একঝলক দেখলে মনে হবে যেন কোনও ছবি থেকে উঠে এসেছে। উজ্জ্বল রঙের পাখিটিকে দেখে বাড়িতে পোষার শখ জাগতেই পারে। যদি তা কেউ করতে চান তা হবে সাক্ষাৎ মৃত্যুকে ঘরে ডেকে আনার শামিল। জীবটিকে স্পর্শ করা মানে বিপদকে আবাহন করা, যার শরীরে থাকা বিষ গোখরোর মতোই মারাত্মক।
শখ করে পাখি পোষাই হোক বা তাকে খাঁচায় বন্দি করে পোষ মানানো, এই দু’টি বিষয় বেশির ভাগ পাখির ক্ষেত্রে সহজ হলেও, এই প্রজাতির পাখির ক্ষেত্রে অতটা সহজ নয়। কারণ এই পাখিকে ছোঁয়া মানে মৃত্যুকে সেধে ডেকে আনা। রঙিন এবং সুন্দর পাখিটি আসলে প্রাণঘাতী।
বিষাক্ত সাপ, পোকামাকড়, সরীসৃপ সম্পর্কে আমরা অনেক কথাই শুনেছি। কিন্তু বিষাক্ত পাখি? বোধহয় এমন কোনও পাখির কাহিনি হয়তো অনেকেই কখনও শোনেননি। হুডেড পিটোহুই (পিটোহুই ডাইক্রোস) পৃথিবীর কয়েকটি বিষাক্ত পাখির মধ্যে অন্যতম। প্রাণিবিজ্ঞানের জগতে পরিচিত ১০ হাজার ৫০০টিরও বেশি পাখির প্রজাতির মধ্যে কমপক্ষে এক ডজন বিষাক্ত হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। তার মধ্যে হুডেড পিটোহুইকে ভয়ানক বিষাক্ত বলে ধরা হয়ে থাকে।
এই পাখিটি আর পাঁচটা সাধারণ পাখির মতো নয়। কারণ এর পালক এবং ত্বক বিষের আকর। এর আকর্ষণীয় কালো এবং কমলা রং মোটেই দর্শককে আকর্ষণ করার জন্য নয়। বরং এটি শিকারিদের দূরে থাকার জন্য একটি সতর্কবার্তাবিশেষ।
প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র নিউ গিনিতে পাওয়া পাখিটি এতটাই শক্তিশালী বিষাক্ত উপাদান বহন করে যে, এটি বর্তমানে সবচেয়ে বিষাক্ত পাখির খেতাব অর্জন করেছে। এটি শিকারকে তাড়া করে না বা শত্রুদের আক্রমণ করে না। কোনও কারণে এটিকে ধরতে গেলে বা এটি ঠুকরে দিলে শরীরে ঝিনঝিনে অসাড় ভাব দেখা দিতে শুরু করে। এমনকি পক্ষাঘাতেও আক্রান্ত হতে পারে মানুষ।
হুডেড পিটোহুইকে ব্যতিক্রমী করে তুলেছে যে উপাদানটি সেটি সায়ানাইডের চেয়েও মারাত্মক বলে মনে করেন পক্ষীবিদদের একাংশ। পাখিটির দেহে যে বিষটির উপস্থিতি টের পাওয়া যায় সেটি হল ব্যাট্রাকোটক্সিন। এই বিষাক্ত রাসায়নিক উচ্চ মাত্রায় অসাড়তা, এমনকি পক্ষাঘাতের কারণ হতে পারে।
পাখিটি নিজে এই বিষ তৈরি করে না। বিজ্ঞানীদের একাংশের ধারণা, এটি যে ধরনের পোকামাকড় খায় তার মধ্যে অন্যতম হল কোরেসিন নামক এক ধরনের পোকা। সেগুলির থেকে বিষাক্ত পদার্থ পাখিটির শরীরে জমা হতে শুরু করে। দক্ষিণ আমেরিকার বিষাক্ত ডার্ট ব্যাঙগুলি তাদের খাদ্যের মাধ্যমে যে ভাবে বিষাক্ত হয়ে ওঠে, তারই অনুরূপ।
১৯৮৯ সালে এক গ্রীষ্মের দুপুরে জ্যাক ডাম্বাচার নামের এক পক্ষীবিদ নিউ গিনির বৃষ্টি-অরণ্যে তাঁর প্রথম অভিযানে যান। সেখানে তিনি দেখতে পান যে তাঁর পাখি ধরার জালে কালো-কমলা রঙের পালকযুক্ত একটি সুন্দর পাখি আটকে আছে। কিন্তু ডাম্বাচার যখন এটিকে মুক্ত করার চেষ্টা করেন, তখন সেটি তাঁকে আঁচড়ে দিয়েছিল। কাটা অংশের রক্তপাত বন্ধ করতে মুখ দিয়ে ক্ষতের জায়গাটি চুষতে শুরু করেছিলেন অনভিজ্ঞ পক্ষীবিদ ডাম্বাচার।
