Pakistan And Saudi Arabia Defence Deal

ঋণের নাগপাশে প্রাণ ওষ্ঠাগত, বুড়ো যুদ্ধবিমানের ডানায় ভর করে নতুন ‘বন্ধু’র থেকে নেওয়া বিপুল ঋণ মেটাবে ইসলামাবাদ?

গভীর অর্থনৈতিক সঙ্কট মোকাবিলার জন্য এবং ক্রমবর্ধমান বৈদেশিক ঋণের কিছু অংশ মেটানোর জন্য বি‌ভিন্ন দেশের সঙ্গে সামরিক চুক্তির কাঁধে ভর করতে চাইছে ইসলামাবাদ। তাই প্রায় ২০০ কোটি ডলারের সৌদি ঋণকে সামরিক চুক্তিতে রূপান্তর করার মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে ইসলামাবাদ।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০৮ জানুয়ারি ২০২৬ ১৬:৫৬
Share:
০১ ১৮

ঋণের বেড়াজাল ক্রমশ ঘিরছে ইসলামাবাদকে। গলা পর্যন্ত দেনায় হাঁসফাঁস অবস্থা। পাকিস্তান সরকারেরই প্রকাশিত এক রিপোর্ট বলছে, গত অর্থবর্ষের (২০২৪-২০২৫) তুলনায় ১৩ শতাংশ ঋণ বৃদ্ধি পেয়েছে দেশটির। ২০২৫ অর্থবর্ষে ইসলামাবাদের ঋণ বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ২৮ হাজার ৬৮৩ কোটি ডলার (ভারতীয় মুদ্রায় ২৫ লক্ষ ১৯ হাজার কোটি টাকারও বেশি)। অর্থবর্ষের প্রথম ন’মাসের একটি হিসাবের ভিত্তিতে এই রিপোর্ট প্রকাশ করেছে শাহবাজ় শরিফ সরকার।

০২ ১৮

সেই হিসাব বলছে, পাকিস্তানের বিভিন্ন ব্যাঙ্ক থেকে শাহবাজ় সরকারের ঋণ রয়েছে ৫১ লক্ষ ৫০ হাজার কোটি পাকিস্তানি রুপি। অন্য বিভিন্ন জায়গা থেকে তাদের ঋণ রয়েছে ২৪ লক্ষ ৫০ হাজার কোটি পাকিস্তানি রুপির। করোনা অতিমারির পরে ডলারের তুলনায় পাকিস্তানি মুদ্রার দাম অত্যধিক পড়ে গিয়েছিল। পাশাপাশি, ব্যাপক মুদ্রাস্ফীতি এবং জ্বালানির অভাবে ভুগছিল পাকিস্তান।

Advertisement
০৩ ১৮

সেই সময় আন্তর্জাতিক অর্থভান্ডারের কাছে হাত পেতেছিল ইসলামাবাদ। পাকিস্তানের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার জন্য মোট ৭০০ কোটি ডলার ঋণ মঞ্জুর করে আন্তর্জাতিক অর্থভান্ডার বা আইএমএফ। এ ছাড়াও বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কয়েকশো কোটি ডলার ঋণ নিয়ে দেশের ফোঁপরা অর্থনীতি মেরামত করার মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে শাহবাজ় সরকার। সে দেশের কোষাগার প্রায় খালি। বিদেশি মুদ্রার ভান্ডার তলানিতে।

০৪ ১৮

ঋণের পরিমাণ যত বাড়ছে, ততই সেই আর্থিক বোঝা ঘাড় থেকে নামানোর জন্য পাক সরকারকে নানা পন্থা অবলম্বন করেতে হচ্ছে। বেলআউট কর্মসূচির আওতায় দেশকে দেউলিয়া হওয়া থেকে উদ্ধারের জন্য সরাসরি নগদ পরিশোধের বিকল্প খুঁজছে ইসলামাবাদ।

০৫ ১৮

গভীর অর্থনৈতিক সঙ্কট মোকাবিলার জন্য এবং ক্রমবর্ধমান বৈদেশিক ঋণের কিছু অংশ মেটানোর জন্য বি‌ভিন্ন দেশের সঙ্গে সামরিক চুক্তিগুলির কাঁধে ভর করতে চাইছে ভারতের পশ্চিমের পড়শি দেশটি। কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিগুলিকে ঋণ পরিশোধের চুক্তিতে রূপান্তরিত করে ফেলছেন পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা দফতরের শীর্ষ কর্তারা। সেই কৌশলের প্রথম ধাপে রয়েছে আর এক ইসলামি রাষ্ট্র।

০৬ ১৮

ভারতের ‘বন্ধু’ রাষ্ট্র বলে পরিচিত সৌদি আরবের থেকে নেওয়া ২০০ কোটি ডলারের ঋণের ফাঁদ থেকে বেরোনোর জন্য তদ্বির শুরু করে দিয়েছেন পাক সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্তারা। সংবাদসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুসারে, প্রায় ২০০ কোটি ডলারের সৌদি ঋণকে সামরিক চুক্তিতে রূপান্তরিত করার জন্য ইতিমধ্যেই আলোচনা শুরু করেছে দুই দেশ। চিন-পাকিস্তান যৌথ উদ্যোগে তৈরি জেএফ-১৭ থান্ডারকে শিখণ্ডী রেখে চুক্তি সম্পাদনে মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রক।

০৭ ১৮

পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরের কয়েক মাস পর রিয়াধ-ইসলামাবাদের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা আরও গভীর হচ্ছে। প্রতিরক্ষা চুক্তি অনুযায়ী পাকিস্তানকে সরাসরি টাকা শোধ করতে হবে না সৌদি আরবকে। ডলারের বিনিময়ে সৌদিসেনাকে জেএফ-১৭ থান্ডার সরবরাহ করবে পাকিস্তান। নিজেদের সামরিক আধিপত্য বজায় রাখতে সৌদি আরব এই অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান সংগ্রহ করার সবুজ সঙ্কেত দিয়েছে বলে সূত্রের খবর।

০৮ ১৮

২০২৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর রিয়াধে সংশ্লিষ্ট সামরিক সমঝোতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করে দুই ইসলামি দেশ। এর পোশাকি নাম ‘কৌশলগত এবং পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি’। গোটা প্রক্রিয়াটি শেষ হওয়ার পর পাক প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ় শরিফের কাঁধে হাত দিয়ে ছবি তোলেন সৌদির যুবরাজ মহম্মদ বিন সলমন।

০৯ ১৮

পশ্চিম এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক ডামাডোল আঁচ করে সৌদিও নিজের ঘর গোছাতে নেমে পড়েছে। সামরিক সুরক্ষা নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘ছেলেভোলানো’ প্রতিশ্রুতিতে ভরসা রাখতে পারছে না রিয়াধ। আরব মুলুকে যুদ্ধ বাধলে আটলান্টিকের পার থেকে আসা মার্কিন সামরিক সাহায্যের দিকে হা-পিত্যেশ করে তাকিয়ে থাকতে রাজি নন সৌদির যুবরাজ।

১০ ১৮

২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর কাতারের রাজধানী দোহায় বোমাবর্ষণ করে ইহুদি বিমানবাহিনী। ওই সময়ে মাত্র ৭২ ঘণ্টার মধ্যে আরও কয়েকটি দেশে হামলা চালায় ইজ়রায়েল। সেই তালিকায় ছিল পশ্চিম এশিয়ায় লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন এবং উত্তর আফ্রিকার তিউনিশিয়া। এ ছাড়া প্যালেস্টাইনের গাজ়ায় ক্রমাগত ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে গিয়েছে তেল আভিভের ফৌজ। এই পরিস্থিতিতে ইজ়রায়েলি ‘আগ্রাসন’ ঠেকাতে আরও এক ইসলামি রাষ্ট্রের সঙ্গে জোট বাঁধতে চাইছে সৌদি। অন্তত তেমনটাই মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞেরা।

১১ ১৮

রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি-পাক সম্ভাব্য চুক্তির মোট অর্থমূল্য ৪০০ কোটি ডলারে পৌঁছোতে পারে। সেখানে ঋণ পরিশোধ করার পর অতিরিক্ত ২০০ কোটি ডলারের সামরিক সরঞ্জাম কেনার পরিকল্পনা রয়েছে সৌদি আরবের।

১২ ১৮

একটি সূত্র জানিয়েছে যে আলোচনাটি কেবলমাত্র জেএফ-১৭ থান্ডার সরবরাহের আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। অন্য দিকে দ্বিতীয় সূত্র জানিয়েছে, আলোচনার তালিকায় থাকা অন্য বিকল্পগুলির মধ্যে এই জেটগুলিই প্রাথমিক বিকল্প বলে উল্লেখ করেছে পাকিস্তান।

১৩ ১৮

বৃহস্পতিবার পাকিস্তানের সেনাবাহিনী এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহে চুক্তি নিয়ে আলোচনার জন্য রিয়াধে পৌঁছে গিয়েছেন পাকিস্তানের বিমানবাহিনী প্রধান জহির আহমেদ বাবর সিধু। দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিবেশ এবং ভবিষ্যতের সহযোগিতা কোন কোন পথে এগোবে সেই নিয়ে সৌদি সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট জেনারেল তুর্কি বিন বান্দর বিন আব্দুল আজিজের সঙ্গে আলোচনা করেছেন।

১৪ ১৮

অবসরপ্রাপ্ত পাক এয়ার মার্শাল এবং বিশ্লেষক আমির মাসুদ জানিয়েছেন, জেএফ-১৭ এবং জেটগুলির প্রয়োজনীয় ইলেকট্রনিক সিস্টেম এবং অস্ত্র ব্যবস্থা-সহ সরঞ্জাম সরবরাহের জন্য ছয়টি দেশের সঙ্গে আলোচনা করছে বা চুক্তি চূড়ান্ত করেছে পাকিস্তান। চুক্তির জন্য প্রস্তাবিত এই দেশগুলির মধ্যে সৌদি আরবও রয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। তবে আলোচনার বিষয়বস্তু নিয়ে নিশ্চিত কোনও বিবৃতি দিতে রাজি হননি তিনি।

১৫ ১৮

একই সঙ্গে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী বা অর্থ ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সকলেই মুখে কুলুপ এঁটেছে। সৌদি আরবের সরকারি কোনও গণমাধ্যমও এই চুক্তি নিয়ে জবাব দেয়নি।

১৬ ১৮

জেএফ-১৭ থান্ডার হল একটি একক ইঞ্জিনবিশিষ্ট যুদ্ধবিমান। পাকিস্তানের বিমানবাহিনীর ক্ষেত্রে জেএফ-১৭ থান্ডার প্রায় মেরুদণ্ডের মতো। এটি ভারতের তেজসের মতো লাইটওয়েট মাল্টি-রোল ফাইটার জেট। পাকিস্তান এবং চিন যৌথ ভাবে ওই যুদ্ধবিমান তৈরির পরিকল্পনা করেছিল ১৯৯৯ সালে। এই যুদ্ধবিমান মূলত ব্যবহার করে পাকিস্তানই।

১৭ ১৮

পাকিস্তান দীর্ঘ দিন ধরেই সৌদির দিকে সামরিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েই রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রশিক্ষণ এবং সেনাবাহিনী মোতায়েনের পরামর্শ। প্রতিদানে অর্থনৈতিক চাপের সময় সৌদি আরব বার বার পাকিস্তানকে আর্থিক ভরসা জুগিয়ে চলেছে।

১৮ ১৮

পশ্চিম এশিয়ার আরব দেশটির অবশ্য এই ধরনের সামরিক চুক্তির নেপথ্যে অন্য হিসাব রয়েছে। পরমাণু শক্তিধর পাক ফৌজকে ইজ়রায়েলের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে চাইছে তারা। ইসলামীয় দেশগুলির মধ্যে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীই সবচেয়ে বড়। শুধু তা-ই নয়, শক্তির নিরিখেও অন্যান্য মুসলিম রাষ্ট্রগুলির চেয়ে অনেকটা এগিয়ে ইসলামাবাদ।

সব ছবি: সংগৃহীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement