ছবি: তারকনাথ মুখোপাধ্যায়।
উপন্যাসের ব্লার্ব লিখতে বলেছিলেন প্রকাশক মহাশয়। মানে আমার এ বছরের বইমেলায় যে উপন্যাসটি প্রকাশিত হতে চলেছে, সেটির ভাবনাটুকুকেই উপন্যাসের ব্লার্ব বলা হয়, যেটা থাকবে মলাট বা জ্যাকেটের ভিতরের দিকে। আমি লিখে পাঠালাম— ‘এক জন মানুষের মধ্যে কখনও কখনও বাস করে বিভিন্ন মানুষ। বিচিত্র ভাবে। এই বিচিত্র পরিচয়ের আভাসে এক-এক জনের কাছে এক-এক রূপে প্রকাশ পায় সে। আমাদের এই উপন্যাসের নায়ক তার এই নানাবিধ এবং প্রায়শই বিপরীত পরিচয়ে বাস করতে করতে বুঝতে পারে, আসলে তার কোনও পরিচয়ই নেই, ছিল না কোনও দিন। এক সময় সে আক্ষেপে ভেঙে পড়ে বিমূঢ় হয়ে যায় এবং ভাবতে বসে এই সত্তা নিয়ে সে কী করবে— সেটাই এই উপন্যাসের মূল কথা।’
প্রকাশক খুব খুশি হলেন। কারণ তিনি একশো শব্দের মধ্যে লিখতে বলেছেন। আমি তার অনেক কম শব্দে উপন্যাসের মূল ভাবনা লিখেছি।
প্রকাশককে বললাম, “চুয়াত্তর শব্দে উপন্যাসের মূল ভাবনা লেখা সহজ নয়।”
“কেন নয়! আপনি মেধাবী মানুষ। চুয়াত্তর শব্দে একটি উপন্যাসের মূল বক্তব্য লেখা আপনার দ্বারাই সম্ভব। আপনি জিনিয়াস...”
প্রকাশক আমাকে উচ্চতার শিখরে তুলে দিলেন।
বললাম, “আমি ঠিক করেছি এখন থেকে গ্যাস না খেয়ে বরং ফলিডল খাব...”
প্রকাশক আঁতকে উঠে বললেন, “ফলিডল তো বিষ! আপনি বিষ খাবেন কেন?”
আমি বললাম, “না মানে গ্যাস না খেয়ে বিষ খাওয়া ভাল, বুঝলেন কিনা? আপনার এবারের পুজোবার্ষিকী পত্রিকাটিতে উপন্যাসটা লিখলাম, ভেবেছিলাম কিঞ্চিৎ দক্ষিণা পাব। পেলাম না।”
“আরে চিন্তা করছেন কেন! আমি তো আপনার বইটা করছি। বিক্রি হলে, ভাল রয়্যালটি পাবেন...”
‘তার মানে গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল!’ কথাটা বলতে গিয়েও বলতে পারলাম না। এই জাতীয় কথায় আমি অভ্যস্ত নই। কিন্তু এই মুহূর্তে বলতে খুব ইচ্ছে হল, কষ্ট করে দমন করলাম ইচ্ছেটাকে। আমার মান থাকে না এসব কথায়। আমি ভদ্র-সভ্য-মার্জিত।
প্রকাশক এ বার হাবিজাবি কথা বলতে আমি ফোনটা কেটে দিলাম। তাকিয়ে রইলাম লেখার টেবিলের সামনের সাদা দেওয়ালের দিকে। অপলক। ব্যর্থ হয়ে গেল কি আমার জীবনটা? প্রকাশক যা বলছেন— তা মিথ্যে না হলেও অর্ধসত্য। আমার একটু-আধটু নাম-ডাক হয়েছে বাজারে। সেটাকে কোনও দিন পাত্তা দিল না লাবণী। লাবণী আমার স্ত্রী। সরকারি অফিসের চাকরি থেকে রিটায়ার করে এখন ধর্মকর্ম আর গানবাজনা নিয়ে মেতে আছে। আমার লেখার টেবিলটাকে সে কোনও দিনই পাত্তা দেয় না। ওটিকে আবর্জনা না ভাবলেও এক নিষ্কর্মার অক্ষম প্রচেষ্টার কারখানা মনে করে এড়িয়ে এড়িয়ে চলে। যে কাজে স্থায়ী ভাবে অর্থ উপার্জন হয় না, সেটা কোনও কাজ নয়। ওটা স্বপ্নবিলাস...
“আমি বিলাসিতা করি? মানে আমার এ টেবিলে বসে যা-যা আজ পর্যন্ত লিখেছি, সব আবর্জনা?”
লাবণী বলে, “আবর্জনা বলিনি, বলেছি, ওটা কোনও কাজই নয়।”
“তার মানে, আমি এ পর্যন্ত যা-যা করে যাচ্ছি, সব পণ্ডশ্রম?”
“সে তুমি জানো। সায়েন্স নিয়ে পড়াশোনা করেছ, তাই নিয়ে একটা ঘর ভাড়া করে ছাত্রছাত্রীদের পড়িয়েছ এবং উপার্জন করেছ। ওটা ছিল তোমার একটা বিশুদ্ধ কাজ।”
“আর এই টেবিলে বসে গত দু’দশক ধরে যে সাহিত্য করে গেলাম, সব মিথ্যে?”
লাবণী চুল আঁচড়াচ্ছিল। চিরুনিটা চুলে গেঁথে এ বার ঘু্রে দাঁড়াল, বলল, “তুমি আমার মতো ইকনমিক্সের লোক হলে বুঝতে পারতে, জোগান আর চাহিদা কী জিনিস। সমস্ত পৃথিবীটা চলছে অ্যাডাম স্মিথ, মাজলো-র মতো ইকনমিক্সের পণ্ডিতদের তত্ত্বগুলো নিয়ে। এর মধ্যে কোনও ভাবালুতা নেই। তুমি সে-সব গুরুত্ব কখনও বোঝোনি, বোঝার চেষ্টাও করোনি...”
আমি বুঝতে চেষ্টা করলাম, লাবণী ঠিক কোন দিক থেকে তার আক্রমণ শাণাতে চাইছে। বললাম, “কী সব ইকনমিক্স-টিকনমিক্স করছ? ঝেড়ে কাশো তো!”
“ঝেড়ে কাশলে তোমার মানে লাগবে, তাই চেপে যাওয়াই ভাল...”
“না, তোমাকে বলতেই হবে কী চাপতে চাইছ তুমি? আমি যৌবনে যথেষ্ট উপার্জন করে তা তোমার হাতে তুলে দিয়েছি। সে টাকায় ব্যাঙ্ক আমাদের সুদ দিচ্ছে; তা হলে আমার এই টেবিলে বসে সাহিত্য করায় অসুবিধেটা কোথায়?”
লাবণী তাচ্ছিল্যের একটা হাসি ছুড়ে দিয়ে বলল, “বললাম তো, চাহিদা আর জোগান ব্যাপারটাই তুমি বোঝো না। ইট’স আ ফ্যাক্ট অব ইকনমিক্স দ্যাট ইউ ডোন্ট নো।”
“হোয়াট দ্য হেল ডু ইউ ওয়ান্ট টু মিন? কাম আউট ক্লিয়ার!”
লাবণী আবার চুলে চিরুনি চালাতে চালাতে তার সাজসজ্জার পরিপাট্য ভাল করে দেখে নিল আয়নায়। বলল, “যে জিনিসের জোগান বেশি অথচ চাহিদা প্রায় নেই, সেটা কোনও প্রোডাক্টই নয়, অন্তত বিক্রয়যোগ্য পণ্য তো নয়ই। এটাই অ্যাডাম স্মিথের কথা, যেটা তুমি মানতে পারছ না। এর মানেটাও তুমি জানো না বা জানতে চাও না।”
“কী সেটা?”
“ওই টেবিলে বসে যা লিখছ, তা বাজারে কোনও চাহিদা তৈরি করতে পারছে না। তাই ওই কাজ বিলাসিতা ছাড়া কিছু নয়। কারণ ওখান থেকে পয়সা রোজগার হয় না। ইট ইজ় ওয়ার্থলেস টু ডু অ্যান্ড...”
“অ্যান্ড কী?” আমি প্রায়গর্জে উঠলাম।
লাবণী আমার গর্জন উপেক্ষা করে লিপস্টিক দিয়ে ঠোঁট দুটো আরও একটু চওড়া করে নিয়ে বলল, “তর্ক করার সময় আমার নেই, ইচ্ছেও নেই। এখন আমি গানের ক্লাসে যাব।”
“অর্থ উপার্জন হবে তাতে?” আমি খোঁচা মারলাম তাকে।
সে মুহূর্তে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, “গত তিরিশ বছর ধরে অক্লান্ত পরিশ্রম করে এ সংসার চালিয়েছি, এখন আমি আমার জীবনটা উপভোগ করতেই পারি।”
“সে তো আমিও এই টেবিলে বসে সাহিত্য করে জীবনটাকে উপভোগ করছি। তা হলে আমার টেবিলটাকে আবর্জনা ভাবছ কেন?”
শাড়িটার পাটগুলো ভাল করে সাজিয়ে লাবণী বলল, “সততার সঙ্গে বলতে পারো, এ সংসারের খরচ, ফ্ল্যাটের ইএমআই, মেয়ের বিয়ে ইত্যাদির মধ্যে তোমার অবদান কতটুকু? প্রায় কিছুই নয়। তুমি টিউশনি করে প্রথম জীবনে যা আয় করেছ, তা দিয়ে একটা সংসার চালানো যায় না। হঠাৎ এক দিন কোচিং ক্লাস তুলে দিয়ে সাহিত্য নিয়ে পড়লে। সাহিত্য তোমাকে কী দিয়েছে? কিচ্ছু না...”
আমি উত্তেজিত হয়ে প্রায় চিৎকার করে উঠলাম, “মেয়ের বিয়ের পর তোমার অনুমতি নিয়েই কোচিং ক্লাস তুলে দিয়ে সাহিত্য করছি। সেটা আমাকে কিছু না হলেও সমাজে বিশিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে পরিচিতি দিয়েছে।”
লাবণী মুচকি হেসে দরজা খুলল, বলল, “সেই পরিচিতি ধুয়ে তুমি জল খেতে পারো, কিন্তু একটি পয়সাও রোজগার করতে পারো না। ইট হ্যাজ় নো ডিম্যান্ড ইন দ্য মার্কেট...” বলতে বলতে দরজাটা বন্ধ করে সে বেরিয়ে গেল, আর আমি আমার হাতে ধরা দামি পেনটা ছুড়ে মারলাম বন্ধ দরজার দিকে। খানিক ক্ষণ চুপ করে বসে রইলাম। তার পর চেয়ার থেকে উঠে টেবিলে আমার অর্ধসমাপ্ত ছোটগল্পটি হাতে নিয়ে কুচি কুচি করে ছিঁড়ে উড়িয়ে দিলাম ঘরময়। সিগারেট ধরিয়ে পায়চারি করতে শুরু করলাম।
কানে বাজছে ইকনমিক্স, অ্যাডাম স্মিথ। ক্রমশ শব্দদু’টি আমাকে আরও উত্তেজিত করল। আমি আমার টেবিলে রাখা কাগজপত্র, বইখাতা উন্মাদের মতো ছুড়ে ফেললাম মেঝেয় এবং পশুর মতো লাথি মারতে শুরু করলাম ওই আবর্জনায়। বার বার বলতে থাকলাম, “ফাক দ্যাট সাপ্লাই অ্যান্ড ডিম্যান্ড... অ্যান্ড...”
*****
“আমাকে দিয়ে কোনও কাজ হবে না। আমি এখন বাতিল মানুষ, যে তার কাজ দিয়ে একটি পয়সাও রোজগার করতে পারে না।”
“তা কেন? আপনি আমাদের গর্ব। আপনি আমাদের প্রতিবেশী, তার ফলে আমরা একটা বাড়তি শ্রদ্ধা অনুভব করি।”
আমি ভদ্রমহিলাকে হাত তুলে থামতে বললাম। তিনি একটু অপ্রস্তুত হয়ে চোখ নামিয়ে নিলেন। অস্পষ্ট স্বরে বললেন, “আমাদের পাড়াতেই একটা নাচ-গানের প্রতিষ্ঠান আছে, তার সভাপতি চাইছিলেন, আপনি আমাদের প্রতিষ্ঠাদিবসে প্রধান অতিথি হিসেবে আসুন। ছেলেমেয়েরা আনন্দ পাক। এই আর কী...”
ভদ্রমহিলাকে প্রকৃতই ভদ্র-সভ্য-শিক্ষিত ও মার্জিত বলে মনে হতে আমি তাঁর আনত চোখদু’টির দিকে তাকালাম। তিনি আমার কথায় বোধহয় একটু আশাহত হয়েছেন। তার মানে আমার লেখা হয়তো কোনও ক্রমে পড়েছেন। আমি একটু নরম সুরেই বললাম, “আচ্ছা, আপনাদের স্কুল কত দিনের পুরনো?”
ভদ্রমহিলা চোখ তুলে সপ্রতিভ ভাবে বললেন, “দশ বছর।”
“দশ বছর!” আমি একটু বিস্মিত হলাম, বললাম, “তা এ দশ বছরের মধ্যে তো আমাকে এক বারের জন্যও তো নিমন্ত্রণ করেননি, এখন হঠাৎ...”
“আমরা তো আগে জানতাম না যে, আপনি এখানেই থাকেন...”
“এখন কী করে জানলেন?”
“আমার এক কোলিগ এক দিন জানতে পেরেছে। ও-ই বলল আপনার কথা। আসলে আপনার মতো এক জন কৃতী মানুষ আমাদের কাছাকাছি থাকেন, জানতাম না। তা সভাপতিমশাই বললেন...”
আমি উৎসুক হয়ে বললাম, “যে কোলিগের কথা বলছেন, তার নামটি জানতে পারি কি?”
“সুনন্দা দাস। ও গান শেখায়।”
“তিনি কী করে জানলেন?”
আমার পুলিশি জেরায় ভদ্রমহিলা একটু বিরক্ত হলেন, বললেন, “তা আমি বলতে পারব না। হয়তো কোনও নতুন ছাত্রছাত্রীর কাছে...”
আমি মুচকি হেসে সুর নরম করে বললাম, “আপনি আমার কোনও লেখা পড়েছেন?”
“হ্যাঁ। আপনার ‘অনির্বচনীয়’ উপন্যাসটি খুব ভাল লেগেছে।”
“ওটা কিন্তু ভাল বিক্রি হয় না।”
ভদ্রমহিলা বললেন, “ভ্যান গঘের জীবিতকালে একটিমাত্র ছবি বিক্রি হয়েছিল। সেটা কিনেছিলেন তাঁর নিজের ভাই। তা ছাড়া কাফকা তাঁর সমস্ত লেখা পুড়িয়ে ফেলে দিতে দিয়েছিলেন তাঁর বন্ধুকে।”
উৎসাহে আমি নড়েচড়ে বসলাম। ইকনমিক্স বিষয়টা কেমন ফুৎকারে উড়িয়ে দিলেন! বললাম, “আপনাদের অনুষ্ঠানটা কবে হচ্ছে?”
“সামনের রবিবার, মানে পনেরোই অগস্ট সকালে।”
“তা ওখানে গিয়ে প্রধান অতিথি হিসেবে কী করতে হবে?”
“ছাত্রছাত্রীদের একটু কিছু বলবেন, ফ্ল্যাগ তুলে ওদের একটু অনুপ্রাণিত করবেন— এই আর কী!”
কী মনে হল, জিজ্ঞেস করলাম, “আমি যদি ওখানে অ্যাডাম স্মিথের সাপ্লাই আর ডিম্যান্ডের ব্যাপারে বক্তৃতা দিই?”
ভদ্রমহিলা হেসে উঠলেন, বললেন, “শুধু ওটা কেন? কেইসনের খাজনা তত্ত্ব, ম্যালথাসের জনসংখ্যা তত্ত্ব... আপনার যা যা ইচ্ছে, তা-ই বলবেন, কোনও অসুবিধে নেই।”
আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম এই বিদুষীর দিকে, “আপনিও ইকনমিক্সের ছাত্রী?”
“ইয়েস, আনফরচুনেটলি...”
*****
কম্বলের স্তূপের দিকে তাকিয়ে ছিলাম আমি। কলকাতা শহরে রাস্তার ফুটপাতে, মাঠে-ঘাটে ঠিক কত জন লোক থাকে, এরা জানে কি? বোধহয় না। তা না জানুক। এরা এদের সাধ্যমতো বন্দোবস্ত করেছে, সেটাই যথেষ্ট। তার মানে জোগান ও চাহিদার তত্ত্ব এই মুহূর্তে এঁদের মাথায় কাজ করছে না। এঁরা মানছেনও না। অ্যাডাম স্মিথের থিয়োরি জেনেও এঁরা এই কাজে হাত দিয়েছেন। তা হলে লাবণীর প্রিয় ইকনমিক্স-তত্ত্বগুলো অগ্রাহ্য করে এঁরা কাজ করছেন এবং আমার মতো সংসারে আপাত-পরাজিত মানুষকে কিছুটা হলেও গুরুত্ব দিচ্ছেন।
আমার নাম ঘোষণা করা হল। ঘোষক মশাই ভারী গলায় বললেন, “এখন আজকের এই বিশেষ দিনটিতে আমাদের সামনে বক্তৃতা করবেন প্রখ্যাত সাহিত্যিক শ্রীযুক্ত অমুক কুমার তমুক।”
সভায় একযোগে হাততালি পড়ল। আমি উঠে দাঁড়ালাম। দেখলাম, প্রথম সারিগুলিতে বসেছে বাচ্চাকাচ্চারা, দ্বিতীয় সারিতে যুবক-যুবতী আর শেষে বয়স্করা। আমি মঞ্চে সভাপতি এবং অন্যদের সম্মান জানিয়ে কিছু কথা বললাম। বিশেষ করে স্বাধীনতা এবং গানবাজনা সম্বন্ধে। এও বললাম, মূলত অর্থনৈতিক স্বাধীনতাহীন নাগরিকরা ঠিক স্বাধীন নয়, বললাম, “গানবাজনা অথবা অন্য কোনও সংস্কৃতির মানুষ হলে তাকে নিরলস সাধনা করতে হয়। নিছক গালগপ্পো করে একটু হারমোনিয়াম বাজিয়ে আমাদের মহান শিল্পজগৎকে অপমান করবেন না। কখনও ভাববেন না এই সঙ্গীত পয়সা এনে দেবে কি না, তা হলে অসাধ্য হয়ে যাবে আপনার সাধনা। আর কে না জানে, প্রকৃত সাধনা ছাড়া মুক্তি লাভ অসম্ভব...”
হাততালিতে ফেটে পড়ল হলঘর। সভাপতিমশাই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। ধন্য ধন্য পড়ে গেল চার দিকে।
ইতিমধ্যে বাচ্চাকাচ্চারা তাদের ছোট্ট ছোট্ট নোটবই নিয়ে আমার দিকে ধেয়ে এল। সই চাই। প্রত্যেকের নাম জেনে তাদের সই দিলাম। আনন্দে ভরে উঠল মন। নিজেকে এক জন সার্থক ব্যক্তি বলে মনে হচ্ছিল।
সইপর্ব শেষ হল। এ বার কিঞ্চিৎ জলখাবার গ্রহণ। গাড়ি করে রওনা দিলাম কলকাতার বিভিন্ন বস্তি অঞ্চলে। দরিদ্র মানুষদের কম্বল প্রদান করে এখনকার অনুষ্ঠান শেষ।
এ বার যেতে হবে সোদপুরে এক সাহিত্যসভায় পতাকা উত্তোলন করতে। বাড়ি থেকে আগেই বলে এসেছি, দুপুরের ও রাতের খাবার আমার অন্যত্র আয়োজিত হয়েছে, অতএব বাড়িতে সে সব ব্যবস্থা রাখার দরকার নেই।
প্রচুর ছবি উঠল। সেই ছবি ফেসবুকে, ইনস্টাগ্রামে ছড়িয়ে পড়ল। মনের মধ্যে যেন একটা প্রতিশোধ চরিতার্থ করার অনুভূতি নিয়ে সোদপুরে রওনা দিলাম।
*****
সোদপুরে পতাকা উত্তোলন করা হল। দুপুরে এক বাড়িতে খাদ্য গ্রহণ এবং কিঞ্চিৎ ভাতঘুমের পর সন্ধেবেলা শুরু হল সাহিত্যসভা। সঙ্গে অঢেল পানীয়ের বন্দোবস্ত। যাঁর বাড়িতে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন, তিনি এক জন রিটায়ার্ড মিলিটারিম্যান। এই সেনাকর্মীকে কখনও ক্যাপ্টেন আর কখনও কর্নেল বলে সম্বোধন করায় তিনি হেসে বললেন, “আমি ক্যাপ্টেন না কর্নেল সেটা বড় কথা নয়, বরং বলুন আমার গিন্নির লেখা আপনার কেমন লাগে? আমি তো সাহিত্য-ফাহিত্য ঠিক বুঝি না তাই...”
সেনাকর্মীর স্ত্রী মধুমিতা তখন সবার পানপাত্রে স্কচ ঢালছিলেন। খুব সুন্দর করে কথা বলেন। এই শেষ যৌবনে এসেও তিনি যথেষ্ট সুন্দরী।
একটু আগে তিনি তাঁর লেখার ঘর আমাকে দেখালেন। কী নিপুণ করে সাজানো! লেখার টেবিলটা মোটা কাচ দিয়ে ঢাকা। সেখানে একটি অত্যাধুনিক টেবিল ল্যাম্প। তার কাছে কলমদান। সেখানে নানাবিধ পেন-পেনসিল-ইরেজ়ার-হোয়াইটনার এবং একটি দামি ল্যাপটপ। টেবিলের নীচে প্রিন্টার।
আমার খুব ভাল লেগেছিল এই সাজসজ্জা। মুখ দিয়ে বেরিয়ে এসেছিল, “বাঃ!”
মধুমিতা মৃদু হেসে বলেছিলেন, “এ-সব আমার কম্ম নয়। আমার কর্তার পারিপাট্য। ও লিখতে জানে না, তবে সাহিত্যকে খুবই সম্মান করে। আজ আপনার মতো এক জন কৃতী সাহিত্যিক আমাদের বাড়িতে আসবেন জেনে সমস্ত রান্না ও নিজের হাতে করেছে...”
“মানে!” আমি চমকে উঠলাম।
মধুমিতা হেসে বললেন, “ও রান্না করতে খুব ভালবাসে। ছুটির দিন রান্নার লোককে ছুটি দিয়ে রান্না করে মন দিয়ে। আর আমাকে লিখতে বলে মাঝে মাঝে চা-কফি দিয়ে যায়...”
“কী ভাবছেন?” মধুমিতার কথায় আমার সম্বিৎ ফিরল। আমার চোখে ভাসছিল তখনও ভদ্রমহিলার লেখার ঘরটি। আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বললাম, “না, কিছু না তো।”
মধুমিতা বললেন, “কিছু একটা ভাবছেন আপনি...”
আমি মাথা নাড়লাম, “আসলে আপনার লেখার ঘরটি আমার খুব ভাল লেগেছে।”
“তাই!” মধুমিতা হাসলেন, “ও তো বামনের চন্দ্রস্পর্শাভিলাষ। বাদ দিন। আপনি এই রকমের পরিবেশে অভ্যস্ত নন, না? আপনার বাড়িতে এ-সব চলে না বোধহয়।”
“না। আমার গিন্নি এ সব পছন্দ করেন না...”
“নিন গ্লাসটা ধরুন, আপনার কর্নেল সাহেব এখন উৎসাহে ফেটে পড়ে বলবেন ‘উল্লাস’।”
আসর জমে উঠল। এখানে প্রত্যেকেই কিছু না কিছু লেখালিখি করেন। এঁরা সকলেই তাঁদের নিজেদের লেখা কবিতা বা ছোটগল্পের অংশ পড়ে শোনাচ্ছিলেন— মূলত আমার মনোযোগ আকর্ষণ করার জন্যই। আমি এঁদের থেকে এ ক্ষেত্রে একটু এগিয়ে আছি, তাই আমাকে মতামত দিতে হচ্ছে সবার লেখার। ক্রমশ একটা বিরক্তিবোধ জাগছে আমার মনে। মাথায় ঘুরছে আমার স্ত্রীর সেই সাপ্লাই অ্যান্ড ডিম্যান্ড, অ্যাডাম স্মিথের কথা। ভাবলাম এর পর এখানে বলি, এ-সব সাহিত্য করে ক’টা পয়সা আসে? অল ওয়ার্থলেস।
দু’পেগ হয়ে গেছে। এখন লেখা ছেড়ে তর্কাতর্কি শুরু হয়েছে। বাণিজ্যিক কাগজ বনাম লিটল ম্যাগাজ়িন। সূক্ষ্ম খোঁচা আসছে আমার উদ্দেশে।
ইতিমধ্যে মধুমিতা সবাইকে তৃতীয় পেগ সাজিয়ে দিয়ে আবার ফিরে এলেন চার-পাঁচটা বই নিয়ে, বললেন, “এই বইগুলোতে সই করে দিন। আমার মেয়েকে পাঠাব দিল্লিতে। ও আপনার ফ্যান।”
আমি আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে রইলাম। সবই আমার লেখা বই!
মধুমিতা তাড়া দিলেন, “নিন, দু’পেগ হয়ে গেছে। চার পেগের পর যদি আপনার হাত কেঁপে যায়, তা হলে সই করতে অসুবিধে হবে। তার আগে প্রত্যেকটায় সই করুন। আমার মেয়ের নাম সঙ্গীতা।”
*****
আদরে-বাঁদর হয়ে মাঝরাতে বীরের মতো বাড়ির দিকে রওনা হলাম। সঙ্গে চাবি আছে।
লাবণী হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে। ঘুমোক লাবণী, ঘুমিয়ে থাকুক। দেখতে পেল না, আমি এখনও জেগে আছি জ্বলন্ত তারার মতো।
দরজা খুলে লাইট জ্বালালাম এবং আশ্চর্য হয়ে থমকে দাঁড়ালাম। আমার চির আগোছালো টেবিলটা ঝলসে উঠল তার রাজসজ্জায়। নিখুঁত করে সাজানো সেটা। সেখানে চার-পাঁচটা দামি পেন। দু’টি পেনসিল, একটি ইরেজ়ার, হোয়াইটনার আর ছোট-বড় দু’টি স্টেপলার।
আমার বইয়ের আলমারিটা চিরকালই অগোছালো থাকে। সেটা এখন পরিপাটি করে সাজানো। আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। এক পা-এক পা করে এক সময় টেবিলের কাছে এসে আরও অবাক হলাম। এ-ফোর সাইজ়ের কয়েক দিস্তা কাগজ।
তার প্রথম পাতায় লেখা—
“তোমার সকালের বক্তৃতা খুব ভাল হয়েছে। আমার গানের দিদিমণিরা খুব প্রশংসা করেছেন। আমায় তাঁরা বলেছেন, প্রত্যেকটি সার্থক মানুষের পিছনে থাকে তাঁর একমাত্র নারী। আই অ্যাম স্যরি, পারলে আমাকে ক্ষমা করে দিয়ো— ইতি তোমার আমি।”
আমি লাবণীর অ্যাডাম স্মিথ, কেইনস আর ম্যালথাসদের এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়ে দৌড়োলাম বেডরুমের দিকে। আলো জ্বালালাম। সেখানে বিছানায় শুয়ে আছে লাবণী। নিপাট সৌন্দর্য নিয়ে। শেষ যৌবনের আনত শরীর প্রস্তুত করে...
আমি স্থির হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। অ্যাডাম স্মিথ বললেন— ‘এই সুযোগ! চাহিদা আছে, এখন জোগান তোমার হাতে।’
আমি বললাম, ‘অ্যাডামদা, আমি মদ খেলে পাশের ঘরে ঘুমোই।’
অ্যাডাম বললেন, ‘ড্যাম ইট... কাম অন... সাপ্লাই ইট...’
আমি আলো নিবিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লাম বিছানায়। ঈযৎ ভার গলায় বললাম, “আমি কিন্তু মদ খেয়ে এসেছি লাবণী...”
লাবণী মৃদু হাসল। বলল, “তা হোক... তুমি এসো...”
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে