US Stryker for Indian Army

দুর্গম পাহাড়ের ‘কঠিন পিচে’ খারাপ স্ট্রাইক রেট, মার্কিন ‘স্ট্রাইকার’কে মাঠে নামার সুযোগই দেবে না ভারতীয় ফৌজ?

মার্কিন সাঁজোয়া যান স্ট্রাইকার কেনার ব্যাপারে ওয়াশিংটন এবং নয়াদিল্লির মধ্যে চলছে আলোচনা। কিন্তু তার মধ্যেই প্রকাশ্যে এসেছে এর পারফরম্যান্স সংক্রান্ত একটি রিপোর্ট, যার জেরে সাঁজোয়া গাড়িটির ব্যাপারে ভারতীয় সেনা আগ্রহ হারাচ্ছে বলে সূত্র মারফত মিলেছে খবর।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০১ জানুয়ারি ২০২৬ ১৫:২০
Share:
০১ ১৮

বরফে ঢাকা দুর্গম পর্বতচূড়ায় মারকাটারি পারফরম্যান্স নয়। উভচর ভূমিকাতেও ব্যর্থ। মার্কিন সাঁজোয়া গাড়ি স্ট্রাইকারকে নিয়ে ক্রমশ আগ্রহ হারাচ্ছে ভারতীয় সেনা। গত দু’-তিন বছর ধরে কৌশলগত এই যানটি নিয়ে নয়াদিল্লির সঙ্গে কয়েক কোটি ডলারের প্রতিরক্ষা চুক্তি সেরে ফেলতে মরিয়া ছিল আমেরিকা। ওয়াশিংটনের সেই স্বপ্ন এ বার বিশ বাঁও জলে যেতে চলেছে বলে মনে করছেন সাবেক ফৌজি অফিসারেরা। যদিও সরকারি ভাবে এই ইস্যুতে এখনও কোনও বিবৃতি দেয়নি কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকার।

০২ ১৮

২০২৫ সালের ১-১৪ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কায় মার্কিন ফৌজের সঙ্গে ‘যুদ্ধাভ্যাস’ নামের যৌথ সামরিক মহড়ায় যোগ দেয় ভারতীয় সেনা। সেখানে শক্তি প্রদর্শনে স্ট্রাইকার সাঁজোয়া গাড়িগুলিকে নামায় আমেরিকা। সূত্রের খবর, সুমেরু সাগর সংলগ্ন এলাকায় সেগুলি আশানুরূপ পারফরম্যান্স দিতে পারেনি, যার জেরে এর আমদানিতে শেষ পর্যন্ত নয়াদিল্লি কতটা আগ্রহী হবে, তা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।

Advertisement
০৩ ১৮

২০২৪ সালের গোড়ার দিকে প্রথম বার স্ট্রাইকার সাঁজোয়া গাড়ি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কথা বলা শুরু করে মোদী সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রক। ওই সময় অবশ্য কত সংখ্যায় এই যান কেনা হবে, সেই সংখ্যা আমেরিকার কাছে প্রকাশ করা হয়নি। ভারতের আগ্রহকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছিল ওয়াশিংটন। তড়িঘড়ি স্ট্রাইকারের নমুনা দিল্লি পাঠায় মার্কিন যুদ্ধ দফতরের (ডিপার্টমেন্ট অফ ওয়ার) সদর কার্যালয় পেন্টাগন।

০৪ ১৮

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে লাদাখের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় স্ট্রাইকারের শক্তি পরীক্ষা করে ভারতীয় সেনা। সূত্রের খবর, সেখানে সংশ্লিষ্ট সাঁজোয়া গাড়িটির একাধিক দুর্বলতা ধরা পড়ে। এর মধ্যে ছিল ইঞ্জিনের সীমাবদ্ধতা এবং খরস্রোতা পাহাড়ি নদী বা জলাশয় পেরোনোর ক্ষেত্রে এর অদক্ষতা। এ ব্যাপারে পদস্থ অফিসারদের কাছে একটি রিপোর্টও পাঠান নমুনা পরীক্ষায় থাকা ভারতীয় ফৌজের কমান্ডারেরা, যা গোপন রেখেছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রক।

০৫ ১৮

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। ওই সময় সদ্য কুর্সিতে বসা ‘পোটাস’কে (প্রেসিডেন্ট অফ দ্য ইউনাইটেড স্টেটস) ভারতের সঙ্গে সামরিক সমঝোতা বাড়ানোর ব্যাপারে প্রকাশ্যে বিবৃতি দিতে শোনা গিয়েছিল। এর পরই নয়াদিল্লির সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে ওয়াশিংটন স্ট্রাইকার সাঁজোয়া গাড়ি তৈরি করতে ইচ্ছুক বলে তুঙ্গে ওঠে জল্পনা। শুধু তা-ই নয়, দ্বিতীয় দফায় দু’তরফে শুরু হয় আলোচনা।

০৬ ১৮

ওপেন সোর্সের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্রাইকারকে নাকি দু’জায়গায় মোতায়েনের পরিকল্পনাও সেরে ফেলেছিল ভারতীয় ফৌজ। এই সাঁজোয়া গাড়ির প্রথম বহর লাদাখের ‘প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা’ বা এলএসিতে (লাইন অফ অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোল) পাঠাবেন বলে ভেবেছিলেন আর্মার্ড ডিভিশনের কমান্ডারেরা। দ্বিতীয় বহর যেত সিকিম সীমান্তে। অর্থাৎ, চিনের আগ্রাসী ‘পিপল্স লিবারেশন আর্মি’ বা পিএলএ-র কথা ভেবেই যে আমেরিকার সাঁজোয়া গাড়িটির দিকে নয়াদিল্লি ঝোঁকে, তা বলা বাহুল্য।

০৭ ১৮

সাবেক সেনাকর্তাদের কথায়, মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হল প্রযুক্তি হস্তান্তর। কোনও অবস্থাতেই তা আমদানিকারী দেশের হাতে তুলে দিতে চায় না যুক্তরাষ্ট্র। শুধু তা-ই নয়, সংশ্লিষ্ট প্রতিরক্ষা সামগ্রীর মেরামতি ও রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়টিও সাধারণ ভাবে নিজেদের হাতে রাখতে দেখা গিয়েছে ওয়াশিংটনকে। ফেব্রুয়ারির আলোচনায় স্ট্রাইকারের ক্ষেত্রে সেই ছুতমার্গ ছাড়তে রাজি হয় আমেরিকা, খবর সূত্রের।

০৮ ১৮

ওই ঘটনার মাত্র আট মাসের মাথায় আলাস্কার ‘যুদ্ধাভ্যাসে’ স্ট্রাইকারের পারফরম্যান্স যুক্তরাষ্ট্রের কপালে ফেলে চিন্তার ভাঁজ। তখনই ভারতের সঙ্গে এই সংক্রান্ত প্রতিরক্ষা চুক্তি যে কঠিন হতে চলেছে, তা বুঝতে দেরি হয়নি ওয়াশিংটনের। ফলে পরবর্তী তিন মাসে ড্রোন ও নৌবাহিনীর বেশ কিছু সামরিক সরঞ্জাম নিয়ে নয়াদিল্লির সঙ্গে কথা হলেও সংশ্লিষ্ট সাঁজোয়া গাড়িটিকে তালিকার বাইরেই রাখতে দেখা গিয়েছে ট্রাম্পের যুদ্ধ দফতরকে। প্রকাশ্যে এই নিয়ে মুখে কুলুপ এঁটে রয়েছে তারা।

০৯ ১৮

স্ট্রাইকারের খারাপ পারফরম্যান্সের মূল্যায়ন করতে গিয়ে দু’টি বিষয়ের কথা উল্লেখ করেছেন সাবেক সেনাকর্তাদের একাংশ। তাঁদের যুক্তি, ওজনের নিরিখে মার্কিন সাঁজোয়া গাড়িটি বেশ ভারী। অন্য দিকে, এতে ৩৫০ অশ্বশক্তির ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে পাহাড়ের দুর্গম এলাকায় ওঠার সময় সমস্যার মুখে পড়ছে আমেরিকার স্ট্রাইকার। গাড়িটির উভচর শক্তি বৃদ্ধির জন্য এর নকশায় কিছু বদল আনার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন তাঁরা।

১০ ১৮

এম১১২৬ পদাতিক সৈন্যবাহী সাঁজোয়া গাড়ি স্ট্রাইকারের নির্মাণকারী সংস্থা হল কানাডার জেনারেল ডায়নামিক্স ল্যান্ড সিস্টেমস। ২০০২ সাল থেকে এটি ব্যাপক ভাবে ব্যবহার করছে মার্কিন ফৌজ। আমেরিকার স্থলবাহিনীতে হাজার পাঁচেক স্ট্রাইকার আছে বলে জানা গিয়েছে। এখনও পর্যন্ত বড় কোনও যুদ্ধে অংশ নেয়নি এই সাঁজোয়া যান। তবে ইউরোপ, মধ্য এশিয়া-সহ বিশ্বের একাধিক জায়গায় সংশ্লিষ্ট হাতিয়ারটিকে মোতায়েন রেখেছে ওয়াশিংটন।

১১ ১৮

আট চাকা বিশিষ্ট স্ট্রাইকার দৈর্ঘ্যে প্রায় ২৩ ফুট। সাধারণত প্রস্থে ও উচ্চতায় যথাক্রমে আট থেকে ন’ফুট হয়ে থাকে। স্ট্রাইকারের একাধিক শ্রেণিবিভাগ রয়েছে। এক একটি সাঁজোয়া গাড়ি দুই থেকে ন’জন পর্যন্ত সৈনিককে বহন করতে সক্ষম। এতে বেশ কয়েক ধরনের হাতিয়ার লাগানো যেতে পারে। সেই তালিকায় রয়েছে ১২.৭ মিলিমিটারের এম২ মেশিনগান, ৪০ মিলিমিটারের এমকে ১৯ গ্রেনেড লঞ্চার, ৩০ মিলিমিটারের এমকে ৪৪ বুশমাস্টার টু কামান এবং ১০৫ মিলিমিটারের এম৬৮এ২ কামান।

১২ ১৮

এ ছাড়া স্ট্রাইকারের মাধ্যমে আরও দু’ধরনের অস্ত্র ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। সেগুলি হল, ১২.৭ মিলিমিটারের এম২ এবং ৭.৬২ মিলিমিটারের এম২৪০ মেশিনগান। এতে ড্রোনের লঞ্চার বসানোর জায়গাও রয়েছে। ঘণ্টায় ৯৭ কিলোমিটার বেগে ছুটতে পারে এই সাঁজোয়া গাড়ি। এর পাল্লা কমবেশি ৫০০ কিলোমিটার বলা যেতে পারে। ২০১২ সালে একটি স্ট্রাইকারের দাম ছিল প্রায় ৫০ লক্ষ ডলার। গত এক দশকে তা অনেকটাই বেড়েছে।

১৩ ১৮

আমেরিকার সঙ্গে শেষ পর্যন্ত স্ট্রাইকার চুক্তি না হলে বিকল্প হিসাবে সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি ‘হুইল্ড আর্মার্ড প্ল্যাটফর্ম’-এর দিকে ঝুঁকতে পারে কেন্দ্র। ২০১৭ সাল থেকে ভারতীয় ফৌজের পাশাপাশি এটি ব্যবহার করছে একাধিক কেন্দ্রীয় আধা সেনা। এর মধ্যে আছে বিএসএফ এবং আইটিবিপির মতো সীমান্তরক্ষী বাহিনী। চাকাযুক্ত এই সাঁজোয়া গাড়ির নকশা তৈরি করেছে প্রতিরক্ষা গবেষণা সংস্থা ডিফেন্স রিসার্চ ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজ়েশন বা ডিআরডিও। আর এর নির্মাণকারী সংস্থা হল টাটা অ্যাডভান্স সিস্টেমস ও মাহিন্দ্রা ডিফেন্স সিস্টেমস।

১৪ ১৮

২৪ টন ওজনের এই দেশীয় সাঁজোয়া গাড়িগুলি দৈর্ঘ্যে ৭.৮৫ মিটার। এগুলির উচ্চতা ও প্রস্থ যথাক্রমে ২.৩ এবং ৩ মিটার। মোট ১০ থেকে ১২ জন সৈনিককে নিয়ে রণক্ষেত্রে ঢুকে পড়ার ক্ষমতা রয়েছে ‘হুইল্ড আর্মার্ড প্ল্যাটফর্ম’-এর। এতে রয়েছে ৬০০ অশ্বশক্তির ইঞ্জিন। ফাঁকা রাস্তায় ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার বেগে ছুটতে পারে সংশ্লিষ্ট সাঁজোয়া গাড়়ি। খরস্রোতা নদী বা জলাশয় পার করার সময় এর গতিবেগ থাকে ঘণ্টায় ১০ কিলোমিটার।

১৫ ১৮

স্ট্রাইকারের মতো দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি সাঁজোয়া গাড়িটিতেও একাধিক হাতিয়ার ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। সেগুলি হল, ৩০ মিলিমিটারের স্বয়ংক্রিয় কামান টারেট, ৭.৬২ মিলিমিটারের মাঝারি পাল্লার মেশিনগান আরসিডব্লিউএস, ৭.৬২ মিলিমিটারের কোঅ্যাক্সিয়াল মেশিনগান এবং ট্যাঙ্ক ধ্বংসকারী গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্র বা স্বয়ংক্রিয় গ্রেনেড লঞ্চার।

১৬ ১৮

২০২৫ সালের অক্টোবরে আমেরিকা থেকে ট্যাঙ্কবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র জ্যাভলিন এ দেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রক কিনতে চলেছে বলে খবর প্রকাশ্যে আসে। সূত্রের খবর, জরুরি ক্রয় কর্মসূচির মাধ্যমে বাহিনীর হাতে ১২টি লঞ্চার এবং ১০৪টি ক্ষেপণাস্ত্র কেন্দ্রের মোদী সরকার তুলে দেবে বলে জানা গিয়েছে। গত পৌনে চার বছরে ইউক্রেন যুদ্ধে বার বার নিজের জাত চিনিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের এই হাতিয়ার, যার পোশাকি নাম ‘এফজিএম-১৪৮ অ্যান্টি ট্যাঙ্ক জ্যাভলিন মিসাইল’।

১৭ ১৮

২০১০ সালে জ্যাভলিন ক্ষেপণাস্ত্র কিনতে চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বারস্থ হয় নয়াদিল্লি। ওই সময় ট্যাঙ্ক ধ্বংসকারী হাতিয়ারের অভাবে ভুগছিল ভারতীয় সেনা। আর তাই প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের কাছে বিভিন্ন পাল্লার অন্তত ৪৪ হাজার ‘ট্যাঙ্ক কিলার’ অস্ত্র আমদানির আর্জি জানান তৎকালীন ফৌজি জেনারেলরা। সেই তালিকায় ছিল জ্যাভলিনেরও নাম। কিন্তু কেন্দ্রের আবেদনে একেবারেই সাড়া দেয়নি মার্কিন প্রশাসন। ফলে বাধ্য হয়ে ‘বন্ধু’ রাষ্ট্র ইজ়রায়েলের দিকে মুখ ফেরাতে হয় ভারতকে।

১৮ ১৮

সূত্রের খবর, জরুরি ভিত্তিতে জ্যাভলিন কেনার পাশাপাশি এর প্রযুক্তি হস্তান্তরের ব্যাপারে আমেরিকার সঙ্গে কথাবার্তা চালাচ্ছে নয়াদিল্লি। তাতে সবুজ সঙ্কেত পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী প্রতিরক্ষা মন্ত্রক। এই আবহে স্ট্রাইকারের চুক্তি একেবারেই সহজ হবে না। যদিও হাল ছাড়তে নারাজ মার্কিন ফৌজি অফিসারেরা। তাঁদের দাবি, উচ্চ অশ্বশক্তির স্ট্রাইকার তৈরি করা একেবারেই কঠিন নয়। ভারতের সেনার চাহিদা অনুযায়ী সাঁজোয়া গাড়ি সরবরাহ করতে পারবে নির্মাণকারী সংস্থা।

সব ছবি: সংগৃহীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement