পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি তিনি। তাঁর মোট সম্পত্তির পরিমাণ ৮০ হাজার কোটি ডলার ছুঁয়েছে। ভারতীয় মুদ্রায় তা প্রায় ৭৭ লক্ষ কোটি টাকা। কুবেরের ঐশ্বর্য রয়েছে তাঁর সিন্দুকে। পৃথিবীর বহু দেশের জিডিপি যোগ করলে তাঁর সম্পদের সমপরিমাণ হবে। আধুনিক যুগের সর্বাধিক ধনী ব্যক্তি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছেন তিনি।
তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ধনকুবের শিল্পপতি ইলন মাস্ক। ব্যাটারিচালিত গাড়ি টেসলা থেকে শুরু করে ইন্টারনেট পরিষেবা সংস্থা স্টারলিঙ্ক। কিংবা জনপ্রিয় সমাজমাধ্যম এক্সের (সাবেক টুইটার) কর্ণধার হিসাবে সারা পৃথিবীর পরিচিত নাম। প্রায় প্রতিনিয়তই খবরের শিরোনামে আসেন তিনি। সম্পত্তিবৃদ্ধিতে প্রায় রোজই নতুন রেকর্ড গড়েন মাস্ক।
ইলন মাস্ক প্রায় সব সময়ই প্রচারের আলোয় থাকতে ভালবাসেন। নিজের মাইক্রোব্লগিং সাইট এক্সেও সক্রিয় তিনি। টেসলা-সহ আরও কয়েকটি সংস্থার দায়িত্ব তাঁর কাঁধে।
তাঁর বর্ণময় জীবনের কথা সংবাদ শিরোনামে এলেও ধনকুবেরের খামখেয়ালিপনার বহু কাহিনি সে ভাবে প্রকাশ্যে আসেনি। তেমনই একটি হল ইলনের ‘কিপটেমি’র কিস্সা। বেতন বৃদ্ধি করার অনুরোধ করতেই ইলন চাকরি থেকে বরখাস্ত করেছিলেন একদা ছায়াসঙ্গী ‘ডানহাত’ বলে পরিচিত সুন্দরী ব্যক্তিগত সহকারীকে।
মার্কিন লেখক অ্যাশলি ভ্যান্সের ইলন মাস্ককে নিয়ে লেখা বইয়ে উঠে এসেছে, বস্ হিসাবে কতটা নির্দয় ও নিষ্ঠুর আচরণ করেছিলেন তিনি। ইলনের জীবনীর উপর ভিত্তি করে লেখা কাহিনিতে তাঁর ব্যক্তিগত ও কর্মজীবনের নানা কথা উঠে এসেছে। সেখানেই বলা হয়েছে দীর্ঘ দিনের সহকারীর সামান্য অনুরোধও কানে তোলার প্রয়োজন মনে করেননি টেসলা-কর্তা।
২০১৪ সালের গোড়ার ঘটনা। ভ্যান্স লিখেছেন, মাস্কের ১২ বছরের সহকারী মেরি বেথ ব্রাউন দীর্ঘ দিনের কঠোর পরিশ্রমের বিনিময়ে বেতনবৃদ্ধির অনুরোধ করেন। প্রায় এক যুগ ধরে মাস্কের জন্য হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেছিলেন মেরি। ন্যায্য অধিকার দাবি করেন মেরি। বেতন বাড়ানোর জন্য মাস্কের কাছে এত বছরে মাত্র এক বারই দরবার করেছিলেন তিনি।
কিন্তু সাধারণ এই অনুরোধটুকুই যে তাঁর পেশাদার জীবনে ইতি টেনে দেবে তা স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেননি মেরি। ইলন মাস্ক এবং তাঁর সংস্থার সঙ্গে সমস্ত সম্পর্কচ্ছেদের সূচনা হয় এই একটি মাত্র অনুরোধের কারণে।
ভ্যান্স তাঁর বইয়ে লিখেছেন, টেসলা ও স্পেসএক্সের কর্মীদের সকলেই মেরি বেথ ব্রাউনকে এমবি বলে উল্লেখ করতেন। ইলন যখন সিলিকন ভ্যালিতে ছিলেন, তখন তাঁর ছায়াসঙ্গী ছিলেন এই মেরি। মাস্কের জন্য দীর্ঘ ১২ বছর নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন মেরি।
২০০২ সালে মাস্কের সংস্থায় যোগ দেওয়ার পর ধীরে ধীরে অনুগত সহকারী হয়ে ওঠেন মেরি। সেই সময় মাস্কের সংস্থার কর্মীরা দেখেছিলেন, মেরি ছাড়া মাস্কের জীবন মসৃণ ভাবে এগোতে পারত না। দিনে ২০ ঘণ্টাও কাজ করতেন মেরি। সময়ের হিসাব ছিল না তাঁর জীবনে।
ভ্যান্স তাঁর বইয়ে মেরিকে অসম্ভব কর্মদক্ষ বলে উল্লেখ করে লিখেছেন, বছরের পর বছর মাস্কের জন্য খাবার নিয়ে আসতেন মেরি। তাঁর ব্যবসায়িক সাক্ষাৎগুলির ব্যবস্থা করতেন। কেজো সম্পর্কের বাইরেও ইলনের পারিবারিক ঝক্কিও সামলাতে হত মেরিকে। ইলনের সন্তানদের সঙ্গে সময় কাটাতেন, তাদের পোশাক বেছে দেওয়ার মতো ব্যক্তিগত কাজও করতে হত মেরিকে।
মাস্কের সঙ্গে বাইরের জগৎ ও সংস্থার কর্মীদের সেতু ছিলেন এই তরুণী, এমনটাই মনে করতেন টেসলা ও স্পেসএক্সের কর্মীরা। সংস্থার কর্মীদের কাছেও এক অমূল্য সম্পদ ছিলেন ধনকুবেরের এই ব্যক্তিগত সহকারী। কারণ স্পেসএক্সের প্রাথমিক উত্থানে মেরির অসামান্য অবদান ছিল বলে মনে করতেন অনেকেই।
মেরি প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয়ের প্রতি গভীর মনোযোগ দিতেন এবং অফিসের চারপাশের পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করতেন। তিনি দু’টি সংস্থাতেই (স্পেসএক্স এবং টেসলা) মাস্কের সময়সূচির হিসাব রাখতেন, জনসংযোগ পরিচালনা করতেন এবং প্রায়শই মাস্ককে ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তে সহায়তা করতেন।
২০১৪ সালে মেরি গভীর আশা নিয়ে মাস্কের কাছে যান এবং বেতন বৃদ্ধির জন্য অনুরোধ করেন। স্পষ্ট করে বলতে গেলে, স্পেসএক্সের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মতো বেতন আশা করেছিলেন তিনি। অনুরোধ পেশের পর, মাস্ক তাঁকে দু’সপ্তাহ ছুটি নিতে বলেন। ছুটি কাটিয়ে ফিরে আসার পর মেরির মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে।
টেসলা কর্তা জানিয়ে দেন, মেরিকে তাঁর আর প্রয়োজন নেই। তিনি দীর্ঘ দিনের সহকারীকে দু’সপ্তাহের ছুটি নিতে বলেছিলেন যাতে মেরির অনুপস্থিতিতে তাঁর কাজের মূল্য নির্ধারণ করতে পারেন। আসলে মাস্ক বুঝতে চেয়েছিলেন যে, মেরি তাঁর জন্য কতটা অপরিহার্য। মাস্ক একই বেতনে অন্য একটি চাকরির প্রস্তাব দিয়েছিলেন মেরিকে। মেরি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন এবং সংস্থা ছেড়ে চলে যান।
এই ঘটনাটি ভ্যান্সের বইয়ের মাধ্যমে প্রকাশ্যে আসার পর স্বাভাবিক ভাবেই তেলেবেগুনে জ্বলে উঠেছিলেন মাস্ক। একাধিক টুইট করে তিনি বইয়ের তথ্যগুলি ভুলত্রুটিতে ভরা বলে দাবি করেছিলেন। মেরি ব্রাউনের ছাঁটাই নিয়েও একাধিক বার টুইট করেছিলেন মাস্ক। তিনি লিখেছিলেন, মেরি বেথ ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এক জন অসাধারণ সহকারী ছিলেন।
তিনি লিখেছিলেন, সংস্থার কাজকর্মের জটিলতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে, একজন সহকারীর পরিবর্তে একাধিক বিশেষজ্ঞের ভূমিকার প্রয়োজন হয়েছিল। কৃতজ্ঞতাস্বরূপ মেরিকে ৫২ সপ্তাহের বেতন এবং স্টক দেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি করেন মাস্ক।
মাস্কের প্রথম স্ত্রী জাস্টিন মাস্ক স্বামী সম্পর্কে বলতে গিয়ে জানিয়েছিলেন, দক্ষিণ আফ্রিকার পুরুষতান্ত্রিক সমাজে ইলন বড় হয়েছেন। তাই তাঁর মধ্যে মহিলাদের শাসন করার স্বভাব জন্মগত। মাস্কের কঠোর স্বভাব তাঁকে ব্যবসায়ী হিসাবে সফল করেছে বটে, তবে ব্যক্তিগত জীবনে নয়। বিয়ের পর যত দিন যেতে থাকে ইলনের ব্যবহারও স্ত্রীর প্রতি বদলাতে শুরু করে। স্ত্রীর কোনও কথাতেই গুরুত্ব দিতেন না মাস্ক।
মেরির চাকরি যাওয়া নিয়েও মুখ খুলেছিলেন জাস্টিন। ২০১৫ সালে তিনি একটি পোস্টে লিখেছিলেন, ‘‘আমরা ১২-১৩ বছর আগে লস অ্যাঞ্জেলসে চলে আসার পরপরই মেরি বেথ ব্রাউন কাজ শুরু করেন ইলনের জন্য (আমি এবং ইলন তখনও বিবাহিত ছিলাম)। মেরি ব্যতিক্রমী এবং নিবেদিতপ্রাণ কর্মচারী ছিলেন এবং ব্যক্তিগত ভাবে তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক খুবই ভাল ছিল। তিনি চাকরির জন্য এবং আমাদের পরিবারের জন্য তাঁর জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। তাঁর চলে যাওয়ার খবরটি আমার কাছে একটি ধাক্কা ছিল।”