পহেলগাঁও জঙ্গি হামলার তদন্তে উঠে আসছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। গোয়েন্দাদের দাবি, গোটা ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে একটাই নাম। তিনি আর কেউ নন, পাকিস্তানের ‘জিহাদি’ সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির। সন্ত্রাসবাদীদের সঙ্গে তাঁর কথোপকথনের প্রমাণও জাতীয় তদন্তকারী সংস্থার (ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি বা এনআইএ) হাতে এসেছে বলে সূত্র মারফত মিলেছে খবর। যদিও সরকারি ভাবে এই নিয়ে কোনও বিবৃতি দেয়নি কেন্দ্র।
বছর ৫৭-র জেনারেল মুনিরের মাথায় ‘জিহাদ’-এর ভূত হঠাৎ করে চড়েছে, এমনটা নয়। ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইং বা ‘র’-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ছোটবেলা থেকেই পাক সেনাপ্রধান মারাত্মক ভাবে ভারতবিদ্বেষী। রাওয়ালপিন্ডির ফৌজি সদর দফতরের শীর্ষপদ পেতে বহু বার ধর্মীয় তাস খেলেছেন তিনি। সেই কারণে এ দেশের গুপ্তচরদের কাছে মুনির একজন ‘জিহাদি জেনারেল’ ছাড়া আর কিছু নন।
২০১৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ‘র’-এর পাকিস্তান ডেস্কের প্রধান ছিলেন রামানাথন কুমার। জেনারেল মুনিরের ‘জিহাদি’ মনোভাবের সঙ্গে খুব ভাল ভাবেই পরিচিত তিনি। সম্প্রতি, এ ব্যাপারে সংবাদমাধ্যমের কাছে মুখ খোলেন ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থার এই সাবেক অফিসার। তাঁর কথায়, ‘‘সৌদি আরবে মোতায়েন থাকাকালীন জেনারেল মুনিরের কণ্ঠস্থ ছিল পবিত্র কোরান। ওই সময় সদ্য ৩৮-এ পা দিয়ে পাক সেনায় লেফটেন্যান্ট জেনারেলের পদ পান তিনি।’’
ইসলামীয় ধর্মগ্রন্থ মুখস্থ থাকার কারণে আরব মুলুকে ‘হাফেজ়-এ-কোরান’ উপাধি পান জেনারেল মুনির। রামানাথনের দাবি, এই কারণে ধর্মীয় উস্কানিমূলক ভাষণ দিতে তাঁর কখনওই কোনও অসুবিধা হয়নি। বরং পাক ফৌজ, গুপ্তচর সংস্থা ‘ইন্টার সার্ভিসেস ইনটেলিজেন্স’ (আইএসআই) এবং ইসলামাবাদ মদতপুষ্ট জঙ্গিদের তাতাতে লাগাতার ধর্মীয় উস্কানি দিয়েছেন তিনি।
মুনিরের অন্যতম গুণ হল ভাষার উপর দখল। উস্কানিমূলক ভাষণ দেওয়ার সময়ে ইংরেজি এবং উর্দু থেকে হঠাৎ করে আরবিতে কথা বলার অদ্ভুত ক্ষমতা রয়েছে তাঁর। ভারতীয় গুপ্তচরদের দাবি, এটা করে ‘ইসলামের রক্ষাকর্তা’ ইমেজ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন পাক সেনাপ্রধান। সেই সঙ্গে অবশ্য তাঁর কট্টরপন্থী এবং মৌলবাদী চেহারাটা বেআব্রু হয়ে গিয়েছে।
জন্মসূত্রে ভারতীয় হওয়া সত্ত্বেও মুনিরের ভারতবিদ্বেষের নেপথ্যে একাধিক কারণ রয়েছে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময়ে পঞ্জাবের জলন্ধর থেকে পাকিস্তান চলে যায় তাঁর পরিবার। পাকাপাকি ভাবে রাওয়ালপিন্ডিতে বসবাস শুরু করেন তাঁরা। ইসলামাবাদের সেনাপ্রধান বংশগত ভাবে কোনও ফৌজি পরিবারের সদস্য নন। তাঁর বাবা ছিলেন স্থানীয় মসজিদের ইমাম। গোয়েন্দাদের অনুমান, খুব ছোটবেলায় মুনিরের মনে ঢুকে যায় মৌলবাদের বিষ।
পাক সেনাপ্রধানকে পুরোপুরি কট্টরপন্থী করে তোলার নেপথ্যে হাত রয়েছে রাওয়ালপিন্ডির মারকাজি মাদ্রাসা ‘দার-উল-তাজউইদ’-এর। সেখান থেকে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন তিনি। ১৯৮৬ সালে অ্যাবোটাবাদের মঙ্গলার ফৌজি প্রশিক্ষণকেন্দ্র (পড়ুন অফিসার্স ট্রেনিং অ্যাকাডেমি) থেকে স্নাতকের ডিগ্রি পান মুনির। এর পর ফ্রন্টিয়ার ফোর্স রেজিমেন্টের ২৩তম ব্যাটালিয়নে কমিশন হলে, সৈনিকজীবন শুরু হয় তাঁর।
২০২২ সালে পাক সেনাপ্রধানের দায়িত্ব পান জেনারেল মুনির। ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থা ‘র’ মনে করে, গত শতাব্দীর ৮০-র দশক থেকে ইসলামাবাদের ফৌজে ঢুকে পড়ে ধর্মীয় কট্টরপন্থা এবং মৌলবাদের বিষবাষ্প। বাহিনীর নেতৃত্বে তখন ছিলেন জেনারেল জ়িয়া-উল-হক। সেনায় তিনি যে বদল আনেন, মুনির তার চূড়ান্ত পরিণতি। ১৯৭৮ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ছিলেন জেনারেল জ়িয়া। সেনা অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ক্ষমতা দখল করেন তিনি।
২০০৪ সালে প্রকাশিত ‘দ্য আইডিয়া অফ পাকিস্তান’ বইয়ে সাবেক সেনাপ্রধান তথা প্রেসিডেন্ট জেনারেল জ়িয়ার হাত ধরে বাহিনীতে কট্টরপন্থা ছড়িয়ে পড়ার বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন মার্কিন গবেষক স্টিফেন কোহেন। তিনি জানিয়েছেন, ফৌজে মদ পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়। অফিসারদের ধর্মীয় অনুশাসন মেনে দাড়ি রাখার নির্দেশ দেন জেনারেল জ়িয়া। সেনা ক্যান্টনমেন্টের দেওয়ালে দেওয়ালে পবিত্র কোরানের বাণী লেখা হয়েছিল।
ভারতীয় গুপ্তচরেরা মনে করেন, পূর্বসূরি জেনারেল জ়িয়ার এই সমস্ত কর্মকাণ্ডে দারুণ ভাবে প্রভাবিত হন মুনির। পাক রাজনৈতিক নেতৃত্বের বদলে মৌলবাদী নেতাদের প্রতি বাড়তে থাকে তাঁর আনুগত্য। ইসলামাবাদের প্রথম দিকের সেনা অফিসারদের মতো কখনওই ইউরোপ বা আমেরিকা থেকে কোনও প্রশিক্ষণ নেননি তিনি। ফলে বাহিনীকে শক্তিশালী করতে বার বার আস্তিন থেকে ধর্মীয় মৌলবাদের তাস বার করেছেন মুনির।
একটা সময়ে ভারত সীমান্তের নর্দার্ন এরিয়াজ় কমান্ডে ব্রিগেডিয়ার হিসাবে কর্মরত ছিলেন পাক সেনাপ্রধান। তখনই কোর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল কমর জাভেদ বাজওয়ার নজর পড়ে তাঁর উপর। ২০১৭ সালে তাঁকে সেনা গোয়েন্দা দফতরের ডিজি (পড়ুন ডিরেক্টর জেনারেল অফ মিলিটারি ইনটেলিজেন্স) নিয়োগ করেন বাজওয়া। তত দিনে অবশ্য সেনাপ্রধানের পদ পেয়ে গিয়েছিলেন তিনি।
২০১৮ সালের মার্চে পাকিস্তানের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘হিলাল-ই-ইমতিয়াজ’ পান সেনাপ্রধান মুনির। ওই সময়ে মেজর জেনারেল হিসাবে বাহিনীতে কর্মরত ছিলেন তিনি। সেপ্টেম্বরে ফের পদোন্নতি হওয়ায় লেফটেন্যান্ট জেনারেল হিসাবে রাওয়ালপিন্ডির সেনা সদর দফতরে চলে আসেন এই ‘জিহাদি’ জেনারেল। অক্টোবরে আইএসআইয়ের প্রধান করা হয় তাঁকে।
জেনারেল মুনির পাক গুপ্তচর সংস্থার দায়িত্ব পাওয়ার পরই ২০১৯ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি জম্মু-কাশ্মীরের পুলওয়ামায় সিআরপিএফ কনভয়ে মানববোমায় হামলা চালায় পাক মদতপুষ্ট জঙ্গি গোষ্ঠী জইশ-ই-মহম্মদ। তাতে মৃত্যু হয় ৪০ জন জওয়ানের। কিন্তু মাত্র আট মাসের মাথায় তাঁকে গুজরানওয়ালার থ্রি এক্স কোরে বদলি করেন তৎকালীন পাক সেনাপ্রধান বাজওয়া। কারণ, ওই সময়ে প্রধানমন্ত্রীর কুর্সিতে থাকা ইমরান খানের স্ত্রী বুশরা বিবির বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির তদন্ত করতে চেয়েছিলেন তিনি।
২০২১ সালের অক্টোবর পর্যন্ত থ্রি এক্স কোর কমান্ডার পদেই ছিলেন জেনারেল মুনির। পরে অবশ্য পাক ফৌজের কোয়ার্টারমাস্টার জেনারেল হিসাবে নিযুক্ত হন তিনি। ২০২২ সালের নভেম্বরে অবসরের মাত্র তিন দিন আগে তাঁকে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ় শরিফ। তার পর থেকে অবশ্য কাজের মেয়াদ বাড়িয়ে চলেছেন ইসলামাবাদের এই ‘জিহাদি জেনারেল’।
পাক সেনাবাহিনীর চূড়ান্ত ক্ষমতা হাতে পাওয়ার পর এক এক করে পথের কাঁটা সরিয়েছেন জেনারেল মুনির। তাঁর নির্দেশেই জেলবন্দি রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। গত বছরের সাধারণ নির্বাচনে তাঁর দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ বা পিটিআইকে একরকম দাঁড়াতেই দেননি তিনি। শুধু তা-ই নয়, বিক্ষোভ দমনের নামে ইমরানের দলের উপর অত্যাচারের অভিযোগও রয়েছে মুনিরের বিরুদ্ধে। ফলে আমজনতার মনে তাঁর বিরুদ্ধে দানা বেঁধেছে ক্ষোভ।
বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, মুনিরের আমলে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছে পাক ফৌজ। বাহিনীর একাংশ প্রধানমন্ত্রীর কুর্সিতে ইমরানকে ফেরাতে তৎপর। অপর অংশ আবার কট্টরপন্থী, মৌলবাদী সেনাপ্রধানের নীতিতে আস্থাশীল। তবে মুনিরের জন্য বালোচিস্তানে তীব্র হয়েছে বিচ্ছিন্নতাবাদী বিদ্রোহ। সেখানকার স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলায় গত কয়েক মাসে কয়েকশো সৈনিক হারিয়েছে ইসলামাবাদ।
বালোচিস্তানের মতোই খাইবার-পাখতুনখোয়ায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান বা টিটিপি নামের বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠী। ইসলামাবাদের অভিযোগ, পর্দার আড়ালে থেকে তাঁদের মদত জুগিয়ে যাচ্ছে আফগানিস্তানের তালিবান সরকার। টিটিপিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছেন জেনারেল মুনির। ফলে ক্রমাগত কমছে তাঁর জনপ্রিয়তা।
এই পরিস্থিতিতে কুর্সি বাঁচাতে কাশ্মীর নিয়ে মুনির জুয়া খেলেছেন বলেই মনে করেন ভারতীয় গুপ্তচর বাহিনীর পদস্থ কর্তারা। এর ফলে যুদ্ধের জিগির তোলা অনেক সহজ হয়েছে তাঁর পক্ষে। পাশাপাশি, পাকিস্তানের সাধারণ নাগরিক থেকে ফৌজকে এককাট্টা করে অন্ধ আনুগত্য চেয়েছিলেন ইসলামাবাদের সেনাপ্রধান। সেই কাজে যে তিনি প্রায় সফল, তা বলাই যায়।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের (পাক অকুপায়েড কাশ্মীর বা পিওকে) রাজধানী মুজ়ফ্ফরাবাদে দেওয়া ভাষণে ভূস্বর্গকে ইসলামাবাদের ‘গলার শিরা’ বলে উল্লেখ করেন জেনারেল মুনির। এর পর ১৫ এপ্রিল রাওয়ালপিন্ডির একটি অনুষ্ঠানে ভারতের বিরুদ্ধে বিষ উগরে দেন তিনি। এর এক সপ্তাহের মাথায় কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ের বৈসরন উপত্যকায় পর্যটকদের উপর হামলা চালায় জঙ্গিরা। প্রাণ হারান ২৬ জন।
পহেলগাঁও হামলার পর বদলার দায়িত্ব ভারতীয় সেনার তিন বাহিনীর উপর ছেড়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। নয়াদিল্লির তরফে এই সংক্রান্ত ঘোষণা হতেই পরমাণু যুদ্ধের হুমকি দিয়েছেন পাকিস্তানের একাধিক নেতা-মন্ত্রী। তবে তাঁদের হুঁশিয়ারিকে গুরুত্ব দিতে নারাজ নয়াদিল্লি। ভারতীয় ফৌজের প্রত্যাঘাতে চরম শাস্তি পাবেন ইসলামাবাদের ‘জিহাদি’ জেনারেল? এর উত্তর দেবে সময়।