Iran Israel Conflict

হিজ়বুল্লা-নিধনে ইজ়রায়েল হামলা চালিয়ে গেলেও ‘স্পিকটিনট’! ৩০০০০ কোটি ডলারে ইরানের মুখ বন্ধ করল আমেরিকা?

পশ্চিম এশিয়ায় পাকাপাকি ভাবে শান্তি ফেরাতে সুইৎজ়ারল্যান্ডে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় বসেছে ইরান। এই আবহে তেহরান মদতপুষ্ট বিদ্রোহী গোষ্ঠী হিজ়বুল্লাকে পুরোপুরি খতম করতে লেবাননে লাগাতার বোমাবর্ষণ করে চলেছে ইজ়রায়েল।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ২৩ জুন ২০২৬ ০৭:৫৫
Share:
০১ ১৮

যুদ্ধবিরতির মধ্যেই চিরস্থায়ী শান্তি খুঁজে পেতে সুইৎজ়ারল্যান্ডে মুখোমুখি আমেরিকা ও ইরান। সোমবার, ২২ জুন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্সের সঙ্গে প্রথম দফায় আলোচনা সেরেছেন তেহরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। পরে এই নিয়ে যৌথ বিবৃতি দেয় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় থাকায় পাকিস্তান ও কাতার। সূত্রের খবর, বৈঠকে গুরুত্ব পেয়েছে ইজ়রায়েল ও লেবানন সংঘর্ষ।

০২ ১৮

ভান্সের সঙ্গে প্রথম দফার বৈঠকের পর এক্স হ্যান্ডলে (সাবেক টুইটার) পোস্ট করেন আরাঘচি। সেখানে তিনি লেখেন, এই আলোচনায় তেহরানের একাধিক প্রাপ্তিযোগ ঘটেছে। চিরস্থায়ী শান্তি পেতে গোড়া থেকেই লেবানন সংঘর্ষে ইতি টানার উপর জোর দিচ্ছিল পারস্যের শিয়া মুলুক। সূত্রের খবর, সেখানে একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনায় সম্মত হয়েছে উভয় পক্ষ। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের তরফে সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে কোনও বিবৃতি দেওয়া হয়নি।

Advertisement
০৩ ১৮

জানা গিয়েছে, ইজ়রায়েল-লেবানন যুদ্ধ থামাতে তৈরি হবে একটি ‘সংঘাত-নিরসন সেল’ বা ‘ডিএস্কেলেশন সেল’। এতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ এবং বেইরুটের প্রতিনিধিরা থাকবেন। নতুন করে পশ্চিম এশিয়ার দেশটিতে যাতে কোনও সামরিক অভিযান না হয়, তা নিশ্চিত করবে এই সেল। যদিও বিষয়টি কতটা ফলপ্রসূ হবে, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞমহলে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। কারণ, লেবানন থেকে সৈন্য প্রত্যাহারে নারাজ ইহুদি রাষ্ট্র।

০৪ ১৮

ইজ়রায়েল-লেবানন সংঘাতে গোড়া থেকেই বেইরুটের পাশে থেকেছে ইরান। পশ্চিম এশিয়ার ওই দেশেই রয়েছে তেহরান মদতপুষ্ট প্যালেস্টাইনপন্থী বিদ্রোহী গোষ্ঠী হিজ়বুল্লা। ইহুদি রাষ্ট্রে রকেট হামলার ভূরি ভূরি অভিযোগ আছে তাদের বিরুদ্ধে। এত দিন তেল আভিভ প্রত্যাঘাত শানালেই হিজ়বুল্লার সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়াচ্ছিল সাবেক পারস্যের শিয়া মুলুক। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, শান্তি আলোচনার মুখে সেই ছবি দেখা যায়নি।

০৫ ১৮

সুইৎজ়ারল্যান্ডে ভান্স ও আরাঘচির মধ্যে বৈঠকের দিন কয়েক আগে লেবাননে বোমাবর্ষণ করে ইজ়রায়েলি বিমানবাহিনী। তাতে মৃত্যু হয় শিশু ও মহিলা মিলিয়ে অন্তত ৮৩ জনের। অতীতে এই ধরনের ঘটনায় ইহুদি রাষ্ট্রকে নিশানা করে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে জবাব দিচ্ছিল ইরানি ফৌজ। কিন্তু, এ বার সংযম দেখিয়েছে তেহরান। নিন্দা জানিয়ে তেল আভিভের বিরুদ্ধে কড়া বিবৃতি দেওয়া ছাড়া শিয়া মুলুকটিকে আর কিছুই করতে দেখা যায়নি।

০৬ ১৮

সামরিক বিশ্লেষকদের দাবি, ইরানের এই পদক্ষেপের নেপথ্যে রয়েছে একাধিক কারণ। প্রথমত, এই মুহূর্তে ইজ়রায়েলের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে শক্তি ক্ষয় করতে নারাজ তেহরান। বরং হরমুজ় প্রণালী বন্ধ রেখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপর চাপ বৃদ্ধির কৌশলকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে তারা। পারস্য উপসাগরের ওই সঙ্কীর্ণ সামুদ্রিক রাস্তাটিকে আরব দুনিয়ার খনিজ তেল বাণিজ্যের ‘লাইফলাইন’ বলা যেতে পারে।

০৭ ১৮

দ্বিতীয়ত, শান্তিচুক্তিতে ইরানের জ্বালানি বাণিজ্যের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে পারে আমেরিকা। পশ্চিমি গণমাধ্যমগুলির দাবি, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ হিসাবে ওয়াশিংটনের থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা পেতে চলেছে তেহরান। এই পরিস্থিতিতে লেবাননের জন্য ইজ়রায়েলের সঙ্গে নতুন করে যুদ্ধে জড়িয়ে ‘হাতের লক্ষ্মী’ যে আরাঘচিরা পায়ে ঠেলতে চাইছেন না, তা বলাই বাহুল্য।

০৮ ১৮

১৯৭৯ সালে ইসলামীয় বিপ্লবে রাজতন্ত্রের পতন হলে কট্টরপন্থী শিয়া ধর্মগুরুদের শাসনের আওতায় আসে ইরান। ওই সময় দেশের সর্বোচ্চ নেতা (সুপ্রিম লিডার) হন আয়াতোল্লা রুহুল্লাহ খোমিনি। তাঁর আমলে দেশের সেনাবাহিনীকে দু’টি ভাগে বিভক্ত করে তেহরান। একটি হল সরকারি ফৌজ। আর দ্বিতীয়টির নাম ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসি। পাশাপাশি, বাধ্যতামূলক করা হয় সেনা প্রশিক্ষণ।

০৯ ১৮

খোমিনির সময় থেকেই শুধুমাত্র দেশের সীমান্ত রক্ষার কাজ করছে ইরানি সরকারি ফৌজ। এর মাথায় রয়েছে তেহরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রক। অন্য দিকে আইআরজিসি সর্বোচ্চ নেতার নিয়ন্ত্রণাধীন। এই আধা সেনার বহরেই রয়েছে হাইপারসনিক (শব্দের পাঁচ গুণের চেয়ে গতিশীল) ক্ষেপণাস্ত্র থেকে ড্রোনের মতো অত্যাধুনিক হাতিয়ার। শুধু তা-ই নয়, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে তাঁদের কমান্ডারদের দ্বারাই পরিচালিত হয় সরকারি বাহিনী।

১০ ১৮

শিয়া ধর্মগুরু খোমিনি কুর্সি পাওয়ার এক বছরের মাথায় (পড়ুন ১৯৮০ সাল) আচমকাই ইরান আক্রমণ করে বসেন কিংবদন্তি ইরাকি প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হুসেন। দু’পক্ষে লড়াই চলে টানা আট বছর। তাতে জয়-পরাজয় সে ভাবে নির্ধারিত না হলেও বাগদাদের বাহিনীকে এক ইঞ্চিও জমি ছেড়ে দেয়নি আইআরজিসি। ফলে আমজনতার মধ্যে বৃদ্ধি পায় তাদের জনপ্রিয়তা। ফলে দেশ পুনর্গঠনের ভারও তাদের হাতেই তুলে দেন সর্বোচ্চ নেতা।

১১ ১৮

প্রথম থেকেই ইরানের ক্ষমতাবদলকে ভাল চোখে দেখেনি আমেরিকা। আর তাই যুদ্ধের মধ্যেই তেহরানের উপর নিষেধাজ্ঞা চাপায় ওয়াশিংটন। এর জেরে খনিজ তেলের বিরাট ভান্ডার থাকা সত্ত্বেও খোলা বাজারে তা বিক্রি করতে গিয়ে সমস্যার মুখে পড়ে পারস্য উপসাগরের ওই দেশ। এই পরিস্থিতিতে যাবতীয় চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে উঠতে অভিনব কৌশল অবলম্বন করে আইআরজিসি, যেটা যুক্তরাষ্ট্রকেও চমকে দিয়েছিল।

১২ ১৮

মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রাষ্ট্র পুনর্গঠনে খনিজ তেল, পরিকাঠামো, জাহাজ নির্মাণ ও জল পরিবহণ, টেলি যোগাযোগ, বিমান এবং গভীর সমুদ্রবন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলিতে একের পর এক সংস্থা খোলে আইআরজিসি। বর্তমানে এর শাখা ছড়িয়ে আছে বিদেশেও। এদের মধ্যে অন্যতম হল খতম অল-আম্বিয়া। এটি একটি নির্মাণ সংস্থা। একে সামনে রেখে আবাসন, সেতু বা হাসপাতাল তৈরি করেছে তেহরান।

১৩ ১৮

দ্বিতীয় ধাপে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার নাগপাশ থেকে বেরিয়ে আসতে ইজ়রায়েলের সঙ্গে ছায়াযুদ্ধ শুরু করে আইআরজিসি। তাদের মদতেই লেবাননে হিজ়বুল্লা, গাজায় হামাস এবং ইয়েমেনে গজিয়ে ওঠে হুথিদের মতো প্যালেস্টাইনপন্থী বিদ্রোহী গোষ্ঠী। এদের প্রত্যেকের রাজনৈতিক শাখা রয়েছে। সেটাও নিয়ন্ত্রিত হয় তেহরানের আধা সেনার কমান্ডারদের অঙ্গুলিহেলনে। পাশাপাশি, এদের অত্যাধুনিক হাতিয়ার ও গোলা-বারুদ সরবরাহ করে থাকেন তাঁরা।

১৪ ১৮

সাবেক সেনাকর্তাদের কথায়, পশ্চিম এশিয়ায় চিরস্থায়ী শান্তি ফেরাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের রাস্তায় হাঁটলে বিনিময়ে ইজ়রায়েলের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে হবে ইরানকে। সে ক্ষেত্রে হিজ়বুল্লা, হামাস বা হুথিদের সমর্থন করা আরাঘচি বা আইআরজিসির পক্ষে বেশ কঠিন। তাই আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নিজেদের ছবি ভাল করতে এখন থেকেই কৌশলী অবস্থান নিচ্ছেন তাঁরা।

১৫ ১৮

২০১৯ সালে আইআরজিসিকে জঙ্গি সংগঠন বলে ঘোষণা করে আমেরিকা। সামরিক বিশ্লেষকদের দাবি, আগামী দিনে এর জেরেও বিপদে পড়তে পারে ইরান। সংঘর্ষ-উত্তর রাষ্ট্র পুনর্গঠনে কয়েক কোটি ডলার হাতে পাবে তারা। ফলে দ্রুত পরিকাঠামোর উন্নতি করতে একাধিক বিদেশি সংস্থাকে তেহরান ডাকবে বলেই মনে করা হচ্ছে। আইআরজিসির কোনও না কোনও শাখার সঙ্গে যৌথ ভাবে কাজ করতে হবে তাঁদের।

১৬ ১৮

এ ছাড়া খনিজ তেল এবং তরল প্রাকৃতিক গ্যাস রফতানির ক্ষেত্রেও একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে ইরানকে। আইআরজিসির ভাবমূর্তি নিয়ে পশ্চিমি দুনিয়ার যথেষ্ট আপত্তি রয়েছে। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের দাবি, সেই কারণেই আগ বাড়িয়ে হিজ়বুল্লার ব্যাপারে চরম কোনও প্রতিক্রিয়া দিচ্ছে না তেহরান।

১৭ ১৮

এ ব্যাপারে আরও একটি তত্ত্ব সামনে এসেছে। শান্তি আলোচনা শেষ পর্যন্ত ভেস্তে গেলে ফের নতুন করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামতে হবে আইআরজিসিকে। সেই কথা মাথায় রেখেই ঘর গোছাতে শুরু করছেন তেহরানের আধা সেনার কমান্ডারেরা।

১৮ ১৮

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে হিজ়বুল্লার সঙ্গে লাগাতার যুদ্ধে ব্যস্ত রয়েছে ইজ়রায়েল। ইরান মদতপুষ্ট এই বিদ্রোহী গোষ্ঠীর শীর্ষনেতা হাসান নাসরাল্লাকে ২০২৪ সালে বিমান হামলায় নিকেশ করে ইহুদি ফৌজ। এর জেরে একরকম কোমর ভেঙে যায় তাদের। বর্তমানে লেবাননের রাজধানী বেইরুটের ৮০ কিলোমিটারের মধ্যে পৌঁছে গিয়েছে তেল আভিভের সেনা। ফলে চুপ করে থাকার কৌশল ইরান কত ক্ষণ বজায় রাখতে পারে, সেটাই এখন দেখার।

ছবি: সংগৃহীত, প্রতীকী ও এআই সহায়তায় প্রণীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement