ঘোর সঙ্কটে পেটিএম পেমেন্টস ব্যাঙ্ক। বেসরকারি ফিনটেক সংস্থাটির লাইসেন্স বাতিল করল রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (আরবিআই)। চলতি বছরের ২৪ এপ্রিল, শুক্রবার এই মর্মে জারি হয় বিজ্ঞপ্তি। সেখানে বলা হয়েছে, ওই তারিখের পর ব্যাঙ্কিং পরিষেবা সংক্রান্ত কোনও কাজ করতে পারবে না পেটিএম। ১৯৪৯ সালের রেগুলেশন আইন অনুযায়ী শাস্তিমূলক পদক্ষেপ করল আরবিআই। শুধু তা-ই নয়, ব্যাঙ্কটিকে পুরোপুরি বন্ধ করতে হাই কোর্টে আবেদনের প্রস্তুতিও নিচ্ছে তারা।
রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক জানিয়েছে, দীর্ঘ দিন ধরেই গ্রাহক এবং আর্থিক স্বার্থের কথা মাথায় না রেখে বেপরোয়া ব্যবসা চালাচ্ছিল পেটিএম পেমেন্টস ব্যাঙ্ক। বার বার তাদের সতর্ক করেও কোনও লাভ হয়নি। ফলে কড়া পদক্ষেপে একরকম বাধ্য হয়েছেন তারা। যদিও আরবিআইয়ের এই সিদ্ধান্তের জেরে ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে ইউপিআই (ইউনিফায়েড পেমেন্টস ইন্টারফেস) ব্যবহারকারীদের মধ্যে পড়ে গিয়েছে শোরগোল। তবে কি এ বার লেনদেনের যাবতীয় অর্থ হারাতে হবে তাঁদের? জল্পনার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে বাড়ছে আতঙ্ক।
পেটিএম পেমেন্টস ব্যাঙ্কের লাইসেন্স বাতিলের পর এই নিয়ে বিবৃতি দেয় আরবিআই। কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কটি বলেছে, ‘‘এত দিন ফিনটেক সংস্থাটি যে ভাবে ব্যবসা পরিচালনা করে এসেছে, সেটা আমানতকারীদের স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর। তারা ব্যাঙ্কিং রেগুলেশন আইনের ২২ (৩) (বি) ধারা মেনে চলছিল না। এই পরিস্থিতিতে আমরা আর্থিক প্রতিষ্ঠানটিকে চালু রাখার অনুমতি দিতে পারি না। কারণ, সেটি সম্পূর্ণ ভাবে জনস্বার্থের পরিপন্থী।’’
এ দেশের আইন অনুযায়ী, আর্থিক লেনদেনের অনুমতিপ্রাপ্ত ব্যাঙ্কগুলিকে কতগুলি বিশেষ শর্ত মেনে চলতে হয়। আরবিআই সূত্রে খবর, সেই সমস্ত নিয়মের তোয়াক্কা না করেই ব্যবসা চালাচ্ছিল পেটিএম পেমেন্টস ব্যাঙ্ক। বর্তমানে লাইসেন্স বাতিল হওয়ায় কোনও ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের থেকে অর্থ নিতে বা দিতে পারবে না তারা। তবে তার জন্য গ্রাহকদের চিন্তা করার কিছু নেই। রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্কের দাবি, আমানতকারীদের পুরো টাকা ফেরানোর মতো নগদ সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্কটির হাতে আছে।
২০২২ সালের ১১ মার্চে নতুন গ্রাহক নেওয়ার ক্ষেত্রে পেটিএম পেমেন্টস ব্যাঙ্কের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে আরবিআই। ২০২৪ সালের ১১ জানুয়ারি ফের এক বার রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্কের রোষে পড়তে হয় তাদের। সে বারের কড়াকড়ির জেরে নিয়ন্ত্রিত হয় ফিনটেক সংস্থাটিতে আমানত জমা-সহ একাধিক লেনদেন। তবে ইউপিআই-সহ অন্যান্য পরিষেবা চালানোর ক্ষেত্রে কোনও সমস্যা হয়নি তাদের।
২০২৪ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি শেষ বার পেটিএম পেমেন্টস ব্যাঙ্কের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ করে আরবিআই। ওই তারিখের পর নিষিদ্ধ হয় গ্রাহক অ্যাকাউন্টে নতুন করে টাকা জমা, প্রিপেড ইনস্ট্রুমেন্ট, ক্রেডিট বা ঋণ দেওয়া এবং ওয়ালেট টপ-আপ। পরবর্তী দু’বছরে এই নিয়মে কোনও রকমের শিথিলতা দেখায়নি কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক। ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যবসাগুলি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গিয়েছে তাদের।
এ ছাড়া পেটিএম পেমেন্টস ব্যাঙ্কের গ্রাহকেরা ফাস্ট্যাগের সুবিধাও পাচ্ছিলেন। ২০২৪ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারির পর আরবিআইয়ের নির্দেশে যা বন্ধ রেখেছে এই ফিনটেক সংস্থা। বিশেষজ্ঞদের দাবি, সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্কটির সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য পরিষেবা সংস্থাগুলিকে এ বার তাদের পরবর্তী নির্দেশিকার দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে। তবে বিকল্প কোনও উৎসের সন্ধান করা যেতে পারে। ২৭ এপ্রিল, সোমবার থেকে তা শুরু হবে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
পেটিএম পেমেন্টস ব্যাঙ্কের লাইসেন্স বাতিল হলেও একমাত্র স্বস্তি পাচ্ছেন ইউপিআই ব্যবহারকারীরা। আরবিআইয়ের এই সিদ্ধান্তের কোনও আঁচ গ্রাহকদের গায়ে লাগবে না বলে জানিয়েছে পেটিএমের মূল সংস্থা ওয়ান৯৭ কমিউনিকেশনস। তাদের দেওয়া বিবৃতি অনুযায়ী, ‘‘পেটিএম অ্যাপ ও ইউপিআই পরিষেবায় কোনও বদল হচ্ছে না। কারণ, আমাদের সঙ্গে পেমেন্টস ব্যাঙ্কের কোনও সম্পর্ক নেই। দু’টি ব্যবসা পুরোপুরি আলাদা।’’
অন্য দিকে পেটিএম পেমেন্টস ব্যাঙ্কের থেকে এখনই সমস্ত টাকা তুলে নিতে পারবেন না গ্রাহক। অর্থ ফেরত, অ্যাকাউন্ট বন্ধ এবং অন্যান্য পরিষেবাগুলি পৃথক ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে স্থানান্তরের জন্য আরও কিছু দিন অপেক্ষা করতে হবে তাঁদের। বিশেষজ্ঞদের একাংশের অনুমান, ৩০ এপ্রিলের মধ্যে এ ব্যাপারে আরও একটা বিজ্ঞপ্তি জারি করবে আরবিআই। সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করতে পারে পেটিএম পেমেন্টস ব্যাঙ্কও।
পেটিএম পেমেন্টস ব্যাঙ্কের লাইসেন্স বাতিলের দিনে আবার নিম্নমুখী হয়েছে ওয়ান৯৭ কমিউনিকেশনসের শেয়ারের দাম। ২৪ এপ্রিল, শুক্রবার বাজার বন্ধ হলে দেখা যায় ১,১৫৩ টাকায় নেমে এসেছে এর সূচক। অর্থাৎ, স্টকের দর পড়েছে ০.৫৬ শতাংশ। গত এক মাসে অবশ্য সংশ্লিষ্ট শেয়ারটির দাম বেড়েছে ৮৭ টাকা। আর শেষ এক বছরে এতে ৩১.৬৭ শতাংশের বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গিয়েছে।
২০১০ সালের অগস্টে ভারতের বাজারে ব্যবসা শুরু করে পেটিএম। গোড়ার দিকে একটি রিচার্জ প্ল্যাটফর্ম হিসাবে কাজ করত এটি। ২০১৪ সালে ডিজিটাল ওয়ালেট পরিষেবা চালু করে পেটিএম। ধীরে ধীরে ইউপিআইয়ের দুনিয়ায় পা রাখে এই ফিনটেক সংস্থা। ২০১৬ সালের নভেম্বরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ৫০০ এবং ১০০০ টাকার নোট বাতিল করলে এ দেশে বিপুল জনপ্রিয়তা পায় ডিজিটাল লেনদেন। তখনই ফুলেফেঁপে ওঠে পেটিএমের কারবার।
পেটিএমের প্রতিষ্ঠাতা হলেন বিজয়শেখর শর্মা। ২০১৭ সালের নভেম্বরে তাঁর হাত ধরেই পেমেন্টস ব্যাঙ্কের ব্যবসায় নামে সংশ্লিষ্ট ফিনটেক সংস্থা। উত্তরপ্রদেশের নয়ডায় রয়েছে এর সদর দফতর। ২০২২ সালে প্রথম বার আরবিআইয়ের নিষেধাজ্ঞা চাপলে প্রবল ডামাডোলের মুখে পড়ে এই আর্থিক প্রতিষ্ঠান। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে পেটিএমের নন এগ্জ়িকিউটিভ চেয়ারম্যান এবং বোর্ড সদস্যের পদ থেকে সরে দাঁড়ান বিজয়শেখর শর্মা।
বিজয়শেখরের ইস্তফার কারণ ব্যাখ্যা করতে অবশ্য ওই সময় দেরি করেনি পেটিএম পেমেন্টস ব্যাঙ্ক। গণমাধ্যমের প্রশ্নের উত্তরে তারা জানায়, কেন্দ্রের ব্যাঙ্কের নিষেধাজ্ঞার জেরে সংস্থার পরিচালন বোর্ডে বড় বদল আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নতুন সদস্যরা এগিয়ে যাওয়ার পথ দেখাবেন। প্রশাসনিক সংস্কারের জেরে উন্নত হবে পরিষেবার মান।
গোড়ার দিকে অবশ্য রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্কের আধিকারিকদের সঙ্গে দেখা করে একটা সমাধানসূত্র বার করার মরিয়া চেষ্টা চালান বিজয়শেখর শর্মা। শুধু তা-ই নয়, ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে পেটিএমকে নিয়ন্ত্রণবিধি সংক্রান্ত সমস্যা থেকে দ্রুত বার করে আনার জন্য কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রীকে চিঠিও লেখেন দেশের প্রথম সারির স্টার্ট-আপ সংস্থাগুলির প্রতিষ্ঠাতারা। কিন্তু তাতে সমস্যা তো মেটেনি, উল্টে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
২০২৪ সালে পেটিএম পেমেন্টস ব্যাঙ্কের বিরুদ্ধে বিদেশি মুদ্রা আইন বা ফেমা (ফরেন এক্সচেঞ্জ ম্যানেজ়মেন্ট অ্যাক্ট) লঙ্ঘনের আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে শীর্ষ ব্যাঙ্ক। এর পরই সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে তদন্ত নামে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। আর্থিক প্রতিষ্ঠানটির বেশ কয়েক জন শীর্ষ আধিকারিককে জিজ্ঞাসাবাদ করে তারা। তাঁদের থেকে বেশ কিছু নথিও চেয়ে নেয় এই কেন্দ্রীয় সংস্থা।
পেটিএম সূত্রে অবশ্য দাবি, বিদেশে টাকা পাঠানো সংক্রান্ত কোনও পরিষেবা দেয় না তারা। পেমেন্টস ব্যাঙ্কটির পদ ছাড়ার সময় এর ৫১ শতাংশ শেয়ারের মালিক ছিলেন বিজয়। বাকি স্টক রয়েছে মূল সংস্থা ওয়ান৯৭ কমিউনিকেশনের হাতে। আগামী দিনে ফিনটেক সংস্থাটির শেয়ার কেমন পারফর্ম করে, সেটাই এখন দেখার।