একসঙ্গে ছোড়া যায় ৬০টি ছোট ছোট ক্ষেপণাস্ত্র (মাইক্রো মিসাইল)! চিন-পাকিস্তানের ঘুম উড়িয়ে এ বার সেই ভয়ঙ্কর ভার্গবাস্ত্রকেই ভারতীয় ফৌজের হাতে তুলে দিচ্ছে একটি দেশীয় সংস্থা। কোম্পানির কর্ণধারের দাবি, আমেরিকা, রাশিয়া হোক বা নেটো-রাষ্ট্র, বর্তমানে বিশ্বের কোনও সৈন্যবাহিনীর কাছে নেই এই প্রযুক্তি। ফলে আগামী দিনে শত্রুর পাঠানো পঙ্গপালের মতো ড্রোনের ঝাঁককে (সোয়ার্ম ড্রোন) যে মাঝ-আকাশেই সংশ্লিষ্ট এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমের সাহায্য নয়াদিল্লি ওড়াতে পারবে, তা বলাই বাহুল্য।
গত বছর মে মাসে অপারেশন সিঁদুরের পর ওড়িশার গোপালপুরে ভার্গবাস্ত্রের পরীক্ষা চালায় ভারতীয় ফৌজ। ওই সময় এর শক্তি সম্পর্কে সরকারি ভাবে কোনও তথ্য প্রকাশ করেনি প্রতিরক্ষা মন্ত্রক। প্রায় ন’মাসের মাথায় সংশ্লিষ্ট হাতিয়ারটির সক্ষমতা নিয়ে একাধিক বিস্ফোরক তথ্য দিলেন নির্মাণকারী সংস্থা সোলার ডিফেন্স অ্যান্ড অ্যারোস্পেস লিমিটেডের (এসডিএএল) প্রতিষ্ঠাতা তথা চেয়ারম্যান সত্যনারায়ণ নন্দলাল নুওয়াল, যা বেজিং ও ইসলামাবাদের রাতের ঘুম কেড়ে নেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট, বলছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা।
সম্প্রতি, মহারাষ্ট্রের নাগপুরে হওয়া একটি অনুষ্ঠানে ভাষণ দেন সোলার ডিফেন্সের চেয়ারম্যান সত্যনারায়ণ। সেখানে তিনি বলেন, ‘‘বিশ্বের শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলিতে (এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম) একসঙ্গে চারটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার সুবিধা থাকে। আর এখানেই ভার্গবাস্ত্র একেবারে আলাদা। এর সাহায্যে একসঙ্গে ৬০টি মাইক্রো-মিসাইল ছুড়তে পারবে ফৌজ। ফলে লড়াইয়ের সময় এ দেশের আকাশকে পুরু কবচে ঢেকে ফেলতে কোনও অসুবিধা হবে না তাদের।’’ এই প্রযুক্তি রাশিয়া বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নেই বলেও দাবি করেছেন তিনি।
শত্রুর পাঠানো ড্রোন, ব্যালেস্টিক ও ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্র থেকে বাঁচতে বর্তমানে বহুস্তরীয় এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম ব্যবহার করে থাকে ভারতীয় বিমানবাহিনী। এর মধ্যে অন্যতম হল রাশিয়ার তৈরি এস-৪০০ ট্রায়াম্ফ, ইজ়রায়েলের বারাক-৮ ও স্পাইডার এবং এ দেশের প্রতিরক্ষা গবেষণা সংস্থা ডিফেন্স রিসার্চ ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজ়েশন বা ডিআরডিওর নকশায় তৈরি আকাশ ক্ষেপণাস্ত্র। অপারেশন সিঁদুরের সময় পাকিস্তানের পাইলটবিহীন যানগুলি মোকাবিলায় এগুলি পারফরম্যান্স ছিল নজরকাড়া। লড়াই চলাকালীন কমান্ড ও কন্ট্রোল সেন্টার থেকে সংশ্লিষ্ট হাতিয়ারগুলিকে একসঙ্গে ব্যবহার করে বাহিনী।
সত্যনারায়ণ জানিয়েছেন, বায়ুসেনার হাতে থাকা যাবতীয় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে মিশে গিয়ে দিব্যি কাজ করতে পারবে তাঁর সংস্থার তৈরি ভার্গবাস্ত্র। আবার প্রয়োজনে স্বতন্ত্র ভাবেও একে ব্যবহার করা যাবে। একগুচ্ছ এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম থাকা সত্ত্বেও কেন সোলার ডিফেন্স নির্মিত হাতিয়ার বাহিনীর বহরে শামিল করতে চাইছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রক? বিশ্লেষকদের দাবি, এর নেপথ্যে রয়েছে একাধিক কারণ। তবে সস্তায় ড্রোন ধ্বংসের যুক্তিকেই সবচেয়ে জোরালো ভাবে তুলে ধরেছেন তাঁরা।
অপারেশন সিঁদুরের সময় ঝাঁকে ঝাঁকে পাইলটবিহীন যান পাঠিয়ে ভারতীয় সেনাকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলার ছক কষে পাকিস্তান। সেই লক্ষ্যে অত্যন্ত সস্তা দরের সোয়ার্ম ড্রোনে এ দেশের একাধিক সামরিক ছাউনিকে নিশানা করেছিল ইসলামাবাদ। ফলে বাধ্য হয়ে সংশ্লিষ্ট পাইলটবিহীন যানগুলিকে মাঝ-আকাশে উড়িয়ে দিতে এস-৪০০ বা আকাশ-তিরের মতো এয়ার ডিফেন্সকে কাজে লাগায় নয়াদিল্লির ফৌজ। কিন্তু, সংশ্লিষ্ট হাতিয়ারের নির্মাণখরচ ড্রোনের চেয়ে অনেক বেশি হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন শীর্ষ সেনাকর্তাদের একাংশ।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের দাবি, এই লড়াই লম্বা সময় ধরে চললে আখেরে লাভ হত পাকিস্তানের। কারণ, সে ক্ষেত্রে সস্তার ড্রোন পাঠিয়ে ভারতের কোটি কোটি টাকার এয়ার ডিফেন্সের ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডার খালি করে ফেলত ইসলামাবাদ। ফলে অপারেশন সিঁদুর চলাকালীনই সস্তার ড্রোন ধ্বংস করতে সমমূল্যের হাতিয়ারের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে নয়াদিল্লি। কিছু দিনের মধ্যেই জানা যায়, এ ব্যাপারে গবেষণায় অনেক দূর এগিয়েছে সত্যনারায়ণের সোলার ডিফেন্স। ফলে ভার্গবাস্ত্রের পরীক্ষার ছাড়পত্র দিতে বেশি দেরি করেনি কেন্দ্র।
গত বছরের (২০২৫ সালের) ১৩ মে গোপালপুরের ফায়ারিং রেঞ্জে ভার্গবাস্ত্রের প্রথম বার পরীক্ষা করে ভারতীয় বিমানবাহিনী। ওই সময় সেখানে হাজির ছিলেন আর্মি এয়ার ডিফেন্সের পদস্থ কর্তারা। পরীক্ষার সময় দু’সেকেন্ডের মধ্যে স্যালভো মোডে ছোড়া হয় দু’টি রকেট। পরে আরও চারটি রকেট ছুড়ে ড্রোন ধ্বংসের মুনশিয়ানা দেখায় সোলার ডিফেন্সের ওই হাতিয়ার। সূত্রের খবর, প্রতি বারই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে আঘাত করতে সক্ষম হয়েছে ভার্গবাস্ত্র।
নির্মাণকারী সংস্থার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটির পাল্লা আড়াই কিলোমিটার। তবে ৬-১০ কিলোমিটার দূরত্বে ড্রোনের ঝাঁককে চিনে নিতে পারে ভার্গবাস্ত্র। হাতিয়ারটিতে রয়েছে বিপুল সংখ্যায় আনগাইডেড মাইক্রো-মিসাইল। সেগুলি ২০ মিটারের ব্যাসার্ধের মধ্যেও পাইলটবিহীন যানের ঝাঁককে উড়িয়ে দিতে সক্ষম। মোট দু’টি স্তরে কাজ করে ভার্গবাস্ত্র। দু’টিরই প্রাথমিক পরীক্ষা ইতিমধ্যে শেষ করেছে এ দেশের বাহিনী।
ভার্গবাস্ত্রের ভিতরে থাকা রকেট ও তার বিস্ফোরক আবার তৈরি করেছে ইকোনমিক এক্সপ্লোসিভ লিমিটেড নামের আর একটি ভারতীয় সংস্থা। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে পাঁচ হাজার মিটার বা তার থেকে বেশি উচ্চতার যে কোনও ধরনের ভূখণ্ডে একে মোতায়েন করতে পারবে ফৌজ। বিমানবাহী রণতরী এবং ডেস্ট্রয়ার শ্রেণির যুদ্ধজাহাজকেও ড্রোন হামলা থেকে ভার্গবাস্ত্র রক্ষা করতে পারবে বলে জানিয়েছে নির্মাণকারী সংস্থা সোলার ডিফেন্স।
এ-হেন ভার্গবাস্ত্রকে কত সংখ্যায় বাহিনীর বহরে শামিল করা হবে, তা অবশ্য স্পষ্ট নয়। সাবেক সেনাকর্তারা অবশ্য মনে করেন, সব কিছু ঠিক থাকলে এ বছরই প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের থেকে বড় অঙ্কের বরাত পাবে সোলার ডিফেন্স। এটি ব্যবহারের বেশ কিছু সুবিধা রয়েছে। হাতিয়ারটি সম্পূর্ণ ভাবে দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি হওয়ায় আগামী দিনে এর পাল্লা বৃদ্ধি করতে তেমন সমস্যা হবে না গবেষকদের। তা ছাড়া প্রয়োজনমতো এর রকেটের অদলবদল করতে পারবেন আকাশ প্রতিরক্ষায় যুক্ত সৈনিকেরা।
সোলার ডিফেন্সের কর্ণধার সত্যনারায়ণ জানিয়েছেন, ভার্গবাস্ত্রের সাফল্য ভারতীয় অর্থনীতিকে মজবুত করবে। কারণ, আগামী দিনে এই হাতিয়ার ‘বন্ধু’ রাষ্ট্রগুলিকে রফতানির পরিকল্পনা আছে তাঁদের। নাগপুরের অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘‘আমাদের অত্যাধুনিক প্রযুক্তির অধিকাংশ অস্ত্রই বিদেশ থেকে কিনতে হয়। সেই ফাঁক পূরণে সোলার ডিফেন্স মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে। জাতীয় স্বার্থে এটা খুবই প্রয়োজন। আগামী দিনে এ ব্যাপারে আমাদের বিদেশি নির্ভরশীলতা পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে হবে।’’
আকাশ প্রতিরক্ষার পাশাপাশি অপারেশন সিঁদুরের পর থেকে ড্রোনশক্তিও বৃদ্ধি করে চলেছে নয়াদিল্লি। সম্প্রতি বেলারুশের থেকে বেরকুট-বিএম জেট পাওয়ার্ড কামিকাজ়ে ড্রোন হাতে পেয়েছে বাহিনী। আত্মঘাতী এই পাইলটবিহীন যানগুলির পাল্লা ১৫০ কিলোমিটার। ঘণ্টায় ৪১০ কিলোমিটার বেগে ছুটে গিয়ে নিখুঁত নিশানায় হামলা চালাতে পারে বেরকুট। উচ্চ মূল্যের সামগ্রী ধ্বংস করার লক্ষ্যে এই আত্মঘাতী ড্রোন প্রতিরক্ষা মন্ত্রক কিনেছে বলে জানা গিয়েছে।
এ ছাড়া কিছু দিনের মধ্যেই আমেরিকা থেকে মানববাহী (ম্যান-পোর্টেবল) ট্যাঙ্ক ধ্বংসকারী (অ্যান্টি ট্যাঙ্ক) জ্যাভলিন ক্ষেপণাস্ত্র পাবে ভারত। প্রতিরক্ষা মন্ত্রক সূত্রে খবর, আপাতত জরুরি ভিত্তিতে ফৌজের জন্য কেনা হচ্ছে ২৫টি লঞ্চার এবং ১০০টি ট্যাঙ্ক ধ্বংসকারী ক্ষেপণাস্ত্র। হাতিয়ারটির পোশাকি নাম ‘এফজিএম-১৪৮ অ্যান্টি ট্যাঙ্ক জ্যাভলিন মিসাইল’। এ ছাড়া এক্সক্যালিবার প্রিসিশন স্ট্রাইক কামানের গোলাও নয়াদিল্লিকে সরবরাহ করবে যুক্তরাষ্ট্র। জোড়া হাতিয়ার এবং বারুদের জন্য ৯.৩ কোটি ডলার পাবে আমেরিকা। ভারতীয় মুদ্রায় যেটা প্রায় ৮২৬ কোটি টাকা।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলে নিজের জাত চেনায় জ্যাভলিন। এর সাহায্যে মস্কোর একের পর এক টি-৭২ ও টি-৯০-এর মতো অতিশক্তিশালী ট্যাঙ্ক উড়িয়েছে কিভের ফৌজ। ফলে পশ্চিমের প্রতিবেশীর এলাকা দখলে গতি কমাতে বাধ্য হয় ক্রেমলিন। জ্যাভলিনের কারণেই বহু রণাঙ্গনে থমকে যায় রুশ আর্মার্ড ডিভিশনগুলির দ্রুত অগ্রসর।
১৯৮৯ সালে জ্যাভলিনের নকশা তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি প্রতিরক্ষা সংস্থা। সেগুলি হল, টেক্সাস ইনস্ট্রুমেন্টস, মার্কিন ম্যারিয়েটা (বর্তমান রেথিয়ন টেকনোলজ়িস) এবং লকহিড মার্টিন। তবে এর উৎপাদনের দায়িত্ব পায় শেষের দু’টি কোম্পানি। অতীতে লিবিয়া ও সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ এবং ইরাক যুদ্ধে এর বহুল ব্যবহার করেছে মার্কিন ফৌজ।
‘ট্যাঙ্ক কিলার’ জ্যাভলিনের বিশেষত্ব হল, সামান্য প্রশিক্ষণের পরেই মাত্র একজন সৈনিক এটিকে ব্যবহার করতে পারেন। ক্ষেপণাস্ত্রটির একটি লঞ্চার রয়েছে, যেটি কাঁধে রেখে নিখুঁত লক্ষ্যে ছোড়া যায় সংশ্লিষ্ট ক্ষেপণাস্ত্র। এর ব্যবহারের সঙ্গে আমেরিকারই তৈরি ‘শোল্ডার ফায়ার্ড’ বিমানবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র স্টিঙ্গারের বেশ মিল রয়েছে।
জ্যাভলিনের ওজন আনুমানিক ২৩ কেজি। বহন করতে পারে সাড়ে আট কেজি বিস্ফোরক। এর লঞ্চার সাধারণত ৬.৪ কেজির হয়ে থাকে। চার কিলোমিটার পাল্লার এই মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র ধীর গতিতে ওড়া হেলিকপ্টার ধ্বংস করতেও পটু। এর আনুমানিক দাম প্রায় দু’লক্ষ ডলার বলে জানা গিয়েছে।