টাকার জন্য বন্যপ্রাণী চোরাশিকার এবং পাচারের কথা হামেশাই শোনা যায়। খবরের শিরোনামেও উঠে আসে সে সব ঘটনা। সারা পৃথিবী জুড়েই বন্যপ্রাণ পাচারের চক্রের জাল ছড়িয়ে আছে।
তবে এ বার এমন একটি প্রাণী পাচারের ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে যা শুনে হতবাক তামাম বিশ্ব। কেনিয়ায় অভিযোগ উঠেছে, জ্যান্ত পিঁপড়ে পাচারের। ইউরোপ ও এশিয়ায় বিদেশি প্রাণী কেনাবেচার যে বাজার রয়েছে সেখানে কেনিয়া থেকে হাজার হাজার পিঁপড়ে এনে পাচারের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ।
বিষয়টি প্রথম প্রকাশ্যে আসে গত বছর। বেলজিয়ামের দুই তরুণ দু’টি টেস্টটিউব এবং সিরিঞ্জে ভরে অভিনব কায়দায় লক্ষ লক্ষ টাকার পিঁপড়ে পাচার করতে গিয়ে ধরা পড়ার পর। গত বছরের ৫ এপ্রিল কেনিয়ার নাকুরু কাউন্টিতে গ্রেফতার করা হয়েছিল তাঁদের।
লরনয় ডেভিড এবং সেপ্পে লোডেউইজকেক্স নামের ওই দুই তরুণের কাছে টেস্টটিউব এবং সিরিঞ্জে লুকিয়ে রাখা ৫ হাজার রানি পিঁপড়ে উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে ছিল ‘মেসর সেফালোটিস’ প্রজাতির পিঁপড়ে। এগুলি ‘জায়ান্ট আফ্রিকান হারভেস্টার’ পিঁপড়ে নামেও পরিচিত।
পিঁপড়েগুলি যাতে বেঁচে থাকে তাই টেস্টটিউব এবং সিরিঞ্জে তুলোর মধ্যে করে আনা হচ্ছিল সেগুলি। তদন্তে জানা যায়, টেস্টটিউবগুলি এমন ভাবে তৈরি করা হয়েছিল যাতে পিঁপড়েরা দুই মাস পর্যন্ত সেখানে বেঁচে থাকতে পারে এবং একই সঙ্গে বিমানবন্দরের নিরাপত্তারক্ষীদের নজর এড়ানো যায়।
আদালতের নথিতে তখন বলা হয়েছিল, ২ হাজার ২৪৪টি বস্তায় বন্দি প্রায় ৫ হাজার রানি পিঁপড়ের বাজারমূল্য প্রায় ১০ লক্ষ কেনিয়ান শিলিং বা ভারতীয় মুদ্রায় ৬ লাখ ৬৬ হাজার টাকা। ওই দুই তরুণকে কেনিয়ার আদালত তখন প্রায় ৬৮৭০ ইউরো জরিমানা করেছিল, কিন্তু আরও মামলা সামনে আসায় শাস্তির মাত্রা কঠোর হয়।
ওই দুই তরুণ ছাড়াও কেনিয়ার ও ভিয়েতনামের বাসিন্দা দু’জনকে নাইরোবির আদালতে হাজির করা হয়েছিল সে সময়। তাঁরাও পিঁপড়ে পাচারে অভিযুক্ত বলে জানা গিয়েছে।
কেনিয়া ওয়াইল্ডলাইফ সার্ভিস একটি বিবৃতিতে জানিয়েছিল, পিঁপড়ের অবৈধ রফতানি কেবল জীববৈচিত্রের উপরই প্রভাব ফেলছে এমন নয়, স্থানীয় সম্প্রদায় এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলিকে সম্ভাব্য পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক সুবিধা থেকেও বঞ্চিত করে চলেছে।
এর পরেই কেনিয়ার কর্তৃপক্ষ এক নতুন ধরনের চোরাশিকারের আশঙ্কা করতে শুরু করেন, যা হাতির দাঁত এবং পশুর চামড়ার চেয়ে পোকামাকড়, সরীসৃপ এবং দুর্লভ উদ্ভিদের উপর বেশি কেন্দ্রীভূত। সম্প্রতি আবার আলোচনায় উঠে এসেছে সেই পিঁপড়ে পাচার। লাল এবং কালো রঙের পিঁপড়েগুলির একটি আন্তর্জাতিক চোরাচালান বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
‘জায়ান্ট আফ্রিকান হারভেস্টার পিঁপড়ে’কে মূলত পোষ্য বাজারের জন্য পাচার করা হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে পিঁপড়েটির চাহিদা ব্যাপক। ওই প্রজাতিতে রানি পিঁপড়ের সংখ্যা কম হওয়ার কারণে সংগ্রহকারীরা একটি মাত্র রানি পিঁপড়ের জন্য শত শত ডলার পর্যন্ত দাম দিতে রাজি থাকেন।
কেনিয়ার পিঁপড়ে বিশেষজ্ঞ ডিনো মার্টিন্স ৪০ বছর ধরে নাইরোবির বাইরে এই ‘জায়ান্ট আফ্রিকান হারভেস্টার পিঁপড়ে’দের বাসা বাঁধার নেটওয়ার্ক নিয়ে গবেষণা করে আসছেন। সংবাদসংস্থা এএফপিকে ওই পিঁপড়ে প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, ‘‘পিঁপড়েগুলি বেশ বড় এবং সাহসী। এরা পিঁপড়ে জগতের বাঘ।’’ তাঁর কথায়, ‘‘এখানকার প্রতিটি বাসায় মাত্র একটি রানি থাকে এবং সে-ই সেই মা যে ৪০, ৫০, এমনকি ৬০ বছর আগে এই বাসাটি তৈরি করেছিল।’’
কিন্তু মার্টিন্স গত বছর এটা জেনে হতবাক হয়েছিলেন যে, এই ‘মেসর সেফালোটিস’ প্রজাতির হাজার হাজার রানি পিঁপড়েকে সিরিঞ্জ এবং টেস্ট টিউবে ভরে বিদেশে পাচার করা হচ্ছে এবং প্রতিটি শত শত ডলারে বিক্রি করা হচ্ছে।
গত মাসে ২,০০০ ‘মেসর সেফালোটিস’ পিঁপড়ে পাচারের চেষ্টার জন্য এক চিনা নাগরিককেও এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। বেশ কয়েকটি ইউরোপীয় ওয়েবসাইট অনুযায়ী ওই প্রজাতির রানি পিঁপড়ের দাম প্রায় ২০০ ইউরো। সেগুলিকে দুষ্প্রাপ্য হিসাবে চিহ্নিত করা হলেও, সঠিক চক্রের খোঁজ থাকলে তা কেনা ক্রমশ সহজ হয়ে উঠছে বলেও জানা গিয়েছে।
ফ্রান্সের ২৫ বছর বয়সি এক পিঁপড়ে সংগ্রাহক জানিয়েছেন, তিনি সবচেয়ে বড় আকারের ‘হারভেস্টার’ পিঁপড়ে কিনতে চেয়েছিলেন, তাই তিনি এক জন অনুমোদিত বিক্রেতার কাছ থেকে ৪৫০ ইউরো দিয়ে একটি রানি এবং ১২টি কর্মী পিঁপড়ে কিনেছিলেন। কিন্তু পিঁপড়েগুলি প্রতিপালন বেশ কঠিন হওয়ায় তিনি সেগুলি বিলিয়ে দেন বলে জানিয়েছেন ওই ফরাসি যুবক।
‘জায়ান্ট হারভেস্টার’ নামের ওই পিঁপড়ে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল থেকে কেপ পর্যন্ত সর্বত্রই দেখা যায়। এরা দিনে প্রায় ২৪ ঘণ্টা একসঙ্গে কাজ করে। নিজেদের লার্ভার জন্য ঘাস সংগ্রহ করে কাটে পিঁপড়েগুলি। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এরা মানুষকে মুগ্ধ করে আসছে।
‘ওল্ড টেস্টামেন্ট’-এ রাজা সলোমন অলসদের যে বিখ্যাত উপদেশ দিয়েছিলেন তা হল, ‘‘পিঁপড়ের কাছে যাও। তার জীবনযাত্রা বিবেচনা করো এবং জ্ঞানী হও।’’ গবেষক মার্টিন্সের কথায়, ‘‘রাজা জেরুজ়ালেমের সেই একই পিঁপড়েকে পর্যবেক্ষণ করছিলেন, যাকে আমরা এখন করছি।’’
‘হারভেস্টার’ পিঁপড়েদের কলোনিতে নতুন রানি তৈরি হতে ২০-৩০ বছর সময় লাগতে পারে। ঘাসের বীজ ছড়িয়ে দেওয়া, মাটিতে বায়ু চলাচল নিশ্চিত করা এবং বনরুইয়ের মতো প্রাণীদের জন্য খাদ্যের জোগান দেওয়া— বাস্তুতন্ত্রে সব ধরনের পরিষেবা প্রদান করে এই পিঁপড়েরা।
সুইৎজ়ারল্যান্ডের ফ্রিবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক জেরোম গিপেটের দাবি, ইন্টারনেটের রমরমা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ওই পিঁপড়ে ব্যবসারও রমরমা বেড়েছে। একসময় এটি ছিল কেবল কয়েক জন উৎসাহী ব্যক্তির আগ্রহের বিষয়, যা পরবর্তী কালে সংগ্রাহক, মধ্যস্থতাকারী এবং চোরাচালানকারীদের জটিল নেটওয়ার্কে পরিণত হয়।
২০১৭ সালে প্রকাশিত গিপেটের একটি সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, ৫০০-রও বেশি প্রজাতির পিঁপড়ে অনলাইনে বিক্রি হয়, যা মোট সংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ। এদের মধ্যে ১০ শতাংশেরও বেশি প্রজাতি সম্ভাব্য আক্রমণাত্মক প্রজাতি এবং সেগুলি বাইরের বাস্তুতন্ত্রের উপর কী প্রভাব ফেলতে পারে, তা অনিশ্চিত।