।
পরিণীতির সঙ্গে সুশান্তের ঘনিষ্ঠতা দেখে গুঞ্জন ছ়ড়িয়ে গিয়েছিল তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে। কিন্তু তাঁদের মধ্যে প্রেম কখনওই দানা বাঁধেনি। কানাঘুষো শোনা যায়, ‘শুদ্ধ দেসী রোমান্স’ ছবির শুটিংয়ের সময় অঙ্কিতা লোখান্ডের সঙ্গে সম্পর্কে ছিলেন সুশান্ত। পরিণীতির খুব ভাল বন্ধু ছিলেন সুশান্ত। ২০২০ সালে অভিনেতার প্রয়াণে মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েছিলেন পরিণীতি। সমাজমাধ্যমে পোস্ট করে লিখেছিলেন, ‘‘আমার খুব ভাল বন্ধুকে হারালাম।’’
যশরাজ ফিল্মসের হাত ধরে বলিউডে আত্মপ্রকাশ পরিণীতির। সেই সূত্রে উদয় চোপড়ার সঙ্গে অভিনেত্রীর পরিচয় বহু দিনের। শোনা গিয়েছিল, দুই তারকার সেই বন্ধুত্বই গড়িয়েছিল প্রেমে। একাধিক বার একসঙ্গে জনসমক্ষে ধরা দিলেও কখনও নিজেদের সম্পর্ক নিয়ে মুখ খোলেননি পরিণীতি বা উদয় কেউই।
সহকারী পরিচালক ও চিত্রনাট্যকার হিসাবে বলিউডের অন্যতম পরিচিত মুখ চরিত দেসাই। ‘তিন পত্তি’, ‘আয়শা’, ‘ইয়ে জওয়ানি হ্যায় দিওয়ানি’, ‘কি অ্যান্ড কা’, ‘কপূর অ্যান্ড সন্স’-এর মতো ছবির সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন চরিত। চরিতের সঙ্গে বেশ কয়েক বছর ধরে নাকি চুটিয়ে প্রেম করেছেন পরিণীতি।
২০১৬ সালে বলি অভিনেত্রী প্রিয়াঙ্কা চোপড়া জোনাসের একটি ‘ড্রিম টিম ট্যুর’-এর সময় চরিত এবং পরিণীতির প্রথম পরিচয় হয়। সেখান থেকেই তাঁদের বন্ধুত্বের শুরু। এমনকি, প্রিয়ঙ্কা ও নিক জোনাসের বিয়ের বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও দেখা গিয়েছিল চরিতকে।
বলিপাড়ার গুঞ্জন, চার বছর সম্পর্কে থাকার পর ব্যক্তিগত কারণে বিচ্ছেদ হয়ে যায় পরিণীতি এবং চরিতের। বিচ্ছেদের পর এক সাক্ষাৎকারে পরিণীতি সরাসরি চরিতের নাম না নিয়ে জানিয়েছিলেন যে, জীবনে একটি সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর তিনি খুব কষ্ট পেয়েছিলেন। সেই কঠিন সময়ই পরিণীতিকে শক্তিশালী মানুষ হিসাবে গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিল।
২০২২ সালের ঘটনা। লন্ডনের এক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে রাজনীতিবিদ রাঘব চড্ঢার সঙ্গে আলাপ হয় পরিণীতির। জলখাবারের টেবিলে আধ ঘণ্টার কথোপকথনে রাঘবকে ভাল লেগে যায় অভিনেত্রীর। এক বছর গোপনে সম্পর্কে থাকার পর রাঘবকে বিয়ে করেন পরিণীতি।
২০২৩ সালের মে মাসে নয়াদিল্লির কপূরথলা হাউসে রাঘবের সঙ্গে বাগ্দান সেরে ফেলেন পরিণীতি। বাগ্দানের চার মাস পর সেপ্টেম্বরে রাজস্থানের উদয়পুরে লেক পিচোলার ধারে রাঘব এবং পরিণীতির চারহাত এক হয়। ২০২৫ সালের অক্টোবরে পুত্র নীরের জন্ম দেন অভিনেত্রী।