Internet Shutdown Threat

তেল-প্রাকৃতিক গ্যাসের পর এ বার ইন্টারনেট! হরমুজ়ের তলায় থাকা বিশ্বের ‘ডিজিটাল ধমনী’তে আঘাত হানবে ইরান?

পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ যখন দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রবেশ করেছে এবং তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের ঘাঁটিগুলিকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হচ্ছে, তখন প্রশ্ন উঠছে, হরমুজ়ে সমুদ্রের নীচে থাকা ইন্টারনেট পরিষেবার জন্য গুরুত্বপূর্ণ কেবলগুলিতেও কি আঘাত হানবে তেহরান?

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ২২ মার্চ ২০২৬ ১০:১৯
Share:
০১ ১৯

পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাতের আবহে খনিজ তেল এবং তরল প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহণের কৌশলগত সামুদ্রিক রাস্তা হরমুজ় প্রণালী অবরুদ্ধ করেছে ইরান। ফলে বিশ্ব জুড়ে ইতিমধ্যেই জ্বালানি-সঙ্কট দেখা দিয়েছে। তার মধ্যেই আবার ইজ়রায়েলের তরফে ইরানের সাউথ পার্স এবং ইরানের তরফে কাতারের রাস লাফান গ্যাসঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা জ্বালানি সংক্রান্ত আশঙ্কাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

০২ ১৯

তিন সপ্তাহ পেরিয়ে পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ থামারও নামগন্ধ নেই। একে অপরকে নিশানা করে ক্রমাগত আক্রমণ শানিয়ে যাচ্ছে যুযুধান ইরান ও ইজ়রায়েল-আমেরিকা। ফলে বারুদের গন্ধে ভরে উঠেছে আরবের আকাশ-বাতাস। সর্ব ক্ষণ সেখানে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে লড়াকু জেট, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন।

Advertisement
০৩ ১৯

এর মধ্যেই আবার ইরানে সংঘাত পরিস্থিতির কারণে নতুন করে একটি উদ্বেগ মাথাচাড়া দিতে শুরু করেছে আর তা হল, ইন্টারনেট পরিষেবা সংক্রান্ত উদ্বেগ। হরমুজ় কেবল খনিজ তেল এবং তরল প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহণের সামুদ্রিক রাস্তা নয়, এই প্রণালীর মধ্যে দিয়ে গিয়েছে গুরুত্বপূর্ণ প্রচুর সমুদ্রগর্ভস্থ ইন্টারনেট কেবল।

০৪ ১৯

পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ যখন দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রবেশ করেছে এবং তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস ঘাঁটিগুলিকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হচ্ছে, তখন প্রশ্ন উঠছে, হরমুজ়ে সমুদ্রের নীচে থাকা ইন্টারনেট পরিষেবার জন্য গুরুত্বপূর্ণ কেবলগুলিতেও কি আঘাত হানবে তেহরান?

০৫ ১৯

হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ থাকার সময় এ-ও আশঙ্কা করা হচ্ছে, লোহিত সাগরের বাব এল-মানদেব প্রণালীও অবরুদ্ধ করতে পারে ইরানের মদতপুষ্ট ইয়েমেনের শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথি। বিশ্বের ‘ডিজিটাল ধমনী’ ওই ইন্টারনেট কেবলগুলি সমুদ্রগর্ভস্থ কেবলের আকারে এই দুই প্রণালীর মধ্য দিয়ে গিয়েছে।

০৬ ১৯

বর্তমানে হরমুজ় প্রণালী জুড়ে সামুদ্রিক মাইন পেতে রেখেছে ইরান। ফলে নিরাপত্তাহীন জলপথের কারণে ওই প্রণালী দিয়ে সমস্ত জাহাজ চলাচল বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে জাহাজসংস্থা এবং বিমাসংস্থাগুলি। অন্য দিকে, লোহিত সাগরে ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী পণ্যবাহী জাহাজ লক্ষ্য করে গুলি চালাচ্ছে, যা ওই সঙ্কীর্ণ জলপথটিকে় আরও বিপজ্জনক অঞ্চলে পরিণত করেছে।

০৭ ১৯

হরমুজ় এবং বাব এল-মানদেব— সঙ্কীর্ণ এই দু’টি প্রণালী সমুদ্রের তলায় বিছোনো ফাইবার-অপটিক তারের এক বিশাল জালের ঠিক উপরে অবস্থিত। হাজার হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত এই সরু তারগুলো ভিডিয়ো কল, ইমেল থেকে শুরু করে ব্যাঙ্কিং লেনদেন এবং এআই পরিষেবা— বিশ্বের ইন্টারনেট ব্যবস্থাকে সচল রাখার প্রায় সমস্ত তথ্য বা ডেটা বহন করে।

০৮ ১৯

বিশ্বব্যাপী টেলিকম, ডেটা সেন্টার এবং ডিজিটাল কাঠামো শিল্পের ওয়েবসাইট ‘ক্যাপাসিটি গ্লোবাল’ জানিয়েছে, বর্তমানে লোহিত সাগরের মধ্য দিয়ে সতেরোটি ‘সাবমেরিন কেবল’ গিয়েছে। এই কেবলগুলি ইউরোপ, এশিয়া এবং আফ্রিকাকে সংযোগকারী ইন্টারনেট ট্র্যাফিকের সিংহভাগ বহন করে।

০৯ ১৯

হরমুজ় প্রণালী অতিক্রমকারী কেবলগুলিও ঠিক ততটাই গুরুত্বপূর্ণ। কেবল তথ্যের অন্যতম প্রধান উৎস ‘টেলিজিয়োগ্রাফি’ জানিয়েছে, পারস্য উপসাগরের সক্রিয় কেবলগুলি হল— এএই-১, ফ্যালকন, গাল্‌ফ ব্রিজ ইন্টারন্যাশনাল কেবল সিস্টেম এবং টাটা-টিজিএন গাল্‌ফ। এই কেবলগুলি ভারতের বৈদেশিক ডেটা সংযোগের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

১০ ১৯

অ্যামাজ়ন, মাইক্রোসফ্‌ট এবং গুগ্‌লের মতো বড় প্রযুক্তি সংস্থাগুলি সংযুক্ত আরব আমিরশাহি এবং সৌদি আরবের মতো উপসাগরীয় দেশগুলিতে বিশাল ডেটা সেন্টার তৈরিতে শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে।

১১ ১৯

তাদের পরিকল্পনা ছিল, এই অঞ্চলটিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পরবর্তী গড়ে পরিণত করা। সমুদ্রের তলদেশের ওই কেবলগুলি ডেটা সেন্টারগুলিকে এশিয়া এবং আফ্রিকার বাজার এবং ব্যবহারকারীদের সঙ্গে যুক্ত রাখে। কেবলগুলি মেরামতেরও প্রয়োজন হয় মাধেমধ্যে।

১২ ১৯

কিন্তু এখন যে হেতু দু’টি প্রণালী দিয়েই জাহাজ চলাচল বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়িয়েছে, ফলে সমুদ্রের তলার কেবলগুলি মেরামতের কাজ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ভাঙা কেবলগুলি মেরামত করার জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষ জাহাজগুলি নিরাপদে ওই এলাকায় প্রবেশ করতে পারছে না।

১৩ ১৯

ফলে কেবলগুলি দুর্ঘটনা বা মাইন বিস্ফোরণের মুখে পড়লে বা ইচ্ছাকৃত ভাবে কেটে ফেলা হলে, নিরাপত্তার অভাবে সেগুলি অনেক দিন ধরে অচল হয়ে পড়তে পারে। বিঘ্নিত হতে পারে ইন্টারনেট পরিষেবা। ব্লুমবার্গকে উদ্ধৃত করে টেলিজিয়োগ্রাফির অন্যতম কর্তা অ্যালান মলডিন বলেছেন, ‘‘যেখানে সক্রিয় সামরিক অভিযান চলছে, সেখানে কেবল মেরামতের জন্য জাহাজগুলো পাঠানো যাচ্ছে না। এই পরিস্থিতিতে ওখানে জাহাজ পাঠানো খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হবে।’’

১৪ ১৯

ওই ইন্টারনেট কেবলগুলি কতটা গুরুত্বপূর্ণ এবং সেগুলি বিকল হয়ে গেলে পরিস্থিতি কতটা গুরুতর হতে পারে, তা আঁচ করা যেতে পারে সাম্প্রতিক অতীতের দিকে তাকালেই। ২০২৪ সালে, গাজ়ায় ইজ়রায়েল-হামাসের মধ্যে সংঘাত চলাকালীন হামাসের প্রতি সমর্থন জানাতে একটি বড় অভিযান চালায় ইরান সমর্থিত ইয়েমেনের বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুথি।

১৫ ১৯

হুথির তরফে লোহিত সাগরের তলায় বেশ কয়েকটি ইন্টারনেট কেবল নষ্ট করা হয়। ফলে এশিয়া এবং আফ্রিকার কিছু অংশে ইন্টারনেটের গতি উল্লেখযোগ্য ভাবে কমে যায়। জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় কেবলগুলি সম্পূর্ণ মেরামত করতে কয়েক মাস সময় লেগে গিয়েছিল সে সময়।

১৬ ১৯

নেটওয়ার্ক সংস্থা ‘কেন্টিক’-এর ইন্টারনেট বিশ্লেষণ বিভাগের ডিরেক্টর তথা ইন্টারনেট বিশ্লেষক ডাগ ম্যাডোরি বর্তমান ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। ‘রেস্ট অফ ওয়ার্ল্ড’ নামক প্রকাশনায় ম্যাডোরিকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, “একই সঙ্গে দুটি সঙ্কীর্ণ পথ বন্ধ করে দেওয়া হলে একটি বিশ্বব্যাপী বিঘ্ন সৃষ্টিকারী ঘটনা হবে।”

১৭ ১৯

ওই দুই প্রণালীর মধ্যে দিয়ে যাওয়া ইন্টারনেট কেবলগুলির ক্ষতি শুধু ফোন এবং ওয়েবসাইটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, এর প্রভাব আরও অনেক বেশি পড়বে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞেরা। ব্যাঙ্ক, শেয়ার বাজার, হাসপাতাল, কৃত্রিম মেধা সিস্টেম— এ সবই ওই কেবলগুলির উপর নির্ভরশীল। উপসাগরীয় দেশগুলি তো ক্ষতিগ্রস্ত হবেই, ভারতেও ধীর গতিতে চলবে ইন্টারনেট পরিষেবা।

১৮ ১৯

আমেরিকার সংবাদমাধ্যম ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, হরমুজ় প্রণালীর সবচেয়ে সঙ্কীর্ণ অংশে জলের গভীরতা মাত্র ২০০ ফুট। ফলে ইন্টারনেট কেবলগুলি অগভীর জলে রয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্প্রতি ওই অঞ্চলে ইরানের নৌবাহিনীর জাহাজে হামলা চালিয়ে ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এখনও ওই এলাকায় তাদের ডুবো দল এবং নৌবহর সক্রিয় রয়েছে বলেই খবর।

১৯ ১৯

হরমুজ় প্রণালীর নীচ দিয়ে যাওয়া কেবলগুলির ক্ষতি ইরান করবে কি না তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে ক্ষতির আশঙ্কার বিষয়টি একেবারে উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশেষজ্ঞেরা। আপাতত, কেবলগুলি এখনও কাজ করছে। কিন্তু সমুদ্র মাইন, অব্যাহত হামলা এবং মেরামতকারী জাহাজগুলো বাইরে আটকে থাকায় বিপদের আশঙ্কা রয়েই গিয়েছে।

সব ছবি: রয়টার্স, সংগৃহীত এবং এআই সহায়তায় প্রণীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement