ছবি: প্রসেনজিৎ নাথ।
কীটনাশক তরল তার জ্বালা ছড়িয়ে সঞ্জীবের কণ্ঠনালি বেয়ে পাকস্থলীতে নেমে আসছিল দ্রুত। তীব্র যন্ত্রণা প্রথমে বুকে, তার পরে পিঠে ছড়িয়ে পড়ল। কিছুক্ষণের মধ্যে শরীরের প্রতিটি কোষে যেন বিছের কামড়। অসহ্য কষ্ট হলেও মস্তিষ্ক অসহায় রকমের পরিষ্কার। সঞ্জীব যন্ত্রণায় চিৎকার করার চেষ্টা করে। গলা দিয়ে স্বর বেরোয় না। চার পাশের নিকষ কালো অন্ধকার চেতনায় ঢুকতে শুরু করে এ বার। সাঁতার না জানা ডুবন্ত মানুষ যেমন জলের কাছে আত্মসমর্পণ করে, তেমনই সেই অসীম অন্ধকারে নিজেকে ছেড়ে দেয় সঞ্জীব।
হঠাৎ একরাশ আলো কেউ যেন ওর চোখেমুখে ছিটিয়ে দেয়। আলোর তীব্রতায় ভাল করে বুঝতে না পারলেও অনুভব করে যে, এক জন সুপুরুষ ব্যক্তি ওর সামনে বসে আছেন। আরও এক জন মহিলা পাশ ফিরে দাঁড়িয়ে একগোছা ফুল একটা পাত্রে সাজাচ্ছেন। ফুলগুলো চিনতে পারে না সঞ্জীব। এমন অদ্ভুত রঙের ফুল কখনও দেখেনি ও।
সঞ্জীব অস্ফুটে বলে যে, বাগানে দেওয়ার বিষ খেয়েছে ও।
মহিলা এ বার ওর দিকে ফেরেন, “কীটনাশক! খুব যন্ত্রণা হয় যে!” মহিলার চিন্তিত মুখে স্পষ্টতই সহানুভূতির চিহ্ন।
সামনে বসা পুরুষমানুষটি বলে ওঠেন, “অর্গানোফসফরাস,” তার পর মৃদু হেসে বলেন, “কিন্তু যন্ত্রণার উপশম কি হল?”
সঞ্জীব মাথা নাড়ে। ভাল করে ভদ্রলোককে দেখার চেষ্টা করে।
“এই যন্ত্রণা কি সেই যন্ত্রণার থেকেও বেশি?”
“হ্যাঁ!” সঞ্জীব বুঝতে পারে, ও একটা হাতলহীন চেয়ারে বসে আছে। চেয়ারটা জলে ডোবা। তার চার পাশে জল অনুভব করে সঞ্জীব। সেখানে বসেই উত্তর দেয়।
“বিষ খেলে কেন? আলোনিকার তো কোনও দোষ দেখি না!” মহিলা এ বার সামনে এসে দাঁড়ান।
আশ্চর্য ঘটনা! এই মহিলা আলোনিকাকে চেনেন তার মানে! চিনলেন কী করে? এত দিনে আলোনিকাকে তো সঞ্জীবও চিনতে পারেনি। অথচ ওর বিশ্বাস ছিল আলোনিকাকে ও সম্পূর্ণ ভাবে চেনে। শরীরের প্রতিটি উপত্যকা, শৃঙ্গ, গিরিখাত ওর চেনা। আলোনিকার মনের সব আলো-আঁধারির খোঁজ জানে সঞ্জীব। কতটা অপচয়ের পর মানুষ চেনা যায়? আলোনিকাকে চেনেনি সঞ্জীব।
অথচ প্রায় তিন বছর এক সঙ্গে ঘোরার পর বিয়ে হয়েছিল। মনের দিক থেকে দারুণ মিল ছিল ওদের। দু’জনেই কেকে-র গান ভালবাসত।
“পল, ইয়ে হ্যায় পেয়ার কে পল/ চল, আ মেরে সঙ্গ চল...” দু’জনে মিলে কৃষ্ণনগরের হাইস্ট্রিটে হাতে হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে গান গেয়েছে। কৃষ্ণনগরে আলোনিকার বাড়ি। কলকাতার পাটুলির ফ্ল্যাটে সেদিন মা ছিল না। প্রথম সোহাগ বিয়ের আগে, প্ল্যান করেই।
সঞ্জীবের বাবা মারা গেছেন ছোটবেলায়। মা স্কুলে চাকরি করতেন। আলোনিকাকে দেখে অপছন্দ হয়নি মায়ের। প্রতিটি সম্পর্কেরই একটা হানিমুন পিরিয়ড চলে। স্বামী-স্ত্রীর মতো শাশুড়ি-বৌমারও। বিয়ের এক বছরের মধ্যে মা মারা যান। হঠাৎ কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট। তখনও শাশুড়ি-বৌমার মধুচন্দ্রিমা শেষ হয়নি। সেই জন্য আলোনিকার চিরস্থায়ী বিশ্বাস যে, তার শাশুড়ির মতো ভালমানুষ আর হয় না।
অবশ্য সঞ্জীবকে প্রথমে খুব একটা ভাল ভাবে নেননি আলোনিকার বাবা-মা। আলোনিকা রতনকে ফিট করেছিল। রতন ওদের পাশের বাড়িতে থাকে। গোবেচারা টাইপের। আলোনিকার থেকে বছর কয়েকের ছোট। সঞ্জীবকে রতনের বন্ধু সাজতে হয়। এমন ঘনিষ্ঠ বন্ধু যে, কলকাতা থেকে কয়েক দিন অন্তর রতনকে দেখতে না এলে সঞ্জীবের হজমের গোলমাল ঘটে।
রতনের বাড়ির লোকজনও সঞ্জীবকে দেখে ঘাবড়ে গিয়েছিল। সঞ্জীব একটা নামকরা প্রাইভেট ফার্মের ঝাঁ-চকচকে অফিসার। চলনে-বলনে চূড়ান্ত স্মার্ট। রতন কোনও দিন কৃষ্ণনগরের বাইরে যায়নি। কৃষ্ণনগর গভর্নমেন্ট কলেজ থেকে টায়েটুয়ে গ্র্যাজুয়েট। দু’জনের এরকম জয়-বিরু মার্কা বন্ধুত্ব দেখে যে কেউ সন্দেহ করবে। ওদের বন্ধুত্ব তৈরির গল্পটা আলোনিকা বানিয়েছিল।
সেই সময়ে প্রতিবাদ না করলেও সঞ্জীবের ধারণা সাউথে যারা রজনীকান্তর সিনেমার স্ক্রিপ্ট লেখে, তারাও এতটা গাঁজাখুরি গল্প লিখতে পারবে না। সঞ্জীব নাকি ন্যাশনাল হাইওয়ে দিয়ে যেতে গিয়ে মারাত্মক অ্যাক্সিডেন্ট করেছিল। রতন জ্ঞানহারা সঞ্জীবকে রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখেছিল। চেঁচিয়ে লোকজন জড়ো করে তিন কিলোমিটার দূরের জেলা হাসপাতালে নিয়ে গেলে জ্ঞান ফেরে সঞ্জীবের। তার পর থেকে রতনকে সপ্তাহে এক বার না দেখলে অসুস্থ বোধ করে ও। অবশ্য রতনকে দলে আনতে বিস্তর কাঠখড়ের শ্রাদ্ধ করতে হয়েছিল ওদের। বিয়ের আগে পর্যন্ত সপ্তাহে গড়ে দু’শো টাকা করে রতনের পিছনে বরাদ্দ ছিল সঞ্জীবের।
সঞ্জীবের সঙ্গে আলোনিকার প্রেমটা হওয়ার মধ্যে খুব একটা নাটক নেই। কল্যাণী ইউনিভার্সিটিতে গ্র্যাজুয়েশন করেছিল আলোনিকা। সঞ্জীব ওদের কলেজ ফেস্টিভ্যালে গিয়েছিল। এক কমন ফ্রেন্ডের মাধ্যমে আলাপ। ফোন নম্বরের আদানপ্রদান। ভাল লেগে যাওয়া। ওয়টস্যাপে প্রেম নিবেদন। আলোনিকার একটু ‘না না’ করে অবশেষে রাজি হওয়া। তার পর মঙ্গল পান্ডে পার্ক, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, নন্দন, ইডেনে কেকেআর আর দিল্লির ম্যাচ। তার পরে পাটুলির ফ্ল্যাটে মায়ের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেওয়া, আলোনিকার গ্র্যাজুয়েশন করে কৃষ্ণনগরে ফিরে যাওয়া এবং সঞ্জীবের সপ্তাহান্তে কৃষ্ণনগর ভ্রমণ।
এর মধ্যে একমাত্র বেগড়বাঁই করেছিলেন আলোনিকার বাবা-মা। আলগা করে আলোনিকার সঞ্জীবকে ভাল লাগার কথা জানাতেই বেঁকে বসেন ওঁরা। রতনের বন্ধু আর কতটা ভাল হতে পারে? আলোনিকার বাবার তো পরিষ্কার কথা— “রতনে রতন ছাড়া আর কী চিনবে? বরাহর যেমন কচু-প্রীতি।”
তার উপর সঞ্জীব তখন হালকা দাড়ি রাখত। মায়ের অনুযোগ ছিল, “ও কি ভাল করে দাড়ি কামানোরও সময় পায় না?”
মাকে আলোনিকা বোঝানোর চেষ্টা করেছিল যে, ওটাকে স্টাবল বিয়ার্ড বলে। ওটাই এখন ফ্যাশন। “আস্তাবলে তো ঘোড়ারা থাকে!” মায়ের স্পষ্ট ও জোরদার বক্তব্য, “ওই ঘোড়াকে বিয়ে করে তোর কাজনেই বাপু।”
সঞ্জীবকে স্টাবল বিসর্জন দিতে হয়েছিল। দেড়েল পুরুষদের দাড়ি হারানো যে কতটা মর্মান্তিক, তা একমাত্র দাড়িওয়ালা পুরুষরাই জানে। সঞ্জীব আলোনিকাকে পাওয়ার জন্য আযৌবনলালিত দাড়ি কেটে ফেলেছিল।
বিয়ের পর বেশ ভাল কাটছিল ওদের। হানিমুনে গোয়া গিয়েছিল। মায়ের মৃত্যু বিয়ের ঠিক আট মাস সতেরো দিনের মাথায় হয়েছিল। দুঃখের দিনগুলো তাড়াতাড়ি কেটে যায় আলোনিকার স্কুলে চাকরি পাওয়ার খবরে। পোস্টিং কলকাতা থেকে খুব দূরে নয়। পাটুলির ফ্ল্যাট থেকে যাতায়াত করা যায়। এর মধ্যে করোনাকাল এবং দু’জনেরই ওয়ার্ক ফ্রম হোম হওয়ায় অধিকাংশ সময় এক সঙ্গে বাড়ি থাকত ওরা।
সেই সময় থেকে চেষ্টা শুরু হয়। বিয়ের পর বছর চারেক কেটে গেছে। এ বার তো একটা বাচ্চা নেওয়াই যায়। করোনার সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর একটু-আধটু ডাক্তার দেখাতে শুরু করে। অবশ্য প্রথম দিকে খুব একটা সিরিয়াস ছিল না ওরা। ডাক্তাররাও ত্রুটি খুঁজে পাচ্ছিলেন না ওদের।
গয়ংগচ্ছ ভাবটা কাটল আলোনিকার মায়ের তাড়নায়। কৃষ্ণনগরে সুধাংশু চৌধুরী নামের এক জন গাইনি আছেন। তাঁর ইনফার্টিলিটি ক্লিনিকের বেশ নামডাক। মায়ের দাবি, সুধাংশুবাবু ইচ্ছে করলে ছেলেদেরও প্রেগন্যান্ট করে দিতে পারেন। আলোনিকার মাকে বোঝানো দায় যে, সঞ্জীবের প্রেগন্যান্ট হওয়াটা খুব একটা কাম্য নয়। আলোনিকাও কৃষ্ণনগরে এক বার ডাক্তার দেখাতে চায়। সংসারের ব্যাকরণ অনুযায়ী কর্ত্রীর ইচ্ছায় কর্ম।
সুধাংশুবাবুকে খুব একটা খারাপ লাগে না সঞ্জীবের। ব্যবহার একদমই ডাক্তারসুলভ গম্ভীর নয়। কথাবার্তায় বোঝা যায়, আলোনিকাকে বিয়ের আগেও দু’-এক বার দেখেছিলেন। সঞ্জীবকে ‘তুমি’ বলে সম্বোধন করছিলেন। আলোনিকাকে তো একেবারে তুইতোকারি শুরু করে দিলেন। দেখেটেখে গুচ্ছের টেস্ট লিখে দিলেন। কিছু ওষুধও দিলেন। এক মাস পরে আবার আসতে বললেন। প্রথম দিকে শুধু আলোনিকারই টেস্ট করানো হল। দ্বিতীয় ভিজ়িটে গিয়ে জানা গেল আলোনিকার কোনও দোষ নেই। এ বার সঞ্জীবের পালা। বেশ কিছু অস্বস্তিকর টেস্ট হল সঞ্জীবের। রিপোর্ট নিয়ে যাওয়ার কথাদু’মাস পর।
কিন্তু তৃতীয় ভিজ়িটে যাওয়ার আগেই সুখবরটা এল। আলোনিকা প্রেগন্যান্ট। সন্দেহ হওয়ায় সকালে টেস্ট করেছিল ও। খুব একটা আশা নিয়ে নয়। আগেও দু’-এক বার ডেট পিছিয়েছে আলোনিকার। সঞ্জীবের মনে হচ্ছিল, প্রেগন্যান্সি কিটটা নিয়ে একটা অটো ভাড়া করে রাস্তায় রাস্তায় মাইকিং করে!
দু’জনেই সেদিন কাজ থেকে ডুব মেরেছিল। স্বপ্নের মতো দিনটা কেটেছিল ওদের। ঠিক করেছিল উইকএন্ডে কৃষ্ণনগর যাবে।
কিছু কিছু ভাল সময় হঠাৎই শেষ হয়ে যায়। তার পরের খারাপ সময়টা বড় বিভীষিকাময় হয়ে দাঁড়ায়। কৃষ্ণনগরে গিয়ে সকালটা দারুণ কেটেছিল। আলোনিকার বাবা-মা খুব খুশি। দুপুরে চিংড়ির মালাইকারি রেঁধেছিলেন শাশুড়ি। সন্ধ্যার দিকে সরপুরিয়া নিয়ে রতনদের বাড়ি একাই গিয়েছিল সঞ্জীব। হাজার হোক অফিশিয়াল জিগরি দোস্ত বলে কথা।
রতনদের বাড়িটা একতলা। রান্নাঘর, বাথরুম আর দু’খানা শোবার ঘর। অথচ সামনে বেশ খানিকটা ফাঁকা জমি। রতনের বাবার খুব ফুলগাছের শখ। নানা ধরনের ফুলগাছে ভর্তি জায়গাটা। একপাশ করে একটা সিমেন্টের বেঞ্চ তৈরি করেছেন। রতনের বাবা মাঝেমধ্যে সেখানে এসে বসেন।
রতনরা অবশ্য আলোনিকার প্রেগন্যান্সির খবরটা আগেই পেয়ে গিয়েছিল। ফলে ওদের কাছে খবরটার কোনও নতুনত্ব ছিল না। রতনের মা চা করে দিয়েছিলেন। চা খাওয়ার সময় হঠাৎই রতন বলে যে, সঞ্জীবের সঙ্গে ও আলাদা ভাবে কথা বলতে চায়। সঞ্জীব কিছুটা দোনোমোনো করে বাইরে বেরিয়ে এসে সিমেন্টের বেঞ্চে বসে। মনে মনে ঠিক করে নেয় যে, আজকে কিছুতেই রতনকে দু’শো টাকা দেবে না।
পূর্ণিমার কয়েক দিন মাত্র দেরি আছে। বাগানে জ্যোৎস্না যেন অন্ধকারের পিছনে কোণে কোণে দৌড়ে বেড়াচ্ছে। মিষ্টি আলোয় ঝলমল করছে চার পাশ। তার মধ্যে খুব বেমানান ভাবে কানের কাছে মুখ এনে যে কথাটা বলে, তাতে দুলে ওঠে সঞ্জীবের পৃথিবী।
“তুমি আলোনিকাদির বাচ্চার বাবা নও। তোমার রিপোর্ট আমি নিজে হাতে এনেছি। তোমার বাবা হওয়ার ক্ষমতা নেই। আমাকে ডাক্তারবাবুও তাই বলেছেন। মাসিমা তোমার রিপোর্টটা আমাকে আনতে পাঠিয়েছিলেন।”
“তুমি কাউকে রিপোর্টের কথা জানিয়েছ?” বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলায় দুলতে দুলতে প্রশ্ন করে সঞ্জীব। তার মনে গভীর সংশয়।
“হ্যাঁ, আলোনিকাদি জানে। আমি ওয়টস্যাপ করেছিলাম।”
“আচ্ছা, রিপোর্টটা কোথায় রাখা আছে জানো?”
এ বার একটু যেন মনেকরার চেষ্টা করে রতন, “আমি তো বাইরের ঘরে ড্রেসিং টেবিলেরড্রয়ারে রেখেছিলাম।”
সেই আশ্চর্য তরলটার মধ্যে দুলতে থাকে সঞ্জীব। সারা শরীর যেন কেউ শক্ত করে বেঁধেছে। নাভির কাছ থেকে সেই বাঁধন একটা দড়ি হয়ে বাইরে বেরিয়ে গেছে। স্পষ্ট না বুঝতে পারলেও মনে হয় দড়িটা বাঁধা আছে ফুল রাখা পাত্রের সঙ্গে। সেখানে একটু একটু করে জল ঢালেন মহিলা।
“তুমি রতনের কথা বিশ্বাস করে নিলে? আর কিছু ভাবলে না?”
“বিশ্বাস না করে ওর উপায় ছিল না। ওর যে তখন অহঙ্কারে আঘাত লেগেছে! অহঙ্কার বা মদ যে ভাঙছে। আমার স্ত্রী আমার সম্পত্তি— এই বোধ যে ধূলিসাৎ!” জ্যোতির্ময় পুরুষটি বলে ওঠেন।
সত্যিই প্রায় পাগলের মতো ও আলোনিকার ড্রেসিং টেবিল ঘেঁটেছিল। রিপোর্টটা পাওয়াও গিয়েছিল। অ্যাজ়ুস্পারমিয়া। গুগল করেছিল সঞ্জীব। শব্দটার মানে, ওর বীর্যের স্যাম্পলে শুক্রাণু নেই। কী হয় না থাকলে? কেনই বা নেই? গুগল সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না। চেনা এক ডাক্তার-বন্ধুকে ফোন করে। আলতো করে পর্দা সরিয়ে দেয় ডাক্তার। এই বীর্যে বাবা হওয়া সম্ভব নয়। দু’বার জিজ্ঞেস করে ডাক্তারের কথাগুলো রেকর্ড করে নেয় ও। আলোনিকা দোতলায় ওর নিজের ঘরে ছিল। রিপোর্ট হাতে নিয়ে সেখানে ঢোকে সঞ্জীব।
জ্যোতির্ময় পুরুষটি এবার হা হা করে হেসে ওঠেন, তার পর বলেন, “দ্বিতীয় রিপুর বশে তখন উন্মত্ত তুমি। মেরেছিলে স্ত্রীকে? সপাটে চড়? ঘুরে পড়ে গিয়ে আলোনিকার কপাল কেটে গিয়েছিল না?”
তার আগে কথা কাটাকাটি হয়েছিল আলোনিকার সঙ্গে। আলোনিকা সরাসরি অস্বীকার করে। রিপোর্ট দেখাতে এবং ডাক্তারের কথাগুলো মোবাইল খুলে শোনাতে মাথা নিচু করে নিয়েছিল। চড় মেরে আর পিছন ফিরে তাকায়নি সঞ্জীব। তলায় রাখা গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে আসে কৃষ্ণনগর থেকে। বেপরোয়া ভাবে গাড়ি চালিয়ে ফিরেছিল নিজের ফ্ল্যাটে। চাইছিল মারাত্মক একটা অ্যাক্সিডেন্ট হোক ওর। মাঝখানে এক জায়গায় থেমে গাছে দেওয়ার ওষুধ কিনেছিল। সঞ্জীব জানত যে, ওটা একটা বিষ। মারাত্মক বিষ।
“তুমি বিষটা খাওয়ার সময় এক বারও ভাবলে না যে, রিপোর্ট ভুল হতে পারে?” পুরুষটিকে কিছুটা আবছা দেখায়।
“যে মা তোমাকে অত কষ্ট করে পৃথিবীতে এনেছিল, তার মুখ এক বার মনে পড়ল না তোমার?” মহিলার চোখে জল।
“হয়তো কোনও ডাক্তারি কারণে রিপোর্ট ওই রকম এসেছিল। আরও কত কারণ থাকতে পারে, স্যাম্পল পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে, জল বা অন্য রাসায়নিক মিশে যেতে পারে, টাইপিংয়ে ভুল হতে পারে...” পুরুষটি বেশ রাগী গলায় বলেন।
এ বার মহিলা বলেন, “আলোনিকার বয়ান শুনতে চাইলে না এক বারও? যদি অন্য পুরুষও আসে ওর জীবনে, সেটাও তো বন্ধু হিসেবে জানা কর্তব্য তোমার। মনে হল না, আর এক বার অন্য কোথাও থেকে পরীক্ষাটা করানো দরকার?”
সঞ্জীবের জলের আস্তরণে সজোরে আঘাত করে পুরুষটি এ বার বলেন, “তুমি লড়াই করতে ব্যর্থ। তোমাকে ফিরে যেতে হবে আবার।”
জলের আস্তরণটা দ্রুত নেমে যেতে থাকে। সঞ্জীবের দম বন্ধহয়ে আসে।
মহিলা চোখভর্তি জল নিয়ে ফুলের কাছ থেকে দড়িটা ছিঁড়ে নেন, “একটা জীবন নষ্ট করলে তুমি।”
একটা গভীর অন্ধকার সুড়ঙ্গে পড়ে যেতে থাকে সঞ্জীব।
কেউ এক জন ওকে লুফে নেয়। এক জন অচেনা মহিলার মুখের কাছে ওর দুই পা ফাঁক করে ধরে বলে, “এই দেখো... তোমার ছেলে হয়েছে।”
লজ্জা এবং আবার আর একটা জীবন কাটানোর আতঙ্কে চেঁচিয়ে কেঁদে ওঠে সঞ্জীব।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে