আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে বিশ্বের অন্যতম প্রসিদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয় স্ট্যানফোর্ড। আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়টি বর্তমানে অনলাইন বিতর্কের মধ্যমণি হয়ে দাঁড়িয়েছে। নেপথ্যে ক্যাম্পাস চত্বরে ছড়িয়ে পড়া কিছু গুজব এবং একটি অভিযোগ, যা শিক্ষার্থীদের আস্থা, ধর্মীয় রীতি এবং ক্যাম্পাসে খাবারের ক্রমবর্ধমান খরচ নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি করেছে।
বিতর্কের সূত্রপাত কয়েক দিন আগে। অভিযোগ ওঠে, স্ট্যানফোর্ডের স্নাতক স্তরের কিছু পড়ুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে বাধ্যতামূলক ভাবে খাবার নেওয়ার নিয়ম থেকে অব্যাহতি পাওয়ার জন্য নিজেদের জৈন ধর্মাবলম্বী বলে পরিচয় দিচ্ছেন।
ফলে স্ট্যানফোর্ডে খাওয়াবাবদ শিক্ষার্থীদের থেকে যে টাকা নেওয়া হয়, তা দিতে হচ্ছে না তাঁদের। ওই শিক্ষার্থীদের বাইরে থেকে জিনিসপত্র কিনে এবং রান্না করে খাওয়ারও অনুমতি দেওয়া হয়েছে বলে দাবি।
যদিও স্ট্যানফোর্ডের তরফে সেই অভিযোগ নিয়ে এখনও কোনও বিবৃতি দেওয়া হয়নি। এমনটা সত্যিই ঘটেছে কি না, তা-ও নিশ্চিত বা অস্বীকার করা হয়নি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের তরফে।
জৈন বলে পরিচয় দেওয়া ওই শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছিলেন স্ট্যানফোর্ডেরই এক ছাত্রী। এলসা জনসন নামে ওই ছাত্রীর দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মীয় খাদ্য বিধিনিষেধ সংক্রান্ত যে নিয়ম রয়েছে, তারই অনৈতিক সুযোগ নিচ্ছেন ওই পড়ুয়ারা। ক্যাম্পাসের বাধ্যতামূলক খাবার পরিকল্পনা এড়াতে এবং আরও অন্য ধরনের ভালো খাবারের স্বাদ পেতে নিজেদের জৈন ধর্মাবলম্বী বলে পরিচয় দিচ্ছেন।
সংবাদমাধ্যম ‘দ্য টাইমস’-এ প্রকাশিত প্রবন্ধে ২১ বছর বয়সি এলসা বর্ণনা করেছেন যে, কী ভাবে কিছু শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন ব্যবস্থার অপব্যবহার করছেন। অথচ আবাসন ব্যবস্থা যাঁদের সুবিধার জন্য তৈরি তাঁরা বঞ্চিত হচ্ছেন।
প্রতিবন্ধী পড়ুয়াদের থাকার ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন এলসা। তবে খাদ্যের জন্য ছাড়কে সবচেয়ে দৃশ্যমান এবং বিতর্কিত উদাহরণগুলির মধ্যে একটি হিসাবে তুলে ধরেছেন তিনি।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক পড়ুয়াদের বেশির ভাগকেই খাবারের জন্য বাধ্যতামূলক ভাবে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দিতে হয়। সেই টাকার বিনিময়ে বিশ্ববিদ্যালয়েই খাবার ব্যবস্থা থাকে তাঁদের।
২০২৫-’২৬ শিক্ষাবর্ষের জন্য আবাসিক পড়ুয়াদের কাছ থেকে খাওয়ার খরচ বাবদ ৭,৯৪৪ ডলার (ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৭ লক্ষ ১৬ হাজার টাকা) করে নেওয়া হয়েছিল স্ট্যানফোর্ডের তরফে।
তবে যদি কোনও শিক্ষার্থী জানান যে, তিনি বিশেষ কোনও ধর্মে বিশ্বাস করেন এবং সেই ধর্ম অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফে দেওয়া খাবার তাঁর জন্য অনুপযুক্ত, তা হলে তাঁকে ছাড় দেওয়া হয়।
এলসার দাবি, খাবারের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়কে টাকা না দিতে মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছেন স্নাতক স্তরের কিছু পড়ুয়া। নিজেদের জৈন ধর্মাবলম্বী বলে দাবি করেছেন, যাতে খাবারের জন্য ওই সাত লক্ষ টাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে না দিতে হয়।
জৈনধর্মে মাটির নীচের শাকসব্জি এবং প্রাণীর মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ। এলসার মতে, জৈন নন এমন শিক্ষার্থীরাও এই সুযোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের খাবার নেওয়া থেকে অব্যাহতি পাচ্ছেন। সেই টাকা দিয়ে বাইরে থেকে খাবার কিনে খাচ্ছেন তাঁরা।
এলসার দাবি, ওই শিক্ষার্থীরা স্থানীয় সুপারমার্কেটে তাদের খাবারের টাকা খরচ করেন। ভাল ভাল খাবার কিনে খান। অন্য দিকে, অন্য পড়ুয়াদের বিশ্ববিদ্যালয়ের খাবারের উপরেই নির্ভর করতে হয়, যা খুব সীমিত এবং গুণগত ভাবে খুব একটা ভাল নয়।
এলসার দাবি, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এই ধরনের দাবি বা অভিযোগের বিরুদ্ধে লড়াই করতে অনিচ্ছুক বা অক্ষম। কোনও শিক্ষার্থীর ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে প্রশ্ন করলে আইনি পদক্ষেপ বা বৈষম্যের অভিযোগের ঝুঁকি থাকে বলে অনেক সময়ে এই সব অভিযোগ কর্তৃপক্ষ এড়িয়ে যান বলেও দাবি তুলেছেন এলসা।
খাবারের টাকা দেওয়া এড়াতে এ ভাবে মিথ্যা বলা একটি বৃহত্তর ক্যাম্পাস-সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে বলেও দাবি তুলেছেন এলসা। পড়ুয়ারা বিষয়টি নিয়ে খোলাখুলি আলোচনাও শুরু করেছেন। এলসার যুক্তি, পুরো বিষয়টি খুবই সাধারণ হয়ে উঠেছে। কয়েক জন নিয়মের অপব্যবহার করছেন বলে যাঁদের সত্যিকারের সুবিধা প্রয়োজন তাঁরা বঞ্চিত হচ্ছেন।
অভিজাত এবং নামী বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে অস্বাভাবিক ভাবে বেশি সংখ্যক শিক্ষার্থীর আবাসনের সুবিধা দেওয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন এলসা। বিষয়টির যৌক্তিকতা এবং তদারকি সম্পর্কেও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
বিষয়টি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে সমাজমাধ্যমে। স্ট্যানফোর্ডের মতো বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে কেমন খাবার দেওয়া হয় এবং এই সংক্রান্ত নিয়ম পর্যালোচনা করা উচিত কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। খাবারের জন্য টাকা দেওয়ার বিষয়টি ঐচ্ছিক করা যায় কি না তা নিয়েও ভাবনাচিন্তা করার পরামর্শ দিয়েছেন অনেকে।