Russia-India-China Troika

নেটো-নির্মূলে আসরে ‘থ্রি মাস্কেটিয়ার্স’? ভারত-চিনকে সঙ্গে নিয়ে ‘তিন ইয়ারি’ জোটের অলীক স্বপ্নে মজে পুতিন!

ভারত ও চিনকে সঙ্গে নিয়ে ত্রিশক্তি জোট গড়ে তুলতে চাইছে রাশিয়া। সেই কারণে সংঘাত ভুলে দুই ‘বন্ধু’কে কাছাকাছি আসার বার্তা দিয়েছে মস্কো। যদিও ক্রেমলিনের এই পরিকল্পনা বাস্তবের মুখ দেখবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ৩১ মে ২০২৫ ১২:০১
Share:
০১ ২০

এশিয়ার দুই শক্তি ভারত ও চিনকে সঙ্গে নিয়ে এ বার ‘থ্রি মাস্কেটিয়ার্স’ শক্তিজোট গড়ে তোলার ডাক দিল রাশিয়া। মস্কোর এ হেন আহ্বানে হতবাক গোটা বিশ্ব। কারণ, নয়াদিল্লি ও বেজিঙের সম্পর্ক মোটেই সরলরৈখিক নয়। সেখানে মিশে আছে সীমান্ত সংঘর্ষ এবং ড্রাগনের ‘আকসাই চিন’ দখল করে রাখার মতো বিষয়। নিজের স্বার্থে এই সমস্যা মেটাতে স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে উদ্যোগী হবে ক্রেমলিন? উঠছে প্রশ্ন।

০২ ২০

চলতি বছরের ২৯ মে পার্ম শহরে ‘ইউরেশিয়া নিরাপত্তা সম্মেলনে’ ভাষণ দেন রুশ বিদেশমন্ত্রী সের্গেই লেভরভ। সেখানে তিনি বলেন, ‘‘আরআইসির (রাশিয়া-ইন্ডিয়া-চায়না) ত্রিপাক্ষিক জোটকে পুনরুজ্জীবিত করার সময় চলে এসেছে।’’ ২০২০ সালের পর এই জোটের কোনও বৈঠক হয়নি। এর জন্য লাদাখে বেজিঙের আগ্রাসী মনোভাব এবং গালওয়ান সংঘর্ষকেই দায়ী করে থাকেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের একাংশ।

Advertisement
০৩ ২০

রাশিয়ার সরকারি সংবাদমাধ্যম ‘তাস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই অনুষ্ঠানে লেভরভ বলেন, ‘‘বহু বছর আগে আমাদের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইয়েভজেনি প্রিমাকভের উদ্যোগে পথ চলা শুরু করে আরআইসি। এখনও পর্যন্ত এই তিন দেশের বিদেশমন্ত্রী পর্যায়ে ২০টির বেশি বৈঠক হয়ে গিয়েছে। কিন্তু, শুধুমাত্র সেখানেই আটকে থাকলে চলবে না। মস্কো সংশ্লিষ্ট ত্রিশক্তি জোটকে এগিয়ে নিয়ে যেতে আগ্রহী।’’

০৪ ২০

আরআইসি-ভুক্ত তিন দেশ কী ভাবে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি করবে, নিরাপত্তা সম্মেলনের অনুষ্ঠানে তার রূপরেখা দেন রুশ বিদেশমন্ত্রী। তাঁর কথায়, ‘‘অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা থেকে খেলাধুলা— সমস্ত ক্ষেত্রে যাতে মস্কো, নয়াদিল্লি এবং বেজিং কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে পারে, সেই রাস্তা খুঁজে বার করতে হবে।’’ লেভরভের দাবি, এই কাজ মোটেই শক্ত নয়। কারণ, লাদাখের সীমান্ত সংঘাত নিয়ে ভারত-চিন সমঝোতায় পৌঁছোতে পেরেছে।

০৫ ২০

১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে দুই ‘বন্ধু’ ভারত ও চিনকে নিয়ে আরআইসি গড়ে তোলে রাশিয়া। বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি, এই জোটেরই ফসল হল ‘ব্রিকস’। সেখানে সংশ্লিষ্ট তিনটি দেশ ছাড়াও রয়েছে ব্রাজ়িল এবং দক্ষিণ আফ্রিকা। গত বছর রাশিয়ার কাজ়ান শহরে শেষ বার বসেছিল ‘ব্রিকস’-এর সম্মেলন, যাতে হাজির ছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং চিনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। সূত্রের খবর, ওই সময় আরআইসিকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করলেও সফল হয়নি ক্রেমলিন।

০৬ ২০

কাজ়ানে ‘ব্রিকস’ সম্মেলন চলাকালীন অবশ্য আলাদা করে প্রধানমন্ত্রী মোদী এবং প্রেসিডেন্ট শি-র মধ্যে বৈঠক করাতে সমর্থ হয় রাশিয়া। আলোচনা শেষে দু’জনকে করমর্দন করতেও দেখা গিয়েছিল। এর পরই লাদাখের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বা এলওসির (লাইন অফ অফ অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোল) পাশ থেকে ধীরে ধীরে পিছু হটে বেজিঙের ‘পিপল্‌স লিবারেশন আর্মি’ বা পিএলএ। বিশ্লেষকেরা মনে করেন ত্রিশক্তি জোটকে মজবুত করতে ওই সময়ে চাপ দিয়ে ড্রাগনকে নতিস্বীকারে বাধ্য করেছিল মস্কো।

০৭ ২০

আরআইসিকে পুনরুজ্জীবিত করার নেপথ্যে অবশ্য ক্রেমলিনের একাধিক উদ্দেশ্য রয়েছে। প্রথমত, গালওয়ান সংঘর্ষের পর পশ্চিমি দেশগুলির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি করে নয়াদিল্লি। আমেরিকা, জাপান ও অস্ট্রেলিয়াকে নিয়ে গঠিত ‘চতুঃশক্তি নিরাপত্তা সংলাপ’ বা কোয়াডের (কোয়াড্রিল্যাটারাল সিকিউরিটি ডায়ালগ) সদস্যপদ নেয় ভারত। ফলে নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারি বৃদ্ধি পেয়েছে নয়াদিল্লির।

০৮ ২০

একই কথা ‘আইটুইউটু’র ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সংশ্লিষ্ট জোটটিতে ভারত ছাড়াও রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইজ়রায়েল এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহি। এতে যোগ দেওয়ায় পশ্চিম এশিয়ার আরব মুলুকগুলির সঙ্গে নয়াদিল্লির সম্পর্ক অন্য খাতে বইতে শুরু করেছে। পাশাপাশি, প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ইহুদিভূমির অনেক কাছাকাছি পৌঁছোতে সক্ষম হয়েছে নরেন্দ্র মোদীর সরকার। পশ্চিমি শক্তিগুলির সঙ্গে দিল্লির এই মাখামাখিতে রুশ রাজনৈতিক নেতৃত্বের কপালে পড়েছে চিন্তার ভাঁজ।

০৯ ২০

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের আমল থেকে ভারতকে নির্ভরযোগ্য ‘বন্ধু’ বলে মনে করে মস্কো। আর তাই চিনা আগ্রাসনের কারণে নয়াদিল্লি ধীরে ধীরে অবস্থান বদল করে মার্কিন শক্তিজোটের দিকে পা বাড়াক, তা কখনওই চায় না ক্রেমলিন। এতে খনিজ তেল এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম বিক্রির বড় বাজার হারাবে রাশিয়া। পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে পুরোপুরি নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে মস্কোর।

১০ ২০

গত তিন বছর ধরে চলা ইউক্রেন যুদ্ধে বড় রকমের ধাক্কা খেয়েছে রুশ অর্থনীতি। লড়াই শুরু হতেই মস্কোর উপরে বিপুল পরিমাণে নিষেধাজ্ঞা জারি করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-সহ পশ্চিমি বিশ্ব। ফলে বর্তমানে চিনের উপর অনেকাংশেই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে ক্রেমলিন। রাশিয়া জানে দীর্ঘমেয়াদে বেজিঙের দিকে ঝুঁকে থাকা মোটেই স্বস্তিজনক নয়। কারণ ‘সুবিধাবাদী’ ড্রাগনকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করা কঠিন।

১১ ২০

বিশ্লেষকেরা মনে করেন, সেই কারণেই ভারসাম্য বজায় রাখতে আরআইসিকে পুনরুজ্জীবিত করতে চাইছে মস্কো। ভারতকে পাশে পেলে ইন্দো-প্রশান্ত এবং ভারত মহাসাগরে অবাধে ঢুকতে পারবে ক্রেমলিনের পণ্যবাহী জাহাজ। পাশাপাশি, ওই এলাকায় মার্কিন আধিপত্যকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানাতে পারবে রাশিয়া।

১২ ২০

তবে এ ক্ষেত্রে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণের কথা বলেছেন বিশ্লেষকেরা। তাঁদের দাবি, মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলির ‘উত্তর আটলান্টিক চুক্তি সংগঠন’ বা নেটোর (নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজ়েশন) পাল্টা শক্তিজোট হিসাবে আরআইসিকে সামনে নিয়ে আসার পরিকল্পনা করছে রাশিয়া। কারণ, এই তিন রাষ্ট্রের হাতে রয়েছে পরমাণু হাতিয়ার। সেই ‘জুজু’ দেখিয়ে নেটোকে দুর্বল করা যাবে বলে আশাবাদী মস্কো।

১৩ ২০

যদিও লেভরভের এই প্রস্তাবে ভারত রাজি হবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। কারণ, পাকিস্তানের সঙ্গে চিনের সম্পর্ক বেশ গভীর। ‘অপারেশন সিঁদুর’ এবং তাকে কেন্দ্র করে চার দিনের ‘যুদ্ধে’ তার যথেষ্ট প্রমাণ হাতে পেয়েছে নয়াদিল্লি। ভারতীয় সেনাকে পশ্চিম সীমান্তে ব্যস্ত রাখতে ইসলামাবাদকে যে বেজিং ‘ছায়াযুদ্ধের পেয়াদা’ হিসাবে ব্যবহার করতে চায়, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।

১৪ ২০

দ্বিতীয়ত, রাশিয়া দাবি করলেও এলওসিতে সীমান্ত সংঘাত যে মিটে গিয়েছে, তা কিন্তু নয়। উত্তর-পূর্বের অরুণাচল প্রদেশের দিকে লোলুপ দৃষ্টি রয়েছে চিনের। সেখানকার একাধিক এলাকার অন্য নামকরণও করেছে বেজিং। বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই কড়া বিবৃতি দিয়েছে নয়াদিল্লি।

১৫ ২০

তৃতীয়ত, ‘অপারেশন সিঁদুর’-এ মার খাওয়া পাক বায়ুসেনার হাত শক্ত করতে পঞ্চম প্রজন্মের ‘স্টেল্‌থ’ শ্রেণির জে-৩৫এ যুদ্ধবিমান দ্রুত সরবরাহ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জিনপিং সরকার। এ ছাড়া আগামী দিনে ভারতের উপর নজরদারি চালাতে চিনের গুপ্তচর কৃত্রিম উপগ্রহের সাহায্য পাবেন রাওয়ালপিন্ডির ফৌজি অফিসারেরা। বেজিঙের এই ধরনের পদক্ষেপ রুশ স্বপ্নে জল ঢালার পক্ষে যথেষ্ট, বলছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকেরা।

১৬ ২০

১৯৬২ সালের যুদ্ধে পূর্ব লাদাখের বিপুল এলাকা কব্জা করে নেয় পিএলএ, বর্তমানে যা ‘আকসাই চিন’ হিসাবে পরিচিত। সম্পূর্ণ লাদাখ-সহ উত্তর-পূর্বের বিপুল অংশ পুরোপুরি দখল করার ‘আগ্রাসী’ মনোভাব রয়েছে ড্রাগনের। রাশিয়ার চাপে বেজিং সেই নীতি থেকে সরে আসবে, এই ধারণা কষ্টকল্পিত, বলছেন বিশ্লেষকেরা। তা ছাড়া আরআইসির পুনরুজ্জীবন নিয়ে চিন কতটা উৎসাহী তাতে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।

১৭ ২০

আর তাই লেভরভের সরাসরি প্রস্তাবের পর এই নিয়ে একটা শব্দও খরচ করেনি ড্রাগন সরকার। অনেকে মনে করেন এই জোট যাতে না হয়, সেই লক্ষ্যেই ২০২০ সালে পূর্ব লাদাখে আগ্রাসী মনোভাব দেখিয়েছিল বেজিং, যার অন্তিম পরিণতি হল গালওয়ানকাণ্ড। ওই ঘটনায় পিএলএর সঙ্গে সংঘর্ষে কর্নেল বি সন্তোষ বাবু-সহ প্রাণ হারান ২০ জন ভারতীয় সৈনিক। আমেরিকা-সহ পশ্চিমি সংবাদমাধ্যমগুলির দাবি, লালফৌজের অন্তত ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছিল।

১৮ ২০

বিশ্লেষকদের দাবি, চিন মনে করে ত্রিশক্তি জোট তৈরি হলে আখেরে লাভ হবে ভারতের। রাশিয়ার সঙ্গে হাত মিলিয়ে তখন প্রযুক্তি, মহাকাশ গবেষণা, প্রতিরক্ষা এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে অনেক বেশি সক্ষমতা লাভ করবে নয়াদিল্লি। এতে দ্রুত গতিতে বাড়বে এ দেশের অর্থনীতি। তখন প্রতিযোগিতার বাজারে বেজিঙের পিছিয়ে পড়ার যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে। কারণ ড্রাগনভূমির বহু পণ্যের গুণগত মান নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে।

১৯ ২০

তা ছাড়া আমেরিকার সঙ্গে হাত মিলিয়ে ভারতের কোয়াডে থাকাকে বরাবর সন্দেহের চোখে দেখে এসেছে চিন। বেজিং একে ‘এশিয়ার নেটো’ বলে কটাক্ষ করতেও ছাড়েনি। চলতি বছরের এপ্রিলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ড্রাগন সরকারের বিরুদ্ধে শুল্কযুদ্ধ শুরু করলে নয়াদিল্লিকে পাশে চেয়েছিল জিনপিং প্রশাসন। ওই সময় বেজিঙের তরফে ‘ড্রাগন ও হাতির নাচ’ বিশ্ব দেখবে বলে বিবৃতিও দেয়। কিন্তু সাউথ ব্লক তাতে উচ্চবাচ্য না করায় ক্ষুব্ধ হন প্রেসিডেন্ট শি।

২০ ২০

এ হেন জটিল পরিস্থিতিতে মস্কো অবশ্য আশা ছাড়তে নারাজ। লেভরভ বলেছেন, ‘‘ভারত ও চিনের মধ্যে সম্পর্ক নষ্টের চেষ্টা করে যাচ্ছে নেটো।’’ রাশিয়া গোটা বিষয়টির দায় পশ্চিমি দুনিয়ার উপর চাপিয়ে নয়াদিল্লি ও বেজিংকে কাছাকাছি আনার চেষ্টা করলেও তাতে সাফল্যের আশা কম। ক্রেমলিনের আহ্বানে মোদী সরকারের মৌনতায় তা দিনের আলোর মতো স্পষ্ট, বলছেন বিশ্লেষকেরা।

সব ছবি: সংগৃহীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement