US Bond

মার্কিন বন্ড বেচে স্বর্ণভান্ডার বৃদ্ধি! ট্রাম্পের ‘পাগলামি’তে আমেরিকার ‘গ্যারান্টি’তেও আস্থা হারাচ্ছে বহু দেশ

পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বিদেশি মুদ্রাভান্ডারে মার্কিন বন্ডের পরিমাণ কমাচ্ছে ভারত ও চিন-সহ দুনিয়ার একগুচ্ছ দেশ। আমেরিকার উপর আস্থা হারিয়ে ফেলায় এই সিদ্ধান্ত, না কি নেপথ্যে আছে অন্য কোনও ছক?

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ২২ জানুয়ারি ২০২৬ ১২:১৯
Share:
০১ ১৮

কখনও শুল্ক নিয়ে হুঙ্কার। কখনও আবার নিজের শর্তে জোরজবরদস্তি বাণিজ্যচুক্তি সেরে নেওয়া। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘পাগলামি’তে অতিষ্ঠ গোটা বিশ্ব। এই পরিস্থিতিতে ভারত ও চিন-সহ একাধিক দেশের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বন্ড বিক্রি নিয়ে পড়ে গিয়েছে হুড়োহুড়ি। এদের অনেকে আবার সেই টাকা লগ্নি করছে সোনায়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে ‘হলুদ ধাতু’র দাম। এর জেরে স্বাভাবিক ভাবেই উঠে গিয়েছে একটা প্রশ্ন। আমেরিকার অর্থনীতির উপর ‘আস্থা’ হারাচ্ছে দুনিয়া?

০২ ১৮

সম্প্রতি, ভারত ও চিনের মতো দেশগুলির বিপুল পরিমাণে মার্কিন বন্ড বিক্রি করে দেওয়ার কথা স্বীকার করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজ়ারি বিভাগ। একটি বিবৃতিতে তারা জানিয়েছে, গত বছরের (পড়ুন ২০২৫ সাল) সেপ্টেম্বরে রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার (আরবিআই) কাছে ২০ হাজার কোটি ডলার মূল্যের মার্কিন বন্ড ছিল। কিন্তু মাত্র এক মাসের মধ্যে (পড়ুন অক্টোবরে) সেটা কমে ১৯ হাজার কোটি ডলারে নেমে আসে।

Advertisement
০৩ ১৮

তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, গত এক বছরে মার্কিন বন্ড বিক্রি করে ৫,০৭০ কোটি ডলার বাজার থেকে তুলে নিয়েছে আরবিআই। শুধু তা-ই নয়, বিদেশি মুদ্রাভান্ডারে (ফরেক্স রিজ়ার্ভ) সামঞ্জস্য রাখতে বড় ধরনের কৌশলগত পরিবর্তন করেছে ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক। বিদেশি বন্ড বা মুদ্রার চেয়েও সোনার উপর বেশি ভরসা রাখছে তারা। রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্কের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের অক্টোবরে তাদের কাছে ‘হলুদ ধাতু’র মজুত ছিল ৮৮০.১৮ টন, যা ২০২৪ সালের অক্টোবরের ৮৬৬.৮ টনের চেয়ে অনেকটাই বেশি।

০৪ ১৮

চলতি আর্থিক বছরের (পড়ুন ২০২৫-’২৬) সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে ৬৮ হাজার ৫০০ কোটি ডলারে স্থিতিশীল ছিল ভারতের বিদেশি মুদ্রাভান্ডার। ওই অবস্থায় সামগ্রিক সম্প্রসারণের বদলে এর পুনর্বণ্টনের সিদ্ধান্ত নেয় আরবিআই। সেপ্টেম্বরের ২৬ তারিখ পর্যন্ত রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্কের বিদেশি মুদ্রাভান্ডারের ১৩.৬ শতাংশ ছিল সোনা। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কটির কাছে গচ্ছিত থাকা হলুদ ধাতুর পরিমাণ ছিল ৯.৩ শতাংশ। সেখান থেকে সোনার মজুত যে রেকর্ড বেড়েছে, তা বলাই বাহুল্য।

০৫ ১৮

ভারতের মতোই মার্কিন বন্ডের থেকে মুখ ফিরিয়েছে চিনও। এ ব্যাপারে আমেরিকার ট্রেজ়ারি বিভাগকে উদ্ধৃত করে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সংবাদসংস্থা পিটিআই। সেখানে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের বন্ডের পরিমাণ কমিয়ে ৬৮ হাজার ২৬০ কোটি ডলারে নামিয়ে এনেছে বেজিং। অক্টোবরে তা ছিল ৬৮ হাজার ৮৭০ কোটি ডলার। ২০০৮ সালের পর যেটা সর্বনিম্ন।

০৬ ১৮

ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর অবশ্য রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছোয় মার্কিন বন্ডের বিদেশি মালিকানা। কিন্তু সেখানে হঠাৎ করে ভারত ও চিনের মতো বড় বড় আর্থিক শক্তির এর থেকে মুখ ঘুরিয়ে নেওয়ার আলাদা গুরুত্ব আছে। আমেরিকার ট্রেজ়ারি বন্ডে অবশ্য আস্থা রেখেছে জাপান ও ব্রিটেনের মতো ওয়াশিংটনের ‘বন্ধু’ দেশ। যুক্তরাষ্ট্রের বন্ডে ২৬০ কোটি ডলার লগ্নি করেছে টোকিয়ো। ফলে ‘সামুরাই যোদ্ধা’দের বিদেশি মুদ্রাভান্ডারে মার্কিন বন্ডের আর্থিক অঙ্কের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১.২ লক্ষ কোটি ডলার।

০৭ ১৮

জাপানের মতো আমেরিকার বন্ডে সাম্প্রতিক সময়ে ১,০৬০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে ব্রিটেন। ফলে তাদের বিদেশি মুদ্রাভান্ডার ৮৮ হাজার ৮৫০ কোটি ডলারে গিয়ে পৌঁছেছে। বিশ্লেষকেরা অবশ্য ভারত বা চিনের মতো দেশগুলির মার্কিন বন্ডের ব্যাপারে ‘অনীহা’র নেপথ্যে একাধিক কারণ খুঁজে পেয়েছেন। তবে এই সিদ্ধান্ত তাদের বিদেশি মুদ্রাভান্ডারকে প্রভাবিত করবে না বলেই মনে করেন তাঁরা।

০৮ ১৮

বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে মুখ খুলেছেন আইডিবিআই ফার্স্ট ব্যাঙ্কের মুখ্য অর্থনীতিবিদ গৌরা সেনগুপ্ত। তাঁর কথায়, ‘‘মূলত দুটো কারণে রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ককে বিদেশি মুদ্রাভান্ডারের বৈচিত্রের দিকে নজর দিতে হচ্ছে। প্রথমত, ট্রাম্পের শুল্ক চাপ। গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ব্রিটেন বা ফ্রান্সের মতো দেশগুলিকে শুল্ক নিয়ে ধমকাচ্ছেন তিনি। নয়াদিল্লির উপর অযৌক্তিক কারণে ৫০ শতাংশ কর চাপিয়ে রেখেছেন। আগামী দিনে সেটা আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা থাকছে।’’

০৯ ১৮

আইডিবিআইয়ের মুখ্য অর্থনীতিবিদ মনে করেন, ট্রাম্প যে ভাবে শুল্ক নিয়ে বাড়াবাড়ি রকমের ‘ব্ল্যাকমেল’ শুরু করেছেন, তাতে বিশ্ববাণিজ্যের অনেক কিছুই ভেঙে পড়তে পারে। তা ছাড়া এতে আমেরিকারও মহামন্দার কবলে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তখন পরিস্থিতি সামাল দিতে সুদের হার যে মার্কিন ট্রেজ়ারি বিভাগ বদল করবে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। এতে আর্থিক দিক থেকে রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্কের লোকসান হওয়ার আশঙ্কা ষোলো আনা।

১০ ১৮

দ্বিতীয়ত, নিজের শর্তে নয়াদিল্লির সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি সেরে নিতে চাইছেন ট্রাম্প। ভারতের কৃষিপণ্যের বাজারে অনুপ্রবেশের ইচ্ছা আছে তাঁর। অন্য দিকে সেই দরজা খুলতে নারাজ কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকার। এই পরিস্থিতিতে ‘বিরক্ত’ মার্কিন প্রেসিডেন্ট এ দেশের উপর চাপাতে পারেন নিষেধাজ্ঞা। তখন বিদেশি মুদ্রাভান্ডারের যুক্তরাষ্ট্রীয় বন্ডের কোনও গুরুত্ব থাকবে না। আর তাই আগাম সতর্কতা হিসাবে সেখানে বৈচিত্র রাখতে চাইছে এ দেশের রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক।

১১ ১৮

তৃতীয়ত, চলতি বছরে ভারতের সঙ্গে অন্যতম বড় বাণিজ্যচুক্তিতে সই করবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। এই সংগঠনটির ২৭টি দেশ আমদানি-রফতানির জন্য ডলারের বদলে ব্যবহার করে ইউরো। সংশ্লিষ্ট মুদ্রাটির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি রয়েছে। বিশ্লেষকদের একাংশের অনুমান, সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যচুক্তিতে ভারতের রুপিকে তুলে ধরতে পারে নয়াদিল্লি। সে ক্ষেত্রে রুপি-ইউরো লেনদেনে ইইউ রাজি হলে আরবিআইয়ের ডলার নির্ভরশীলতা অনেকটাই কমবে।

১২ ১৮

বেজিঙের ক্ষেত্রে আবার অন্য যুক্তি রয়েছে। প্রযুক্তির স্বার্থে এই পদক্ষেপের প্রয়োজন ছিল বলে উল্লেখ করেছেন চৈনিক অর্থনীতিবিদেরা। তাঁদের দাবি, ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপর কড়া নজর রাখছে ড্রাগনভূমির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং তাঁর সরকার। ফলে আগামী দিনে যুক্তরাষ্ট্রের বন্ডের মাত্রা তাঁরা আরও কমাবেন বলেই মনে করা হচ্ছে। বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বড় বিদেশি মুদ্রাভান্ডার রয়েছে মান্দারিনভাষীদের কাছে। এর পরিমাণ ৩.৩৫৭৯ লক্ষ কোটি ডলার বলে জানা গিয়েছে।

১৩ ১৮

চিনের সরকারি সংবাদসংস্থা ‘গ্লোবাল টাইমস’-এর কাছে মার্কিন বন্ড বিক্রি করে দেওয়ার ব্যাখ্যা দিয়েছেন সাংহাই বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক শি জ়ুনিয়াং। তাঁর কথায়, ‘‘শি প্রশাসন বিদেশি মুদ্রাভান্ডারকে সুরক্ষিত ও স্থিতিশীল করতে চাইছেন। কিন্তু, ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর যে ভাবে ওয়াশিংটন ও বেজিঙের মধ্যে বাণিজ্যিক সংঘাত দেখা গিয়েছে, তাতে সেটা অসম্ভব। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের বন্ড ধরে রাখা বা তার উপর ভরসা করা যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে বাধ্য হয়েই সেখানে বৈচিত্র আনতে হচ্ছে ড্রাগনকে।’’

১৪ ১৮

ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সায়েন্স টেক ইনোভেশন ম্যানেজমেন্ট রিসার্চ’-এর অর্থনীতির অধ্যাপক শাও ইউ আবার বলেছেন, ‘‘মার্কিন বন্ড চিনের কাছে কতকটা পঞ্জি স্কিমের মতো। এতে প্রতারিত হওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। কারণ, বন্ডের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণে ঋণ নিয়ে ফেলেছে আমেরিকা। এই পরিস্থিতিতে পুরনো বন্ড বাতিল করে নতুন ঋণপত্র বাজারে আনার নির্দেশ দিতে পারেন ট্রাম্প। তখন বিপুল আর্থিক লোকসানের মুখে পড়বে ড্রাগন সরকার।’’ তা সামলাতে জিনপিং সরকার আগেই পদক্ষেপ করল বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।

১৫ ১৮

ভারতীয় রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্কের মতোই মার্কিন বন্ড বিক্রির পাশাপাশি শেষ এক বছরে সোনা সংগ্রহের মাত্রা বাড়িয়েছে বেজিঙের ‘পিপল্‌স ব্যাঙ্ক অফ চায়না’। তাদের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বরে চিনের বিদেশি মুদ্রাভান্ডারে হলুদ ধাতুর পরিমাণ ছিল ৭ কোটি ৪১ লক্ষ ৫০ হাজার আউন্স। নভেম্বরের তুলনায় যা ৩০ হাজার আউন্স বেশি। টানা ১৪ মাস ধরে ড্রাগনভূমির কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কটি সোনা কিনছে বলে জানা গিয়েছে।

১৬ ১৮

শি জ়ুনিয়াঙের মতো চৈনিক অর্থনীতির অধ্যাপকেরা মনে করেন, শি প্রশাসনের ‘হলুদ ধাতু’ কেনায় আরও বেশি জোর দেওয়া উচিত। ‘গ্লোবাল টাইমস’কে তিনি বলেছেন, ‘‘বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় বেজিঙের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের বিদেশি মুদ্রাভান্ডার অনেক কম বৈচিত্রপূর্ণ। এখনও এর বড় অংশ দখল করে আছে আমেরিকার ডলার।’’ ওয়াশিংটনের সঙ্গে সংঘাত বৃদ্ধি পেলে যা বিপদের কারণ হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।

১৭ ১৮

২০২৬ সালের গোড়া থেকেই গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে সুর চড়িয়ে যাচ্ছেন ট্রাম্প। যে কোনও মূল্যে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দ্বীপটিকে যে ওয়াশিংটন কব্জা করতে ইচ্ছুক, তা বুঝিয়ে দিয়েছেন তিনি। এই পরিস্থিতিতে চিনের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি সেরেছে কানাডার মতো যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবেশী ‘বন্ধু’ রাষ্ট্র। ফলে নিজেদের মুদ্রা রেনমিনবিকে শক্তিশালী করার মেগা সুযোগ চলে এসেছে বেজিঙের হাতে। এই পরিস্থিতিতে আমেরিকার আর্থিক লোকসান বাড়াতে বন্ড বিক্রির রাস্তায় হাঁটতে পারে ড্রাগন সরকার, বলছেন বিশ্লেষকেরা।

১৮ ১৮

তবে এর উল্টো যুক্তিও রয়েছে। কারণ, সাম্প্রতিক সময়ে আমেরিকার বাজারে হু-হু করে চড়তে দেখা গিয়েছে বন্ডের দাম। গত ২০ জানুয়ারি ১০ বছরের মেয়াদি ট্রেজ়ারি বন্ডের দাম দিনের শেষে ৪.২৯৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে দেখা যায়। ২০ বা ৩০ বছরের মেয়াদি বন্ডের দাম চড়েছে ৪.৮৭৮ ও ৪.৯২০ শতাংশ। ফলে আরবিআই বা চিনা কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের সিদ্ধান্ত আগামী দিনে ‘বুমেরাং’ হয় কি না, সেটাই এখন দেখার।

সব ছবি: সংগৃহীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement