চার দশকের কেরিয়ারে দু’শোটির বেশি ছবিতে অভিনয় করেছিলেন। বলিউডের প্রথম সারির খলনায়ক ছিলেন। পেশার জন্য ডনের সঙ্গে সময় কাটিয়েছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনও বর্ণময় ছিল তাঁর। তৃতীয় স্ত্রীর মন ভাঙতে চাইতেন না বলে দ্বিতীয় সংসারের কথা গোপন করে রেখেছিলেন বলি অভিনেতা অজিত খান।
১৯২২ সালের জানুয়ারিতে হায়দরাবাদের গোলকোণ্ডায় জন্ম অজিতের। তাঁর আসল নাম অবশ্য হামিদ আলি খান। পেশার প্রয়োজনে অজিত নামটি ব্যবহার করতেন তিনি। অজিতের বাবা পেশায় ছিলেন গাড়ির চালক। হায়দরবাদের নিজ়াম মির ওসমান আলি খানের চালক ছিলেন অজিতের বাবা।
অভিনেতা হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে সামান্য টাকা সম্বল করে মুম্বই চলে গিয়েছিলেন অজিত। অর্থাভাবের কারণে সিমেন্টের পাইপের ভিতর দিন কাটাতেন তিনি। এলাকার গুন্ডারা তাঁর কাছে তোলাবাজির চেষ্টা করলে তিনি প্রতিবাদ করেছিলেন। তার পর থেকে এলাকায় নামডাক হয়ে গিয়েছিল অজিতের।
চল্লিশের দশক থেকে বড়পর্দায় কাজ করতে শুরু করেছিলেন অজিত। অর্থের প্রয়োজনে বহু ছবিতে ‘এক্সট্রা’ হিসাবেও নেওয়া হত তাঁকে। পরে ১৯৫০ সালে ‘বেকসুর’ ছবিতে মধুবালার সঙ্গে অভিনয় করে বলিপাড়ায় নজরে এসেছিলেন অজিত। ‘জঞ্জীর’ ছবিতে খলনায়কের অভিনয় করে বিপুল প্রশংসিত হয়েছিলেন তিনি।
বলিপাড়া সূত্রে খবর, ‘জঞ্জীর’ ছবিতে খলনায়কের চরিত্র ফুটিয়ে তুলতে অজিত নাকি আসল ডনের সঙ্গে কয়েক দিন সময় কাটিয়েছিলেন। বাস্তবে ডন কী ভাবে হাঁটাচলা করেন, তাঁদের অভিব্যক্তিটুকুও রপ্ত করে ফেলেছিলেন অজিত। সত্তর বছর বয়সেও তিনি ৫৭টি ছবিতে পর পর অভিনয় করেছিলেন।
অজিতের ব্যক্তিগত জীবন ছিল বর্ণময়। গোয়েন নামে এক তরুণীকে প্রথমে বিয়ে করেছিলেন অজিত। অজিত মুসলিম এবং গোয়েন ছিলেন অ্যাংলো ইন্ডিয়ান। কয়েক বছর সংসার করার পর সংস্কৃতিগত ভেদাভেদের জন্য বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে গিয়েছিল তাঁদের। কানাঘুষো শোনা যায়, সেই বিয়ে থেকে কোনও সন্তান না হওয়ায় বিচ্ছেদের পথে হেঁটেছিলেন অভিনেতা।
পরে অজিতের বাবা তাঁর বিয়ে দিয়েছিলেন তুতো বোন শাহিদার সঙ্গে। বিয়ের পর শাহিদা তিন সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন। দ্বিতীয় বিয়ের পরেও ২৫ বছরের ছোট এক তরুণীর প্রেমে প়ড়ে গিয়েছিলেন অজিত। সেই তরুণী, অর্থাৎ অজিতের তৃতীয় স্ত্রীর নাম ছিল সারা।
অজিত এবং সারার পুত্রসন্তান শেহজাদ খান তাঁর বাবার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে আলোচনা করেছেন। শেহজাদ জানান, সারাকে ভালবেসে বিয়ে করে ফেলেছিলেন অজিত। কিন্তু তিনি যে বিবাহিত, সে কথা সারার কাছে গোপন করেছিলেন।
অজিতের সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদের পর গোয়েন চলে গিয়েছিলেন লন্ডনে। কিন্তু বিচ্ছেদের পরেও তাঁদের দু’জনের মধ্যে যোগাযোগ ছিল। প্রাক্তন স্ত্রী হিসাবে গোয়েনের সঙ্গে সারার আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন অজিত। জানাজানি হওয়ার ভয়ে দুই ভিন্ন শহরে আলাদা আলাদা সংসার পেতেছিলেন তিনি।
শেহজাদ জানান, হায়দরাবাদে অজিতের দ্বিতীয় স্ত্রী এবং তাঁর তিন সন্তান থাকেন। সারা এবং তাঁর দুই সন্তানকে নিয়ে মুম্বইয়ে সংসার ছিল অজিতের। দ্বিতীয় স্ত্রীর নামেই প্রচুর সম্পত্তি লিখিয়ে রেখেছিলেন তিনি। পরে সেই সম্পত্তি শেহজাদের সৎভাইয়েরা দখল করে নিয়েছিলেন।
হায়দরাবাদ এবং মুম্বইয়ে নিয়মিত যাতায়াত করতেন অজিত। দুই সংসারের দায়িত্ব সমান ভাবে পালন করেছিলেন তিনি। শেহজাদ বলেন, ‘‘আমার জন্মের সময় মা জানতে পারল বাবার দ্বিতীয় বিয়ের কথা। কিন্তু মা কোনও প্রতিবাদ করেনি। বাবার সঙ্গেই থেকে গিয়েছিল।’’
১৯৭৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ব্লকবাস্টার ছবি ‘কালীচরণ’-এ খলনায়কের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন অজিত। সেই চরিত্রের সাঙ্কেতিক নাম ছিল ‘লায়ন’। তার পর থেকে অজিতের ব্যারিটোন কণ্ঠ, অনন্য বাচনভঙ্গির কারণে তিনি বলিউডেও ‘লায়ন’ তকমা পেয়ে গিয়েছিলেন।
জীবনের শেষ সময় হায়দরাবাদে কাটাতেন অজিত। ১৯৯৮ সালের অক্টোবরে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছিলেন তিনি। দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে গেলেও শেষরক্ষা হয়নি। না ফেরার দেশে পাড়ি দিয়েছিলেন বলিউডের ‘সিংহ’। মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স ছিল ৭৬ বছর।