সেনাবাহিনীতে গেড়ে বসেছে দুর্নীতির শিকড়। সমূলে উৎখাত করতে সাফাই অভিযান চলছে চিনের পিপল্স লিবারেশন আর্মি বা পিএলএতে। সর্ষের মধ্যেই রয়েছে ভূত। ইতিমধ্যেই আমেরিকায় তথ্যপাচারের অভিযোগে চিনের সশস্ত্র বাহিনীর দুই সর্বোচ্চ আধিকারিককে গ্রেফতার করেছে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বাহিনী।
মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত চালিয়ে চিনের সশস্ত্র বাহিনীর শীর্ষ সেনা আধিকারিক ঝাং ইউশিয়াও এবং সিনিয়র কমান্ডার লিউ ঝেনলি-সহ শীর্ষ সামরিক নেতাদের অপসারণ করা হয়েছিল। সেনাবাহিনীতে দুর্নীতির ঘুণপোকা কতটা বাসা বেঁধেছে তা দেখার জন্য নিবিড় তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে শি জিনপিং প্রশাসন। সেই তদন্তে উঠে এসেছে আরও এক চাঞ্চল্যকর তথ্য।
মার্কিন গোয়েন্দাদের রিপোর্টে অনুযায়ী, চিনের পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি দুর্নীতির গভীর পাঁকে নিমজ্জিত হয়ে রয়েছে। পশ্চিম চিনের বিশাল ক্ষেপণাস্ত্র সাইলো (ক্ষেপণাস্ত্রের সুরক্ষা এবং উৎক্ষেপণের জন্য বিশেষ ভাবে নকশা করা নলাকার ভূগর্ভস্থ কাঠামো) ক্ষেত্রগুলি ত্রুটিপূর্ণ ঢাকনা দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল। উৎক্ষেপণের সময় ক্ষেপণাস্ত্রগুলি এতে বাধাপ্রাপ্ত হয়।
সবচেয়ে বিস্ফোরক দুর্নীতির অভিযোগ, চিনের ক্ষেপণাস্ত্রগুলিতে জ্বালানির পরিবর্তে জল ভরে রাখা হত, যাতে বিপদকালে সেগুলি কাজ না করে। পশ্চিম চিনের অসংখ্য ক্ষেপণাস্ত্র সাইলোয় ত্রুটিপূর্ণ ঢাকনা খুঁজে পাওয়া গিয়েছে। একটি বোতামের চাপে যেখানে ক্ষেপণাস্ত্রগুলির হাজার হাজার কিলোমিটার পাড়ি দেওয়ার কথা ছিল, সেখানে সঙ্কটকালে বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র ওড়া তো দূর অস্ত, সাইলোতেই নিস্তেজ হয়ে পড়ত।
ক্ষেপণাস্ত্রে জল ভরার যে দাবি সংবাদসংস্থা ব্লুমবার্গের রিপোর্টে প্রকাশিত হয়েছে, সেই তত্ত্ব আগেই নস্যাৎ করে দিয়েছিল হংকঙের সংবাদমাধ্যম দ্য এশিয়ান টাইমস। ২০২৪ সালে একটি রিপোর্টে তারা দাবি করে, তরল জ্বালানিচালিত রকেটগুলিকে প্রোপেল্যান্ট বা জ্বালানি দিয়ে পূর্ণ রাখা হয় না চিনে।
ক্ষেপণাস্ত্রগুলি খালি অবস্থায় সাইলোয় পড়ে থাকে, কারণ তাতে জ্বালানি সংরক্ষণ করলে অভ্যন্তরীণ ট্যাঙ্কগুলির ক্ষয় হতে পারে। জ্বালানির বদলে জল ভরে দেওয়ার বিষয়টিকে নাশকতা বলে দাবি করেছিল চিনা সংবাদমাধ্যমটি। তারা জানিয়েছিল, ক্ষেপণাস্ত্রগুলিতে জল ভরে দেওয়ার কোনও কারণ নেই, যদি না এটি ইচ্ছাকৃত নাশকতা হয়।
মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, জিনজিয়াং ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডারের সাইলোগুলিতে এমন ভাবে ঢাকনা লাগানো ছিল, যা ক্ষেপণাস্ত্রগুলিকে কার্যকর ভাবে উৎক্ষেপণ করতে বাধার সৃষ্টি করেছিল। জ্বালানির পরিবর্তে জলভরা ক্ষেপণাস্ত্রগুলি পিপল্স লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) অভ্যন্তরীণ চরম দুর্নীতির আরও একটি উদাহরণ বলে উল্লেখ করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যমটি। তবে এই প্রতিরক্ষা দুর্নীতিতে কোন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ছিল তা প্রতিবেদনে নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি।
এই কেলেঙ্কারির ফলে চিনের পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণকারী ‘পিএলএ রকেট ফোর্স’-এর নেতৃত্বকে অপসারণ করা হয়। ২০২৩ এবং ২০২৪ সালে চিনের পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র অস্ত্রাগারের পরিচালন সংস্থা পিএলএ রকেট ফোর্সের নেতৃত্বকে অপসারণের ধারাবাহিকতা মেনেই অপসারণ করা হয় শি জিনপিং-ঘনিষ্ঠ দুই শীর্ষ সামরিক কর্তাকে। গত ২৪ জানুয়ারি গুরুতর শৃঙ্খলাভঙ্গ ও আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে ধৃত শীর্ষ সেনা আধিকারিক ঝাং ইউশিয়া ও শি জিনপিং-ঘনিষ্ঠ লিউ ঝেনলির অপরাধ তদন্তাধীন।
সূত্র উল্লেখ করে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, আমেরিকায় তথ্যপাচারের মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে সেনা আধিকারিক ঝাং ইউশিয়ার বিরুদ্ধে। বেজিঙের শীর্ষ সামরিক কর্তাদের একটি বৈঠকের পর জেনারেল ঝ্যাং ইউক্সিয়ার বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ দেয় চিনের জাতীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রক। তাঁর গুপ্তচরবৃত্তির গল্পটি থ্রিলারের চেয়ে কম কিছু নয়।
চিনের প্রেসিডেন্ট জিনপিঙের সবচেয়ে বিশ্বস্ত যোদ্ধা বলে পরিচিত ঝ্যাঙের মাথায় চিনের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির সংবেদনশীল তথ্য পেন্টাগনের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার মতো অভিযোগের খাঁড়া ঝুলছে। অভিযোগ, চিনের পরমাণু অস্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত তথ্য ফাঁস করে দিয়েছেন ঝ্যাং। তা পাচার করেছেন আমেরিকায়। সরকারি ভাবে জানানো হয়েছে, দলীয় শৃঙ্খল এবং রাষ্ট্রীয় আইন ভেঙেছেন ঝ্যাং। এমন গুরুতর অভিযোগের সঙ্গে কী ভাবে তাঁর নাম জড়িয়ে পড়ল, স্পষ্ট নয়।
ঝ্যাং চিনের প্রেসিডেন্ট জিনপিঙের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বৃত্তের এবং ছেলেবেলার বন্ধু। বেজিঙে তাঁকে জিনপিঙের ‘ডানহাত’ বলেও দাবি করেন কেউ কেউ। ঝ্যাংয়ের বিরুদ্ধে দলকে উপেক্ষা করে রাজনৈতিক চক্র তৈরির অভিযোগ এসেছে। কমিউনিস্ট পার্টির সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশনের সঙ্গে অসহযোগিতার অভিযোগও রয়েছে ঝ্যাংয়ের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া, এক আধিকারিকের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
৭৫ বছর বয়সি ঝ্যাং চিনের কমিউনিস্ট পার্টির পলিটব্যুরোর প্রভাবশালী সদস্য। তাঁর বাবার আমল থেকেই জিনপিঙের পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার শুরু। জিনপিং ও ঝ্যাঙের বাবা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মাও সে তুংয়ের নেতৃত্বে যুদ্ধে লড়েছিলেন। চিনের রাজনৈতিক ও সামরিক প্রেক্ষাপটের দিকে নিয়মিত নজর রেখেছেন যাঁরা, সেই সব বিশেষজ্ঞদের মতে ঝ্যাঙের অপসারণের অর্থ হল শীর্ষ নেতৃত্বের কেউই এখন নিরাপদ নন।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে, সম্ভবত প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে সেনা অভ্যুত্থানের ঘোঁট পাকাচ্ছিলেন জিনপিঙেরই ডানহাত বলে পরিচিত লিউ ঝেনলি। ঝ্যাঙের সঙ্গে সন্ধি করে জ়িনপিঙের সরকারের কুর্সি ওলটপালট করার পরিকল্পনা করছিলেন লিউ, এমন আশঙ্কার কথাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না পিএলএ-এর শীর্ষকর্তারা।
গদি থেকে তাঁকে উৎখাত করার চক্রান্তের গন্ধ পেতেই সামরিক পরিসরে অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি রোধের তৎপরতা দেখাতে শুরু করেন কমিউনিস্ট সরকারের সর্বাধিনায়ক। সামরিক বাহিনীতে ‘শুদ্ধিকরণ অভিযান’-এ বিশেষ গুরুত্ব দিতে শুরু করেছেন জিনপিং। প্রতিরক্ষা দফতরে সিঁধ কাটতে গিয়ে ধরা পড়া শীর্ষ সেনা আধিকারিকদের ইতিমধ্যেই আটক করা হয়েছে। এই দুই সামরিক কর্তার বিরুদ্ধে যে তদন্ত শুরু হয়েছে তা পারমাণবিক নিরাপত্তা ত্রুটির সঙ্গেও যুক্ত বলে মনে করছেন অনেকেই।
২০২৩ সাল থেকেই বিভিন্ন দুর্নীতিতে অভিযুক্ত সরকারি কর্মকর্তাদের ডানা ছেঁটে ফেলার অভিযান শুরু করেছিলেন জ়িনপিং। সরকারের শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল ও কলঙ্কিত করে তোলার চেষ্টাকে রুখতে মরিয়া তিনি। সামরিক পারমাণবিক প্রকল্পগুলি নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা চায়না ন্যাশনাল নিউক্লিয়ার কর্পের প্রাক্তন জেনারেল ম্যানেজার গু জুনের বিরুদ্ধেও তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে চিন সরকার।
২০২৪ সালেও বেশ কয়েক জন সরকারি কর্মকর্তাকে তাঁদের পদ থেকে অপসারণ করা হয়েছিল বলে সিআইএ-প্রভাবিত মার্কিন সংস্থা ‘দ্য জেমস্টাউন ফাউন্ডেশন’-এর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। স্ত্রী বা সন্তান বিদেশে বসবাস করেন, এমন ২০ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার পদ কেড়ে নেওয়া হয়েছে। দেশের গোপন তথ্য যাতে পাচার না হয় কারণেই ওই পদক্ষেপ বলে শি জ়িনপিংয়ের সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।