অনলাইনে গেমের প্রবল আসক্তি। আরও স্পষ্ট করে বললে কোরিয়ান গেম। সেই গেম খেলায় বাধা পড়ায় জীবন শেষ করে দিতে দু’বার ভাবেনি তিন সহোদরা। উত্তরপ্রদেশের গাজ়িয়াবাদের তিন নাবালিকার ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যার ঘটনায় শিউরে উঠেছে গোটা দেশ। গেম খেলতে না দেওয়ায় বাবা-মায়ের উপর অভিমানে ১০তলা থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করে ১২, ১৪ এবং ১৬ বছরের কিশোরীরা।
মারা যাওয়ার আগে একটি সুইসাইড নোটেও নিজেদের মনের অবস্থার কথা লিখে রেখে যায় তিন জন। ছোট একটি পকেট ডায়েরিতে আট পাতার একটি নোট খুঁজে পেয়েছে পুলিশ। সেই নোটে ইংরেজি ও হিন্দি ভাষায় লেখা ছিল, ‘‘এই ডায়েরিতে যা লেখা আছে, সব পড়ো। কারণ, এটাই সত্যি। এখনই পড়ো! আমরা সত্যিই দুঃখিত। দুঃখিত, বাবা।” তার পরে শুধু একটি কান্নার ইমোজি। তাদের শোয়ার ঘরের দেওয়ালেও ইংরেজিতে লেখা ছিল, ‘‘আমি খুব একা ও ভেঙে পড়ছি।’’ এমনকি কোরীয় ভাষার প্রতি ভালবাসার কথা তারা লিখে রেখে গিয়েছে সেই নোটবুকে।
সূত্রের খবর, তিন নাবালিকা একটি কোরীয় গেমের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছিল। করোনা অতিমারি থেকেই এই আসক্তির সূত্রপাত। দিনরাত ঘাড়মুখ গুঁজে মোবাইল নিয়েই ব্যস্ত থাকত তিন বোন। মা-বাবার কোনও বারণই কানে তুলত না নাবালিকারা। একটি বিশেষ কোরিয়ান গেম খেলার জন্য ভারতীয় পরিচয় ভুলে নিজেদের কোরীয় ভাবতে শুরু করেছিল তিন বোন।
সেই ডায়েরির একটি জায়গায় লেখা ছিল, “আমরা কোরিয়া ছাড়তে পারব না। কোরিয়াই আমাদের জীবন। তুমি আমাদের এর থেকে আলাদা করতে পারবে না। আমরা আমাদের জীবন শেষ করে দিচ্ছি।” কে-পপ ড্রামা ও কোরীয় অভিনেতার প্রতি অসম্ভব টান ছিল মৃতাদের। যতটা তারা কোরীয় সংস্কৃতিকে ভালবেসেছিল পরিবারের প্রতিও ততটা ভালবাসা তাদের ছিল না বলে ডায়েরিতে উল্লেখ করে গিয়েছে গাজিয়াবাদের এই তিন বোন।
ডায়েরির পাতায় ছত্রে ছত্রে বিদেশি সংস্কৃতির প্রতি তাদের ভালবাসা ও টানের কথা লিখে রেখে গিয়েছে তিন কিশোরী। কোরীয় সিনেমার অভিনেতা এবং কে-পপ ছাড়াও, সেই তালিকায় তাই, চিনা এবং জাপানি সঙ্গীত এবং চলচ্চিত্রের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। উল্টো দিকে বলিউডের সিনেমা ও তারকাদের দু’চোখে দেখতে পারত না তারা, ডায়েরিতে এমনটাই লিখে রেখেছিল তিন কন্যা। নিজেদের জীবনের সবচেয়ে ঘৃণার বস্তু ছিল হিন্দি চলচ্চিত্র। এই নিয়ে মা-বাবার সঙ্গে তুমুল মতবিরোধ ছিল তাদের।
কোভিড অতিমারিতেই তিন বোন যে কোরীয় গেমের প্রতি আসক্ত হয়েছিল সেটির নাম ছিল ‘কোরিয়ান লাভ গেম’। নিজেদের ভারতীয় বলতেও কুণ্ঠা বোধ করত তারা। ওই টাস্ক-বেস্ড কোরিয়ান গেমেই (যে গেমগুলি খেলার সময় গেমের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের কাজ করতে হয় এবং তার ভিত্তিতে লেভেল বৃদ্ধি পায়) মজে থাকত তারা। জানা গিয়েছে ওই গেমের প্রতি এতটাই আসক্ত হয়ে পড়েছিল যে একে অন্যকে বিভিন্ন কোরীয় নাম দিয়েছিল তারা।
গাজিয়াবাদ-কাণ্ডের তদন্তে উঠে এসেছে মূলত মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে এই খেলাটি খেলতে হয়। কোরীয় খেলাটির মূল বিষয় হল খেলোয়াড়কে বিভিন্ন টাস্ক বা চ্যালেঞ্জের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। খেলার প্রথম ধাপে এক জন অজ্ঞাত ব্যক্তি (সাধারণত ভার্চুয়াল প্রেমিক বা সঙ্গী) সমাজমাধ্যমে বা নির্দিষ্ট মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে শিশুদের সঙ্গে কথোপকথন শুরু করেন।
ভার্চুয়াল ব্যক্তি নিজেকে কোরীয় বা বিদেশি নাগরিক বলে দাবি করেন। বন্ধুত্ব এবং ভালবাসার কথা বলে আস্থা তৈরির চেষ্টা করেন। সেই ভরসা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর নাবালকদের নানা ধরনের কাজ দেওয়া হয়। প্রথম প্রথম মাঝরাতে ঘুম থেকে ওঠার মতো সহজ চ্যালেঞ্জগুলি পূর্ণ করার ‘টাস্ক’ দেওয়া হয়।
এক একটি ধাপ পেরোনোর সঙ্গে সঙ্গে চ্যালেঞ্জগুলি কঠিনতর হয়ে ওঠে। প্রাথমিক ভাবে, এতে ছবি পাঠানো, গল্প করা বা সারা দিন চ্যাট করার মতো ছোট ছোট কাজ জড়িত থাকে। তবে, পরে কাজগুলি খুব ব্যক্তিগত এবং বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
কোনও প্রতিযোগী যদি ‘খেলার মাস্টার’ বা নিয়ন্ত্রণকারী ব্যক্তির আদেশ না মানে তাহলে তাদের হুমকি পর্যন্ত দেওয়া হয়। সূত্র জানিয়েছে, এই ‘চ্যালেঞ্জ’ টানা ৫০ দিন ধরে চলে। ৫০তম চূড়ান্ত ‘টাস্ক’ বা ‘চ্যালেঞ্জ’টিই হল আত্মহত্যা করা!
এই খেলাটিতে কোরীয় ড্রামা ও কোরীয় সংস্কৃতির বিপুল প্রভাব থাকে। সেই প্রভাব ধীরে ধীরে মাদকের মতো ছড়াতে থাকে প্রতিযোগীদের মস্তিষ্কেও, বলে দাবি অনেকের। খেলায় বুঁদ হয়ে থাকা নাবালক-নাবালিকারা নিজেদের কোরীয় বলে কল্পনা করতে শুরু করে। নিজেদের কোরীয় প্রেমিকের স্বপ্নের প্রেয়সী বলে কল্পনা করে আবেগে ভেসে বেড়ায়।
কোরীয় এই খেলার প্রতি তিন বোনের এতটাই আবেগ ছিল যে তারা বড় হওয়ার পর কোনও ভারতীয়কে বিয়ে করার মতো ধারণাটিকেও ঘৃণা করতে শুরু করেছিল। তারা পরিবারের উদ্দেশে ডায়েরিতে লিখেছিল, ‘‘আমরা এক জন কোরীয়কে পছন্দ করতাম এবং ভালবাসতাম, কিন্তু তোমরা আমাদের একজন ভারতীয়ের সঙ্গে বিয়ে দিতে চেয়েছিলে। আমরা কখনও এমন কিছু আশা করিনি। তাই আমরা আত্মহত্যা করছি।’’
তিন বোনের মৃত্যুর সঙ্গে এই খেলার সরাসরি সংযোগ রয়েছে কি না সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে এখনও আসেনি পুলিশের তদন্তকারী আধিকারিকেরা। তবে তদন্তে উঠে এসেছে এই ‘মারণখেলা’য় চরম আসক্তি ছিল নাবালিকাদের।
কিশোরীদের বাবা চেতন কুমার জানিয়েছেন যে, তাঁর মেয়েরা একে অপরকে কোরীয় নামে ডাকত। মোবাইল ফোন থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করেছিলেন অভিভাবকেরা। যদিও তাতে কান দেয়নি কেউই। তারা সব সময় পরিবারের কাছে দাবি করত কোরিয়া তাদের জীবন, সবচেয়ে বড় ভালবাসা।
এই ধরনের আরও একটি বিপজ্জনক খেলা যা দুনিয়ায় সাড়া ফেলেছিল সেটি হল রাশিয়ায় উদ্ভূত ‘ব্লু হোয়েল চ্যালেঞ্জ’। খেলাটির ধাঁচও কোরীয় গেমের মতোই। ৫০ দিন ধরে এই চ্যালেঞ্জ চলে। নীল তিমি চ্যালেঞ্জেও ৫০ দিন এক জন সঞ্চালক অনলাইনে খেলোয়াড়দের একের পর এক ভয়ঙ্কর কিছু কাজ করার দায়িত্ব বা ‘টাস্ক’ দেন, যা কখনও কখনও খেলোয়াড়দের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। প্রতি ধাপে আরও কঠিন হতে থাকে সেই খেলা।