গত দু’দিন ধরে উত্তাল লোকসভা। চিন প্রসঙ্গ তুলে সোমবারের পর মঙ্গলবারও বক্তৃতায় ‘বাধা’ পেয়েছেন কংগ্রেস সাংসদ রাহুল গান্ধী। লোকসভায় শোরগোলে সাসপেন্ডও করা হয়েছে কংগ্রেসের আট সাংসদকে।
সোমবার প্রাক্তন সেনাপ্রধান মনোজ মুকুন্দ নরবণের ‘অপ্রকাশিত’ বই থেকে চিন প্রসঙ্গ উত্থাপন করার চেষ্টা করেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল। তিনি অভিযোগ করেন, ২০২০ সালে পূর্ব লাদাখে ট্যাঙ্ক নিয়ে কৈলাস রেঞ্জের দিকে এগোচ্ছিল চিনের সেনা। সেনাপ্রধান তা জানানোর পরেও নাকি প্রধানমন্ত্রী কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি।
সোমবার রাহুল ওই বইয়ের একাংশ পড়া শুরু করার পর রাহুলের উদ্দেশে স্পিকার বলেছিলেন, “নিয়ম অনুযায়ী সংবাদপত্রের প্রতিবেদন, বই বা এমন কিছু জিনিস যা প্রমাণিত নয়, তা সংসদে পাঠ করা যায় না।” তবে কংগ্রেস নেতা বিষয়টিকে ‘জাতীয় নিরাপত্তার’ বিষয় হিসাবে তুলে ধরে আবার পড়তে শুরু করেন। এর পরেই রাজনাথ সিংহ, অমিত শাহেরা রাহুলকে বাধা দেন। রাহুল অনড় থাকায় অধিবেশন ভন্ডুল হয়ে যায়।
মঙ্গলবারও একই প্রসঙ্গ তোলেন কংগ্রেস সাংসদ রাহুল। একটি ম্যাগাজ়িনে প্রকাশিত প্রাক্তন সেনাপ্রধানের ওই বইয়ের বিশেষ অংশ যাচাই করে তিনি সত্য বলছেন বলে শংসাপত্রও জমা দেন তিনি। কিন্তু স্পিকার ওম বিড়লা তাঁকে থামিয়ে সোমবারের নির্দেশের কথা স্মরণ করিয়ে দেন।
রাহুলের বক্তৃতা থামানোর প্রতিবাদে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন কংগ্রেস সাংসদেরা। শুরু হয় হট্টগোল। সংসদে ‘খারাপ আচরণের’ জন্য গোটা বাজেট অধিবেশনে সাসপেন্ড করা হয় মানিকম টেগোর, অমরিন্দর সিংহ রাজা ওয়ারিং-সহ মোট আট জন কংগ্রেস সাংসদকে। আগামী ২ এপ্রিল সংসদের বাজেট অধিবেশন শেষ হওয়ার কথা। তত দিন পর্যন্ত অধিবেশনে যোগ দিতে পারবেন না এই সাংসদেরা।
সংসদ চত্বরে রাহুল বলেন, ‘‘প্রাক্তন সেনাপ্রধান একটি বই লিখেছেন। বইটি প্রকাশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। এটি স্থবির। সেখানে সেনাপ্রধানের দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার কেন সেনাপ্রধানের দৃষ্টিভঙ্গিতে ভীত?’’
কংগ্রেস নেতা যে বইটির কথা উল্লেখ করেছেন তা হল প্রাক্তন সেনাপ্রধান নরবণের স্মৃতিকথা ‘ফোর স্টারস অফ ডেস্টিনি’। কিন্তু কেন সেই ‘অপ্রকাশিত’ বই নিয়ে এত বিতর্ক, এত শোরগোল?
সম্প্রতি একটি ম্যাগাজ়িনের প্রচ্ছদে উঠে এসেছে নরবণের বইয়ের একাংশ। বইটি প্রকাশিত হওয়ার কথা ছিল দেশের একটি জনপ্রিয় প্রকাশনা সংস্থার তরফে। তবে সেই বই এখনও জনসাধারণের জন্য উপলব্ধ নয়। জানা গিয়েছে, প্রায় দেড় বছর ধরে প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে বইটি।
কিন্তু কেন জেনারেল নরবণের বইটি বিতর্কিত বলে বিবেচিত হচ্ছে? পূর্ব লাদাখে যখন ভারতীয় ও চিনা সেনাদের সংঘর্ষ হয়, তখন সেনাবাহিনীর প্রধান ছিলেন জেনারেল নরবণে। তাঁর আমলেই সরকার অগ্নিপথ নিয়োগ প্রকল্পও চালু করে, যা দেশ জুড়ে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়।
২০১৯ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২২ সালের এপ্রিল পর্যন্ত দেশের সেনাপ্রধান ছিলেন নরবণে। তাঁর ‘অপ্রকাশিত’ বইয়ের অংশ সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে ম্যাগাজ়িনে। ৪৪৮ পাতার ওই বইয়ে বলা হয়েছে, ২০২০ সালে ডোকলাম সীমান্তে ভারত এবং চিনের সেনা যখন মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়ে, তখন বেজিঙের সাঁজোয়া গাড়ি ভারতীয় ভূখণ্ডে ঢুকে পড়েছিল।
২০২০ সালের ১৫-১৬ জুনের মধ্যবর্তী রাতে লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখায় (এলএসি) ভারতীয় এবং চিনা সেনার মধ্যে সংঘর্ষে একজন কর্নেল-সহ ২০ জন ভারতীয় সেনা নিহত হন। চিনা পক্ষের হতাহতের সংখ্যা আনুষ্ঠানিক ভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
জেনারেল নরবণের বইয়ের বিষয়বস্তু নাকি সামরিক অভিযান এবং সরকারের নীতিমালা নিয়ে লেখা। তবে তা পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে এবং বইটির প্রকাশনা বিলম্বিত হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। এ-ও জানা গিয়েছে, বইটিতে এলএসি-তে চিনের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে ২০২০ সালের ৩১ অগস্ট প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংহের সঙ্গে তাঁর কথোপকথনের বর্ণনাও দিয়েছেন নরবণে।
সংবাদসংস্থা পিটিআই অনুযায়ী নরবণে স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ‘‘উনি (রাজনাথ সিংহ) বলেন যে তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন এবং এটি সম্পূর্ণ রূপে একটি সামরিক সিদ্ধান্ত। আমাকে বলা হয় যা উপযুক্ত মনে হয় তা করতে। ... এই সম্পূর্ণ স্বাধীনতা পাওয়ার পর এখন সম্পূর্ণ দায়িত্ব আমার উপর। আমি একটি গভীর শ্বাস নিলাম এবং কয়েক মিনিট চুপ করে বসে রইলাম।’’
বইটির পিছনের প্রচ্ছদে প্রাক্তন সেনাপ্রধান ভিপি মালিকের একটি লেখাও নাকি রয়েছে, যিনি ১৯৯৯ সালে কার্গিল যুদ্ধের সময় ভারতীয় সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী জেনারেল মালিক নাকি লিখেছেন, ‘‘ভারতের সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ভূমিকা, কার্যকারিতা এবং চলমান বিতর্ক সম্পর্কে একটি অন্তরঙ্গ এবং বাস্তব অন্তর্দৃষ্টি এই বই। গালওয়ান উপত্যকার ঘটনার আগে এবং পরে পূর্ব লাদাখে ভারত-চিন সংঘর্ষের বিশদ এবং স্পষ্ট তথ্যবহুল বর্ণনা।’’
২০২৫ সালের অক্টোবরে ভারতের প্রাক্তন সেনাপ্রধান জেনারেল নরবণে বলেছিলেন যে, তাঁর স্মৃতিকথা এক বছরেরও বেশি সময় ধরে পর্যালোচনাধীন। সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী তিনি বলেছিলেন, ‘‘আমার কাজ ছিল বইটি লেখা এবং প্রকাশকদের কাছে হস্তান্তর করা। প্রকাশকদের প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের কাছ থেকে অনুমতি নেওয়ার দায়িত্ব ছিল। তারা তা করেছে। সেটি পর্যালোচনাধীন। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে পর্যালোচনা চলছে।’’
প্রকাশনা সংস্থা এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বিষয়টি নিয়ে একে অপরের সঙ্গে ক্রমাগত যোগাযোগ রেখেছিল বলেও মন্তব্য করেছিলেন প্রাক্তন সেনাপ্রধান। সংবাদমাধ্যম অনুযায়ী নরবণে আরও বলেছিলেন, ‘‘তাই বই নিয়ে কী হচ্ছে তা দেখা আর আমার কাজ নয়। বল প্রকাশক এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের কোর্টে। ভাল হোক বা খারাপ, বইটা লিখে আমি আনন্দ পেয়েছি। ব্যস। প্রতিরক্ষা মন্ত্রক যখন ঠিক মনে করবে তখন অনুমতি দেবে।’’
জেনারেল নরবণের সেই স্মৃতিকথা ‘ফোর স্টারস অফ ডেস্টিনি’ অনুমোদনের প্রক্রিয়াধীন। তবে ‘অপ্রকাশিত’ বইটি একটি ম্যাগাজ়িনের এই মাসের প্রচ্ছদ। বইটি নিয়ে একটি নিবন্ধও লেখা হয়েছে সেখানে। কংগ্রেস নেতা রাহুল সংসদে সেই প্রতিবেদনই পড়ার চেষ্টা করতে গিয়ে বাধা পান।
সোমবার লোকসভায় বাজেট অধিবেশন শুরু হওয়ার কিছু ক্ষণ পরেই বিজেপি সাংসদ তেজস্বী সূর্য কংগ্রেসকে খোঁচা দিয়ে বলেন, “ওরা দেশপ্রমিক হতে পারল না।” এর পর বক্তৃতা করতে উঠে লোকসভার বিরোধী দলনেতা প্রাক্তন সেনাপ্রধান নরবণের ‘অপ্রকাশিত’ বইয়ের একাংশ পড়তে শুরু করেন।
বক্তৃতা করতে উঠে রাহুল নরবণের বই থেকে কেবল ‘ডোকলামে চিনের ট্যাঙ্ক’ অংশটি পড়তে শুরু করেন। তার পরেই নিজের আসন থেকে উঠে দাঁড়ান প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ। তিনি বলেন, “উনি (রাহুল) বলুন, বইটি কি আদৌ প্রকাশিত হয়েছে? এটা প্রকাশিতই হয়নি। উনি এখান থেকে উদ্ধৃত করতে পারেন না।”
রাজনাথের পর বিষয়টি নিয়ে সরব হন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাহও। তিনি বলেন, “যখন বই প্রকাশিতই হয়নি, তখন উনি কেন সেটা পড়ছেন? রাহুল গান্ধীকে কে বলেছেন যে, চারটি চিনা ট্যাঙ্ক কৈলাস রেঞ্জের দিকে এগোচ্ছিল? কোথা থেকে জানলেন?” বিষয়টি নিয়ে শাসক এবং বিরোধী বেঞ্চে শোরগোল শুরু হয়। গোটা ঘটনাপ্রবাহ তাঁর সামনে ঘটলেও নিজে কোনও মন্তব্য করেননি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।
রাহুলকে বইয়ের ওই অংশ বাদ দিয়ে বক্তৃতা চালিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেন স্পিকার। কংগ্রেস সাংসদ কেসি বেণুগোপাল, এসপি সাংসদ অখিলেশ সিংহ যাদব রাহুলকে বক্তৃতা করতে দেওয়ার অনুরোধ করেন। সংসদ বিষয়কমন্ত্রী কিরেন রিজিজু লোকসভার নিয়ম স্মরণ করিয়ে দেন। স্পিকার বলেন, “বইটি প্রকাশিত হলেও সভার আলোচ্যসূচির সঙ্গে এর কোনও সম্পর্ক নেই।”
রাহুল বইটি উদ্ধৃত না করে সেটির মর্মার্থ পড়ে শোনানোর অনুমতি চান। তাঁর সেই আর্জি খারিজ করে দেন স্পিকার। রাজনাথ অভিযোগ করেন যে, রাহুল সভাকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছেন। তার পরেও কিছু ক্ষণ স্পিকার এবং রাহুলের মধ্যে কথোপকথন চলে। স্পিকার জানান, রাষ্ট্রপতির ভাষণের উপর ধন্যবাদজ্ঞাপক বক্তৃতাই শুধু দিতে পারবেন রাহুল। শোরগোলের কারণে দুপুর ৩টে পর্যন্ত লোকসভার অধিবেশন মুলতুবি করে দেওয়া হয়।
মঙ্গলবারও বিষয়টি নিয়ে তরজা শুরু হয় লোকসভায়। লোকসভায় চিন প্রসঙ্গ তুলে বক্তৃতায় ফের ‘বাধা’ পান কংগ্রেস সাংসদ রাহুল। রাহুলকে বাধা দেন রাজনাথ সিংহ, অমিত শাহ, কিরেন রিজিজুরা। তা নিয়ে বিরোধীদের হট্টগোলে ফের বানচাল হয় অধিবেশন। সাসপেন্ড হন কংগ্রেস সাংসদেরা।
সংসদ থেকে রাহুলের অভিযোগ, চিন ও জেনারেল নরবণের বইয়ের প্রসঙ্গ নিছক বাহানা। আসলে তিনি এপস্টিন ফাইল এবং তার চাপে নরেন্দ্র মোদীর বাণিজ্যচুক্তিতে রাজি হয়ে যাওয়া নিয়ে সংসদে প্রশ্ন তুলবেন বুঝেই বিজেপি বাধা দিচ্ছে। তিনি বলেন, ‘‘জেনারেল নরবণের বিবৃতি আসল বিষয় নয়। সেটা উনি জানেন। আমিও জানি। আসল কথা হল, প্রধানমন্ত্রীকে আপস করানো হয়েছে।’’ যদিও এপস্টিন ফাইলে মোদীযোগের বিষয়টি বিদেশ মন্ত্রক ‘ভিত্তিহীন গুজব’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে।