Pakistan UAE Airport Deal

আরব শেখরা চালাবেন না ইসলামাবাদের বিমানবন্দর, ‘বন্ধু’ ভারতের মন রাখতে পাকিস্তানের অনুরোধ ফেরাল আবু ধাবি?

ইসলামাবাদের বিমানবন্দর পরিচালনার ভার সংযুক্ত আরব আমিরশাহির হাতে তুলে দিতে চেয়েছিল পাকিস্তান। শেষ মুহূর্তে সেই চুক্তি থেকে সরে গিয়েছে আবু ধাবি। নেপথ্যে ভারতের কূটনীতি? উঠছে প্রশ্ন।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ ০৭:৫৮
Share:
০১ ১৮

পাকিস্তান ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহির সম্পর্কে চিড়! ‘ইসলামিক ভ্রাতৃত্ব’ (ইসলামিক ব্রাদারহুড) ভুলে ইসলামাবাদের সঙ্গে হতে চলা বিমানবন্দরের চুক্তি থেকে সরে এল আবু ধাবি। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, সম্প্রতি ভারতের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সমঝোতায় সই করেন আমিরশাহির প্রেসিডেন্ট শেখ মহম্মদ বিন জ়ায়েদ আল নাহিয়ান। ঠিক তার পরেই পাকিস্তানের উড়ান পরিষেবা চুক্তি থেকে মুখ ফেরাল ওই উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্র। ফলে গোটা বিষয়টিতে নয়াদিল্লির দিকে ষড়যন্ত্রের আঙুল তুলতে দেরি করেনি পাক প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ় শরিফের সরকার।

০২ ১৮

লতি বছরের ২৩ জানুয়ারি আবু ধাবির চুক্তি বাতিল সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে জনপ্রিয় পাক গণমাধ্যম দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউন। তার পরই পশ্চিম এশিয়া-সহ গোটা দুনিয়ায় রীতিমতো শোরগোল পড়ে যায়। গত বছরের (২০২৫ সাল) অগস্টে আমিরশাহির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সমঝোতার ব্যাপারে কথা বলা শুরু করে শাহবাজ় সরকার। শর্ত অনুযায়ী রাজধানী ইসলামাবাদের বিমানবন্দরটির পরিচালনার ভার উপসাগরীয় আরব দেশটির পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু, তাতে আবু ধাবি আচমকা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে বলে সূত্র মারফত মিলেছে খবর।

Advertisement
০৩ ১৮

দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউন জানিয়েছে, গত বছর আর্থিক সঙ্কট তীব্র হওয়ায় ইসলামাবাদের বিমানবন্দরের বেসরকারিকরণের সিদ্ধান্ত নেয় শাহবাজ় সরকার। তখনই এগিয়ে আসে আবু ধাবি। দীর্ঘ আলোচনার পর এর পরিচালনার ভার আমিরশাহিকে দিতে রাজি হয় পাক প্রশাসন। শুধু তা-ই নয়, সংশ্লিষ্ট সমঝোতায় বিমানবন্দরের পরিকাঠামোগত উন্নয়নের কাজও উপসাগরীয় আরব দেশটির কাঁধে তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল ভারতের পশ্চিমের প্রতিবেশীর।

০৪ ১৮

ইসলামাবাদ বিমানবন্দরের চুক্তির বিষয়টি যখন প্রায় পাকা, তখন হঠাৎ কেন এর থেকে সরে এল আবু ধাবি? এর নেপথ্যে মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যকেই দায়ী করেছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের একাংশ। গত বছরের সেপ্টেম্বরে সবাইকে চমকে দিয়ে হঠাৎ করে সৌদি আরবের সঙ্গে সামরিক চুক্তি সারে পাকিস্তান। এর পোশাকি নাম ‘কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি’। এই সমঝোতা ইসলামাবাদের ব্যাপারে আমিরশাহিকে যে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে, তা বলাই বাহুল্য।

০৫ ১৮

পাক-সৌদি ‘কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি’তে বলা হয়েছে, এই দুইয়ের মধ্যে কোনও একটি দেশ তৃতীয় কোনও শক্তি দ্বারা আক্রান্ত বা আগ্রাসনের শিকার হলে তাকে উভয় দেশের উপর আঘাত বা যুদ্ধ হিসাবে বিবেচনা করা হবে। এ-হেন সমঝোতা হওয়ার পরেই গণমাধ্যমের কাছে বিস্ফোরক মন্তব্য করেন ইসলামাবাদের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খোয়াজা আসিফ। রাওয়ালপিন্ডির জেনারেলরা যে রিয়াধকে পরমাণু অস্ত্রের নিরাপত্তা দেবেন, তা একরকম স্পষ্ট করে দেন তিনি। তাঁর ওই মন্তব্যের জেরে পশ্চিম এশিয়ার রাজনীতিতে আসে অস্থিরতা।

০৬ ১৮

পাক-সৌদির এই সামরিক চুক্তির জেরে প্রমাদ গোনে আমিরশাহির সরকার। কারণ, দীর্ঘ দিন ধরেই রিয়াধের সঙ্গে আবু ধাবির সম্পর্ক আদায়-কাঁচকলায় বলা যেতে পারে। এই পরিস্থিতিতে ইসলামাবাদের পরমাণু শক্তির সমর্থন সৌদিকে আরও বেশি উচ্চাকাঙ্ক্ষী করতে পারে। সেই আশঙ্কা থেকেই উপসাগরীয় আরব মুলুকটির কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ‘কৌশলগত অংশীদার’ হিসাবে প্রাথমিক পছন্দ হয়ে দাঁড়িয়েছে ভারত। পাশাপাশি পাকিস্তানের সঙ্গে দূরত্ব বাড়াতে শুরু করেছে তারা।

০৭ ১৮

দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউনে অবশ্য এ ব্যাপারে আরও একটি ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। পাক গণমাধ্যমটির দাবি, ইসলামাবাদ বিমানবন্দর পরিচালনা সংক্রান্ত চুক্তি একটি জায়গায় আটকে ছিল। সমঝোতায় শাহবাজ় সরকার আউটসোর্সিং কাজের স্থানীয় অংশীদারদের নাম উল্লেখ করুক, চেয়েছিল আবু ধাবি। কিন্তু, কোনও এক অজ্ঞাত কারণে তাতে রাজি হয়নি ইসলামাবাদ। ফলে দু’তরফে আলোচনা ভেস্তে যায়। এ ব্যাপারে পাক প্রশাসনের উপর রাওয়ালপিন্ডির সেনা সদর দফতরের কোনও চাপ ছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়।

০৮ ১৮

ভারত ভাগের জেরে জন্ম হওয়া পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের তালিকায় একটা সময়ে উপরের দিকে নাম ছিল আমিরশাহির। আবু ধাবির সঙ্গে ইসলামাবাদের বাণিজ্য ও অন্যান্য সহযোগিতার লম্বা ইতিহাস রয়েছে। গত শতাব্দীর ৮০-এর দশকে আমিরশাহির অসামরিক বিমান পরিষেবা সংস্থা এমিরেটস এয়ারলাইন্স প্রতিষ্ঠায় বড় ভূমিকা নিয়েছিল পাক সরকার। করিগরি দক্ষতা ও কর্মী সরবরাহের পাশাপাশি দু’টি বিমান ভাড়া দেয় তারা। এর মধ্যে একটি দুবাই-করাচি রুটে নিয়মিত চলাচল করত।

০৯ ১৮

কিন্তু, ২১ শতক আসতে না আসতেই বাড়তে থাকে ইসলামাবাদের আর্থিক সঙ্কট। ফলে পাকিস্তানের সঙ্গে বিমান পরিষেবা উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে দেয় আবু ধাবি। গোদের উপর বিষফোড়ার মতো, ২০২০ সালের পর আর কখনওই লাভের মুখ দেখতে পারেনি ইসলামাবাদের কোনও উড়ান সংস্থা। পাশাপাশি পাইলটদের লাইসেন্স কেলেঙ্কারির খবর আরও কোণে ঠেলে দেয় তাদের।

১০ ১৮

২০২০ সালে পাকিস্তানি বিমানচালকদের বিরুদ্ধে ওঠে এক মারাত্মক অভিযোগ। জানা যায়, লাইসেন্স জাল করে উড়োজাহাজ ওড়াচ্ছেন তাঁরা। ফলে ইসলামাবাদের বিমান পরিষেবার উপর নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেয় ব্রিটেন, ফ্রান্স-সহ পশ্চিমি দুনিয়ার একাধিক দেশ। ২০২৫ সাল পর্যন্ত তা বহাল ছিল। এর জেরে বিনিয়োগের অভাবে পাক অসামরিক উড়ান সংস্থাগুলি ধুঁকতে শুরু করে। গোটা বিষয়টি অনিশ্চয়তার মুখে পড়ায় সেখান থেকে অনেকটা সরে আসে আমিরশাহিও।

১১ ১৮

অন্য দিকে ২০২১ সালে আফগানিস্তানে দ্বিতীয় বারের জন্য তালিবান ক্ষমতায় ফিরলে তাদের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বৃদ্ধি করে আবু ধাবি। বর্তমানে পঠানভূমির তিনটি বিমানবন্দরে পরিষেবা দেওয়ার কাজে যুক্ত আছে আমিরশাহির জিএএসি হোল্ডিং নামের একটি সংস্থা। সংশ্লিষ্ট বিমানবন্দরগুলি হল কাবুল, হেরাত এবং কন্দহর। সেখানে কাজ করার জন্য হিন্দুকুশের কোলের দেশটির থেকে আলাদা করে লাইসেন্স পেয়েছে তারা।

১২ ১৮

আমিরশাহির পাক বিদ্বেষের দ্বিতীয় কারণ হল, ‘ইসলামীয় নেটো’ গঠনের ব্যাপারে ইসলামাবাদের তৎপরতা। সেই লক্ষ্যে সৌদি আরবের সঙ্গে হওয়া সামরিক চুক্তিতে তুরস্ককে যুক্ত করতে চাইছেন রাওয়ালপিন্ডির জেনারেলরা। সংশ্লিষ্ট বিষয়টিতে আগ্রহী আঙ্কারাও। গোপনে এ ব্যাপারে যে ত্রিপাক্ষিক আলোচনা চলছে, ইতিমধ্যেই সেই খবর প্রকাশ্যে এসেছে।

১৩ ১৮

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের দাবি, শেষ পর্যন্ত ‘ইসলামীয় নেটো’ গঠনে পাকিস্তান সফল হলে চুপ করে বসে থাকবে না রিয়াধ। তখন আবু ধাবি দখলের মরিয়া চেষ্টা চালাতে পারে সৌদি সরকার। পাশাপাশি, খনিজ তেলের উৎপাদনের ব্যাপারেও আমিরশাহির উপর চাপ বৃদ্ধির সুযোগ থাকবে তাদের হাতে, যা একেবারেই না-পসন্দ ওই উপসাগরীয় আরব দেশের। সেই কারণেই ভারতের পাশাপাশি ইজ়রায়েলের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠতা বাড়াতে দেখা যাচ্ছে তাদের।

১৪ ১৮

গত ১৯ জানুয়ারি মাত্র তিন ঘণ্টার জন্য ভারত সফরে আসেন আমিরশাহির প্রেসিডেন্ট নাহিয়ান। বিমানবন্দরে তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তার পরই নয়াদিল্লির সঙ্গে একগুচ্ছ বাণিজ্যিক এবং প্রতিরক্ষা চুক্তি সেরে ফেলেন তিনি। ফলে আগামী ছ’বছরের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ২০ হাজার কোটিতে যাওয়ার রাস্তা খুলল বলে মনে করা হচ্ছে। প্রতিরক্ষা চুক্তির জেরে এ দেশের একাধিক উচ্চাকাঙ্ক্ষী হাতিয়ারের গবেষণা ও নির্মাণ প্রকল্পে আবু ধাবি অর্থ লগ্নি করতে পারে বলে আশাবাদী সাবেক সেনাকর্তাদের একাংশ।

১৫ ১৮

গত বছরের ডিসেম্বরে একটি ত্রিপাক্ষিক সামরিক সহযোগিতামূলক সমঝোতায় সই করে ইজ়রায়েল, গ্রিস ও সাইপ্রাস। তাতে বিমান ও নৌবাহিনীর যৌথ মহড়া, বৈদ্যুতিন যুদ্ধকৌশল (ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার), ড্রোনের লড়াই, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার (এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম) যৌথ অনুশীলন এবং গোয়েন্দা তথ্যের আদান-প্রদানের ব্যাপারে সম্মত হয় ওই তিন দেশ। সংশ্লিষ্ট জোটে ভারতকে সামিল করতে চাইছে তারা। সম্প্রতি এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ পায় নয়াদিল্লি। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, তিনটি দেশের সঙ্গেই যথেষ্ট ভাল সম্পর্ক রয়েছে মোদী সরকারের।

১৬ ১৮

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে সাইপ্রাসের নিকোসিয়ায় ওই সামরিক সমঝোতায় সই করার পরই বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে বিবৃতি দেয় ইহুদিদের স্থলবাহিনী আইডিএফ (ইজ়রায়েল ডিফেন্স ফোর্স)। তাঁদের এক সেনাকর্তা বলেন, ‘‘এই জোটে ভারতকে পাশে পাওয়া অত্যন্ত জরুরি। নয়াদিল্লি থাকলে আমাদের কৌশলগত গোষ্ঠী তৈরি করা অনেক সহজ হবে। গোয়েন্দা তথ্যের পাশাপাশি আমরা অবাধে হাতিয়ার ও গোলাবারুদ লেনদেন করতে পারব, জাতীয় নিরাপত্তায় যা আপৎকালীন পরিস্থিতিতে খেলা ঘুরিয়ে দিতে পারে।’’

১৭ ১৮

পশ্চিমি গণমাধ্যমগুলির একাংশ ইতিমধ্যেই এই জোটকে ‘ভূমধ্যসাগরীয় কোয়াড’ নামে ডাকতে শুরু করেছে। এর মূল উদ্দেশ্য হল চক্রব্যূহে তুরস্ককে ঘিরে ফেলা। ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর সময় আঙ্কারার পূর্ণ সমর্থন পায় ইসলামাবাদ। সংঘাত পরিস্থিতিতে পাক ফৌজের হাতে অত্যাধুনিক ড্রোন তুলে দিতে কসুর করেনি আঙ্কারা। ফলে তাদের শিক্ষা দিতে ওই জোটের অংশ হতে পারে নয়াদিল্লি।

১৮ ১৮

অবসরপ্রাপ্ত সেনাকর্তাদের কেউ কেউ মনে করেন, আগামী দিনে ‘ভূমধ্যসাগরীয় কোয়াডে’ যোগ দিতে পারে আমিরশাহিও। বর্তমানে ‘আইটুইউটু’ নামের একটি সংগঠনের সদস্যপদ রয়েছে আবু ধাবির। এর অন্য তিন সদস্য রাষ্ট্র হল ভারত, ইজ়রায়েল এবং আমেরিকা। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের পাল্লা সব সময়েই রিয়াধের দিকে ঝুঁকে থাকায় এই উপসাগরীয় আরব দেশটির বেড়েছে চিন্তা। আগামী দিনে নয়াদিল্লির সঙ্গে হাত মিলিয়ে তারা কতটা ইসলামাবাদের লোকসান করতে পারে, সেটাই এখন দেখার।

সব ছবি: সংগৃহীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement