ছবি: সৌমেন দাস।
তুমি ওটাও জানো না দেবুদা, কী জানো তুমি!” হাসতে হাসতে দু’কূলপ্লাবী নদীর মতো হয়ে উঠল মেঘমালা, “মা আমাকে হাতে ধরে শিখিয়েছে, জানো, কী ভাবে পুষ্পান্ন রান্না করতে হয়!”
“আমাকেও শিখিয়ে দাও তা হলে!” দেবজ্যোতি বলল।
“চেষ্টা করলেই পারবে!” আত্মবিশ্বাসী গলায় বলল মেঘমালা।
“চেষ্টা করলেই কি সব কিছু পারা যায় মেঘ! সব চেষ্টাই কি সাফল্য পায়? আমি তো জীবনে কম চেষ্টা করছি না, তবুও দেখো, স্বপ্নগুলো হাতছাড়াই হয়ে যাচ্ছে!”
দেবজ্যোতির ম্রিয়মাণ গলায় বলা কথাগুলোয় পাত্তা না দিয়ে মেঘমালা ধমকের সুরে বলল, “আবার! এক কথা কত বার বলবে তুমি?”
“সত্যি কথাই তো বলি মেঘ! না পেয়েছি চাকরি, না পেয়েছি একটা সুস্থির জীবন। আমার জন্য আর কত দিন অপেক্ষা করবে তুমি!”
“তোমার জন্য সারা জীবনের অপেক্ষা আমার। শিবের মাথায় জল ঢালতে ঢালতে আমি মনে মনে শুধু তোমার নামই বলি দেবুদা। প্রার্থনার প্রতিটা স্তবকে লুকিয়ে থাকে তোমাকে পাওয়ার ইচ্ছে। ভগবান শুনুন আর না শুনুন, আমার মন তো তোমাকেই চায়।”
কথাটা বলতে বলতে দেবজ্যোতির কাছে আরও ঘন হয়ে এল মেঘমালা। এক হাত দিয়ে নিজের দিকে টেনে নিল আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলা তরুণটিকে।
দেবজ্যোতি দেখল, পশ্চিম আকাশে ডুবন্ত সূর্যের আলো মাঠের ধানের উপর সোনালি রং ছড়িয়ে দিচ্ছে। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে পিছলে আসা হালকা হাওয়ায় মেঘমালার চুলগুলো উড়ে যাচ্ছিল বার বার। দূরে কোথাও কোকিল ডাকছিল একটা। তার ডাকে বিকেলটা যেন আরও নরম হয়ে উঠছিল।
ওরা দু’জন এই শঙ্খনীলপুরের বাগানবাড়ির পিছনে এসে দেখা করে মাঝেমধ্যে। বাগানবাড়িটা যেখানে শেষ হচ্ছে, তার দশ হাত দূর থেকে শুরু হচ্ছে দিগন্তবিস্তৃত ধানের মাঠ। বিকেলের দিকে সচরাচর এদিকটাতে কেউ আসে না।
দেশের পরিস্থিতি এখন ভাল নয়। লালবাহাদুর শাস্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে জেরবার হয়ে উঠেছে দেশ।
মেঘমালার বয়স এখন উনিশ। ওর অনেক বন্ধুরই বিয়ে হয়ে গিয়েছে। কিন্তু ওদের বাড়ি একটু আধুনিক। মেয়ে লেখাপড়া শিখে স্বাবলম্বী হোক, এমনই ইচ্ছে ওর বাবা-মার।
দেবজ্যোতি ছোটবেলাতেই বাবা-মাকে হারিয়েছে। মামার কাছে মানুষ। পড়াশোনা শিখেছে। এখন ভারত সরকারের উচ্চপদে আসীন হতে চায় সে। কিন্তু সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়ে তার মনোবল তলানিতে।
বেকারত্বের জ্বালা আর মেঘমালাকে হারিয়ে ফেলার ভয়ে রাতে তার ঘুম আসতে চায় না।
“দেবুদা!” আদুরে গলায় ডাকল মেঘমালা।
“শুনছি তো, বলো! পুষ্পান্ন রান্না শেখাবে আমাকে?”
“সিভিল সার্ভিসের মোটা মোটা বইপত্তর ছেড়ে দেবজ্যোতি বসু কিনা শেষে মেয়েদের মতো পুষ্পান্ন রান্না শিখবে!” ফের খুক-খুক করে হেসে উঠল মেঘমালা।
“পুরুষ হলে চাকরি করবে, মেয়ে হলে সন্তান লালনপালন করবে, রান্না করবে, এ-সব ভেদাভেদ দূর হওয়া দরকার, মেঘ। যে দিন এই বৈষম্য মুছে যাবে, সে দিনই দেশের উন্নতির পথ খুলে যাবে, দেখো!”
“আচ্ছা বাবা, বেশ। ঘাট হয়েছে আমার।” দু’হাত দিয়ে দুটো কান মলে জিভটা অল্প বার করে মেঘমালা বলল, “পুষ্পান্ন এক ধরনের ভাতের মতো খাবার। মা আতপ চাল, ঘি, গুড়, দুধ আর নানা শুকনো ফল দিয়ে রান্না করে। সময় লাগে ঠিকই, পরিশ্রমও হয়। তবে এক বার চেখে দেখলে বোঝা যায়, পুরো অমৃত।”
“তুমি শিখেছ? বানাতে পারবে?”
“হ্যাঁ। কেন পারব না! শেষ কয়েক বার তো আমিই বানালাম। বাসন্তীপুজোয় অত লোকের জন্য পুষ্পান্ন তো আমিই রান্না করলাম!”
“আমাকে কবে খাওয়াবে, মেঘ?”
দেবজ্যোতির প্রশ্নটা শুনে মুখে আঁধার নেমে এল মেঘমালার। কয়েক সেকেন্ড চুপ করে বসে থেকে সে বলল, “তোমার সঙ্গে লুকিয়ে দেখা করতে আসাটাই যে কী বড় বিড়ম্বনা! এই ছোট্ট মফস্সলে যদি কেউ দেখে ফেলে, তবে কত কথা উঠবে, ভাবতে পারছ? বাবা হয়তো আমার পড়াটাই বন্ধ করে দেবে। জোর করে বিয়ে দিয়ে দেবে নিশ্চয়ই। কিন্তু তোমাকে না দেখলে বিকেলটাই যেন ফাঁকা লাগে, দেবুদা। সব ভয় ভুলে তাই আবার চলে আসি শঙ্খনীলপুরের এই নির্জন বাগানবাড়ির পিছনে।”
“অত ঝুঁকি নিয়ে আসার দরকারটাই বা কী? এক জন ব্যর্থ মানুষের সঙ্গে নিজের জীবনটা না-ই বা জড়ালে!” আবেগে রুদ্ধ হয়ে এল দেবজ্যোতির গলা।
“পৃথিবীর অন্য সব ভয়ের চেয়েও তোমাকে না দেখার ভয়টাই আমার কাছে সবচেয়ে বেশি, দেবুদা!”
দেবজ্যোতি দূরে তাকিয়ে ছিল। দেখছিল, সূর্যটা আলতো করে মাঠের ঘাসে গড়িয়ে পড়ছে। দূরে কাঁচা রাস্তার ধুলো পাক খাচ্ছে হাওয়ায়, পাখিরা ফিরে আসছে বাসায়।
এই মুহূর্তে দু’জনেই কোনও কথা বলছিল না।
দূরের মন্দির থেকে ভেসে আসা ঘণ্টার শব্দে সময়টা যেন আরও ধীর হয়ে উঠছিল।
দেবজ্যোতির মনে হচ্ছিল, এই মুহূর্তটাই যদি থেমে যেত!
মেঘমালার দুটো চোখে রয়েছে অদ্ভুত এক মায়া। ভবিষ্যতের ভয় আর ভালবাসা আঁকা আছে তাতে। দু’জনের দুটো হাত কাছে এসেও পরস্পরকে ছুঁতে সাহস পাচ্ছিল না।
দেবজ্যোতি ফিসফিস করল, “আর তো মাত্র ক’টা দিন। তোমার বাবা-মা নিশ্চয়ই অন্য কোথাও তোমার বিয়ের ব্যবস্থা করবেন। এক জন পরপুরুষের স্ত্রী হওয়ার পর আমাকে তোমার মনে পড়বে, মেঘ?”
কথাটা শুনে আহত হল মেঘমালা। আসন্ন বিপদের আশঙ্কায় কুঁকড়ে গেল সে, “কী ভাবে তোমার জায়গায় অন্য এক জনকে মেনে নেব দেবুদা! আমার শ্বাস-প্রশ্বাসে তো শুধু তোমারই উপস্থিতি!”
দেবজ্যোতি কোনও কথা বলতে পারল না। দূরে তাকিয়ে দেখল, পাখিরা উড়ে যাচ্ছে মন্থরগতিতে। শেষ বিকেলের আকাশে সূর্যের আলো ফিকে হয়ে এসে ধূসর বিষাদের মতো ছড়িয়ে পড়ছে।
“আচ্ছা দেবুদা, সব সময় খারাপটাই কেন ভাবো! ধরো তুমি চাকরি পেলে। আমাদের বিয়ে হল। দু’জনে সুখে সংসার করলাম। এমনটাও তো হতে পারে!” আশাবাদী শোনাল মেঘমালাকে।
“হ্যাঁ। হতেই পারে।” বিষণ্ণ আর অবিশ্বাসী গলায় দেবজ্যোতি বলল, “ধরো দু’জনের একটা ফুটফুটে মেয়ে হল। তার নাম রাখলাম স্নেহদিয়া। আমরা ডাকব দিয়া নামে। বয়স বেড়ে চলবে আমাদের। দিয়ার বিয়ে হবে। তার ছেলেপুলে হবে। আমরা দাদু-দিদিমা হব। আমি অবসরকালীন জীবন কাটাব একটা খাবারের হোটেল খুলে। দারুণ দারুণ সব খাবার পাওয়া যাবে সেখানে। স্বাদে গন্ধে অতুলনীয় সব রান্না। হুড়মুড়িয়ে লোকে ভিড় জমাবে আমার হোটেলে।”
“দারুণ ভাবনা তো! তা সেখানে কী কী পাওয়া যাবে শুনি!” উৎসাহিত হল মেঘমালা।
“কী পাওয়া যাবে না তাই বলো! সব বাঙালি খাবার পাওয়া যাবে। ভাত, ঘি, মুগডাল, শুক্তো, আলুভাজা, লাবড়া, রুই-কাতলার কালিয়া, চিংড়ির মালাইকারি, খাসির মাংস, পোলাও, চাটনি, চমচম, আর শেষপাতে অবশ্যই থাকবে...”
“দই? তাই তো?”
“না, দই নয়,” এ বার অতি উৎসাহী শোনাল দেবজ্যোতির গলা, “পুষ্পান্ন। মেঘমালার রেসিপি মেনে সেটা রান্না করা হবে। গোটা শহরে একমাত্র আমার হোটেলেই পাওয়া যাবে সেই খাবার!”
“সত্যি দেবুদা, হবে এ-সব! আমার তো বিশ্বাসই হচ্ছে না!” মেঘমালার চোখ দুটো আনন্দে চকচক করে উঠল।
আস্তে আস্তে নেমে আসা গোধূলির আলোয় এই মুহূর্তে বড় স্নিগ্ধ লাগছে মেঘমালাকে।
দূরের আকাশে মেঘেরা রং বদলাতে বদলাতে যেন তাদের কথাই প্রতিধ্বনিত করছে।
*****
দুপুরের শহরটা রোদের ঝিলিকে আর কর্মব্যস্ততায় ছুটে চলেছে প্রতিদিনের মতোই। ঝাঁ-চকচকে রেস্তরাঁটির সামনে হঠাৎই এসে থামল কালো রঙের একটি বিদেশি গাড়ি। তার গায়ে সূর্যের আলো পিছলে যাচ্ছে।
রেস্তরাঁর স্বয়ংক্রিয় কাচের দরজা নিঃশব্দে খুলে গেল, ভিতর থেকে শীতল বাতাসের ছোঁয়া বেরিয়ে এল।
সামনের ফ্যাসাড জুড়ে কাচ আর স্টিলের ঝকঝকে কারুকাজ, দুপুরের রোদে পুরো এলাকাটা যেন আলো ছড়াচ্ছে। পালিশ করা মার্বেলের সিঁড়ি আর স্বয়ংক্রিয় একাধিক দরজা। দু’পাশে সাজানো নকশাদার গাছপালা আর গভীর নীল জলের ফোয়ারা পরিবেশটাকে আরও রাজকীয় করে তুলেছে।
রেস্তরাঁর সামনে দাঁড়ানো কর্মীরা নিখুঁত আদব-কায়দায় অভ্যর্থনা জানাচ্ছে সকলকে।
স্মার্ট ফিটিং স্যুট আর রোদচশমা চোখে গাড়ি থেকে নেমে এল বছর পঁচিশের যে তরুণটি, তার মাথার চুল থেকে জুতোর পালিশ— সব কিছুতেই আভিজাত্য ও যত্নের ছোঁয়া স্পষ্ট। ঠোঁটের কোণের হালকা হাসিতে ব্যক্তিত্বের ঝলক দেখা যাচ্ছে। তার এখানে আসার কারণ একটাই। কিছু ক্ষণ আগে সে নামিয়ে দিয়ে গিয়েছিল তার মা, বোন, ঠাকুমা আর পোষ্য কুকুরটিকে। তাদের খাওয়াদাওয়া শেষে গাড়িতে তুলে শহরটা ঘুরে দেখাবে, এমনটাই পরিকল্পনা।
সে হোটেলে খায়নি, কারণ এই শহরেই তার ছোটবেলার বন্ধুর আস্তানা। চাকরিসূত্রে বন্ধু এখানে থাকে। খুব অনুরোধ করেছিল তার কাছে লাঞ্চ সারতে।
তরুণটির ভাল নাম অধিরাজ বর্মণ। ঠাকুমা ডাকে গোপাল নামে। নামটা ছেলেটির ঠিক পছন্দ না হলেও ফেলতে পারে না ঠাকুমার জন্য। বাড়িতে বাবা আর দাদুকে রেখে অন্য রাজ্যের অন্য শহরে নিছকই ঘুরতে আসা। ঠাকুমার বয়স আশি ছুঁই-ছুঁই হলেও এখনও যথেষ্ট কর্মঠ। প্রতিদিন দুপুরে পুরনো দিনের কিংবা আধুনিক সাহিত্যিকদের গল্প-উপন্যাস পড়া চাই-ই। রাতে শোবার আগে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার কোনও না কোনও অধ্যায়ের অডিয়ো শুনতে শুনতে ঘুমোন।
ঠাকুমা তার প্রিয়তম বান্ধবী। এক ঘণ্টা ঠাকুমাকে দেখতে না পেলে মনটা ছটফট করে অধিরাজের। সেই ঠাকুমা কেমন যেন ফ্যাকাশে মুখ নিয়ে মায়ের সঙ্গে বেরিয়ে আসছে রেস্তরাঁ থেকে। মা কী-সব বোঝানোর চেষ্টা করে চলেছে এক নাগাড়ে। ঠাকুমা কিছুতেই শুনছে না সে-কথা।
অধিরাজ এগিয়ে গিয়ে কিছু বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই ঠাকুমা বলল, “গোপাল, এই হোটেলের ম্যানেজারের সঙ্গে দেখা করব আমি। তুই ব্যবস্থা কর।”
মা বলল, “শেষ পাতে একটা স্পেশাল ডেসার্ট খেয়ে তোর ঠাকুমার মাথাটা গোলমাল হয়ে গেল গোপাল। তার পর থেকেই এক ভাবে বলে চলেছে কথাটা।”
খোঁজ নিয়ে জানা গেল, রজনীশ রাও এই হোটেলের ম্যানেজার। এক জন বর্ষীয়সী তাঁর সঙ্গে দেখা করতে চান শুনে তিনি নিজেই উপস্থিত হলেন ঠাকুমার কাছে।
ঠাকুমার প্রশ্নের উত্তরে ম্যানেজার বললেন, “আমাদের হোটেলের ফাউন্ডার দেবজ্যোতি বসুর ইচ্ছাতেই আজও এই পদটি অপরিবর্তিত রয়ে গিয়েছে। এর নাম পুষ্পান্ন। শোনা যায়, এই পদটি নিয়ে তিনি খুব আবেগপ্রবণ ছিলেন। সময়ের সঙ্গে বাকি সব পদ আধুনিকতার ছোঁয়ায় বদলে গেলেও, এটিকে স্পর্শ করতে দেননি তিনি। পুষ্পান্ন তাই শুধু একটি খাবার নয়, এটি ওই মানুষটির একটা আশ্চর্য দুর্বলতা বলতে পারেন।”
ঠাকুমা কিছু বললেন না প্রথমে। নিঃশব্দে তাকিয়ে রইলেন ম্যানেজারের মুখের দিকে। তার পর ধীরে ধীরে বললেন, “কোথায় থাকেন তিনি? আপনাদের ফাউন্ডার?”
“প্রাক্তন আইপিএস দেবজ্যোতি বসু আট বছর আগে মারা গেছেন। আজও বড়সাহেবের অনুপস্থিতি অনুভব করি আমরা। বড় ভাল মানুষ ছিলেন। বিয়ে-থা, সংসার তো করেননি। এই রেস্তরাঁ, এই রেস্তরাঁর সঙ্গে যুক্ত সকলেই ছিল তাঁর পরিবার...” কথাটা বলতে বলতেই কাকে যেন হাত তুলে অপেক্ষা করতে বললেন ম্যানেজার ভদ্রলোকটি।
তার পর ঠাকুমার চোখের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, “দূরসম্পর্কের এক ভাইয়ের হাতে দায়িত্ব দিয়ে তিনি নিঃশব্দেই বিদায় নিয়েছিলেন। আজ মালিক বদলালেও, প্রতিটি
কোণে লেগে আছে বড়সাহেবের আবেগের ছোঁয়া। আমরা তাঁকেই অনুসরণ করি।”
কথাটা শেষ পর্যন্ত শুনলেন না ঠাকুমা। ধীরপায়ে বেরিয়ে এলেন রেস্তরাঁ থেকে। নিজের অজানতেই ফিরে গেলেন সেই সময়টাতে। ষাট বছর আগের সেই বিকেলটা মেঘমালার ভিতরে আজও সজীব। দেবুদার সঙ্গে প্রেম করার অপরাধে বাড়ির লোকেরা তড়িঘড়ি বিয়ে ঠিক করেছিল এক ধনী জাহাজ-ব্যবসায়ীর সঙ্গে। শেষ বার দেখা করতে গিয়ে মেঘ ছোট্ট টিফিনকৌটোতে করে নিয়ে গিয়েছিল পুষ্পান্ন, আর ভাঁজ করা এক চিরকুটে নিজের হাতে লেখা পুষ্পান্নর রেসিপি। যেন প্রেমটাকে বাঁচিয়ে রাখার শেষ ব্যর্থ চেষ্টা।
তার পর দেবজ্যোতি বসুর সঙ্গে আর কখনও দেখা হয়নি তার। সোনা, হিরে, অট্টালিকা, প্রাচুর্য সবই পেয়েছিল মেঘমালা, শুধু পায়নি সেই মানুষটাকে, যে এক দিন তার নাম ধরে ডাকলে পৃথিবীটা হঠাৎ খুব আপন মনে হত।
স্মৃতির সরণি থেকে ফিরে রেস্তরাঁর সুউচ্চ প্যালেসের গায়ে ঝলমলে অক্ষরে লেখা নামটা তিনি পড়ার চেষ্টা করলেন কাঁপা চোখে। রেস্তরাঁয় ঢোকার সময় ঠিকমতো খেয়াল করেননি।
“দিয়া, কী নাম রে হোটেলটার?” কণ্ঠে অদ্ভুত এক কৌতূহল আর ক্লান্তি নিয়ে প্রশ্ন করলেন মেয়েকে।
দিয়া একটু থেমে, সময় নিয়ে বোঝার চেষ্টা করল। তার আগেই বছর কুড়ির নাতনি হৃদি চিৎকার করে বলে উঠল, “আরিব্বাস! ঠাম্মি, তোমার নাম গো! মেঘমালা!”
অধিরাজ রেস্তরাঁর নামটি আগে দেখলেও, এই প্রথম বাকিরা তাকিয়ে রইল সেই নামের দিকে। ঠাকুমার চোখ হঠাৎ স্থির হয়ে গেল, তার পর কাঁপতে কাঁপতে ভিজে উঠল জলে। যদিও বুঝতে দিলেন না কাউকেই। নিজের নাম, যেটা এখন থেকে ছ’দশক আগে ছিল শুধুই ভালবাসার ডাক, আজ ঝলমলে অক্ষরে দাঁড়িয়ে আছে সামনে। সময়ের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া এক অসম্পূর্ণ জীবনের স্মৃতি যেন হঠাৎ করেই ফিরে এসে ভাসিয়ে দিল বছর আশির মহিলাটিকে।
ছায়াধূসর প্রাচীন অলীক ইচ্ছেগুলো পালকের মতো ভেসে বেড়াতে লাগল মেঘনীল আকাশে।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে