তৃতীয় সপ্তাহে পা দিয়েছে ইজ়রায়েল এবং আমেরিকার সঙ্গে ইরানের সংঘর্ষ। উত্তেজনা এখনও কাটেনি। পশ্চিম এশিয়ায় আমেরিকার বিভিন্ন বন্ধু দেশে হামলা চালাচ্ছে ইরান। তবে ইরানের বিরুদ্ধে এখনই সামরিক অভিযান বন্ধ করতে নারাজ যুক্তরাষ্ট্র।
চলতি বছরের ১৩ মার্চ এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানকে ‘সম্পূর্ণ ভাবে’ ধ্বংস করছে আমেরিকা। আগামী দিনে ইরানে হামলার তেজ আরও বাড়াবে মার্কিন বাহিনী। অন্য দিকে, পশ্চিম এশিয়ার মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলি লক্ষ্য করে প্রতিনিয়ত হামলা চালাচ্ছে তেহরান। অবরুদ্ধ করে রেখেছে হরমুজ় প্রণালীও।
ইরানে যুদ্ধের জন্য আমেরিকার অর্থনীতি প্রভাবিত হচ্ছে। কোটি কোটি ডলার খরচ হচ্ছে যুদ্ধে! এই দাবি অনেকাংশেই মেনে নিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। পাশাপাশি এ-ও জানান, ‘‘আমি সকলকে আশ্বস্ত করতে চাই, ইরানের উপর হামলার আগে আমেরিকার অর্থনীতি যে জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিল, সেই জায়গায় ফিরে যাবে।’’ তাঁর মতে, ইরান যুদ্ধ শেষ হলেই ঘুরে দাঁড়াবে যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্পের কথায়, ‘‘আমি মনে করি না, এটা দীর্ঘস্থায়ী হবে।’’
পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বিশ্ব জুড়ে ব্যারলপ্রতি তেলের দাম ৪২ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ৭২.৪৮ ডলার থেকে বাড়তে বাড়তে শুক্রবার (পড়ুন ১৩ মার্চ) তা হয়েছে ১০৩.১৪। জানা গিয়েছে, গত সপ্তাহের তুলনায় প্রায় ১১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে দাম।
তবে পাল্টা ইরানের অর্থনীতিকে দুর্বল করতে তৎপর মার্কিন বাহিনীও। জানা গিয়েছে সংঘাতের ১৩তম দিনে ইরানের ব্যাঙ্কগুলিকে লক্ষ্য করে হামলা চালাতে শুরু করেছে আমেরিকা। এর মধ্যে নাকি রয়েছে ইরানের সবচেয়ে পুরনো ব্যাঙ্কও।
এর পর ইরানও ঘোষণা করেছে, ইজ়রায়েলের বিভিন্ন ব্যাঙ্ক এবং পশ্চিম এশিয়ায় থাকা আমেরিকার ব্যাঙ্কগুলি লক্ষ্য করে হামলা চালাবে তারাও। পাশাপাশি, পশ্চিম এশিয়া জুড়ে থাকা অ্যামাজ়ন, গুগ্ল এবং মাইক্রোসফ্টের মতো মার্কিন প্রযুক্তি সংস্থাগুলিকেও লক্ষ্যবস্তু করতে পারে তেহরান।
অন্য দিকে আমেরিকার দাবি, ইরানের বন্দর এলাকাগুলিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে মার্কিন বাহিনী। একই সঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে আমেরিকা আরও তিনটি নৌ-যান পাঠানোর কথা ভাবছে। সেখানে মোতায়েন থাকবে ২,২০০ নৌ-সৈনিক। মার্কিন হুমকির পর ইরান ইতিমধ্যেই বন্দর এলাকাগুলি থেকে সাধারণ নাগরিকদের সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
ইরানেরও পাল্টা হুমকি, পশ্চিম এশিয়ার যে বন্দরগুলি দিয়ে আমেরিকা এবং ইজ়রায়েল বাণিজ্য করে, সেগুলি গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে। এর মধ্যেই সমাজমাধ্যমে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের খার্গ দ্বীপের সামরিক ঘাঁটিগুলিতে বোমা হামলা চালিয়েছে আমেরিকার বাহিনী। তাঁর দাবি, হরমুজ় প্রণালী দিয়ে অবাধ জাহাজ চলাচল শুরু হলে তবেই এই হামলা থামবে।
সব মিলিয়ে একে অপরকে ‘ভাতে মারতে’, অর্থাৎ, অর্থনীতিকে দুর্বল করতে একের পর এক হুমকি এবং প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে দু’পক্ষই। একে অপরকে লক্ষ্য করে চালানো হচ্ছে ক্ষেপণাস্ত্রের হামলা।
বিশেষজ্ঞদের দাবি, পরিস্থিতি এ ভাবে চলতে থাকলে, খুব শীঘ্রই বড়সড় অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়বে আমেরিকা এবং ইরান— উভয়েই। এমনতি ব্যারলপ্রতি তেলের দাম ২০০ ডলার ছুঁতে পারে।
এর মধ্যেই হরমুজ় প্রণালীতে আমেরিকার জ্বালানি ভর্তি একাধিক ট্যাঙ্কারে হামলা চালিয়েছে তেহরান। যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি ব্রিটেন, তাইল্যান্ড এবং জাপানের তেলের ট্যাঙ্কারে গিয়েও আঘাত হেনেছে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইজ়রায়েল-আমেরিকার সঙ্গে সংঘাতের মধ্যেই শত্রুসংখ্যা বাড়িয়ে ফেলেছে ইরান। হরমুজ় প্রণালীতে জাপান এবং তাইল্যান্ড তেলের ট্যাঙ্কারে হামলা চালানোর কারণে ওই দেশগুলিও ইরানের বিরোধিতায় নেমে আসতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছে ইজ়রায়েল এবং আমেরিকা। এই অভিযানের পোশাকি নাম ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে ইরানের সর্বোচ্চ পদাধিকারীদের ‘খতম’ করেছে যৌথ বাহিনী।
আয়াতোল্লা আলি খামেনেই ছাড়াও আইআরজিসির সর্বাধিনায়ক মেজর জেনারেল মহম্মদ পাকপুর, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আজিজ নাসিরজাদেহ, সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল সইদ আব্দুর রহিম মুসাভি-সহ বেশ কয়েক জনের মৃত্যু হয়েছে এই কয়েক দিনে।
‘ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অফ ওয়ার’-এর প্রতিবেদন অনুসারে আমেরিকা-ইজ়রায়েলের যৌথ হামলার উদ্দেশ্য ছিল ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর মনোবলে ধাক্কা এবং তাদের সব সামরিক ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দেওয়া। কিন্তু আমেরিকা বা ইজ়রায়েল— কেউই এখনও পর্যন্ত তাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছোতে পারেনি।
অন্য দিকে পাল্টা হামলা চালাচ্ছে ইরানও। ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ জানিয়েছে, শুক্রবার সৌদি আরবে আমেরিকার বায়ুসেনার পাঁচটি বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইরানের হামলায়। সেগুলি সৌদির বিমানঘাঁটিতে রাখা ছিল।