গত বছরের ডিসেম্বরে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছিল আদিত্য ধরের পরিচালনায় ‘ধুরন্ধর’ ছবির প্রথম পর্ব। তিন মাস পর ছবিটির দ্বিতীয় পর্ব মুক্তি পেলে জামিল জামিলি নামের চরিত্রটিকে ঘিরে কৌতূহল জাগে দর্শকের। অধিকাংশের দাবি, এই চরিত্রটি বাস্তব থেকেই বড়পর্দায় তুলে ধরা হয়েছে। এমনকি, পাকিস্তানের এক রাজনীতিবিদের জীবনের উপর ভিত্তি করেই নাকি জামিল জামালি চরিত্রটি নির্মিত।
‘ধুরন্ধর’-এর দু’টি পর্বে জামিল জামালি চরিত্রে অভিনয় করে প্রশংসা কুড়িয়েছেন রাকেশ বেদী। ছবির প্রথম পর্বটি মুক্তির পর পাকিস্তানের এক রাজনীতিবিদ নিজে থেকেই দাবি করেছিলেন যে, সেই চরিত্রটি তাঁর জীবনের উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। সেই পাক রাজনীতিবিদের নাম নাবিল গাবোল।
ঘটনাচক্রে, রাকেশ অভিনীত চরিত্রটি দেখতেও অনেকটা নাবিলের মতো। সেখান থেকে আলোচনা আরও বেশি করে দানা বাঁধতে শুরু করেছিল। পাক সংবাদমাধ্যমে একাধিক সাক্ষাৎকার দিয়ে নাবিল জানিয়েছিলেন, জামিল চরিত্রটি স্পষ্টতই তাঁর উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। এমনকি, ছবির একটি গানে রিলও তৈরি করেছিলেন তিনি।
পাক রাজনীতির আঙিনায় তিনি পা রেখেছিলেন পাকিস্তান পিপল্স পার্টির (পিপিপি) হাত ধরে। পরে পিপিপি ছেড়ে ২০১৩ সালে মুত্তাহিদা কওমি মুভমেন্ট-লন্ডন দলে যোগ দিয়েছিলেন। ২০১৭ সালে ‘ঘরওয়াপসি’ হয়েছিল তাঁর। তবে মাত্র কয়েক বছরের জন্য।
২০২৫ সালে আবার পিপিপি ছেড়ে দিয়েছিলেন নাবিল। বর্তমানে তিনি মুত্তাহিদা কওমি মুভমেন্ট-পাকিস্তান দলের সদস্য। পাক রাজনীতিতে ‘দলবদলু’ হিসাবে নাকি দুর্নামও রয়েছে নাবিলের। বলা হয়, তিনি নাকি সব সময় ক্ষমতার ভরকেন্দ্রের আশপাশে থাকতে পছন্দ করেন। অনেক বিতর্কও রয়েছে তাঁকে কেন্দ্র করে।
কিন্তু ‘ধুরন্ধর ২’ মুক্তির পর নিজের দাবি ফিরিয়ে নিয়েছিলেন নাবিল। কারণ ছবির শেষ দৃশ্যে দেখা গিয়েছিল, পাকিস্তানের রাজনীতিবিদ জামিলের আনুগত্য আদতে ভারতের প্রতি। সেই দৃশ্যের পর পাকিস্তানে তাঁর টিকে থাকা কঠিন হতে পারে ভেবে ‘ধুরন্ধর ২’ মুক্তির পর নাকি তিনি গা ঢাকাও দিয়েছিলেন।
পরে নিজের দাবি থেকে সম্পূর্ণ সরে এসে নাবিল জানিয়েছিলেন যে, জামিলের চরিত্রটি তাঁর জীবন থেকে অনুপ্রাণিত নয়। অন্য দিকে, ফিল্ম বিশেষজ্ঞদের দাবি, জামিল জামালি চরিত্রটি আদতে বাস্তব থেকেই গ্রহণ করা। এমনকি, সেই ব্যক্তি এখনও জীবিত রয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কাছে তিনি নাকি রাজনৈতিক আশ্রয়ের অনুরোধ করেছিলেন। পাকিস্তানের সেই রাজনীতিবিদের নাম আলতাফ হুসেন।
১৯৫৩ সালের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানের করাচির এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম আলতাফের। দেশভাগের সময় তাঁর পরিবার উত্তরপ্রদেশ থেকে করাচি চলে গিয়েছিল। করাচি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফার্মেসি নিয়ে পড়াশোনা করে স্নাতক হন আলতাফ।
১৯৭৮ সালে অল পাকিস্তান মুহাজির স্টুডেন্ট অর্গানাইজ়েশন (এপিএমএসও) গঠন করেন আলতাফ। তাঁর লক্ষ্য ছিল, ভারত থেকে আসা উর্দুভাষী মুসলিম ছাত্রদের অধিকার রক্ষা করা। ১৯৮৪ সালে তিনি এপিএমএসও-কে একটি রাজনৈতিক দলে রূপান্তর করেন, যার নাম দেওয়া হয় মুহাজির কওমি মুভমেন্ট (এমকিউএম)। পরবর্তী কালে দলের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় মুত্তাহিদা কওমি মুভমেন্ট।
আলতাফের দল মুত্তাহিদা কওমি মুভমেন্ট নেহাত ছোট কোনও রাজনৈতিক দল ছিল না। পাকিস্তানের চতুর্থ বৃহত্তম দল হিসাবে জায়গা করে নিয়েছিল এমকিউএম। সিন্ধ প্রদেশের প্রাদেশিক আইনসভার এক-তৃতীয়াংশ আসনই ছিল তাদের দখলে। করাচির উপর আলতাফের নিয়ন্ত্রণ এতটাই শক্তিশালী হয়ে পড়েছিল যে, তাঁকে ছাড়া এই শহরের রাজনীতি কল্পনা করাও অসম্ভব ছিল।
১৯৯২ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী করাচিতে অপরাধ দমনে ‘অপারেশন ক্লিন-আপ’ শুরু করলে আলতাফ পালিয়ে লন্ডনে চলে যান। তাঁর অবর্তমানেও করাচির রাজনীতি কয়েক দশক ধরে লন্ডন থেকেই পরিচালিত হত। টেলিফোন বা ভিডিয়োর মাধ্যমে সমর্থকদের উদ্দেশে ভাষণ দিতেন আলতাফ।
২০১৬ সালের অগস্টে একটি বিতর্কিত ভাষণে পাকিস্তান-বিরোধী স্লোগান দিয়েছিলেন আলতাফ। পাকিস্তানকে ‘বিশ্বের জন্য ক্যানসার’ হিসাবে অভিহিত করেছিলেন তিনি। এর ফলে পাকিস্তানে তাঁর দলের মধ্যে বিভাজন তৈরি হয় এবং দলের নেতারা আলতাফের থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে শুরু করেন।
আলতাফ এবং তাঁর দলের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদ, তোলাবাজি এবং রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের অসংখ্য অভিযোগ উঠেছিল। লন্ডনে থাকাকালীন আর্থিক কারচুপি এবং ঘৃণা ছড়ানোর অভিযোগে তাঁকে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখিও হতে হয়। যদিও ২০২২ সালে ব্রিটেনের একটি আদালত তাঁকে বিদ্বেষমূলক মন্তব্যের মাধ্যমে উস্কানি দেওয়ার অভিযোগ থেকে মুক্তি দেয়।
২০০১ সালে ফইজ়া নামের এক তরুণীকে বিয়ে করেন আলতাফ। বিয়ের পর এক কন্যাসন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন ফইজ়া। ২০০৭ সালে আলতাফের বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে যায়। কানাঘুষো শোনা যায়, ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং (র)-এর সঙ্গে নাকি আলতাফের যোগাযোগ ছিল।
২০১৯ সালের নভেম্বরে এক ভাষণে আলতাফ বলেছিলেন, ‘‘প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী যদি আমায় এবং আমার সহকর্মীদের ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়ার অনুমতি দেন, তা হলে আমি ভারতে যেতে প্রস্তুত। কারণ, আমার দাদু-দিদার সমাধি সেখানে রয়েছে। আমি তাঁদের সমাধিস্থলে যেতে চাই। আমি শান্তিপ্রিয় ব্যক্তি। আমি ভারতের রাজনীতিতে কোনও রকম হস্তক্ষেপ করব না, কথা দিচ্ছি। শুধু আমায় এবং আমার সহকর্মীদের ভারতে থাকার জায়গা চাই।’’
জনশ্রুতি, চলতি বছরের গোড়ার দিকে লন্ডনের হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছিল আলতাফকে। দীর্ঘ দিনের মানসিক চাপ এবং সাংগঠনিক কাজের চাপের কারণে তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটেছিল বলে শোনা যায়। বর্তমানে তিনি মূলত সমাজমাধ্যমের দ্বারা সমর্থকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে মন্তব্য করেন।