‘সীমাহীন’ দুরত্ব পেরিয়ে নিখুঁত নিশানায় হামলা। আটকাতে পারবে না কোনও আকাশ প্রতিরক্ষা (এয়ার ডিফেন্স) ব্যবস্থা। ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যেই এ-হেন ‘ব্রহ্মাস্ত্র’ এ বার পেতে চলেছে রুশ ফৌজ। ইতিমধ্যেই সংশ্লিষ্ট হাতিয়ারের সফল পরীক্ষা চালিয়েছে মস্কো। তবে হাতিয়ারটি বাহিনীতে সংযুক্ত হওয়ার আগেই শুরু হয়েছে বিতর্ক। একে ‘উড়ন্ত চেরনোবিল’ বলে খোঁচা দিতে ছাড়েননি মার্কিন গবেষকদের একাংশ।
ক্রেমলিনের ফৌজে যুক্ত হতে চলা সীমাহীন পাল্লার সংশ্লিষ্ট হাতিয়ারটি প্রকৃতপক্ষে একটি পরমাণু ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্র। নাম, ৯এম৭৩০ বুরেভেস্টনিক। রুশ ভাষায় এর অর্থ হল ‘স্টর্ম পেট্রেল’। মার্কিন নেতৃত্বাধীন ইউরোপীয় সামরিক জোট উত্তর আটলান্টিক চুক্তি সংস্থা বা নেটো অবশ্য এর পৃথক নামকরণ করেছে। সেটা হল, এসএসসি-এক্স-৯-স্কাইফল। ক্ষেপণাস্ত্রটির পরীক্ষার পর থেকেই এর শক্তি ও দুর্বলতা খুঁজে বার করার চেষ্টা চালাচ্ছে আমেরিকা।
২০১৮ সালেই বুরেভেস্টনিক তৈরির কথা ঘোষণা করেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। যদিও মার্কিন সামরিক বিশ্লেষকদের দাবি, বহু দিন আগে থেকে সংশ্লিষ্ট ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্রটির নির্মাণকাজ চালিয়ে আসছে মস্কো। শুধু তা-ই নয়, মোট ১৩ বার এর পরীক্ষায় পুরোপুরি ব্যর্থ হয় ক্রেমলিন। তার পর নকশায় বদল এনে ফের নতুন উদ্যমে কাজে লাগে রাশিয়া। তাতে সাফল্য পান পুতিনের সামরিক গবেষকেরা।
বুরেভেস্টনিকের সফল পরীক্ষার পর গণমাধ্যমে মুখ খোলেন রুশ প্রেসিডেন্ট। বলেন, ‘‘এটা একটা অনন্য সৃষ্টি, যা বিশ্বের কারও কাছে নেই।’’ অন্য দিকে ক্রেমলিনের সেনাপ্রধান ভ্যালেরি গেরাসিমভেরকে উদ্ধৃত করে সংবাদসংস্থা এএফপি জানিয়েছে, সর্বশেষ পরীক্ষায় সময় সংশ্লিষ্ট ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্রটি টানা ১৫ ঘণ্টা আকাশে উড়তে দেখা গিয়েছে। তবে সেটা হাতিয়ারটির সর্বোচ্চ পাল্লা নয়।
উল্লেখ্য, সীমাহীন দূরত্বের বুরেভেস্টনিকের অধিকাংশ তথ্যই গোপন রেখেছে রাশিয়া। পশ্চিমি গণমাধ্যমগুলির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্রটির দৈর্ঘ্য ১২ মিটার। এতে পরমাণু বা হাইড্রোজ়েন বোমার মতো বিস্ফোরক ভরতে পারবে ক্রেমলিন। মার্কিন গবেষকদের দাবি, হামলার সময় আকাশে আণবিক তেজ়স্ক্রিয়তা ছড়াতে ছড়াতে এগোয় পুতিনের সাধের ‘স্টর্ম পেট্রেল’। সেই কারণেই একে ‘উড়ন্ত চেরনোবিল’ বলে কটাক্ষ করেছেন তাঁরা।
বর্তমানে সীমাহীন পাল্লার রুশ ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্রটির যাবতীয় খুঁটিনাটি খুঁজে বার করার মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি (এমআইটি)। তাদের দাবি, পাল্লা সংক্রান্ত মস্কোর তথ্য অতিরঞ্জিত। তবে এটা ঠিক যে, স্কাইফলের সাহায্যে ২০,০০০ কিলোমিটার দূরের কোনও শহরে পরমাণু হামলা চালাতে পারবেন পুতিন। তবে তার থেকেও বিপজ্জনক হল এর যাত্রাপথে তেজস্ক্রিয়তার বিকিরণ।
প্রসঙ্গত, জ্বালানির নিরিখে নির্ধারিত হয় ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা। অর্থাৎ বেশি পরিমাণে জ্বালানি ভরা গেলে তবেই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে পারবে এই হাতিয়ার। এমআইটির দাবি, সেই কারণেই স্কাইফলে অতি ক্ষুদ্র একটি পরমাণু চুল্লি বসিয়েছে পুতিনের সামরিক গবেষক বাহিনী। বলা বাহুল্য, সেটাই কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে এই হাতিয়ারের পাল্লা। লক্ষ্যের দিকে ওড়ার জন্য সেখান থেকেই অপরিমিত শক্তি পাচ্ছে বুরেভেস্টনিক।
এমআইটির গবেষকদের দাবি, জ্বালানির জায়গায় পরমাণু চুল্লি থাকার কারণে হামলার সময় বাতাসে তেজ়স্ক্রিয় পদার্থ ছড়িয়ে দেবে স্কাইফল। এর ফল হতে পারে মারাত্মক। সে ক্ষেত্রে যে রাস্তা দিয়ে রুশ ক্ষেপণাস্ত্রটি যাবে সেখানকার বাতাসও চরম দূষিত হওয়ার আশঙ্কা থাকছে ষোলোআনা। এমনকি বাতাসে তেজ়স্ক্রিয় বিকিরণের শুরু হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না তাঁরা।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-’৪৫) পরবর্তী সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ঠান্ডা লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ে আমেরিকা। এই পর্বে ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্রের জন্য পরমাণু শক্তিচালিত র্যামজেট ইঞ্জিন তৈরির চেষ্টা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। সেই সামরিক গবেষণার সাঙ্কেতিক নাম ছিল ‘প্রজেক্ট প্লুটো’। যদিও তাতে তেমন সাফল্য পায়নি ওয়াশিংটন। ফলে গত শতাব্দীর ৬০ দশকের মাঝামাঝি সেটা বন্ধ করতে বাধ্য হয় তারা।
এমআইটির গবেষকেরা মনে করেন, ‘প্রজেক্ট প্লুটো’র চিন্তাভাবনার উপর ভিত্তি করেই স্কাইফল ক্ষেপণাস্ত্রটি তৈরি করেছে রাশিয়া। এটি আকাশে ওড়ার সময় পরমাণু শক্তিচালিত ইঞ্জিনের সংস্পর্শে আসছে বাইরের ঠান্ডা বাতাস, যা ওই আণবিক চুল্লির ভিতরে ঢুকে মারাত্মক গরম হয়ে সুনির্দিষ্ট ভেন্টিলেটর দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এসে ক্ষেপণাস্ত্রকে দিচ্ছে রামধাক্কা। হাওয়ার এই বলের জন্যই দৌড়োতে পারছে পুতিনের হাতিয়ার।
রুশ ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্রের এই প্রযুক্তিগত দিকটি নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন মার্কিন গবেষকদের একাংশ। তাঁদের দাবি, বুরেভেস্টনিকের পরমাণু চুক্তির তেজস্ক্রিয় পদার্থের সংস্পর্শে আসতে পারে বাইরের বাতাস। ভেন্টিলেটর দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসার পর সেটাই ছড়াতে থাকবে ওই তেজস্ক্রিয়তা। সে ক্ষেত্রে স্কাইফল ওড়ার সময় দেখতে পাওয়া যাবে এর তেজস্ক্রিয় লেজ। এর প্রভাব কয়েক হাজার বর্গ কিলোমিটার পর্যন্ত ছড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকছেই।
রুশ ক্ষেপণাস্ত্রটিকে ‘উড়ন্ত চেরনোবিল’ বলে কটাক্ষ করার অবশ্য একটি সুনির্দিষ্ট কারণ আছে। ১৯৮৬ সালে সোভিয়েত শাসনকালে রাশিয়ার চেরনোবিল এলাকার পরমাণু বিদ্যুৎ চুল্লিতে পর পর ঘটে দু’টি বিস্ফোরণ। তাতে উড়ে যায় চুল্লির উপরের প্রায় দু’হাজার টন ওজনের ধাতব ঢাকনা। তার পর তেজস্ক্রিয় বিকিরণ খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে লাগোয়া এক হাজার বর্গ কিলোমিটারেরও বেশি এলাকায়।
চেরনোবিল দুর্ঘটনা কেবলমাত্র রাশিয়ায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। হাওয়ার দাপটে ওই সময় ইউরোপের অন্তত ১৩টি দেশে ছড়িয়ে পড়ে তেজস্ক্রিয় বিকিরণ। তড়িঘড়ি পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বন্ধ করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছিল মস্কো। যদিও তাতে তেমন লাভ হয়নি।
রুশ পরমাণু চুল্লির তেজস্ক্রিয়তার জেরে ক্ষতিগ্রস্ত হন ছ’লক্ষ মানুষ। পরবর্তীকালে তাঁদের মধ্যে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান প্রায় চার হাজার জন। মানব ইতিহাসে এত বড় দুর্ঘটনা এখনও পর্যন্ত ঘটেনি। চেরনোবিল কাণ্ডের পর বিকিরণের ছোবল থেকে আমজনতাকে বাঁচাতে পারমাণবিক শক্তি উৎপাদন কেন্দ্রের বাইরে বিশাল এলাকা জুড়ে ‘এক্সক্লুশন জ়োন’ গড়ে তোলে মস্কো প্রশাসন।
তবে বুরেভেস্টনিক ক্ষেপণাস্ত্রের জন্য চেরনোবিলের মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা নিয়ে বেশ সন্দিহান সাবেক সেনাকর্তাদের একাংশ। তাদের দাবি, পরমাণু বিমানবাহী রণতরী বা ডুবোজাহাজে এই ধরনের ছোট আণবিক চুল্লি থাকে। কিন্তু তার জন্য কোনও রকমের তেজ়স্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ছে এমনটা নয়। ফলে ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্রের ক্ষেত্রে সেটা হবে, এটা আগাম ধরে নেওয়ার কোনও কারণ নেই।
সামরিক বিশ্লেষকদের দাবি, ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যেই বুরেভেস্টনিকের মতো আরও কিছু তৈরি করেছে রাশিয়া। এর মধ্যে অন্যতম হল পোসাইডন। গত বছর (২০২৫ সাল) একটি ফৌজি হাসপাতাল পরিদর্শনে গিয়ে এর সম্পর্কে গণমাধ্যমে মুখ খোলেন খোদ পুতিন। বলেন, ‘‘এটি পরমাণু শক্তিচালিত স্বয়ংক্রিয় মনুষ্যবিহীন সাবমার্সিবল যান, যাকে ডুবোজাহাজ থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে।’’
পোসাইডনকে একরকম সামুদ্রিক ড্রোন বলা যেতে পারে। রুশ প্রশাসনের দাবি, এর পাল্লাও সীমাহীন। পরমাণু শক্তিচালিত ডুবোজাহাজের ১০০ ভাগ ছোট পরমাণু চুল্লি দ্বারা এটি পরিচালিত হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে। সংশ্লিষ্ট ড্রোন কী ধরনের বিস্ফোরক বহনে সক্ষম, তা অবশ্য পরিষ্কার নয়।
গত বছর পোসাইডনের সফল পরীক্ষার খবর প্রকাশ্যে আসতেই নড়েচড়ে বসে আমেরিকা। তড়িঘড়ি শক্তি প্রদর্শনে আণবিক বোমা পরীক্ষার নির্দেশ দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি, এর পাশাপাশি মস্কোর হাতিয়ার সম্পর্কে ঢালাও মিথ্যা প্রচার চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। সেই কারণেই পরমাণু ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্রের নামকরণ ‘উড়ন্ত চেরনোবিল’ করেছেন তাঁরা? উত্তর দেবে সময়।