চলতি বছরের ১ এপ্রিল থেকে কার্যকর হচ্ছে নতুন আয়কর আইন। সেই লক্ষ্যে গত ২০ মার্চ ‘আয়কর বিধিমালা, ২০২৬’-এর খসড়া বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রক। সেই নির্দেশিকা অনুযায়ী, এ বার আমূল বদলে যাবে প্রত্যক্ষ কর ব্যবস্থা। ফলে আমজনতার মনে স্বাভাবিক ভাবেই উঠছে একগুচ্ছ প্রশ্ন। নতুন বিধিতে বাড়বে আয়করের অঙ্ক? কী কী পদ্ধতিতে কর হ্রাস বা মকুবের সুবিধা পাবেন তাঁরা?
ভারতের প্রত্যক্ষ কর ব্যবস্থা পরিচালনের দায়িত্ব রয়েছে আয়কর দফতরের নিয়ন্ত্রণে থাকা ‘সেন্ট্রাল বোর্ড অফ ডাইরেক্ট ট্যাক্সেস’ বা সিবিডিটির উপর। এ বছরের জানুয়ারিতে নতুন আইনে আয়কর বিধিমালার খসড়া প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে কোমর বেঁধে কাজে লেগে পড়েছে তারা। এত দিন ১৯৬১ সালের আয়কর আইনের উপর ভিত্তি করে যাবতীয় কর কাঠামো নির্ধারণ করেছিল সরকার। সেই জায়গায় এ বার থেকে ২০২৫ সালের আয়কর আইনে সমস্ত কাজ করবেন আধিকারিকেরা।
কেন্দ্র জানিয়েছে, নতুন আইনের আওতায় আয়কর বিধিমালা প্রকাশের লক্ষ্য হল কর ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ করে তোলা। পাশাপাশি এর মাধ্যমে ডিজিটাল ব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক মানোন্নয়নের দিকেও নজর দিয়েছে সরকার। ওয়াকিবহাল মহলের দাবি, নয়া বিধিতে তথ্য সংগ্রহ, আন্তঃসীমান্ত করে স্বচ্ছতা আনা এবং উন্নত নিয়ন্ত্রণ কাঠামো তৈরি করা সহজ হবে। এতে কর সংক্রান্ত বিরোধ হ্রাস পাবে বলে আশাবাদী প্রশাসন।
এ বছরের ১ ফেব্রুয়ারিতে সংসদে পেশ হয় বাজেট। ওই দিন আয়কর রিটার্ন নিয়ে বড় ঘোষণা করেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ। ফলে করদাতাদের একাংশ রিটার্ন জমার ক্ষেত্রে বাড়তি সময় পাচ্ছেন। নির্মলা জানিয়েছেন, যাঁদের করের ক্ষেত্রে হিসাব পরীক্ষার (পড়ুন অডিট) প্রয়োজন নেই, তাঁরা আইটিআর-৩ এবং আইটিআর-৪ ফর্ম ৩১ অগস্ট পর্যন্ত জমা করতে পারবেন। আগে এই নথি জমা করার শেষ তারিখ ছিল করবর্ষের শেষ দিন।
নতুন আইনে আরও একটি জায়গায় স্বস্তি পাচ্ছেন আয়করদাতারা। সেটা হল, আয়কর হারের স্তর বা স্ল্যাবের কোনও পরিবর্তন হচ্ছে না। অতীতে কেন্দ্রীয় বাজেটের দিনে নতুন স্তর বা স্ল্যাব ঘোষণা করতে দেখা গিয়েছে। কিন্তু, এ বছরের বাজেটে সেটা অপরিবর্তিত রেখেছেন জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী নির্মলা।
বর্তমানে দেশে দু’টি কর কাঠামো রয়েছে। একটি পুরনো এবং অপরটি নতুন কর ব্যবস্থা। প্রথমটিতে আয়করের মোট চারটি স্তর রয়েছে। দ্বিতীয় অর্থাৎ নতুন কর কাঠামোয় মোট সাতটি স্তরে আয়কর নিচ্ছে সরকার। পুরনো কাঠামোয় বার্ষিক আড়াই লক্ষ টাকা পর্যন্ত আয়ে দিতে হবে না কোনও কর। এর পর বছরে পাঁচ লাখ এবং ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত আয়ে যথাক্রমে পাঁচ ও ২০ শতাংশ পর্যন্ত কর ধার্য করেছে কেন্দ্র।
পুরনো কর কাঠামো অনুযায়ী, বছরে ১০ লাখ টাকা রোজগার হলে কর বাবদ দিতে হবে ২০ শতাংশ টাকা। আর ১০ লাখের বেশি আয় করলে করের মাত্রা বেড়ে দাঁড়াবে ৩০ শতাংশ। অন্য দিকে নতুন কাঠামোয় বার্ষিক চার লক্ষ টাকা আয়ে দিতে হবে না কোনও কর। কিন্তু রোজগার বছরে আট লক্ষ টাকা হলে, পাঁচ শতাংশ হারে ধার্য হবে কর। এই কাঠামোয় তৃতীয় স্তর হল ১২ লক্ষ টাকা। তাতে আয়কর ১০ শতাংশ।
নতুন কাঠামোয় বছরে আয়ের পরিমাণ ১৬ লক্ষ, ২০ লক্ষ এবং ২৪ লক্ষ টাকা হলে আয়কর দাঁড়াবে ১৫ শতাংশ, ২০ শতাংশ এবং ২৫ শতাংশ। তবে যদি কেউ বছরে ২৪ লক্ষ টাকার বেশি রোজগার করেন, তা হলে আয়করের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়াবে ৩০ শতাংশ। নতুন ব্যবস্থায় অবশ্য বেশ কিছু ছাড় দিচ্ছে কেন্দ্র। সেই সুবিধা পুরনো কর কাঠামোয় নেই।
২০২৫ সালের বাজেটে নতুন কর কাঠামোয় বিপুল ছাড়ের ঘোষণা করেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ। সেই ঘোষণা অনুযায়ী, বর্তমানে বছরে ১২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত আয়ে দিতে হচ্ছে না কোনও কর। সরকারি এবং বেসরকারি চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে বার্ষিক ১২.৭৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত আয়ে প্রযোজ্য হয়েছে এই নিয়ম।
২০২৪ সালের পূর্ণাঙ্গ বাজেটে নতুন কর কাঠামোর ক্ষেত্রে স্ট্যান্ডার্ড ডিডাকশনের পরিমাণ ৫০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৭৫ হাজার টাকা করেন জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী নির্মলা। পরবর্তী দু’টি বাজেটে সেই নিয়ম অপরিবর্তিত রেখেছেন তিনি। গত বছরের বাজেটে নতুন কর কাঠামোয় নতুন স্ল্যাব ঘোষণার আগে পর্যন্ত বার্ষিক তিন লক্ষ টাকা পর্যন্ত আয়ে দিতে হচ্ছিল না কোনও কর। বছরে আয়ের পরিমাণ তিন থেকে সাত লক্ষ হলে কর ধার্য হত পাঁচ শতাংশ।
নতুন কর কাঠামোর পুরনো স্ল্যাব অনুযায়ী, সাত থেকে ১০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত আয়ে ১০ শতাংশ কর ধার্য করেছিল কেন্দ্র। ১০ থেকে ১২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ১৫ শতাংশ, ১২ থেকে ১৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ২০ শতাংশ এবং ১৫ লক্ষ টাকার বেশি আয়ের ক্ষেত্রে দিতে হত ৩০ শতাংশ কর।
নতুনের মতো না হলেও পুরনো কর কাঠামোয় বেশ কিছু সুবিধা রয়েছে। এতে ৬০ থেকে ৮০ বছর বয়সিরা বছরে তিন লক্ষ এবং ৮০ ঊর্ধ্বেরা বছরে পাঁচ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ছাড় পেয়ে থাকেন। তা ছাড়া করদাতা পিপিএফ (পাবলিক প্রভিডেন্ট ফান্ড), ইএলএসএস (ইকুইটি লিঙ্কড সেভিংস স্কিম্স) এবং জীবন বিমায় দেড় লক্ষ টাকা পর্যন্ত ছাড় পেতে পারেন। পাশাপাশি স্বাস্থ্য বিমায় কর ছাড় দিচ্ছে কেন্দ্র।
১৯৬১ সালের আয়কর আইনে, পুরনো কাঠামোয় গৃহঋণে কর ছাড়ের সুবিধা রয়েছে। এখন এটি বছরে ১.৫ লক্ষ টাকা। নতুন বিধিতে তা বদল করেনি কেন্দ্র। চলতি বছরে বাজেট পেশের আগে এই ঊর্ধ্বসীমা দু’লক্ষ টাকা করার দাবি তুলেছিল শিল্প সংগঠন ক্রেডাই। যদিও বাস্তবে তা হয়নি।
কর বিভাগের দাবি, নিয়ম সহজ করা, জটিলতা কমানো, ভাল ভাবে প্রযুক্তির ব্যবহার এবং করদাতাদের বোঝা কমানোর উদ্দেশ্যেই নতুন কাঠামো গড়া হয়েছে। যদিও আয়কর বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, আয়কর আইনকে আগের থেকে সরল করা হলেও, অনেকে ক্ষেত্রে ধারাগুলি করদাতাদের স্বার্থ কতটা রক্ষা করতে পারবে তা নিয়ে সংশয় থাকছে। এই আবহে নতুন আয়কর বিধি ঘিরে বিভিন্ন মহলে শুরু হয়েছে চর্চা।
আয়কর বিশেষজ্ঞ নারায়ণ জৈন মনে করেন, অনেক ক্ষেত্রে করের বোঝা কমানো হলেও, আগের থেকে বাড়ানো হয়েছে জরিমানা। উদাহরণ হিসাবে জৈন জানান, করদাতার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট অথবা হিসাবের খাতায় নগদ টাকা জমা পড়লে তিনি যদি ওই টাকার উৎস প্রমাণ করতে না পারেন, তা হলে আগে ওই টাকার উপর করের হার ছিল ৭৮ শতাংশ এবং জরিমানা দিতে হত করের ১০ শতাংশ। নতুন ব্যবস্থায় কর ৩৭.৬ শতাংশ করা হলেও জরিমানা হয়েছে করের ২০০ শতাংশ।
এ ছাড়া সম্পত্তি-সহ কিছু ক্ষেত্রে বিক্রির সময় করদাতার প্রকৃত আয়ের থেকে ধরে নেওয়া আয়ের (ডিমড ইনকাম) অঙ্ক সরকারি নথিতে অনেক সময় বেশি থাকে। সরকারি নথিতে উল্লিখিত আয়ের উপরই করদাতাকে কর গুনতে হয়। জৈন বলেন, ‘‘এটা অযৌক্তিক এবং করদাতার স্বার্থবিরোধী। আশা করেছিলাম নয়া আইনে সংশোধিত হবে। কিন্তু হয়নি।’’