কিছু ক্ষণ পরই তাঁর মুখ ঝিনঝিন করতে শুরু করে। গা জ্বালা করতে শুরু করে। তার পরই দেহ অসাড় হয়ে যায়। বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল সাময়িক পক্ষাঘাত। স্থানীয় গাইডদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে ডাম্বাচার জানতে পারেন অদ্ভুত এক তথ্য। নিউ গিনির স্থানীয়েরা বংশপরম্পরায় জেনে আসছেন যে এই পাখির থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ।
এই পাখিগুলি আর পাঁচটি সাধারণ পাখির মতো নয় যে, এদের মন চাইলেই খাওয়াবেন বা গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করবেন। এই সব পাখি থেকে দূরে থাকতেই পরামর্শ দিয়েছেন নিউ গিনির আদি বাসিন্দারা। তাঁরা এটিকে ‘আবর্জনা পাখি’ বলে ডাকেন। স্থানীয়েরা সকলেই জানেন এটি খাওয়াও নিরাপদ নয়। এমনকি একে ধরাও বারণ।
শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন স্নাতক ছাত্র পরের বছর হুডেড পিটোহুয়েরই নমুনা সংগ্রহ করেন। বাড়িতে ফিরে এমন এক জন রসায়নবিদকে খুঁজতে শুরু করেন যিনি পাখিটির শরীরের বিষের উৎস সন্ধানে তাঁকে সহায়তা করবেন।
১৯৯২ সালে, ডাম্বাচার এবং তাঁর সহযোগীরা আশ্চর্য এক আবিষ্কার করেন। তাঁরা জানান, হুডেড পিটোহুই ব্যাট্রাকোটক্সিন বহন করে। এই বিষ সায়ানাইডের চেয়েও মারাত্মক এবং প্রাণিজগতের সবচেয়ে মারাত্মক পদার্থগুলির মধ্যে একটি। এটি সেই একই পদার্থ যা বিশ্বের এক প্রজাতির বিষাক্ত ব্যাঙের মধ্যে পাওয়া যায়।
এই প্রজাতির পাখিদের শরীরে থাকা ব্যাট্রাকোটক্সিন একটি অত্যন্ত ঘাতক নিউরোটক্সিন বিষ। এটি শরীরের সংস্পর্শে এলে ভয়ানক খিঁচুনি শুরু হয়। এমনকি হৃদ্যন্ত্র বিকল হয়ে মৃত্যুও হতে পারে।
দক্ষিণ আমেরিকার সেই বিষাক্ত ব্যাঙ ‘ডার্ট ফ্রগ’ নামে পরিচিত। ক্ষুদ্রাকৃতির সেই ব্যাঙের বিষ এক জন মানুষকে মেরে ফেলার ক্ষমতা রাখে। এই প্রজাতির পাখির ক্ষেত্রেও তাই। ছুঁলে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। হুডেড পিটোহুইয়ের শরীরটি বিষ তৈরির কারখানা নয়। ‘ডার্ট ফ্রগ’-এর মতো, এটি তার খাদ্য থেকে বিষাক্ত পদার্থ গ্রহণ করে। এটি যে পোকামাকড় খায় তাতে এই রাসায়নিক যৌগ থাকে। সেটি ধীরে ধীরে পাখির শরীরে জমা হয়।
হুডেড পিটোহুই পাহাড়ের ঢালের বনাঞ্চলে বাস করে। এরা সমাজবদ্ধ ভাবে বাস করে এবং প্রায়শই ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে ঘুরে বেড়ায়। অন্যান্য প্রজাতির সঙ্গে মিশে ফল, বীজ এবং পোকামাকড়ের মতো খাবারের সন্ধান করে।
পাখিটির দেহের বিষাক্ত পদার্থগুলি পরজীবীদের দূরে রাখতে সাহায্য করে। উকুন এবং পোকামাকড় পাখির বিষাক্ত পালক এবং ত্বকে আক্রমণ করলেও বিষের প্রভাবে বেশি ক্ষণ বেঁচে থাকে না। এর থেকে বোঝা যায় যে বিষটি পোকামাকড়ের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক ঢাল হিসাবেও কাজ করতে পারে।