Venezuela Echoes US Panama Raid

মাদুরোর কায়দায় প্রেসিডেন্ট ‘অপহরণ’ করতে শত্রু দেশে হানা, গান শুনিয়ে অন্য এক সেনাশাসককে বন্দি করেছিল আমেরিকা!

সস্ত্রীকে ভেনেজ়ুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ‘অপহরণ’ করে এনে দুনিয়া জুড়ে হইচই ফেলে দিয়েছে আমেরিকার ডেল্টা ফোর্স। অতীতে এই ধরনের একাধিক অভিযান চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী। এর মধ্যে অন্যতম হল পানামার সাবেক সেনাশাসক ম্যানুয়েল অ্যান্টোনিও নেরিয়েগাকে বন্দির ঘটনা।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০৫ জানুয়ারি ২০২৬ ১৪:৩৩
Share:
০১ ১৮

ভেনেজ়ুয়েলায় মার্কিন সামরিক অভিযানকে কেন্দ্র করে সরগরম বিশ্ব। রাজধানী কারাকাস থেকে সস্ত্রীক সেখানকার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নিয়ে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের ডেল্টা ফোর্স। আমেরিকার এ-হেন ‘অপারেশন অ্যাবসোলিউট রিজ়লভ’-এর (পড়ুন চরম সংকল্প) সঙ্গে কিন্তু সাড়ে তিন দশক আগের একটি ঘটনার রয়েছে হুবহু মিল। সেখানে শত্রু দেশের প্রেসিডেন্টের কব্জিতে হাতকড়া লাগাতে কামান-বন্দুকের পাশাপাশি রক সঙ্গীতের উপর ভরসা করতে দেখা গিয়েছিল ওয়াশিংটনকে!

০২ ১৮

গত শতাব্দীর ৮০-র দশক। উত্তর আমেরিকা মহাদেশের মধ্যভাগে অবস্থিত পানামা প্রজাতন্ত্রে (পড়ুন রিপাবলিক অফ পানামা) হঠাৎ করেই ঢুকে পড়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী। সেখানকার কুর্সিতে তখন ছিলেন সেনাশাসক ম্যানুয়েল অ্যান্টোনিও নেরিয়েগা। তাঁকে উৎখাত করাই ছিল ওয়াশিংটনের মূল উদ্দেশ্য। তাঁকে বন্দি করতে গিয়ে অবশ্য কালঘাম ছুটে গিয়েছিল মার্কিন ফৌজের। যদিও শেষ হাসি হেসেছিলেন তাঁরাই।

Advertisement
০৩ ১৮

সালটা ১৯৮৯। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের কুর্সিতে তখন জর্জ এইচডব্লিউ বুশ। পানামার জন্য আমেরিকাবাসীদের জীবন বিপন্ন হতে পারে বলে আচমকাই উল্লেখ করে বসে তাঁর সরকার। ফলে নেরিয়েগাকে বিচারের আওতায় আনার প্রয়োজন অনুভব করেন তিনি। সেই লক্ষ্যে সরু একফালি দেশটিতে সামরিক অভিযান চালাতে দ্বিতীয় বার ভাবেননি বুশ। সেখানকার কৌশলগত এলাকাগুলি কব্জা করতে ওই সময় প্রায় ২০ হাজার সৈনিককে কাজে লাগিয়েছিল ওয়াশিংটন।

০৪ ১৮

পানামায় যুক্তরাষ্ট্রের এই সেনা অভিযানের সাঙ্কেতিক নাম ছিল ‘অপারেশন জাস্ট কজ়’। এর শুরুটা অবশ্য নেরিয়েগার বাহিনীই করেছিল। তাদের আক্রমণে এক জন মার্কিন সৈনিকের মৃত্যু হতেই তীব্র প্রত্যাঘাত শানাতে থাকে ওয়াশিংটন। ওই সময় মাদুরোর মতোই পানামার সেনাশাসকের বিরুদ্ধে মাদকপাচারের অভিযোগ তুলেছিল আমেরিকা। এ ছাড়া নির্বাচনে কারচুপির মতো অপরাধের খাঁড়াও ঝুলছিল তাঁর মাথার উপর।

০৫ ১৮

‘অপারেশন জাস্ট কজ়’-এ মার্কিন আক্রমণের ঝাঁজ পানামা সহ্য করতে পারেনি। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট সামরিক অভিযানে ৫১৪ জন সৈনিক হারান নেরিয়েগা। এ ছাড়া বেশ কয়েক জন অসামরিক নাগরিকেরও মৃত্যু হয়েছিল। পরবর্তী কালে সেই সংখ্যাটা কম-বেশি হাজার বলে জানিয়ে দেয় বেশ কিছু স্থানীয় সংবাদপত্র। অন্য দিকে, নিহত মার্কিন সৈনিকের সংখ্যা ছিল মাত্র ২৩।

০৬ ১৮

সংশ্লিষ্ট সেনা অভিযান শুরু হওয়ার মাত্র এক মাসের মধ্যে প্রায় সম্পূর্ণ পানামা কব্জা করে ফেলে আমেরিকার সেনা। যদিও নেরিয়েগার টিকির ডগাটা পর্যন্ত ছুঁতে পারেনি তারা। বিপদ বুঝে তড়িঘড়ি ভ্যাটিকানের দূতাবাসে ঢুকে পড়েন তিনি। সেখানে ঢুকে তাঁকে বন্দি করা যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর পক্ষে সম্ভব ছিল না। ফলে সংশ্লিষ্ট দূতাবাস ঘিরে ফেলে অন্য রকমের রণকৌশল নেন ওয়াশিংটনের কমান্ডারেরা।

০৭ ১৮

আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, যে কোনও দূতাবাসকে ওই দেশের জমি হিসাবে গণ্য করা হয়। সেখানে ঢোকার অর্থ হল সংশ্লিষ্ট দেশটির উপর আক্রমণ। এই আইনকে হাতিয়ার করেই মার্কিন সৈন্যদের থেকে প্রাণ বাঁচানোর নীলনকশা ছকে ফেলেন পানামার সামরিক শাসক নেরিয়েগা। তাঁকে গ্রেফতার করতে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর পা যে ভ্যাটিকানের দূতাবাসে পড়বে না, তা ভালই জানতেন তিনি। হাল ছাড়তে রাজি ছিলেন না ওয়াশিংটনের কমান্ডারেরাও।

০৮ ১৮

ভ্যাটিক্যানের দূতাবাসে নেরিয়েগার আশ্রয় নেওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হতেই একটি অভিনব সিদ্ধান্ত নেয় আমেরিকার ফৌজ। ওই দূতাবাস ঘিরে রক সঙ্গীত বাজাতে থাকে তারা। এর মূল্য উদ্দেশ্য ছিল পানামার সামরিক শাসকের উপর মানসিক চাপ তৈরি করা। তা ছাড়া এই পদ্ধতিতে সারা বিশ্বের মনোযোগ আকর্ষণেরও চেষ্টা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র।

০৯ ১৮

মার্কিন যুদ্ধ দফতরের (ডিপার্টমেন্ট অফ ওয়ার) সদর কার্যালয় পেন্টাগন থেকে প্রকাশিত নথি অনুযায়ী, নেরিয়েগাকে দূতাবাস থেকে বার করতে একগুচ্ছ রক গান বাজিয়েছিল মার্কিন বাহিনী। সেই তালিকায় ছিল জনপ্রিয় কেসি অ্যান্ড দ্য সানশাইন ব্যান্ডের ‘গিভ ইট আপ’, অ্যালিস কুপারের ‘নো মোর মিস্টার নাইস গাই’, ব্ল্যাক সাবাথের ‘প্যারানয়েড’, গানস এন’ রোজ়েসের ‘ওয়েলকাম টু দ্য জাঙ্গল’, বন জোভির ‘ওয়ান্টেড ডেড অর অ্যালাইভ’ এবং দ্য ডোরসের ‘দ্য এন্ড’।

১০ ১৮

ওয়াশিংটনের এই কৌশল কিন্তু কাজে এসেছিল। ভ্যাটিক্যান দূতাবাসে ১১ দিন থাকার পর ১৯৯০ সালের ৩ জানুয়ারি আত্মসমর্পন করেন পানামার সামরিক শাসক নেরিয়েগা। সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে মিয়ামিতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানকার আদালত মাদকপাচার, জালিয়াতি এবং আর্থিক তছরুপের মামলায় দোষী সাব্যস্ত করে তাঁকে।

১১ ১৮

মার্কিন সৈন্যদের এই কৌশলের কিন্তু কম সমালোচনা হয়নি। বিষয়টি নিয়ে সরব হন তৎকালীন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ব্রেন্ট স্কোক্রফ‌ট। এ সব সিদ্ধান্ত নিয়ে বাহিনী কূটনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘন করছে বলে সটান প্রেসিডেন্ট বুশের কাছে গিয়ে নালিশ ঠোকেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যমগুলির একাংশের দাবি, এর পর নেরিয়েগাকে দূতাবাস থেকে বার করতে রক সঙ্গীত বাজানো বন্ধ করে আমেরিকার ফৌজ। যদিও প্রত্যক্ষদর্শীরা সে কথা মানতে চাননি।

১২ ১৮

১৯৮৫ সালে পানামার ক্ষমতায় আসেন নেরিয়েগা। সেখানকার স্থলবাহিনীর সর্বোচ্চ পদ (পড়ুন জেনারেল) পেয়েছিলেন তিনি। ক্ষমতা দখল করতে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আরদিতো বারলেত্তাকে পদত্যাগে বাধ্য করেন পানামার এই সেনা অফিসার। কট্টর আমেরিকাবিরোধী হিসাবে পরিচিতি ছিল তাঁর। যুক্তরাষ্ট্রের রোষের সেটাই ছিল সবচেয়ে বড় কারণ, বলছেন বিশ্লেষকেরা।

১৩ ১৮

মিয়ামির আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়া নেরিয়েগা কিন্তু আর কখনওই জেলের বাইরে বেরিয়ে আসতে পারেননি। ২০১০ সাল পর্যন্ত আমেরিকার কারাগারেই বন্দি ছিলেন তিনি। পরে অন্য এক মামলায় বিচারের জন্য তাঁকে ফ্রান্সে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। এক বছর সেখানে ছিলেন নেরিয়েগা। পরে আবার পানামায় ফেরত পাঠানো হয় তাঁকে। সেখানেই জেলবন্দি অবস্থায় ২০১৭ সালে মৃত্যু হয় তাঁর। ওই সময় নেরিয়েগার বয়স ছিল ৮৩ বছর।

১৪ ১৮

২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণ করে আমেরিকা। বাগদাদের বিরুদ্ধে গণবিধ্বংসী হাতিয়ার তৈরির অভিযোগ এনেছিল ওয়াশিংটন। পশ্চিম এশিয়ার আরব দেশটির কুর্সিতে তখন ছিলেন সাদ্দাম হুসেন। ওই বছর ইরাকের তিকরিত শহরের একটি বাঙ্কার থেকে তাঁকে গ্রেফতার করে যুক্তরাষ্ট্রের কমান্ডো বাহিনী। ২০০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর ফাঁসিতে ঝোলানো হয় তাঁকে।

১৫ ১৮

এ ছাড়া মাদক পাচারের অভিযোগে মার্কিন সেনার হাতে বন্দি হয়েছেন হন্ডুরাসের সাবেক প্রেসিডেন্ট জ়ুয়ান অরল্যান্ডো হার্নান্দেজ়। ২০২২ সালে নিজের বাড়িতে গ্রেফতার হন তিনি। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্রের সৈনিকদের সঙ্গে ছিল হন্ডুরাসের বাহিনীও। ধরা পড়ার মাস দুয়েক পর তাঁকে আমেরিকায় পাঠানো হয়। সেখানে ৪৫ বছরের কারাদণ্ডের সাজা পান তিনি। তবে তাঁর পরিণতি সাদ্দাম বা নেরিয়েগার মতো হয়নি। গত বছরের ১ ডিসেম্বর বিশেষ ক্ষমতাবলে হার্নান্দেজ়কে ক্ষমা করে দেন ট্রাম্প।

১৬ ১৮

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকেরা অবশ্য হার্নান্দেজ়ের ঘটনার সঙ্গে মাদুরো-কাণ্ডের তুলনা টানতে নারাজ। তাঁদের যুক্তি, গ্রেফতারির আগেই প্রেসিডেন্টপদ থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন হন্ডুরাসের একসময়ের সর্বময় কর্তা। তা ছাড়া তাঁকে গ্রেফতারির অভিযানকে পুরোপুরি ভাবে আমেরিকার বলা যাবে না। কারণ, এতে ছিল হন্ডুরাসের বাহিনীও।

১৭ ১৮

চলতি বছরের ২ জানুয়ারি মধ্যরাতে (স্থানীয় সময় রাত ২টো নাগাদ) ভেন‌েজ়ুয়েলায় আক্রমণ শানায় আমেরিকার ডেল্টা ফোর্স। ওই সময় রাজধানী কারাকাসে ঢুকে প্রেসিডেন্ট মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে তুলে নিয়ে যায় মার্কিন সেনা। এই সামরিক অভিযানের সাঙ্কেতিক নাম ‘অপারেশন অ্যাবসোলিউট রিজ়লভ’ রেখেছে আমেরিকা। বিগত কয়েক দশকে বিশ্ব ইতিহাসে এমন ঘটনা যে বেনজির, তা বলাই বাহুল্য।

১৮ ১৮

মাদুরো দম্পতিকে ইতিমধ্যেই নিউ ইয়র্ক নিয়ে গিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা। সেখানে মার্কিন ফৌজদারি আইনে তাঁদের বিচার হবে বলে মনে করা হচ্ছে। ভেনেজ়ুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অবৈধ সরকার চালানোরও অভিযোগ রয়েছে। তাঁর অবর্তমানে দেশটির অবস্থা কী হবে, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই তুঙ্গে উঠেছে জল্পনা।

সব ছবি: সংগৃহীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement