Japan’s carry trade

ক্যারি ট্রেডের বুদবুদ ফাটলেই তছনছ? ইয়েনের ‘জুজুৎসু প্যাঁচে’ সর্বস্বান্ত হবে আমেরিকা-ভারতের শেয়ার বাজার?

ডলারের নিরিখে শক্তিশালী হয়ে উঠছে ইয়েন। খুব শীঘ্রই সোনার মতো ক্যারি ট্রেডের বুদবুদ ফেটে যাওয়ার শঙ্কায় কাঁটা বিশ্ববাজার। জাপানি মুদ্রার লেখচিত্র উপরের দিকে উঠতেই ক্যারি ট্রেড থেকে নিজেদের দ্রুত গুটিয়ে নিতে শুরু করেছে জাপানি সংস্থাগুলি।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ ০৭:৫৬
Share:
০১ ১৮

বছরের পর বছর ধরে জাপানি মুদ্রা (ইয়েন) ধার করে সেই পুঁজি অন্যান্য মুদ্রায় (মূলত ডলারে) রূপান্তর করার প্রবণতা এ বার নিদারুণ ঝুঁকির মুখে। ঋণ পরিশোধের খরচ শূন্য বা তার কাছাকাছি থাকায় বিপুল পরিমাণে জাপানি মুদ্রা ঋণ নিয়ে বিদেশের শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করত জাপানি সংস্থাগুলি। শূন্য বা ঋণাত্মক সুদে ঋণ দেওয়ার সেই নীতি থেকে সম্প্রতি সরে এসেছে ব্যাঙ্ক অফ জাপান।

০২ ১৮

জাপানের বাজেট নীতির পরিবর্তন এবং জাপানের শীর্ষ ব্যাঙ্কের মুদ্রানীতির প্রস্তাবিত স্বাভাবিকীকরণের ফলে জাপানি সরকারি বন্ডের সুদের হার গত ২০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বছরের শুরু থেকে, ১০ বছর মেয়াদি এবং ৩০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের সুদের হার ১০০ বেসিস পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়ে যথাক্রমে ১.৯৫ শতাংশ এবং ৩.৯৫ শতাংশে পৌঁছেছে সে দেশে। এর ফলে মার্কিন সরকারি বন্ডের তুলনায় সেই সব বন্ডের আপেক্ষিক আকর্ষণ উল্লেখযোগ্য ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

Advertisement
০৩ ১৮

দীর্ঘ দিন ধরেই জাপানের অর্থনীতির হাল সুবিধার নয়। গত দু’দশক ধরেই পণ্যের চাহিদা না বাড়ায় জিনিসপত্রের দাম বাড়া তো দূর, বরং তা কমছে। জাপান ভুগছে মূল্যহ্রাসের সমস্যায়। দীর্ঘ দিন দেওয়ালে পিঠ ঠেকে থাকা অর্থনীতিকে ঘুরিয়ে দাঁড় করাতে এক বছর আগে শূন্য সুদের হারের নীতি থেকে সরে এসেছে জাপান।

০৪ ১৮

কম সুদের হারের একটি মুদ্রা ধার করে এবং সেই অর্থ বেশি সুদের হারের অন্য মুদ্রায বা সম্পদে বিনিয়োগ করাকে অর্থনীতির ভাষায় ক্যারি ট্রেড বলে। দেড় বছর আগে নেওয়া সিদ্ধান্তের জের নতুন বছরে এই ক্যারি ট্রেডের বাজারকে ধীরে ধীরে আরও সঙ্কুচিত করে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতি বিশেষজ্ঞেরা।

০৫ ১৮

যখন ব্যাঙ্ক অফ জাপান (বিওজে) শূন্য সুদের হারের নীতির পরিবর্তন ঘোষণা করে, তখনই বিশ্বব্যাপী ইকুইটি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল। ইয়েন ক্যারি ট্রেডের জনপ্রিয়তা ধীরে ধীরে হ্রাস পাচ্ছে। গত আর্থিক প্রান্তিকে তাতে কোনও বৃদ্ধি লক্ষ করা যায়নি।

০৬ ১৮

অন্য দিকে ডলারের নিরিখে ইয়েন শক্তিশালী হতে শুরু করেছে। বাজারে জাপানি মুদ্রার লেখচিত্র উপরের দিকে উঠতেই ক্যারি ট্রেড থেকে নিজেদের দ্রুত গুটিয়ে নিতে শুরু করেছে জাপানি সংস্থাগুলি।

০৭ ১৮

ভারত, আমেরিকা-সহ বিভিন্ন বৈশ্বিক বাজারে এর প্রতিফলন দেখা দিতে শুরু করেছে। এর ফলে বিশ্বের বিভিন্ন শেয়ার বাজারে বড় ধরনের পতন ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। জাপান যখন শূন্য, এমনকি ঋণাত্মক সুদের হারে স্বল্পমেয়াদি ঋণ দিতে শুরু করে, তখন বৃহৎ আর্থিক সংস্থাগুলি প্রায় বিনামূল্যে ইয়েন ধার করা শুরু করে। তার পর সেই তহবিলগুলিকে অন্যান্য মুদ্রায় (বিশেষ করে ডলারে) রূপান্তর করে। মার্কিন সম্পদ কিনতে ব্যবহার করা হয় ইয়েন। ঋণ পরিশোধের খরচ শূন্য বা তার কাছাকাছি হওয়ায় সংস্থাগুলির কাছে জাপান হয়ে উঠেছিল এটিএমের মতো।

০৮ ১৮

১৯৯১ সালে ফেটে যায় টোকিয়োর অর্থনীতির বুদবুদ। দ্বীপরাষ্ট্রের তৎকালীন সরকার সুদের হার শূন্যে নামিয়ে আনে। জাপানিরা দেশে শূন্য উৎপাদনের চেয়ে ভাল কিছু পাওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক বাজারের দিকে ঝুঁকে পড়তে শুরু করে। বিদেশের বাজারে লক্ষ লক্ষ ডলার বিনিয়োগ করে সম্পদ বৃদ্ধিতে ফুলেফেঁপে ওঠে। এই ক্যারি ট্রেডের দৌলতে জাপান বিশ্বের বৃহত্তম ঋণদাতা দেশে পরিণত হয়।

০৯ ১৮

‘ইল্ড কার্ভ কন্ট্রোল’ নীতি রক্ষার জন্য আগ্রাসী ভাবে সরকারি বন্ড কেনে জাপানের প্রধান ব্যাঙ্কটি। ‘ইল্ড কার্ভ কন্ট্রোল’ হল মুদ্রানীতির একটি কৌশল যেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক নির্দিষ্ট মেয়াদের সরকারি বন্ডের সুদের হারকে একটি নির্দিষ্ট স্তরে রাখার জন্য প্রয়োজনে বন্ড কেনে বা বেচে। এই ভাবে বিওজে ১০ বছরের ইল্ডকে প্রায় ০ শতাংশ হারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কটি অনেক বন্ড কিনে বন্ডের ইল্ড (সুদের হার) নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল।

১০ ১৮

২০২৪ সালে ব্যাঙ্কটি সিদ্ধান্ত নেয়, এক থেকে দুই বছরের মধ্যে জাপানি সরকারি বন্ড কেনার পরিমাণ তারা কমিয়ে দেবে। মাসিক বন্ড কেনার পরিমাণ ধীরে ধীরে ৬ লক্ষ কোটি ইয়েন থেকে কমিয়ে ৩ লক্ষ কোটি ইয়েনে নামিয়ে আনবে। মূল্যহ্রাসের সঙ্গে যুঝতে এর আগে বহু বার মরিয়া চেষ্টা করেছে জাপান। কখনও বিপুল অঙ্কের ত্রাণ ঘোষণা করেছে টোকিয়ো, তো কখনও সুদ কমিয়ে নগদের জোগান বাড়ানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু কোনও দাওয়াইয়ে পুরো অসুখ না সারায় শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়েই তাদের এই ঘোষণা করতে হয়েছে।

১১ ১৮

বিওজের বন্ড কেনা থেকে পিছিয়ে আসার সিদ্ধান্ত এবং সুদের হার বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বন্ডের দাম কমতে থাকে ও ইল্ডের দাম (সুদের হার) বাড়তে থাকে। দাম ও ইল্ডের (সুদের হার) সম্পর্ক ব্যস্তানুপাতিক। ক্রেতার অনুপস্থিতি এবং বন্ড বিক্রির চাপ বৃদ্ধির কারণে, বন্ডের দাম কমতে থাকে। ফলস্বরূপ ইল্ড (সুদের হার) বৃদ্ধি পায়।

১২ ১৮

তবে এই মুক্ত বাণিজ্যের সমাপ্তি ঘটতে হয়তো খুব বেশি দিন অপেক্ষা করতে হবে না। খুব শীঘ্রই সোনার মতো ক্যারি ট্রেডের বুদবুদে ফেটে যাওয়ার শঙ্কায় কাঁটা হয়েছে বিশ্ববাজার। কারণ ইতিমধ্যেই জাপানে সরকারি বন্ডের সুদের হার ২.১৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৯৯ সালের ফেব্রুয়ারির পর এটিই সর্বোচ্চ। গত ১২ মাসে প্রায় ১০০.৮০ বেসিস পয়েন্ট বেড়েছে। জাপানের বন্ড মার্কেটের উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনে সিঁদুরে মেঘ দেখছেন আর্থিক বিশ্লেষকদের একাংশ।

১৩ ১৮

বছরের পর বছর ধরে নীরবে ক্রিপ্টোর দুনিয়ায় অর্থ জুগিয়ে আসছে ইয়েন। জাপানি ইল্ডের সুদের পরিমাণ বৃদ্ধির নেতিবাচক প্রভাব ইতিমধ্যেই ক্রিপ্টোদুনিয়ায় পড়তে শুরু করে দিয়েছে। বিটকয়েন বা ইথেরিয়ামের সূচক নীচের দিকে তো নামছেই, তার সঙ্গে সঙ্গে এক্সআরপির মতো ক্রিপ্টোমুদ্রার অস্বাভাবিক পতন লক্ষ করা গিয়েছে। বিওজে সুদের হার আর কয়েক বেসিস পয়েন্ট বাড়ালেই ক্রিপ্টোর বাজারে ধস নামার প্রবল আশঙ্কা করছেন বাজার বিশেষজ্ঞেরা।

১৪ ১৮

ইয়েনের ক্যারি ব্যবসার ডালপালা বিশ্ব জুড়ে ঠিক কতখানি ছড়িয়ে রয়েছে সে সম্পর্কে কেউই পুরোপুরি নিশ্চিত নন। আর্থিক বিশ্লেষকদের অনুমান, বিশ্বব্যাপী ইয়েন বাণিজ্যে জাপানি ব্যাঙ্কগুলির ৩৫ হাজার কোটি ডলারের স্বল্পমেয়াদি বহিরাগত ঋণ রয়েছে।

১৫ ১৮

প্রায় দেড় বছর আগে, জাপানের ব্যাঙ্ক অপ্রত্যাশিত ভাবে সুদের হার বৃদ্ধি করলে ইয়েন ক্যারি ট্রেড বিশ্ববাজারে ত্রাসের সঞ্চার করেছিল। বিওজে-র পদক্ষেপ বিশ্বব্যাপী ইকুইটি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করে। যদিও সেই প্রভাব স্বল্পস্থায়ী ছিল। বহু আর্থিক বিশেষজ্ঞের মত, ইয়েন ক্যারি ট্রেডের গতিপ্রকৃতি নতুন বছরে অস্থিরতার দিকেই নির্দেশ করছে।

১৬ ১৮

জাপানের বিনিয়োগকারীরা বিদেশি সম্পদের প্রতি তাঁদের বহু দশকের মোহ হারাতে শুরু করেছেন। এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে সে দেশের কিছু বৃহৎ বিমা সংস্থা নিজের দেশে বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। একটি সম্পদ ব্যবস্থাপনা সংস্থা জানিয়েছে যে, ৩০ বছরের ইল্ড ২.৫ শতাংশের উপরে থাকলে অর্থ দেশে ফিরে আসার সম্ভাবনা থাকে।

১৭ ১৮

জাপানের বিনিয়োগকারীরা মার্কিন সরকারি বন্ডের বৃহত্তম বিদেশি ধারক। অস্ট্রেলিয়ার ঋণের প্রায় ১০ শতাংশ মালিকানা রয়েছে জাপানি বিনিয়োগকারীদের হাতে। সিঙ্গাপুর থেকে নেদারল্যান্ডস এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক হাজার কোটি ডলারের শেয়ারেরও নিয়ন্ত্রক জাপানি সংস্থাগুলি। ভারতে মিড ক্যাপের বাজারে প্রবল ধাক্কা আসতে পারে। পুঁজি ও নগদে টান পড়তে পারে। আগামী দিনে ক্যারি ট্রেডের প্রবাহ কমলে ঋণ নেওয়ার খরচ বহু গুণ বাড়বে।

১৮ ১৮

জাপান সরকারের বন্ডগুলির ইল্ডের তীব্র বৃদ্ধি বিশ্বব্যাপী আর্থিক বাজারকে অস্থির করে তুলেছে। মনে করা হচ্ছে বিনিয়োগকারীরা সম্ভাব্য মূলধন সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবেন। জাপানের বিভিন্ন বিনিয়োগকারী সংস্থা, যারা বিদেশি বন্ড, ইক্যুইটি এবং বিকল্প সম্পদের অন্যতম অংশীদার, তাঁরা বিদেশের বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে দেশীয় বাজারে ফিরে আসতে চাইবেন। তাই ‘জাপানি বোমার ঘায়ে’ কেঁপে উঠতে পারে বিশ্বব্যাপী শেয়ার বাজার, এমনটাই ধারণা শেয়ার বাজার বিশেষজ্ঞদের একাংশের।

সব ছবি: সংগৃহীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement