প্রেমে পড়েছিলেন এক বলি নায়িকার। কিন্তু বিয়ে করতে চেয়েছিলেন সাদাসিধে স্বভাবের তরুণীকে। ১০ বছরের ছোট এক কলেজপড়ুয়াকে মনে ধরেছিল নায়কের। তাঁকে বিয়ে করার জন্য সম্ভ্রান্ত পরিবারের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু মনের মানুষকে বিয়ের পর অন্য নায়িকাদের সঙ্গে পরকীয়া সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন রাজেন্দ্র কুমার।
১৯২৯ সালের ২০ জুলাই ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতের শিয়ালকোটে (অধুনা পাকিস্তান) জন্ম হয় রাজেন্দ্রের। তাঁর বাবা করাচির বস্ত্র ব্যবসায়ী ছিলেন। দেশভাগের পর পরিবার-সহ পাকিস্তান ছেড়ে মুম্বই চলে যান তিনি।
ছোটবেলা থেকেই ‘লাইট, ক্যামেরা অ্যাকশন’-এর জগৎ হাতছানি দিত রাজেন্দ্রকে। কেরিয়ারের গোড়ার দিকে ক্যামেরার পিছনে কাজ করতে শুরু করেন তিনি। ‘পতঙ্গ’, ‘সাগাই’, ‘পকেটমার’-এর মতো নানা ছবিতে এইচ এস রাওয়ালের সহকারী পরিচালক হিসাবে কাজ করতে দেখা যায় তাঁকে। পরে তিনি অভিনয়ের দিকে ঝুঁকে পড়েন।
দু’-একটি ছবিতে পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করলেও ১৯৫৫ সালে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘বচন’-এ প্রথম মুখ্যচরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান রাজেন্দ্র। অভিনেতা হিসাবে কেরিয়ার শুরুর আগেই বিয়ে করে ফেলেন তিনি। রাজেন্দ্রের পরিবার মনে করতেন, তাঁর স্ত্রীই নায়কের সৌভাগ্যের কারণ।
কানাঘুষো শোনা যায়, দিল্লির এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের সদস্যেরা রাজেন্দ্রের সঙ্গে তাঁদের বাড়ির মেয়ের বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। রাজেন্দ্রের বাবা-মায়ের কাছে বিয়ের প্রস্তাবও পাঠিয়েছিলেন তাঁরা। কিন্তু রাজেন্দ্র সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।
রাজেন্দ্র নাকি বলেছিলেন, ‘‘মেয়েটি ছোটবেলা থেকে যে ধরনের স্বাচ্ছন্দ্যে বড় হয়ে উঠেছে, আমার তা দেওয়ার সামর্থ্য যদি সব সময় না থাকে! এ তো বাঁধাধরা কোনও চাকরি নয়। সাফল্যের ওঠাপড়া লেগেই থাকে। আগামিকাল কী হবে তা কেউ জানেন না। আমি যে ওর ইচ্ছে সব সময় পূরণ করতে পারব, তার নিশ্চয়তা নেই।’’
রাজেন্দ্রের কথা শুনে তাঁর বাবা-মা পরিস্থিতি বুঝতে পেরে সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিতে রাজি হন। সেই সুযোগে বাবা-মাকে মনের ইচ্ছাও জানান রাজেন্দ্র। বলিউডের প্রভাবশালী এক পরিবারের কনিষ্ঠ কন্যাকে মনে ধরেছিল রাজেন্দ্রের। তাঁর নাম ছিল শুক্লা তুলি।
শুক্লার তুতো দাদার সঙ্গে একই কলেজে পড়়তেন রাজেন্দ্র। সেই সূত্রে শুক্লাকে এক ঝলক দেখেছিলেন তিনি। সাদাসিধে স্বভাবের শুক্লাকে দেখে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন রাজেন্দ্র। তাঁর চেয়ে শুক্লা ১০ বছরের ছোট হলেও বয়সের পার্থক্য নিয়ে চিন্তিত ছিলেন না রাজেন্দ্র।
বাবা-মাকে শুক্লার কথা জানানোর পর তাঁর ছবি দেখতে চেয়েছিলেন রাজেন্দ্রের বাবা-মা। মুম্বই গিয়ে শুক্লার ছবি বাড়িতে পাঠিয়েছিলেন তিনি। শুক্লার ছবি দেখামাত্রই তাঁকে পছন্দ হয়ে গিয়েছিল রাজেন্দ্রের বাবা-মায়ের। কানাঘুষো শোনা যায়, শুক্লার ছবি নাকি ঘরে বাঁধিয়ে রেখেছিলেন তাঁরা। বন্ধুবান্ধব এবং আত্মীয়স্বজনকে সেই ছবি দেখিয়ে হবু বৌমার পরিচয় দিতেন তাঁরা।
কলেজের দ্বিতীয় বর্ষে পড়াকালীন ১০ বছরের বড় রাজেন্দ্রের সঙ্গে আংটিবদল পর্ব সেরে ফেলেন শুক্লা। বাগ্দান পর্বের পর পরস্পরের প্রেমে পড়েছিলেন তাঁরা। শুক্লা এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, তাঁরা মাঝেমধ্যে একসঙ্গে সিনেমা দেখতে যেতেন। চিঠি লিখে মনের কথা আদানপ্রদানও করতেন দু’জনে।
বাগ্দান পর্ব সারার দেড় বছর পর রাজেন্দ্র এবং শুক্লা বিয়ে করেছিলেন। সেই সময় রাজেন্দ্র অভিনীত ‘বচন’ ছবিটি মুক্তি পায়। টানা ২৫ সপ্তাহ জুড়ে সেই ছবিটি প্রেক্ষাগৃহে চলেছিল। রাজেন্দ্রের পরিবার মনে করত, রাজেন্দ্রের জীবনে শুক্লা সৌভাগ্য নিয়ে আসে।
রাজেন্দ্রের অধিকাংশ ছবিই ২৫ সপ্তাহ জুড়ে প্রেক্ষাগৃহে চলত। সে কারণে বলিপাড়ায় ‘জুবিলি কুমার’ হিসাবে জনপ্রিয় হয়ে গিয়েছিলেন তিনি। তবে, সফল কেরিয়ারের পাশাপাশি রাজেন্দ্রের ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও কম আলোচনা হত না। বলিউডের বহু নায়িকার সঙ্গে নাম জড়িয়েছিল তাঁর।
পেশাগত সূত্রে বলি অভিনেত্রী নূতনের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল রাজেন্দ্রের। একসঙ্গে অসংখ্য ছবিতে অভিনয়ও করেছেন তাঁরা। বলিউডের গুঞ্জন, নূতনের সঙ্গে সম্পর্কে ছিলেন রাজেন্দ্র। কিন্তু জামাই হিসাবে নায়ককে অপছন্দ ছিল নূতনের মায়ের। সে কারণেই নাকি অভিনেত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে গিয়েছিল রাজেন্দ্রের।
নূতনের সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার কয়েক বছরের মধ্যেই শুক্লাকে বিয়ে করেন রাজেন্দ্র। কিন্তু বিয়ের পরেও একের পর এক বলি নায়িকার সঙ্গে পরকীয়া সম্পর্কে জড়িয়ে পড়তে শুরু করেন অভিনেতা। এমনকি, তাঁদের নাকি বিয়েও করতে চেয়েছিলেন রাজেন্দ্র।
বলিপাড়ার জনশ্রুতি, বলি অভিনেত্রী সায়রা বানুর প্রেমে পড়েছিলেন রাজেন্দ্র। তখন তিনি বিবাহিত এবং সন্তানের পিতাও। স্ত্রী-সংসার ছেড়ে সায়রাকে বিয়ে করার জন্য সিদ্ধান্তও নাকি নিয়ে ফেলেছিলেন অভিনেতা। কিন্তু দুই তারকার প্রেমে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন সায়রার মা।
কোনও বিবাহিত পুরুষকে মেয়ের জীবনসঙ্গী হিসাবে মেনে নিতে পারেননি সায়রার মা। সায়রা এবং তাঁর মায়ের সঙ্গে ভাল সম্পর্ক ছিল বলি অভিনেতা দিলীপ কুমারের। শোনা যায়, সায়রার মা নাকি মেয়েকে বোঝানোর দায়িত্ব দিয়েছিলেন দিলীপকে। রাজেন্দ্রের সঙ্গে সায়রার সম্পর্ক ভেঙে যায়। ১৯৬৬ সালে দিলীপকে বিয়ে করেন সায়রা।
কান পাতলে শোনা যায়, ১৯৬৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘সঙ্গম’ ছবির শুটিংয়ের সময় বলি অভিনেত্রী বৈজয়ন্তীমালার সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছিল রাজেন্দ্রের। পরে সেই সখ্যই পরিণতি পায় প্রেমে। এই নায়িকাকেও বিয়ে করতে চেয়েছিলেন রাজেন্দ্র।
বলিপাড়ার একাংশের দাবি, বৈজয়ন্তীমালাকে বিয়ের প্রস্তুতি নিলে সন্তানদের নিয়ে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন রাজেন্দ্রের স্ত্রী। সে কারণে বৈজয়ন্তীমালাকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে গিয়েছিলেন রাজেন্দ্র। সংসার ভাঙার ভয়ে পরকীয়া সম্পর্কে ইতি টেনেছিলেন অভিনেতা।
১৯৭২ সালের পর বলি অভিনেতা রাজেশ খন্নার সঙ্গে পেশাগত প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছিল রাজেন্দ্রের। এই সময় তাঁর বেশ কিছু ছবি বক্সঅফিসে মুখ থুবড়েও পড়ে। নায়কের ভূমিকা থেকে সরে চরিত্রাভিনেতা হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা শুরু করেছিলেন রাজেন্দ্র।
রাজেন্দ্রের কেরিয়ারপতনের জন্য অনেকে আবার একটি ‘ভূতুড়ে’ বাংলোকেও দায়ী করেন। মুম্বইয়ের কার্টার রোডে সমুদ্রের ধারে ‘আশীর্বাদ’ নামের দোতলা একটি বাংলো ছিল। ষাটের দশকে সেই বাংলোটির মালিকানা গিয়েছিল রাজেন্দ্রের কাছে। ৬০ হাজার টাকায় বাংলোটি কিনে নিয়েছিলেন তিনি।
বাংলোটি রাজেন্দ্রের এতই পছন্দ হয়ে গিয়েছিল যে, বাংলো কেনার টাকা জোগাড় করতে এক প্রযোজনা সংস্থার সঙ্গে তিনটি ছবিতে কাজ করার জন্য চুক্তি করে ফেলেছিলেন তিনি। ‘অভিশপ্ত’ বাংলো নিয়ে রাজেন্দ্রকে অনেকেই নাকি সাবধান করেছিলেন। তবে তিনি কোনও বারণ শোনেননি।
মেয়ের নাম অনুযায়ী রাজেন্দ্র বাংলোটির নাম রেখেছিলেন ‘ডিম্পল’। অভিনেতা বন্ধু মনোজ কুমারের পরামর্শে বাড়ির ‘অভিশাপ’ দূর করার জন্য পুজোর ব্যবস্থাও করেছিলেন তিনি। বাড়িতে পুজো দেওয়ার পর পরই নাকি ভাগ্য ফিরেছিল অভিনেতার। একের পর এক ছবি বক্সঅফিসে সফল হয়েছিল তাঁর। ‘জুবিলি কুমার’-এর তকমাও জুটে গিয়েছিল রাজেন্দ্রের।
রাজেন্দ্রের ভাগ্যে সাফল্য বেশি দিন সহায় হয়নি। তাঁর জীবনে নাকি ফিরে এসেছিল বাংলোর ‘অভিশাপ’। ১৯৬৮ সালের পর থেকে রাজেন্দ্রের অনেকগুলি ছবি ব্যর্থ হয়। একের পর এক ছবি ‘ফ্লপ’ হওয়ায় আর্থিক অনটনের মধ্যেও পড়তে হয়েছিল রাজেন্দ্রকে।
রাতারাতি নায়কের তকমা হারিয়ে ফেলেছিলেন রাজেন্দ্র। বাধ্য হয়ে পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করা শুরু করেছিলেন তিনি। চরম আর্থিক অনটনের মধ্যে পড়ে প্রিয় বাংলোটিও বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন রাজেন্দ্র।