পশ্চিম এশিয়া জুড়ে অস্ত্রের দাপাদাপি। ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকা এবং ইজ়রায়েলের সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে একাধিক দেশ। যুদ্ধে প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করতে মুড়িমুড়কির মতো নিক্ষেপ করা হচ্ছে ক্ষেপণাস্ত্র থেকে ড্রোন। এরই মধ্যে লেবাননের বিরুদ্ধে যুদ্ধে আবার নিষিদ্ধ অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে ইহুদি রাষ্ট্র ইজ়রায়েলের বিরুদ্ধে।
‘হিউম্যান রাইট্স ওয়াচ’ (এইচআরডব্লিউ) নামে একটি অসরকারি নজরদারি সংস্থা অভিযোগ করেছে, মার্চের শুরুতে দক্ষিণ লেবানন অঞ্চলে সাদা ফসফরাস বোমা নিক্ষেপ করেছে ইজ়রায়েল বাহিনী। ইজ়রায়েলের বিরুদ্ধে এই ধরনের অভিযোগ প্রথম নয়। ২০২৩ সালের অক্টোবরে দক্ষিণ লেবানন এবং গাজ়া জুড়ে একই ধরনের ঘটনার অভিযোগ উঠেছিল। এই নিষিদ্ধ অস্ত্র ব্যবহারের জন্য ইজ়রায়েলকে কাঠগড়ায় তুলেছে এইচআরডব্লিউ এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।
ফসফরাস বোমার মতো বেশ কয়েকটি অস্ত্র ব্যবহারের উপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে বিশ্ব জুড়ে। শুধুমাত্র আধুনিক যুদ্ধের ইতিহাসে নয়, প্রাচীন যুগেও যুদ্ধক্ষেত্রে অস্ত্রের উপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করার নিয়ম চালু ছিল। আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মেনে আধুনিক যুদ্ধাস্ত্রের ক্ষেত্রে কিছু নিষিদ্ধ বা সীমিত অস্ত্রের রূপরেখা তৈরি করেছে ‘দ্য কনভেনশন অন সার্টেন কনভেনশনাল ওয়েপন্স’।
আন্তর্জাতিক আইন এবং জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী, অতিরিক্ত যন্ত্রণাদায়ক ফলাফল ও মরাত্মক অসামরিক ক্ষতির কারণে বেশ কিছু অস্ত্র যুদ্ধক্ষেত্রে কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ বা নিয়ন্ত্রিত। ফসফরাস বোমা ছাড়াও বেশ কিছু অস্ত্র রয়েছে যার ব্যবহার রাষ্ট্রপুঞ্জের আন্তর্জাতিক কনভেনশন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত বা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তবে মাঝেমধ্যেই সেই সমস্ত নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অস্ত্রপ্রয়োগের অভিযোগ উঠেছে রাশিয়া, ইজ়রায়েল, ইরানের মতো দেশের বিরুদ্ধে।
যন্ত্রণায় চিৎকার করতে করতে নগ্ন হয়ে রাস্তা দিয়ে দৌড়োচ্ছে নয় বছরের এক বালিকা। পিছনে আমেরিকার যুদ্ধবিমান থেকে নাগাড়ে ফেলা হচ্ছে বোমা। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের চিত্রসাংবাদিক নিক উটের তোলা সেই ছবি পরবর্তী কালে ‘নাপাম গার্ল’ নামে খ্যাত হয়। ১৯৭২-এর জুনে ভিয়েতনামে কিম ফুকের গ্রামে হামলা করে আমেরিকার যুদ্ধবিমান। মুহুর্মুহু নাপাম বোমা ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছিল ছোট্ট গ্রামটিকে। প্রাণ হাতে পালানোর সময় নাবালিকা তাঁর জ্বলন্ত পোশাক ছিঁড়ে ফেলেছিল। সেই ছবি দেখে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল গোটা বিশ্ব।
জঙ্গলের আড়ালে লুকিয়ে আছে গেরিলারা, তাই ধ্বংস করে দিতে হবে সমস্ত সবুজ। দক্ষিণ ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট গেরিলাদের জব্দ করতে এর পরই গ্যালন গ্যালন রাসায়নিক ঢালতে শুরু করে মার্কিন সেনা। রাসায়নিক দিয়ে ভিয়েতনামে সবুজ ধ্বংসের পাশাপাশি গাছ জ্বালানোর অভিযানেও নেমেছিল আমেরিকা।
সেই কাজে তাঁদের হাতিয়ার ছিল নাপাম বোমা। প্লাস্টিক পলিয়েস্টিরিন, হাইড্রোকার্বন বেঞ্জিন আর গ্যাসোলিন দিয়ে তৈরি এই জেলির মতো রাসায়নিক মিশ্রণ ভিয়েতনাম জুড়ে ফেলেছিল মার্কিন সেনা। কখনও স্প্রে করে, কখনও বা সরাসরি বোমা ফেলে জ্বালিয়ে দেওয়া হত জঙ্গল থেকে ঘরবাড়ি। এই রাসায়নিকে আগুন লাগলে তা জ্বলতে থাকে ১০ মিনিট ধরে, তাপমাত্রা পৌঁছে যায় ১০০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডে। ১৯৪২ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তৈরি করেছিল নাপাম বোমা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, কোরীয় যুদ্ধ এবং কুখ্যাততম ভিয়েতনাম যুদ্ধে এই বোমাটির ব্যাপক ব্যবহার করেছিল মার্কিন বাহিনী।
ভিয়েতনামের নাপাম বালিকার ছবি প্রকাশিত হওয়ার পরই বিশ্ব জুড়ে নিন্দার ঝড় উঠেছিল। যুদ্ধে নাপামের ব্যবহার পুরোপুরি নিষিদ্ধ নয়। তবে অসামরিক লক্ষ্যবস্তু এবং জনবসতি এলাকার কাছাকাছি সামরিক লক্ষ্যবস্তুর উপর এর ব্যবহার স্পষ্ট ভাবে নিষিদ্ধ।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যাপক বাড়বাড়ন্ত শুরু হয়। আনুমানিক ১৩ লক্ষ মানুষ হতাহত হন। পরবর্তী কালে ১৯৯৩ সালের রাসায়নিক অস্ত্র কনভেনশনের চুক্তিতে রাসায়নিক অস্ত্রের উৎপাদন, ব্যবহার এবং মজুত নিষিদ্ধ করা হয়। ১৯৩টি দেশ ‘কেমিক্যাল ওয়েপন্স কনভেনশন’ (সিডব্লিউসি) মেনে চলে। সব দেশ এই নিয়ম মানছে কি না, তা দেখার জন্য নির্দিষ্ট সংস্থা রয়েছে— ‘দ্য অর্গানাইজ়েশন ফর দ্য প্রোহিবিশন অফ কেমিক্যাল ওয়েপন্স’ (ওপিসিডব্লিউ)।
স্নায়ুর জন্য ক্ষতিকারক, মাস্টার্ড গ্যাসের মতো ফোস্কা তৈরি করা উপাদান এবং ক্লোরিন-ফসজিনের মতো শ্বাসরোধকারী রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করে তৈরি করা অস্ত্রে মৃত্যু, আঘাত, অস্থায়ী অক্ষমতা তৈরি হয়। সেই সমস্ত যুদ্ধাস্ত্রের ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে আন্তর্জাতিক আইন এবং জেনেভা কনভেনশন। ইরান-ইরাক যুদ্ধে সাদ্দাম হোসেন ঢালাও রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করেছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। ইরাকি সামরিক কর্মকর্তা আলি হাসান আল-মাজিদ, যাঁকে পরে ‘কেমিক্যাল আলি’ নামে ডাকা হত, তাঁর নেতৃত্বে সাদ্দাম হোসেন প্রচুর পরিমাণে মাস্টার্ড গ্যাস এবং তাবুন, সারিন ও ভিএক্সের মতো স্নায়ু এজেন্ট তৈরি করেছিলেন বলে মনে করা হয়।
ধোঁয়ার পর্দা তৈরি এবং আলোকচ্ছটার জন্য সাদা ফসফরাসের ব্যবহার বৈধ। ১৯৮০ সালে গৃহীত কিছু প্রচলিত অস্ত্রের কনভেনশনের তৃতীয় প্রোটোকল অনুসারে অসামরিক নাগরিক বা অসামরিক জনগোষ্ঠীর কাছাকাছি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার জন্য সাদা ফসফরাস অস্ত্র ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কারণ এগুলি থেকে অনিয়ন্ত্রিত আগুন তৈরি হয় ও অসামরিক কাঠামোয় গুরুতর আঘাত হানতে পারে।
সাদা ফসফরাস আগুনের সংস্পর্শে আসার ফলে কেউ গুরুতর ভাবে আহত হলে চিকিৎসা করা খুবই কঠিন। কারণ এগুলি অক্সিজেনের উপস্থিতিতে জ্বলে ওঠে। তাই সাদা ফসফরাস নেবানো কঠিন। এর টুকরোগুলি ত্বক ও টিস্যু ভেদ করে হাড় পর্যন্ত পুড়িয়ে দিতে পারে।
ক্লাস্টার বোমা হল এমন অস্ত্র যা বিস্তৃত এলাকা জুড়ে কয়েক ডজন বা শত শত ছোট বিস্ফোরক বা বোমা নিক্ষেপ করে। এগুলি বিমান, ক্ষেপণাস্ত্র বা কামান দিয়ে নিক্ষেপ করা যেতে পারে। বিমানক্ষেত্র বা সেনাব্যারাকের মতো বৃহৎ এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা লক্ষ্যবস্তুতে সর্বাধিক ক্ষতি করার জন্যই নকশা করা হয়েছিল ক্লাস্টার বোমার। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়েও এই অস্ত্রকে ভয়ানক বলে মনে করা হয়। কারণ, এর মাধ্যমে কোনও একটি জায়গায় নয়, একসঙ্গে একাধিক জায়গায় একাধিক হামলা চালানো যায়।
২০০৮ সালের ক্লাস্টার যুদ্ধাস্ত্র সংক্রান্ত কনভেনশন বা অসলো কনভেনশন স্পষ্ট ভাবে এই অস্ত্রের ব্যবহার নিষিদ্ধ করে। ক্লাস্টার বোমার মধ্যে থাকে একগুচ্ছ ছোট ছোট বোমা। ছোট, কিন্তু শক্তিশালী। একটি বড় ক্ষেপণাস্ত্র বা বোমার মোড়কে ওই ছোট বোমাগুলি ভরা থাকে।
উৎক্ষেপণের পর শূন্যে খুলে যায় ক্লাস্টার বোমার অস্ত্র-মুখ। ভিতর থেকে ছোট ছোট বোমাগুলি বেরিয়ে আসে এবং বিস্তীর্ণ অংশে ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষতির পরিমাণও হয় তুলনামূলক বেশি। ক্লাস্টার বোমায় যে কোনও এলাকায় সাধারণ মানুষের ক্ষতির আশঙ্কা বেশি থাকে।
অ্যান্টি পারসোনেল ল্যান্ডমাইন বা মানববিরোধী ল্যান্ডমাইন হল মাটিতে পুঁতে রাখা বা লুকিয়ে রাখা বিস্ফোরক। মানুষ বা পদাতিক বাহিনীর স্পর্শে এগুলি বিস্ফোরিত হয়। এগুলি মূলত শত্রুপক্ষকে পঙ্গু বা হত্যা করতে এবং এলাকা দখলে বাধা দিতে ব্যবহার করা হত।
যুদ্ধক্ষেত্রে মূলত দু’ধরনের ল্যান্ডমাইন ব্যবহৃত হয়— ট্যাঙ্ক বিধ্বংসী (অ্যান্টি ট্যাঙ্ক) এবং মানববিরোধী (অ্যান্টি পারসোনেল)। নব্বইয়ের দশক থেকেই আমেরিকা এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ‘অ্যান্টি পারসোনেল ল্যান্ডমাইন’ ব্যবহারের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপুঞ্জ-সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মঞ্চে সরব হয়েছে।
এগুলি প্লাস্টিক এবং কাঠের মতো অধাতব পদার্থ দিয়ে তৈরি। ফলে এগুলিকে চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। ১৯৯৭ সালের অটোয়া চুক্তির অধীনে এগুলির উৎপাদন এবং ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। ৩০ গ্রাম থেকে শুরু করে কয়েকশো গ্রাম পর্যন্ত টিএনটি থাকতে পারে মাইনগুলিতে, যা গুরুতর আঘাত বা মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যুদ্ধ শেষ হওয়ার অনেক পরেও মাটিতে পোঁতা মাইন নাগরিকদের জন্য বিপদ ডেকে আনে।
এক্সপ্যান্ডিং বুলেট বা সম্প্রসারণশীল বুলেট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করার পরে প্রসারিত হয়। ফলত তা আরও মারাত্মক আঘাতের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ১৮৯৯ সালের হেগ কনভেনশনে সম্প্রসারণশীল বুলেটের ব্যবহার যুদ্ধে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। তবে এখনও এই বুলেট শিকার ও অন্যান্য ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
জৈবিক অস্ত্রকে আধুনিক যুদ্ধের সবচেয়ে বিপজ্জনক এবং ভয়ঙ্কর অস্ত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ, বুলেট বা বোমার মতো এর প্রভাব কেবল একটি জায়গায় সীমাবদ্ধ নয়। এক বার যদি ব্যবহার করা হয়, তা হলে যুদ্ধ আর রণাঙ্গনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না। মহামারিতে পরিণত হতে পারে। একবার কোনও রোগ ছড়িয়ে পড়তে শুরু করলে, এটি সৈন্য এবং অসামরিক লোকের মধ্যে পার্থক্য করে না। এই কারণেই জৈবিক অস্ত্রকে মানব সভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুতর হুমকি হিসাবে বিবেচনা করা হয়।
এই অস্ত্রগুলি সাধারণত ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা ছত্রাকের মতো অণুজীব ব্যবহার করে তৈরি করা হয়। এগুলি পরীক্ষাগারে তৈরি করা হতে পারে। আবার প্রাকৃতিক ভাবে পাওয়া মারাত্মক রোগজীবাণু থেকেও প্রাপ্ত হতে পারে। এতে থাকতে পার অ্যানথ্রাক্স, প্লেগ, গুটিবসন্ত এবং বোটুলিনাম ব্যাকটেরিয়ার মতো মারণজীবাণু। যদি বাতাস, জল বা খাবারের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, তা হলে সারা বিশ্বে কার্যত ধ্বংসলীলা শুরু হবে।
জৈবিক অস্ত্রকে ‘নীরব অস্ত্র’-এর দলে ফেলা হয়। ১৯২৫ সালের জেনেভা কনভেনশনে জৈবিক অস্ত্রের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। ১৯৭২ সালে আন্তর্জাতিক জৈবিক অস্ত্র কনভেনশন তৈরি হয়। এই চুক্তি জৈবিক অস্ত্রের উন্নয়ন, উৎপাদন এবং মজুতকে নিষিদ্ধ করে।